ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

মূল : শহীদ আয়াতুল্লাহ মুরতাজা মুতাহারী

আজ থেকে চৌদ্দ শত বছর পূর্বে ইসলাম প্রণয়ন করেছিল এই (নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা) আইন এবং নির্দেশ দিয়েছিলঃ “পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ (পুরুষের) এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ (নারীর)।”(সূরা ৪ঃ ৩২)

এই আয়াতে পবিত্র কুরআন বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এনে পরিগণিত করেছে,পুরুষের প্রচেষ্টা এবং পরিশ্রমের ফল লাভের অধিকারী পুরুষ,আর একইভাবে নারীর প্রচেষ্টা ও পবিশ্রমের ফল লাভের অধিকারী নিংসঙ্কোচে নারী।

পবিত্র কোরআনের অন্যত্র এক আয়াতে আদেশ দেয়া হয়েছে,“পরলোকগত পিতামাতা এবং আত্মীয় স্বজনের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে।”(সূরা ৪ ঃ ৭)

এখানে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান যে,পরলোকগত পিতামাতা রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে পুরুষ অবশ্যই অংশীদার তদ্রুপ নারীও (অংশীদার)।

এই আয়াত প্রতিষ্ঠা করেছে নারীর উত্তরাধিকার চৌদ্দশত বছর পূর্বে আজে যেখানে পৃথিবীর  অনেক নারীর উত্তরাধিকারের অধিকার আছে কি না তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক; আর তার পিছনে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস আল্লাহ চাইলে পরিবর্ততে সেটা আমরা আলোচনা করব।

ইসলাম পূর্ব যুগে আরবরা নারীদের উত্তরাধিকার প্রদানে ইচ্ছুক ছিলেন, সত্য কিন্তু পবিত্র কোরআন দ্বারা সেই (উত্তরাধীকার) আইন হল দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।

যে কোন একটা সহজ অথচ সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক নিরীক্ষায় প্রতীয়মান হয় যে,যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা উত্তরাধীকার ইউরোপীয় নারীরা আজ একাবিংশ শতাব্দীতে অর্জন করেছে,ইসলাম নারীদের সেই অধিকার এবং স্বাধীনতা দিয়েছে আজ হতে চৌদ্দশত বছর পূর্বে আর তা প্রথমত এই পার্থক্য সূচিত করার লক্ষ্যে যে ইসলাম হল শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী ধর্ম এবং ইসলাম বিশ্বাস করে পারস্পরিক এবং স্বর্গীয় ন্যায়পরায়নতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায়। লক্ষ্যণীয় যে এক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের কারখানা মালিকদের গোপন অর্থলিপ্সা চরিতার্থ করার মত কোন উদ্দেশ্য ইসলামের ছিল না যারা আরো আরো বেশী মুনাফা লাভ এ ব্যবসায়িক সাফল্যের লক্ষ্যে বিলাতে এই আইন পাশ করায়ে নিয়েছিল যাতে করে তারা নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নামে নারীকে কারখানার শ্রমিক বানানোর মাধ্যমে নিজেদের শ্রমিকের যোগান নিশ্চিত করেছিল এবং বিশ্বব্যাপী এই ঘোষণা দিয়েছিল যে ইউরোপ নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিলো এবং নর নারীর সমঅধিকারকে স্বীকৃতি করে নিলো।

দ্বিতীয়তঃ ইসরাম নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছিল কিন্তু (ঠিক যেমনটি বলেছেন উইল ডুরান্ট) ইউরোপের মত পারিবারিক বন্ধনকে নষ্ট করে নয়,পারিবারের ভিত্তিতে ধ্বংস করে নয় বরং পারিবারিক বন্ধনকে অটুট এবং ভিত্তিকে ইস্পাত মজবুত করার তাগিদে। ইসলাম ইউরোপের মত স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়নি;কন্যাকে তার পিতার সাথে সম্মুখ বিরোধীতায় লিপ্ত করায়নি। এই দুই আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম ঘটিয়েছিল এক বিশাল ও পরিপূর্ণ সামাজিক বিপ্লব তবে তা ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ একান্তই নিরাপদ এবং একেবারেই অহিংস।

তৃতীয়তঃ উইল ডুরান্টের মতে,ইউরোপ প্রকৃতপক্ষে নারীকে মুক্তি দেয়নি,সে নারীকে বদ্ধঘরের নিরস পরিশ্রম থেকে টেনে নিয়ে (নারী স্বাধীনতা নামে) তাকে বন্দী করল গুমোটাবদ্ধ গুদাম এবং নোংরা কারখানার নির্মম ফুটনি আর ঝঞ্ঝাটে। ইউরোপ তার দেহ থেকে এক প্রস্থ গলাবন্ধনী আর শিকল খুলে নিয়ে পরিয়ে দিল আরেককে তা গলাবন্ধনী আর শিকল যেটা তার আগের শিকল গলাবন্ধনী থেকে কোন দিক দিয়েই কম ভারী ও যন্ত্রনাময় নয়। কিন্তু ইসলাম ঘরে বাহিরে সর্বত্রই নারীকে পুরুষের দাসত্ব ও বন্দ্বীত্ব থেকে মুক্ত করেছিল এবং সমস্ত পরিবারের ভরন পোষণ রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বকে বাধ্যতামূলক করেছিল পূরুষের জন্য আর মুক্তি দিয়েছিল নারীকে তার নিজের সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ব্যায়ভার,দায়ভার নির্বাহের দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা থেকে (তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং উত্তরাধিকার দেয়ার পরেও) ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারীর সম্পদ উপার্জন অর্জন,সঞ্চয় এবং প্রবৃদ্ধি ঘটানোর অধিকার থাকলেও সে কোনভাবেই পরিবারের প্রয়োজন ও চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে দায়ী নয়। নিশ্চিতভাবে এই দৃষ্টিভঙ্গি কোন নারীর উপর কলংক বয়ে আনে না,তার সম্মান গৌরব ও সৌন্দর্য যা তার মানসিক পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তার থেকে তাকে বঞ্চিত করে না বা তার উপর কোন প্রভাব ফেলে না বরং সেটাকে সুনিশ্চিত ও সুদৃঢ় করে।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More