ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র জন্মের আনন্দঘন মাস রবিউল আউয়াল। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, এ মাসের ১৭ তারিখে তিনি বেহেশতী সুষমা নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, ১২ রবিউল আউয়ালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। যদিও এ মতবিরোধের সমাধানের জন্য আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনী (রহ:) ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়ালকে ‘ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ’ ঘোষণা করেন।
কে আসে, কে আসে সাড়া পড়ে যায়,
কে আসে, কে আসে নতুন সাড়া।
জাগে সুষুপ্ত মৃত জনপদ, জাগো শতাব্দী ঘুমের পাড়া।
হারা সম্বিত ফিরে দিতে বুকে তুমি আনো প্রিয় আবেহায়াত,
জানি সিরাজাম-মুনীরা তোমার রশ্মিতে জাগে কোটি প্রভাত
কবি ফররুখ আহমদের বর্ণনায় সমগ্র বিশ্বে সাড়া জাগানিয়া এই মহামানব জন্মেছিলেন ১২ই রবিউল আউয়াল মতান্তরে ১৭ই রবিউল আউয়াল তারিখে মা আমেনার কোল আলোকিত করে। ৫৭০ হিজরির ঘটনা এটি। যাই হোক আমরা যথারীতি মতানৈক্যে না গিয়ে পুরো সপ্তাজুড়েই রাসূলে খোদার সিরাত নিয়ে আলোচনা এবং তাঁর প্রদর্শিত ঐক্যের পথ বেছে নিয়েছি। কবি নজরুল যথার্থই লিখেছেন: তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে …
‘পড়ে দরুদ ফেরেশতা বেহেশতে সব দুয়ার খুলে’
হ্যাঁ, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এবং তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। সুতরাং হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাও। এটা কুরআনের আয়াত। তাই আমাদের উচিত নবীজীর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠানো।
নবীজীর আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বব্যাপী মুক্তির সূচনা হয়ে গেছে সবার অজান্তেই। বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে যায় সেদিন। মহানবী (সা.) এর জন্মদিনের প্রত্যুষেই বিশ্বের মূর্তিগুলো মাটির দিকে আনত মুখ হয়ে পড়ে। বিশ্বের সব সম্রাটের সিংহাসন উল্টে পড়ে। এ ঘটনায় সম্রাটেরাও হতবাক হয়ে যায়। মুখে কথা ফুটছিল না তাদের। ইরানের ফার্স প্রদেশে হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত অগ্নিমন্দিরের আগুন নিভে যায়। ইরানের সর্ভে অঞ্চলে একটি হৃদ ছিল। বছরের পর বছর ধরে ওই হৃদের পূজা করা হত। নবীজীর জন্মের রাতে সেই হৃদটি শুকিয়ে যায়।
যিনি পৃথিবীতে এসেছেন মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে, তাঁর জন্মলগ্নে এসব ঘটবে-তাতে আর অবাক হবার কী আছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নিজেই ঘোষণা করেছেন: ‘হে নবী! আপনাকে আমি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি’। মহান আল্লাহ যাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত বলে ঘোষণা করেছেন তাঁর আলোকোজ্জল জীবনই তো আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি যে রহমতস্বরূপ এসেছেন এই পৃথিবীতে তার প্রমাণ কী? প্রমাণ হলো তাঁর জন্মপূর্ব, জন্মকালীন পৃথিবীর সঙ্গে জন্ম-পরবর্তীকালীন পৃথিবীর তুলনা। নবীজী এসেছিলেন আরবের কুরাইশ বংশের হাশিমী গোত্রে। আরবের সে সময়পর্বকে জাহেলিয়াতের যুগ বলা হত। এমন কোনো অন্যায় কাজকর্ম ছিল না-যা সে সময় হতো না। তখন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ছিল চরমে। ধনী-দরিদ্র সাদা-কালো, নারী পুরুষে ভেদাভেদ ছিল চরমে।
নবীজী এইসব ভেদাভেদ দূর করে সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। বাদশাহ ফকিরকে এক কাতারে এনে দাঁড় করান তিনি। মহানবী (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে যে আদর্শ নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন তার বাস্তব নমুনা ছিলেন তিনি নিজেই। নিজের জীবনে আল্লাহর দেয়া সকল আদর্শ বাস্তবায়ন করে ওই আদর্শকে মানবজাতির জন্য পেশ করেছেন। তিনি পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত সুচারুরূপে। এভাবেই রাসূল (সা.) পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করে অনাগত পৃথিবীর জন্যও এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন রেখে গেছেন।
শৈশব থেকেই নবীজী একের পর এক বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। জন্মের কিছুদিন আগেই পিতা আব্দুল্লাহকে হারান। বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে আব্দুল্লাহ সিরিয়ার শামে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। নবীজীর বয়স যখন ছয় তখন মা আমেনার সঙ্গে বেড়াতে যান নানার বাড়ি। সেখান থেকে ফেরার পথে মাও মৃত্যুবরণ করেন। পিতা-মাতাহীন শিশু মুহাম্মাদের লালন পালনের ভার পড়ে দাদা আবদুল মোত্তালেবের ওপর। তিনিও নবীজীর আট বছর বয়সে আল্লাহর ইচ্ছায় পরপারে পাড়ি জমান। এবার তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে চাচা আবু তালিবের ওপর। যুবক বয়সে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক সংগঠনের মাধ্যমে মজলুমের সহায়তায় অবদান রাখেন নবীজী। বিশ্বস্ততার জন্য তিনি ‘আল-আমিন’ উপাধি লাভ করেন এই কৈশোর বয়সেই। সমাজে যখন জুলুম অত্যাচারের শ্রোত বহমান সে সময় তিনি এই অনন্য উপাধি লাভ করেন। এই উপাধিটি খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজা (সা.আ.) এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খাদিজা ছিলেন অনেক বড় ব্যবসায়ী। তিনি নবীজীর নেতৃত্বে একটি বাণিজ্য কাফেলা পাঠান সিরিয়ায় এবং বিশ্বস্ততার অনন্য পরাকাষ্ঠা দেখে পনের বছরের ছোট নবীকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। আল্লাহর ইচ্ছায় অসম বয়সি দুজনের মাঝে বিয়ে সংঘটিত হয়।
হেরা গুহায় নবীজীর ওপর যখন কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তিনি নবুয়্যতি লাভ করেন তখন খাদিজা (সা) সকল পরিস্থিতিতে তাঁর সহযোগী ছিলেন। আয়াত নাজিল হবার আগ পর্যন্ত প্রায়ই নবীজী হেরা গুরায় যেতেন এবং একাকি ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন। জিব্রাইল (আ) কুরআনের সূরা আলাকের প্রথম আয়াত নিয়ে উপস্থিত হয়ে নবীজীকে বলেন: ইকরা’ মানে পড়ো! পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানের বাণী দিয়ে সূচনা হয়েছে ইসলামের। সেই জ্ঞান যে জ্ঞান মহান স্রষ্টা আল্লাহর নামে শুরু হয়েছে। জ্ঞানের তাত্তি¡ক নীতিমালা দিয়েই শুরু হয়েছে কুরআন। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তাই এই জ্ঞান চর্চার মধ্যেই রয়েছে। আয়াত নাজিল হবার পর সেই আয়াত অন্যদের মাঝে প্রচারের দায়িত্ব পড়েছে নবীজির ওপর। তিনি এবার ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। প্রথমেই পারিবারিক পরিমন্ডলে দাওয়াত দিলেন। আলী ইবনে আবি হযরত তালিব এবং খাদিজা (সা.আ.) ইসলামের দাওয়াতে সাড়া দিলেন। বছর তিনেকের মধ্যে সমগ্র কুরাইশদের ডেকে সামষ্টিক দাওয়াত দিলেন। আল-আমিন খ্যাত নবীজীর ইসলামের দাওয়াতে কুরাইশরা এবার বিপরীত আচরণ করলো। নবীজীর ওপর তারা ব্যাপক কঠোরতা আরোপ করলো। পূর্বসূরীদের ধর্ম বাদ দিয়ে ইসলামের দাওয়াতকে তারা মেনে নিতে পারলো না।
তারা নবীজীর ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চাপিয়ে দেয়। নবীজী বাধ্য হয়ে তাঁর কতিপয় সাহাবিকে তখন হাবশায় হিজরত করতে বলেন। এরপর কুরাইশরা একটি চুক্তিপত্র করে। তাতে বলা হয় আবদুল মোত্তালেবের পরিবারের কারও সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক, বৈবাহিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা যাবে না। একটি কাপড়ে এই চুক্তিনামা লিখে কাবা ঘরের ভেতর সংরক্ষণ করা হয়েছিল। নবীজী তখন তাঁর খান্দানকে নিয়ে ‘শোয়াবে আবু তালিব’ নামের একটি উপত্যকায় আশ্রয় নেন। সেখানে কার্যত তাঁরা বন্দি ও অবরুদ্ধ জীবনযাপন করেন। নবুয়্যতের দশম বছরে এই বন্দিজীবনের অবসান হলে চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী খাদিজাও মৃত্যুবরণ করেন।
এবার শুরু হলো নতুন ষড়যন্ত্র। নবীজীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র। শত্রুরা সিদ্ধান্ত নিলো রাতের অন্ধকারে নবীজীকে হত্যা করা হবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে এবং হত্যাকান্ডের দায়ভার কারও ওপর না বর্তায়। কিন্তু নবীজী তো জেনে গেছেন আল্লাহর সাহায্যে। তিনি তাই নিজের বিছানায় হযরত আলী ইবনে আবি তালিবকে শুইয়ে দিয়ে আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। পথের ব্যাপক সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করে মদীনায় পৌঁছানোর পর মদীনাবাসী রাসূল (সা)কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
এসেছে পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের কাছে
‘সানিয়াতিল ওয়াদা; উপত্যকা দিয়ে পাড়ি
তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা পেশ ওয়াজিব আমাদের
যতদিন রবে আল্লাহকে ডাকার মতো কেউ।
হে আমাদের পথ-নির্দেশক!
আমাদের মাঝে আজ নিয়ে এসেছেন
আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশ-উপদেশ
যার অনুসরণ আমাদের কর্তব্য।
এই শহরের জন্য নিয়ে এসেছেন প্রশংসা ও মর্যাদা!
স্বাগতম আপনাকে! হে সঠিক পথ প্রদর্শনকারী! স্বাগতম!
মদিনার সহযোগী আনসার এবং মুহাজিরদের নিয়ে নবীজী এই মদিনাতেই গড়ে তোলেন প্রথম মসজিদ-বর্তমান মাসজিদুন্নবি। ধীরে ধীরে মুহাজিরদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আনসাররাও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে গড়ে তোলেন নিশ্ছিদ্র বন্ধন-যা রাসূলের অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ফল। নবীজী মুসলমানদেরকে সুসংগঠিত করে তোলেন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে মক্কার মুশরিকদের সঙ্গে শুরু হয় ভয়াবহ যুদ্ধ-জঙ্গে বদর। প্রতিরক্ষামূলক ওই যুদ্ধেই আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক সাহায্য আসে এবং মুসলমানরা মাত্র ৩১৩ জনের বাহিনী নিয়ে মুশরিকদের বিশাল বাহিনীর ওপর বিজয়ী হয়। হিজরতের তৃতীয় বছরে সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ এবং পঞ্চম বছরে হয় খন্দকের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধের পর নবীজী সাহাবাদের নিয়ে হজ্জ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে মুশরিকরা বাধা দেয় এবং পরবর্তীকালে একটি সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নবীজীর প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল আল্লাহ নির্দেশিত। তাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই মুসলমানদের জন্য নিয়ে এসেছিল সুদূরপ্রসারী কল্যাণ।
হিজরতের সপ্তম বছরে নবীজী সিদ্ধান্ত নেন বিভিন্ন দেশের বাদশা ও সম্রাটদের দ্বীনের দাওয়াত দেবেন। সে লক্ষ্যে চিঠি লিখেছেন পূর্ব রোমান সম্রাট নাজ্জাশি, ইয়ামামার আমির, শামের আমিরকে। হিজরতের অষ্টম বছরে মক্কার মুশরিকরা চুক্তি ভঙ্গ করে। নবীজীও সাহাবাদের নিয়ে মক্কায় যাবার ইচ্ছে পোষণ করেন। মক্কার অদূরে রাত্রিবেলায় রাসূল (সা) তাঁবু গাড়েন। সেখানে মুশরিকদের নেতা আবু সুফিয়ান এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের কাফেলা বিনা বাধায় মক্কা বিজয় করেন এবং রাসূল (সা)ও সবার উদ্দেশ্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তারপর কাবাঘরের ভেতর থেকে সকল মূর্তি সরিয়ে পবিত্র করেন এবং সাফা পাহাড়ে উঠে বসেন। মক্কাবাসীরা দলে দলে এসে রাসূলের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যান।
মক্কা বিজয়ের পরেও শত্রুরা শেষ হয়ে যায় নি। ভেতরে ভেতরে তারা একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করে। মাত্র দু’সপ্তার মাথায় অনুষ্ঠিত হয় হুনাইনের যুদ্ধ। তাবুক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে হিজরতের নবম বছরে। ইসলাম কখনও কোনো যুদ্ধ বাধায় নি। ইসলাম ছিল মানবিকতার ধর্ম। মানুষের মর্যাদা ও সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিল ইসলাম। অথচ আজকের বিশ্বে শত্রুরা ইসলামকে বিকৃত করে তুলে ধরে শান্তির এই ধর্মকে সন্ত্রাসী বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। নবীজীর পবিত্র জন্মদিন উপলক্ষে এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। ইসলামের প্রকৃতস্বরূপ তুলে ধরে শান্তির সুশীতল ছায়ায় আসার আহ্বান জানাতে হবে বিশ্ববাসীকে। তবেই সার্থক হবে মিলাদুন্নাবী।

 

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More