ইসলামে মুনাফিক মুনাফিকি-অন্তরের রোগ

অন্তরোগ কাকে বলে?
ভণ্ডামিকে অন্তরের রোগ বলা হয়। আমাদের সমাজের অনেক মানুষ উপলব্ধিও করেন না যে, তারা তাদের কাজের মাধ্যমে ভণ্ডামির লক্ষণ প্রকাশ করছেন। আত্মার এই রোগটি আগ্রাসীভাবে ছড়িয়ে পড়ে যদি কোনো ব্যক্তি এটিকে স্বীকার না করে এবং এর প্রতিকার না খোঁজে। ভণ্ডামি কেবল ভয়াবহ পরিণতিই ডেকে আনে না, বরং ভণ্ডদের আশেপাশের মানুষদের উপরেও এর প্রভাব পড়ে।
কুরআনে যেমন উল্লেখ আছে, “আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন আছে, যারা বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি’, অথচ তারা মুমিন নয়।
তারা আল্লাহকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে। অথচ তারা নিজেদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে এবং তারা তা অনুধাবন করে না।
তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। কারণ তারা মিথ্যা বলত।” (সুরা বাকারা: ৮-১০)
ভণ্ডামি কী?
ভণ্ডামি যা দ্বিমুখীতা নামেও পরিচিত। যা এমন এক ব্যক্তির জঘন্য বৈশিষ্ট্য, যিনি তার অভ্যন্তরীণ অবস্থার বিপরীত আচরণ প্রদর্শন করেন। এই ধরনের লোকেরা খ্যাতি অর্জনের জন্য তাদের বাহ্যিক রূপকে মহিমান্বিত করে।
ভণ্ডামির উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন ব্যক্তি বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক হওয়ার ভান করতে বা শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ার অভিনয় করতে পারে। সে বিশ্বাসের অনুসারী হিসেবে আচরণ করে কিন্তু তার অন্তরের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ধরনের লোকেরা অন্যদের সামনে ভালো সাজার ভান করে কিন্তু মানুষের অনুপস্থিতিতে তারা বিপরীত স্বভাব প্রকাশ করে। একে ভণ্ডামি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং আল্লাহ এমন লোকদের অপছন্দ করেন যারা এই ধরনের স্বভাব অর্জন করে।
মুনাফিকদের সম্পর্কে কুরআন কী বলে?:
সূরা আল-মুনাফিকুন-এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন গর্তে রয়েছে। জাহান্নামের আগুন যত নিচের দিকে, তা তত কঠিন হতে থাকে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) জাহান্নামের সর্বনিম্ন গর্তগুলো মুনাফিকদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন।
দুইটি ভিন্ন স্থানে আল্লাহ আমাদের নবী (সা.)-কে বলেন,
“তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়টি তাদের ক্ষেত্রে সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। অবশ্যই আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না।” (সুরা মুনাফিকুন: ৬)
মুনাফিকরা তাদের কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ অমান্য করার এমন এক চরম সীমায় পৌঁছে যায় যেখান থেকে তাদের আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকে না। এমনকি যদি অন্য কোনো ব্যক্তি তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবুও তা ক্ষমা না চাওয়ারই সমান। আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে বলেছেন যে, তিনি তাদের জন্য তাঁর কাছে ক্ষমা চান বা না-ই চান, তাতে কোনো পার্থক্য হবে না, কারণ মুনাফিকি এমন একটি পাপ যা আল্লাহ কখনো ক্ষমা করেন না।
আল্লাহ বলেন, “তুমি তাদের জন্য ক্ষমা চাও, অথবা তাদের জন্য ক্ষমা না চাও। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বার ক্ষমা চাও, তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে কুফরী করেছে, আর আল্লাহ ফাসিক লোকদেরকে হিদায়াত দেন না।” (সুরা আত তাওবাহ: ৮০)
ভণ্ডদের প্রকারভেদ:
শরিয়তে দুই ধরনের মুনাফিকের কথা উল্লেখ আছে।
আন-নিফাক আল-আকবার:
যখন কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক চেহারায় আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূলগণ, হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র আহলে বায়েত, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং বিচার দিবসের উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকে, কিন্তু সে তার অন্তরে এমন প্রকৃত চিন্তা গোপন করে যা এই সমস্ত বা এর কিছু বিষয়কে অস্বীকার করে, তখনই তাকে মুনাফিক বলা হয়। আমাদের নবী (সা.)-কে এমন মুনাফিকদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যাদেরকে আল্লাহ জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আন-নিফাক আল-আসগর:
এটি ভণ্ডামির একটি কম তীব্র রূপ। এক্ষেত্রে প্রদর্শিত বাহ্যিক রূপ অর্থাৎ ভালোত্ব ও সৎকর্ম ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। এই ধরনের ভণ্ডামি হাদিসে উল্লেখিত চারটি প্রধান চিহ্নের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
ভণ্ডের লক্ষণ:
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন যে, নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে; যার মধ্যে এগুলো থাকে সে মুনাফিক এবং যার মধ্যে এর কয়েকটি থাকে, সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকির একটি উপাদান থাকে। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় তা ভঙ্গ করে, বিতর্ক করার সময় সীমা লঙ্ঘন করে এবং কোনো চুক্তি করার সময় তা ভঙ্গ করে। [সহীহ মুসলিম ও বুখারী]
নিজেকে মূল্যায়ন করতে এবং আপনার চারপাশের ভণ্ডদের সম্পর্কে জানতে, মানুষের এই লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা জরুরি।
১. তারা যখনই কথা বলে, তাদের কথা মিথ্যায় ভরা থাকে।
২. যখন কোনো তর্ক হয়, তারা রাগে ফেটে পড়ে এবং তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করে।
৩. যখনই তাদের উপর কোনো দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তারা সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করে।
৪. এই ধরনের লোকেরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে অভ্যস্ত।
৫. তারা অলস এবং অযৌক্তিক অজুহাত দেখিয়ে নামাজ এড়িয়ে চলে।
কীভাবে ভণ্ডামি এড়ানো যায়?:
আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে অন্যদের ছোট করে দেখা এবং তাদের সাথে অহংকার করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার কথা ও কাজে আন্তরিক এবং সঙ্গতিপূর্ণ হন। প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবন আলাদা রাখবেন না। আন্তরিক মানুষদের সাথে থাকুন এবং সর্বদা নিজের উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণে রাখুন

Related posts

ইসলামী ভ্রাতৃত্ববন্ধন

মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের ইতিবাচক দিকসমূহ

কীভাবে বুঝবেন—আপনার নামাজ আল্লাহর কাছে কবুল হয়েছে?

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More