উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠী এবং মুসলিম উম্মাহর দিকে তাদের কালো থাবা

উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠী বলতে সাধারণত তাদেরকে বুঝায় যারা ইসলামের নামে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটায় এবং কোনরূপ উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ ব্যতিরেকে সম্পূর্ণ গোঁড়ামি মানসিকতার বশবর্তী হয়ে কোন মুসলমানকে কাফির ফতোয়া দেয়। নিঃসন্দেহে এ উগ্র গোষ্ঠিগুলো বর্তমান সময়ে মুসলিম জাহানের জন্য সবচেয়ে ভয়ানক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, তারা নির্বিচারে নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের উপর লোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যা ও নিধন চালিয়ে আসছে। তাদের এমন অমানুষিক ও বর্বর উগ্রনীতির কারণে শান্তি, ইনসাফ ও মানবতার ধর্ম তথা পবিত্র ইসলাম আজ কলঙ্কিত। মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এ উগ্র গোষ্ঠির মানবতাবিরোধী কার্যক্রমের কারণে পৃথিবীর অনেকের কাছে ইসলাম সন্ত্রাসবাদের ধর্ম হিসেবে চিত্রিত হয়েছে; যা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাংখিত।
এ উগ্রপন্থী ও অশুভ গোষ্ঠী তাদের মনগড়া ও খোঁড়া অজুহাতে যখন-তখন যে কারও বিরুদ্ধে কাফির ফতোয়া জারি করে। যদি কেউ তাদের হঠকারী আচরণের বিরোধিতা করে তবে তাকে বিচ্যুত কিংবা গোমরাহ বলে অপবাদ দেয় এবং তারা এতই উগ্র যে, সুযোগ পেলে তাদের মতবিরোধী যে কাউকে হত্যা করতে কোনরূপ দ্বিধাবোধ করে না।
ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে তাদের নিতান্তই অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে তারা ধর্মের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোন বিষয়কে মৌলিক বিষয় মনে করে। ফলে যদি কেউ উক্ত বিষয়ে সামান্যতম ভিন্ন মতপোষণ করে, তবে তড়িৎ তাকে কাফির ফতোয়া দিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। অথচ পবিত্র ইসলাম ও কুরআনের দৃষ্টিতে যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদ, রাসূলের (সা.) রেসালত, কুরআনের বাণী এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি তথা কিয়ামত দিবস, পরকাল, নামায, রোযা, হজ্ব প্রভৃতির প্রতি ঈমানপোষণ করে, তবে সে মুসলিম এবং তার কোনরূপ ক্ষতিসাধন আদৌ জায়েয নয়। ধর্মের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ বিভিন্ন মাযহাবসমূহের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, যেমনভাবে রাসূলের (সা.) যুগেও সাহাবিদের মধ্যে এ ধরনের কোন সাধারণ বিষয়ে মতভেদের প্রচলন ছিল। তখন তো কেউ এমন বিষয় নিয়ে পরস্পরকে কাফির (নাউজুবিল্লাহ) বলে ফতোয়া দেন নি। তাহলে কী বর্তমান সময়ে কথায় কথায় অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফির ফতোয়াদানকারি এ তাকফিরি গোষ্ঠী রাসূলের (সা.) একনিষ্ঠ সাহাবিদের তুলনায় ধর্মের বিধানাবলি সম্পর্কে বেশি জ্ঞানী?
সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠী ছাড়াও মুসলমানদের মধ্যে ভেদাভেদ ও অনৈক্য উস্কে দেয়ার ক্ষেত্রে এবং কথায় কথায় অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফির ফতোয়াদানে একশ্রেণীর ধর্মের লেবাসধারী তথাকথিত আলেমরাও দায়ী। কারণ, বর্তমান বিশ্বে ইহুদি চক্র ও সা¤্রাজ্যবাদীরা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। এ পরিস্থিতিতে যখন ইসলামের শত্রæদের নানামুখী চক্রান্ত নস্যাত করতে মুসলিম উম্মাহর মাঝে সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি গড়ে তোলা অতীব জরুরী এবং প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত; তখন এ শ্রেণীর লোকেরা ইসলাম ও মুসলিম জাহানকে দূর্বল করতে অহেতুক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়কে পুঁজি করে মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি আর বিভেদের বাঁশি বাজাচ্ছে। আর তাদের এহেন আত্মবিধ্বংসী পদক্ষেপ একদিকে ইসলামের শত্রুদের লাভবান এবং অপরদিকে মুসলিম উম্মাহকে দিন দিন চরম দূর্বলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উগ্র তাকফিরি ও ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন না করেই নিজেদেরকে তথাকথিত ইসলামের সৈনিক দাবি করে। যেহেতু তারা ইসলাম ও কুরআনের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে নিতান্তই অজ্ঞ, তাই তাদের অজ্ঞতা ও উগ্রনীতির কারণেই ইসলাম ও মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তারা পবিত্র ইসলাম ও কুরআন স্বীকৃত কোন মানদন্ড ছাড়াই এবং যৌক্তিক ও জ্ঞাননির্ভর কোন তথ্য-প্রমাণ ব্যতিরেকে তাদের গোঁড়ামিপূর্ণ আকিদার বিরোধিতাকারী যেকোন মুসলমানের বিরুদ্ধে কাফির ফতোয়া দিতে সিদ্ধহস্ত। এমনকি তারা নিজেদের মতবিরোধী লোকদেরকে (চাই সে মুসলমান হোক কিংবা অমুসলিম) নির্বিচারে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
পবিত্র কুরআনে যেখানে আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য ধর্মের লোকদের সাথে গঠনমূলক ও জ্ঞাননির্ভর আলোচনা ও সংলাপের আদেশ দিয়েছেন, সেখানে তাকফিরি গোষ্ঠীগুলো মুসলিম মাযহাবসমূহের মধ্যে আন্তঃসংলাপ তো অনেক দূরের কথা বরং তারা মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক ভেদাভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টির লক্ষ্যে নানামুখী চক্রান্তে লিপ্ত। বস্তুতঃ ইসলাম ধর্ম আমাদেরকে সব সময় অন্যদের প্রতি সৌহার্দপূর্ণ, সহনশীল, বন্ধুভাবাপন্ন, শ্রদ্ধাশীল, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও সদাচরণের আদেশ দিয়েছে। এমনকি অন্য ধর্মের লোকদের সাথেও আলোচনা ও সংলাপের ক্ষেত্রে অবশ্যই সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে বলা হয়েছে। কারও আকিদা-বিশ্বাসের প্রতি কটাক্ষ ও উপহাস নয়, বরং পারস্পরিক সৌহার্দ ও সম্প্রীতি বজায় রেখে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সর্বোত্তম উপায়ে সংলাপ ও বিতর্ক করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।
এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে রাসূলের (সা.) প্রতি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দান করে বলেছেন,
“তুমি (মানুষকে) প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রতিপালকের দিকে আহব্বান কর এবং তাদের সাথে এমন পন্থায় বিতর্ক কর যা সর্বাধিক উত্তম। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক যারা তাঁর পথ হতে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে তাদের সম্বন্ধে সমধিক জ্ঞাত এবং যারা হেদায়েতপ্রাপ্ত তাদের সম্বন্ধেও তিনি সমধিক জ্ঞাত।” (সূরা নাহল : ১২৫)
সহজাতভাবেই মুনাযিরা বা বিতর্ক অবশ্যই বাস্তবসম্মত, তথ্যনির্ভর ও সত্যানুসন্ধানী হতে হবে। না আত্মপ্রচার, একগুঁয়েমি ও জোরপূর্বক নিজের মত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হওয়া; কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় যাকে ‘মারআ’ (মারআ’ হচ্ছে একগুঁয়েমী ও গোঁড়ামি মানসিকতার বশবর্তী হয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া এবং অন্যের উপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা) বলা হয়।
পবিত্র কুরআনে মু’মিনদের প্রতি আদেশ করা হয়েছে যে, তারা যেন কিতাবধারীর (মুশরিকদের) সাথে সুন্দর ও উত্তম পন্থায় সংলাপ ও বিতর্ক করে। কুরআনের ভাষায়, “তোমরা কিতাবধারীদের সঙ্গে কেবল উত্তম পন্থায় বিতর্ক করবে।” (সূরা আনকাবুত : ৪৬) অপর একটি আয়াতে নমরূদের সাথে হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) মুনাযিরার প্রতি ইঙ্গিত করে মু’মিনদেরকে উক্ত মুনাযিরার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, “তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য কর নি, যারা ইব্রাহীমের সাথে তার প্রতিপালকের ব্যাপারে বিতর্ক করেছিল।” (সূরা বাকারা : ২৫৮)
পবিত্র কুরআনের সূরা আনআমের ৭৫ ও ৮৩ নং আয়াতে মূর্তি পূজারী, চন্দ্র পূজারী ও সূর্য পূজারীদের সাথে হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) সংলাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি মুসলমানদেরকে এ সংলাপের পদ্ধতি অবলম্বনের আহব্বান জানান হয়েছে। কুরআনের ভাষায়, “এটা ছিল আমাদের যুক্তি-প্রমাণ যা ইব্রাহীমকে তার সমপ্রদায়ের বিপক্ষে দান করেছিলাম।” (সূরা আনআম : ৮৩)
সুতরাং, মুসলমানদের উচিত বিরোধী ও বিধর্মীদের সাথে সংলাপ কিংবা বিতর্কের ক্ষেত্রে নবী-রাসূলদের (আ.) অনুসৃত পদ্ধতি অবলম্বন এবং এক্ষেত্রে সংলাপের সঠিক ও কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োগ করা।
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত বিধর্মী ও বিরোধীদের সাথে নবী-রাসূলগণের (আ.) সংলাপ কিংবা বিতর্কের একটি বিষদ ও বিস্তৃত অধ্যায় রয়েছে; যা পর্যালোচনা করতে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনার প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তাহলে বিষয়টি আমাদের নিকট অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর পূর্বগামী নবীগণ এমনকি তাঁর উত্তরসূরীগণ তাঁদের যুগের বিরোধী ও বিধর্মীদের সাথে কতই উত্তম, মার্জিত, চমকপ্রদ ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁরা আদৌ রূঢ়, ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হন নি কিংবা এমন কোন ভাষা প্রয়োগ করেন নি যাতে প্রতিপক্ষের অনুভূতিতে সামান্যতম আঘাত লাগে। অথচ বর্তমান যুগে তাকফিরিদের আচার-ব্যবহার এবং কার্যক্রমের প্রতি লক্ষ্য করলে সম্পূর্ণ বিপরীত ও ভিন্ন চিত্র সামনে চলে আসে।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রতি জ্ঞান, বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তবসম্মত উপায়ে কুরআন ও সুন্নাতের আলোকে মুক্ত মন নিয়ে নিজেদের মধ্যকার আকিদা ও ফিকাহগত মতভেদসমূহ নিরসনে আন্তরিক হওয়ার আদেশ করেছেন। মুসলিম উম্মাহ কয়েকটি বিশেষ মাযহাব ও ফেরকার অনুসারী। স্বাভাবিকভাবেই এসব মাযহাব ও ফেরকাসমূহের অনুসারীদের মধ্যে ইসলামে শাখা-প্রশাখা কিংবা ঐচ্ছিক বিষয়াবলি সম্পর্কে কিছুটা মতভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু এ মতভিন্নতা কোন অবস্থাতে ইসলামের মুখ্য ও মৌলিক বিষয়সমূহে নয়; যেমনঃ আল্লাহর একত্ববাদ, রাসূলের (সা.) রেসালত, আল কুরআন, পরকাল প্রভৃতি বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে কোনরূপ মতভেদ নেই। শুধুমাত্র ইসলামের মৌলিক বিষয়াদির কিছুকিছু শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে; যা নিতান্তই স্বাভাবিক ও ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে গণ্য। কিন্তু এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে এক মাযহাবের অনুসারীরা অন্য মাযহাবের অনুসারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ আদৌ গ্রহণযোগ্য ও সমীচীন নয়।
ইসলামের শাখা-প্রশাখাগত বিষয়াবলি নিয়ে মুসলিম মাযহাবসমূহের মধ্যে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তারতম্য থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কুরআনের কোন আয়াতের তাফসীরের ক্ষেত্রে এক মাযহাবের দৃষ্টি এক রকম আবার অন্য মাযহাবের তাফসীরকারকদের দৃষ্টিতে ভিন্ন রকমও হতে পারে, কিন্তু আয়াতের মূল বাণী ও মর্মার্থের ক্ষেত্রে সব মাযহাবের অনুসারীদের মধ্যে ঐকমত্য বিদ্যমান রয়েছে; এমনটি মোটেও দূষণীয় নয়। বিশেষ কোন বিষয়ে বর্ণিত একটি হাদীস কোন মাযহাবের হাদীস বিশারদদের নিকট সহীহ হিসেবে বিবেচিত। পক্ষান্তরে, একই হাদীস হয়তো অন্য মাযহাবের মনীষীদের নিকট সহীহ হিসেবে প্রমাণীত নাও হতে পারে। কেননা, বিষয়টি সম্পূর্ণ তত্তয় এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মানদন্ডের উপর নির্ভরশীল।
সুতরাং, এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়কে পুঁজি করে কাউকে কাফির, নাস্তিক কিংবা বেধর্মী ফতোয়া দেয়া কখনও কোন ঈমানদার ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পরিচয় হতে পারে না। আর পবিত্র ইসলাম ও কুরআনও কখনও এমন কাজের স্বীকৃতিও দেয় না। মূলতঃ ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অভাবের কারণেই তাকফিরি গোষ্ঠীগুলো এমন ভিত্তিহীন ফতোয়াবাজি, উগ্রনীতি এবং জঙ্গিবাদের ন্যায় ইসলাম ও কুরআন বিদ্বেষী অপতৎপরতায় লিপ্ত।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে নিরপরাধ মানুষ হত্যা এবং মানুষের অনিষ্ট সাধন মারাত্মক গুণাহ। কিন্তু উগ্র তাকফিরি ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো কোন্ ইসলামের দোহাই দিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে? এমনকি তাদের হিং¯্রতা ও নৃশংসতা হতে নারী ও শিশুরাও নিরাপরাধ নয়। এটা কোন্ ইসলামের শিক্ষা? পবিত্র কুরআনে মাত্র একজন নিরাপরাধ ব্যক্তির হত্যাকান্ডকে সমগ্র মানবজাতির হত্যার সাথে তুলনা করা হয়েছে; কাজেই হত্যা ও রক্তপাত কতইনা জঘণ্য ও অমার্জনীয় অপরাধ। কুরআনের ভাষায়, “যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে কোন হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ অথবা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির কারণ ব্যতিরেকে হত্যা করে তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে কেউ কোন একজন মানুষকে জীবন দান করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবনদান করল।” (সূরা মায়েদাহ : ৩২)
নিঃসন্দেহে উগ্র তাকফিরি ও ধর্মান্ধ মানসিকতা শুধু মুসলিম জাহানেই নয় বরং সমগ্র মানবসমাজের জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকফিরি ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো কখনও ধর্মের দোহাই দিয়ে আবার কখনও ভিত্তিহীন ফতোয়াবাজির উগ্র শ্লোগান দিয়ে তাদের মতবিরোধী নিরীহ মুসলমানদের হত্যা, জান-মালের ক্ষতিসাধন, নারীদের সম্ভ্রমহানী এবং শিশুদের প্রতি অমানুষিক আচরণ করে। এমনকি অমুসলিমরাও তাদের হিংস্রতা থেকে নিরাপদ নয়। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ব্যাপার হচ্ছে, তারা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও পরকালে বেহেশতপ্রাপ্তির আশায় এমন বর্বর ও পৈশাচিক হত্যাকান্ড ও অপকর্ম চালায়; বিষয়টি একদিকে যেমন চরম হাস্যকর, অপরদিকে তেমনই তাদের চিন্তার বক্রতা ও মূর্খতারই পরিচয় বহন করে। (আমরা যদি ২০১১ সন থেকে ২০২০ সন পর্যন্ত সিরিয়া ও ইরাকের পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব, মধ্যপ্রাচ্যের এ দু’টি দেশেই মাত্র এক দশকে কয়েক লক্ষ্য নিরীহ ও নিরপরাধ মুসলিম নর, নারী ও শিশু তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস’র বর্বরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আবার কেউ গৃহহারা হয়েছেন। কথিত ইসলামিক এষ্টেট প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দিয়ে এ উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠী দেশ দু’টিতে যে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ও লোমহর্ষক তান্ডব চালিয়েছে, তার নজির মানব ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। (অনুবাদক))
পবিত্র কুরআন আমাদেরকে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ, সম্প্রীতি এবং একতার শিক্ষা দেয়। পাশাপাশি আমাদেরকে ভেদাভেদ, বিচ্ছিন্নতা, অনৈক্য এবং পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপোষণের মত ক্ষতিকারক বিষয়াবলি থেকে বিরত থাকার আদেশ দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এক ও অভিন্ন অবয়ব এবং অস্তিত্ব বিশিষ্ট। পৃথিবীর কোথাও যদি কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী নির্যাতন ও নিস্পেষণের শিকার হয়, তাহলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঈমানি দায়িত্ব হচ্ছে উক্ত অসহায় মুসলমানদের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু কারা আজ মুসলমানদেরকে ভেদাভেদ আর বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? কারা মুসলিম উম্মাহর মাঝে অনৈক্যের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে? তাদের আসল পরিচয় কি, কারা তাদেরকে ইন্ধন দিচ্ছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কি? এসব বিষয়ে অবহিত হওয়া প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানের জন্য অত্যন্ত জরুরী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে আদেশ করছেন, “আর তোমরা সমবেতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে ধর এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ো না; এবং তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতগুলো স্মরণ কর।” (সূরা আলে ইমরান : ১০৩) সুতরাং, পবিত্র কুরআনের এ অকাট্য ঘোষণা মতে প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয হচ্ছে নিজেদের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা এবং বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী শয়তানি প্ররোচনা থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকা। পাশাপাশি বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কেও সদা সচেতন থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
মুসলিম উম্মাহর উচিত যদি কোন বিষয়ে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য ও মতপার্থক্য দেখা দেয়, তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই পবিত্র কুরআনের আদেশাবলি এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রদত্ত দিকনির্দেশনার প্রতি শরণাপন্ন হওয়া। কেননা, এমনটিই কেবল আমাদেরকে যেকোন ধরনের বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশের অধিকর্তা (উলিল আমর), তাদের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে মতভেদ কর, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি সমর্পণ কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাসী হও।” (সূরা নিসা : ৫৯)
যখন-তখন কোনরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই যে কাউকে কাফির, মুশরিক কিংবা মুরতাদ প্রভৃতি ফতোয়া দেয়া কখনও একজন ধর্মপ্রাণ ও সচেতন মুসলমানের পরিচয় হতে পারে না। কেননা, যদি কোন মুসলমানের বিরুদ্ধে কাফির ফতোয়া দিতে হয়, তবে অবশ্যই পবিত্র কুরআনের দিকনিদের্শনা এবং শরিয়তের বিধি মোতাবেক হতে হবে। নিজেদের মনগড়া ও খেয়ালখুশি মত কাউকে কাফির, মুশরিক কিংবা মুরতাদ অখ্যায়িত করা একদিকে যেমন শরিয়ত পরিপন্থী, অপরদিকে তেমন আইনগত দিক থেকেও গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য। এছাড়া এভাবে পাল্টাপাল্টি ফতোয়াবাজি ও দোষারোপ মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিন্নতার ন্যায় মারাত্মক ক্ষতিকর ব্যাধিগুলো মহামারী আকারে দেখা দেয়। আর এহেন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র মুসলিম উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং মুসলমানদের দুশমনরা ব্যাপকভাবে লাভবান হবে এবং তারা আরও মুসলিম জাহানের বিরুদ্ধে বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
অমুক শিয়া তাই তার সাথে সম্পর্ক রাখা যাবে না কিংবা অমুক সুন্নী তাই তার সাথে আমাদের বিরোধ রয়েছে। এটা সুন্নী মসজিদ, ওটা মোহাম্মাদিদের মসজিদ, সেটা মাইজভান্ডারিদের মসজিদ কিংবা এটা শিয়া মসজিদ। শিয়াদের অনুষ্ঠানে যাওয়া যাবে না, সুন্নীদের মাহফিলে বসা যাবে না কিংবা অমুক মাযহাবের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়। শিয়াদের বই পড়া যাবে না কিংবা সুন্নী বই ধরা যাবে না- নিঃসন্দেহে এমন কাদা ছোঁড়াছুড়ি এবং হিংসাত্মক প্রচারণা মুসলমানদের জন্য আত্মহননের সামিল।
নিঃসন্দেহে আমরা প্রতিটি মুসলিম এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থাপোষণ করি, আমরা এক কুরআনকে মান্য করি, আমরা এক রাসূলকে (সা.) অনুসরণ করি, আমরা এক কা’বা গৃহের প্রতি মুখ করে নামায আদায় করি এবং আমরা এক ও অভিন্ন ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তাহলে কেন আজ মুসলিম উম্মাহ এত দল, মত ও ভেদাভেদে জর্জরিত? অবশ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে মাযহাবগত মতপার্থক্য থাকাটা খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু এসব বিষয়কে পুঁজি করে মুসলমানদের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও অপপ্রচার আদৌ জায়েয নয়।
নিশ্চয়ই বর্তমান সময়ে মুসলিম জাহানের সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। কেননা, একদিকে ইসলামের চিরশত্রæ ইহুদি চক্র ও সামজ্যবাদী অপশক্তিগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একের পর এক গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। অপরদিকে একশ্রেণীর অজ্ঞ, উগ্র ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোর আত্মঘাতী কার্যক্রম সমগ্র মুসলিম উম্মাহর অগ্রযাত্রাকে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ করছে।
তাই আসুন! মুসলিম উম্মাহ এর চেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হওয়ার আগেই আমরা সচেতন ও সজাগ হই। নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ও বিচ্ছিন্নতা পরিহার করে পবিত্র কুরআনের আহব্বানে সাড়া দিয়ে মহান আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মাঝে শক্তিশালী ও অভেদ্য ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলি।

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More