ইসলামের দৃষ্টিতে ‘মা’ এর অধিকার

লেখক : সৈয়দ মোহাম্মাদ আলী আবেদী

ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) বলেছেন, একদা একজন ব্যক্তি রাসূলে খোদা (সাঃ) এর নিকট এসে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! দুনিয়াতে আমি কার খিদমত করবো? রাসূল (সাঃ) বললেন – তোমার মায়ের। লোকটি বললো তারপর কার? রাসূল (সাঃ) বললেন – তোমার মায়ের। লোকটি বললো তারপর ? রাসূল (সাঃ) এবারও ও বললেন – তোমার মায়ের। লোকটি আবারও জিজ্ঞাসা করলো তারপর কার? এরপর রাসূল (সাঃ) বললেন – তোমার বাবার। (আল-কাফিঃ ৯/১৫৯/২, মুনতাখাবে মিজানুল হিকমাহ ঃ ৬১৪)
পৃথিবীতে একজন মানুষ যিনি নিঃস্বার্থভাবে আপনাকে ভালোবাসে তিনি হলেন “মা”।
“মা”- যিনি অবর্ণনীয় বিশাল কষ্টের সাথে লড়াই করে তার গর্ভে থাকা সন্তানকে পৃথিবীর আলো বাতাস দেখার সুযোগ করে দেন।
ইসলাম ‘মা’ এর অধিকার সম্পর্কে আমাদেরকে অনেক কিছু জানিয়েছে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজের কথার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের আধিকার এর কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন, -“তোমাদের পালনকর্তা আদেশ করছেন, তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করো না এবং মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করো। তাদের মধ্যে কেউ একজনও যদি তোমার জীবতদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীয় হয় , তবে তাদেরকে ‘উহ্’ শব্দটিও বলোনা এবং তাদের ধমক দিওনা। তাদের সঙ্গে আদবের সাথে কথা বলো।” (সূরা বনি ইসরাঈল ঃ ২৩)
উক্ত পবিত্র কুরআন এর আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের বুঝিয়েছেন যে, ইসলামে মহান আল্লাহর পরে মাতা-পিতার অধিকার সবথেকে বেশি।
রাসূলে খোদা (সাঃ) বলেন ,“মহান আল্লাহ তায়ালা মায়ের অবাধ্য হওয়াকে তোমাদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।” (সহিহ মুসলীম ঃ ৪৫৮০)
এছাড়াও রাসূল (সাঃ) একই হাদীসে আরো উল্লেখ করে বলেন -“দুনিয়াতে দু’টি বড় অপরাধ রয়েছে, প্রথম বড় অপরাধ হলো- মহান আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে কাউকে শরিক করা এবং দ্বিতীয় বড় অপরাধ হলো- মাকে কষ্ট দেওয়া, মায়ের অবাধ্য হওয়া।”
আসুন আমরা দেখি ইসলাম আমাদেরকে কি কি দায়িত্ব ‘মা’ এর প্রতি দিয়েছে-
সন্তান জন্ম দেবার পর সেই সন্তানকে সঠিকভাবে লালন পালন করে বড় করার দায়িত্ব নেন ‘মা’, ঠিক একই ভাবে সেই সন্তান যখন বড় হয় স্বনির্ভর হয় তখন তার অনেক দায়িত্ব থাকে মায়ের প্রতি। একজন মা তার সন্তানকে স্নেহ মায়া-মমতা দিয়ে বড় করে তোলার পর সন্তানেরা কাছে তেমন কোন চাওয়া থাকেনা ছোট একটি চাওয়া থাকে সেটি হলো মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যাবে সন্তান যেন তার দেখভাল করে তার দায়িত্ব নেয় এতটুকু চাওয়া থাকে মা এর তার সন্তানের কাছে। মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তিনি তার সন্তানের সেবার প্রতি নির্ভশীল হয়ে পড়েন। ইসলামের দৃষ্টিতে তখন সন্তানের প্রধান দায়িত্ব মায়ের সকল প্রকার সুবিধা-অসুবিধাগুলোকে জানা প্রয়োজনের তুলনায় অধিক যত্নশীল হওয়া। মায়ের সেবা করা, মাকে খুশি রাখা।
রাসূলে খোদা (সাঃ) সকল সন্তানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং মাকে খুশি রাখার গুরুত্ব বুঝাতে বলেন -“জান্নাত মায়ের পদতলে” (কানজুল উম্মাহ ঃ ৪৫৪৩৯)
যে সন্তান তার মাকে খুশি রাখবে, মায়ের সকল প্রকার অধিকার নিজ দায়িত্বে পূরণ করবে তাদের সর্ম্পকে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন “তাদের জন্য সুখবর পৌঁছে দাও, যে নিজের ‘মা’ কে খুশি রাখে সে আমাকে খুশি রাখে আর যে আমাকে খুশি রাখে তার জন্য জান্নাত নিশ্চিত রয়েছে। ”(হাদীসে কুদসি)
প্রিয় পাঠক, এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে যেখানে স্বয়ং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন আমাদের শুধুমাত্র মাকে খুশি রাখার জন্য।
পৃথিবীতে যখন একটি সন্তান জন্মগ্রহন করে তখন সেই সন্তানের সব থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থাল হলো তার মায়ের কোল। আমাদের সকলকে সেই আশ্রয় স্থালের যত্ন নিতে হবে , যে আশ্রয় থেকে আজ আমরা এত বড় হয়েছি।
ইসলামে একজন ‘মা’-এর সম্মান অকল্পনিয়। ইসলামে পিতার থেকে মায়ের সম্মান তিনগুন বেশি বলা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- “তার জননী তাকে কষ্ট সহকারে তাকে গর্ভধারন করেছেন এবং কষ্ট সহকারে তাকে প্রসব করেছেন। তাকে গর্ভ ধারন করতে ও স্তন্য ছাড়াতে সময় লেগেছে ত্রিশ মাস”-(সূরা আহকাফ ঃ ১৫)
বর্ণিত এই পবিত্র কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক আমাদের বুঝিয়েছেন যে একজন মা ত্রিশটা মাস যিনি অবর্ণনীয় বিশাল কষ্টের সাথে লড়াই করে অক্লান্ত পরিশ্রম এর মাধ্যমে সন্তানকে লালন-পালন করেন সে ঋন সন্তানের পক্ষে কখনোই শোধ করা সম্ভব নয়।
রাসূলে খোদা (সাঃ) আরও উল্লেখ করে বলেন – “মা সন্তানের জন্য এমন একটি নেয়ামত যে নেয়ামতের জন্য সন্তান সকল প্রকার বিপদ থেকে রক্ষা পায় এবং তিনি আরও বলেন যে, একজন মায়ের এত মর্যাদা যে তিনি মৃত্যু বরণ করার পরেও তার সন্তান যদি কোন বিপদের সম্মুক্ষীণ হয় তখনও সেই সন্তানের জন্য মাকে দোয়া করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”
এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ‘মা’ এর অধিকার মায়ের মর্যাদা ও মূল্যায়ন কতো বেশি।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে যেন মায়ের সকল অধিকার মায়ের প্রতি সকল দায়িত্ব সঠিক ভাবে পূরণ করার তৌফিক দান করেন-(আমিন)।###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More