লেখকঃ সৈয়দ মোহাম্মাদ আলী আবেদী
[হযরত] আলী এমন একটি প্রসিদ্ধ নাম, যার নামের ফজিলত ও বরকত মানুষের ঈমানকে দৃঢ় করার জন্য যথেষ্ট। আলীর নামটি স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নামকরণ করা হয়েছে; এ নামটি যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে মুখে উচ্চারণ করবে সে সমস্ত বিপদাপদ থেকে মুক্তি পাবে এবং উচ্চারণের সাথে সাথে তার অন্তরে অদ্ভুত নতুন একটি অনুভুতি সৃষ্টি হবে। হযরত আলী (আঃ) সত্যের প্রতীক। তিনি নিজেকে আল্লাহর রসুলের (সাঃ) আদর্শে আদর্শিত করে তুলেছিলেন এবং রসূলের (সাঃ) সকল প্রকার গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব যার সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে আসাকার, ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করে বলেন, হযরত আলী (আঃ) এর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে যত আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, ততটি আয়াত কারোর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়নি। ইবনে আব্বাস আরও বলেন:‘হযরত আলীর (আ.) শানে তিনশত আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এবং তার গুনাবলি অত্যধিক ও প্রসিদ্ধ।’
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদায় হযরত আলী (আঃ) শানে ইরশাদ করছেন-“তোমাদের অভিভাবক শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেই বিশ্বাসী যে নামাজ বজায় রাখে এবং যাকাত দেয় রুকু অবস্থায়।” (সূরা আল-মায়েদা-৫৫)
উক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর রসুল এবং তাঁর চাচাতো ভাই হযরত আলী (আঃ) এর মর্যাদা আল্লাহর নিকট কত বেশি। কতটা প্রিয় ব্যক্তিত্ব মহান আল্লাহর নিকট উল্লেখিত আয়াতটি তা প্রকাশ করে দিয়েছে। বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী হযরত আলী (আঃ) পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ ও তার রাসূলকে (সাঃ) চিনতেন অনুরূপভাবে আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) আলীকে (আঃ) চিনতেন। যাই হোক কিছু মানুষের ধারণা অনুযায়ী হযরত আলী (আঃ) ছিলেন অন্য সকল সাহাবীদের মতো সাধারণ একজন সাহাবী। কিন্তু না অন্য সকল এর থেকে তার মর্যাদা ছিলো অনেক গুণবেশী। হযরত আলী (আঃ) ছিলেন হেদায়েতের প্রদীপ। রাসূল (সাঃ) বলেনÑ মহান আল্লাহ আলী সম্পর্কে আমাকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে এই যে: “হে রসুল! আলী হচ্ছে হেদায়েতের নিশান, আমার প্রিয় বান্দাদের নেতা এবং যারা আমার আনুগত্য করবে তাদের জন্য আলী (আ.) হেদায়েতের প্রদীপ।” মহান আল্লাহ হযরত আলী (আঃ) কে যে সর্বোচ্চ স্থান ও মার্যাদা দান করেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তিনি এমন এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যিনি সারাটি জীবন সত্যের পথে ব্যয় করেছেন। নবী (সাঃ) নিজেই বলেছেন-“আলী সর্বদা সত্যের সাথে এবং সত্য সর্বদা আলীর সাথে।”
হযরত আলী (আঃ) শুধু সত্যের প্রতীক ছিলেন তা নয়, বরং তিনি ছিলেন সত্যের কান্ডারি, সকল জ্ঞানের অধিকারী, যুদ্ধে রনাঙ্গনের মহাবীর। এক কথায় বলা যায় তিনি সকল বিষয়ের পরিপূর্ণ পূর্ণত্বের অধিকারী।
হযরত আলী (আঃ) এর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর গুণাবলী এত সুন্দর ও চমৎকার যেগুলিকে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। তার এই গুণাবলীর বর্ণনা করতে গিয়ে ভারত উপমহাদেশের সুফি সাধক ও চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা খাজা মুঈনউদ্দিন চিশতি (র.) বলেছেন: সমুদ্রের পানিকে যেমন একটি ঘটিতে ধারন করানো সম্ভব নয়, তেমনিভাবে আলীর গুণাবলী বর্ণনা করে তুলে ধরাও সম্ভব নয়। হযরত আলী (আঃ) এর ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলী এতই মুগ্ধকর যে তার জীবনেতিহাস যখন কেউ পড়ে, তখন তার মনে অন্যরকম একটি অনুভুতির সৃষ্টি হয় যা নিজের ঈমানকে মজবুত করে তোলে। তিনি সেই ব্যক্তি ছিলেন যার সম্পর্কে রাসূলের (সাঃ) অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। ঐতিহাসিক মাসুদী হযরত আলীর (আঃ) জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করে বলেন, রাসূলে খোদার (সাঃ) চরিত্রের সঙ্গে যার চরিত্রের মিল ছিল তিনি হলেন হযরত আলী (আঃ)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)’র পরে হযরত আলী (আঃ)’র ন্যায় উত্তম ব্যক্তি আর কেউ ছিলেন না। তাঁর মর্যাদার সমতুল্য কেউ হতে পারেননি। তাঁর মর্যাদা সম্বন্ধে রাসূলের (সাঃ) হাদিস এতো অধিক বর্ণিত হয়েছে যেগুলি অন্য সকল সাহাবিদের তুলনায় অনেক বেশি। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেন- রাসূলের (সাঃ) সাহাবিগণের মধ্যে হযরত আলীর (আঃ) ন্যায় অন্য কারোর মর্যাদা বর্ণিত হয় নি। (মুনতাহাল আমাল, ১ম খ. পৃষ্ঠা ১২০) হযরত আলী (আঃ) হলেন সেই ব্যক্তি, যাকে স্বয়ং রসূল (সাঃ) নিজের ভাই বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন; আলী আমার ভাই, এবং আমার পরবর্তীকালের আমার ওয়াসী এবং আমার খলীফা তার আদেশ নিষেধকে মান্য করো এবং তার আনুগত্য করো। (কানযুল উম্মাল, খ. ১৩: পৃ. ১৩১)
আমরা সকলেই মহান আল্লাহর দরবারে দু’হাত উত্তলন করে দোয়া করি যেনো আমরা মুসলমানরা আল্লাহর রসুল (সাঃ) এবং তার প্রিয় ব্যক্তিত্বকে মনে প্রাণে আনুগত্য করে ইহকাল ও পরকালের সৌভাগ্য হাসিল করতে পারি। এবং তাদের যথাযথ সম্মান ও তাদের জীবনীকে অনুসরণ করে নিজেদের গড়ে তুলতে পারি। (আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন)।###