মাওলানা মোঃ শহীদুল হক, শিক্ষক, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা
আয়াতসমূহঃ
- ১- দোয়া করা ইবাদতঃ “তোমাদের পালনকর্তা বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।” (সূরা মুমিনঃ ৬০)
- ২- দোয়া করঃ “বলুন, আমার পালনকর্তা পরওয়া করেন না যদি তোমরা তাঁকে না ডাক। তোমরা মিথ্যা বলেছ। অতএব সত্বরই নেমে আসবে অনিবার্য শাস্তি।” (সূরা ফুরকানঃ ৭৭)
- ৩- খোদা দোয়া কবুল করেনঃ “(হে রাসূল!) যখন আমার বান্দা আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞেস করে তখন বলে দাও আমি তাদের নিকটেই আছি এবং যখনই কেউ আমার নিকট প্রার্থনা করে তখন আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার উত্তর দেই।” (সূরা বাকারাহঃ ১৮৬)
- ৪- দোয়া করার পদ্ধতিঃ “(হে মানবজাতি!) তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা কর” (সূরা আ’রাফঃ ৫৫)
- ৫- দোয়ার মধ্যে একনিষ্ঠতাঃ “সুতরাং তোমরা একনিষ্ঠ বন্দেগীর সাথে আল্লাহকে আহবান কর” (সূরা মুমিনঃ ১৪)
হাদীসসমূহঃ
- দোয়ার ফজিলতঃ রাসূল করীম (স.) বলেছেনঃ “দোয়া করা কোরআন তেলাওয়াত করা থেকে উত্তম ও বরকতময়।” (আল মিযান, খন্ড ২, পৃ. ৩৪)
- মুমিনের অস্ত্রঃ পয়গম্বার আকরাম (স.) বলেছেনঃ “দোয়া মুমিনদের অস্ত্র, দ্বীনের স্তম্ভ এবং জমিন ও আসমানের নূর।” (কাফী, খন্ড ২, পৃ. ৪৬৮)
- দোয়া বালা-মুসিবত দূর করেঃ পয়গম্বার আকরাম (স.) বলেছেনঃ “দোয়ার মাধ্যমে তুমি তোমার বিপদ-আপদকে দূর কর।” (ওসায়েলুশ শিয়া, খন্ড ৭, পৃ. ৪২)
- আল্লাহ কবুল করেনঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “যে খোদার নিকট দোয়া করে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করে।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১, পৃ. ৪৫৯)
- উত্তম হাতিয়ারঃ হযরত আলী ইববে আবি তালিব (আ.) বলেছেনঃ “উত্তম হাতিয়ার দোয়া।” (গুরারুল হেকাম, খন্ড ১, পৃ. ৪৬০)
বিশ্লেষণঃ দোয়া মানুষের গর্বের ধন, ইবাদতের রত্ন, নিজ প্রতিপালকের কাছে বান্দার অভাব অভিযোগের প্রার্থনা, মুমিনদের জন্য অস্ত্র, আম্বিয়াদের (আ.)-এর পথ, আইম্মাদের (আ.) রীতিনীতি। এই প্রশস্ত বিশ্বে মানুষ কোথাও কোন কিছুর মালিক নয়, সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ যিনি অদ্বিতীয়, তিনি তাঁর কুদরত দ্বারা এ ধরণের অনুগ্রহ দান করেছেন। দোয়া কতই না প্রয়োজন মুমিনদের জন্য! কতই না জরুরী মানুষের তার প্রতিপালকের সাথে কথা বলার! কত বড় প্রত্যাশা মুমিনের জন্য! তাঁর প্রার্থনার দরবারে আমাদের প্রার্থনা পৌঁছানোর জন্য, কত মহান শান্তির সম্পদ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মানুষের জন্য, কতবড় দুর্ভাগ্য ঐ মানুষের জন্য যার কাছে এই সম্পদ, এই ধন নেই। কত সৌভাগ্য ঐ ব্যক্তির যার জীবনের সম্পদ দোয়া। আল্লাহর কাছে দোয়া করি ইমাম জয়নুল আবেদীন, সাইয়েদুস সাজেদীন (আ.)-এর অসিলায় আমাদিগকে দোয়া করার তৌফিক দান কারেন (আমিন)
ঘটনাবলী:
১- আল্লাহ ব্যতীত কারো কাছে প্রার্থনা করো নাঃ আল্লামা মাজলেসী (র.) বিহারুল আনোয়ারে উল্লেখ করেছেন যে, মুহাম্মাদ বিন আযালান বলেছেন, আমি খুব সমস্যার মধ্যে পড়েছিলাম ও কিছু ঋণী হয়েছিলাম। ঋণদাতা আমাকে খুব চাপ দিচ্ছিলো, একারণে আমি আমার পুরনো বন্ধু হাসান বিন যায়িদ যিনি তখন মদীনার গভর্নর ছিল, তার নিকট গেলাম। তখন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আলী বিন হোসাইন (আ.) যিনি আমার অপর একজন পুরনো সাথী ও বন্ধু ছিলেন তিনি আমার সমস্যা ও দুশ্চিন্তা সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে পথিমধ্যে তাঁর সাথে দেখা হয়ে গেলো এবং তিনি আমার হাত ধরে বললেনঃ আমি তোমার সমস্যা ও দুশ্চিন্তা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বল কি করতে চাও? কার সাহায্য নিতে চাও? আমি বললামঃ হাসান বিন যায়িদ।
তিনি বললেনঃ সে তোমার আশা পূরণ করতে পারবে না এবং তুমি যা চাচ্ছ তা সে করতে পারবে না। এসো এমন একজনের কাছে যাবো যিনি তোমার কাজ ও তোমার সমস্যা দূর করতে পারবেন। তিনি (আজওয়াদুল আজওয়াদিন) সর্বোচ্চ সাহায্যকারী, তুমি তোমার চাহিদা তাঁর কাছে বলো, আমি আমার চাচা ইমাম সাদেক (আ.) যিনি তাঁর সম্মানিত দাদা ইমাম হোসাইন (আ.) থেকে এবং তিনি তাঁর সম্মানিত পিতা আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) থেকে এবং তিনি আল্লাহর রাসূল (স.) থেকে রেওয়ায়েত করেছেন যে, তিনি (স.) বলেছেনঃ “আল্লাহ তায়ালা কোন কোন পয়গম্বার (আ.) কে ওহীর মাধ্যমে বলেছেন আমি আমার মর্যাদা ও মহত্ত্বর কসম খেয়ে বলছি, কেউ আমাকে ব্যতীত অন্য কারো কাছে আশা করবে আমি তার আশাকে নিরাশায় পরিবর্তন করবো এবং অপমান ও অপদস্থের পোশাক মানুষের মধ্যে তাকে পরিয়ে দিবো এবং আমার রহমত ও করুণা থেকে তাকে দূরে রাখবো। আমার বান্দা কি কষ্টের মধ্যে আমাকে ব্যতীত অন্য কারো নিকট পরিত্রাণ পাওয়ার আশা করবে? যেহেতু কঠোরতা আমার হাতে, আমাকে ব্যতীত অন্য কারো নিকট কিসের আশা করবে? যেহেতু আমি হলাম সমস্যা দূরকারী, বন্ধ দরজার চাবি আমার কাছে আর আমার দরজা প্রত্যেকের জন্য খোলা রয়েছে।
তোমরা কি জান না যদি কারো ওপর কোন মুসিবত আসে আমি ব্যতীত কেউ দূর করতে পারে না। তাহলে আমার বান্দা কেন আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও অন্যের কাছে আশা করে। যেহেতু আমি তার চাওয়ার পূর্বেই তাকে প্রদান করি। এটা কি সম্ভাব যে, কোন বান্দা আমার কাছে চাইবে আর আমি তাকে প্রদান করবো না? কখনো এটা সম্ভাব নয়। কেননা আমার দয়া ও ক্ষমা বিশেষ কারো জন্য নয়। দুনিয়া ও আখেরাত কি আমার অধিকারে নয়? যদি সমস্ত জমিন ও আসমানের অধিবাসী আমার কাছে কিছু চায় আর আমি প্রত্যেকের চাহিদা অনুযায়ী পৃথক পৃথকভাবে প্রদান করি তারপরও আমার সাম্রাজ্যের মাছির পাখা পরিমাণ সম্পদও কমবে না, আর কিভাবে কমবে? কারণ সব কিছুর বন্ঠনকারী তো আমি। হে নিঃস্ব ও অসহায়! তোমরা আমার অবাধ্যতা কর আর আমাকে ভয়ও কর না।”
আমি তাকে বললামঃ হে রাসূল (স.)-এর সন্তান! এই হাদীসটি আর একবার আমার জন্য বর্ণনা করুন। হযরত ফাতিমা জাহরা (আ.)-এর সন্তান এই হাদীসটি তিন বার আমার জন্য বর্ণনা করলেন। আমি বললামঃ আল্লাহর কসম! এরপর আমি আমার চাওয়া-পাওয়ার জন্য কারো কাছে হাত পাতবো না। কয়েক দিনের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁর পক্ষ থেকে আমার জন্য রুজি পাঠিয়ে দিলেন। (চেহেল হাদীসে রাসূলে মাহাল্লাতী, খন্ড ২ , পৃ. ১২৯, ইনসান সজে অকেয়াত, পৃ. ১৩৮)
২- যার দোয়া কবুল হয় নাঃ বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি ইমাম সাদেক (আ.)-এর সাথে মক্কা ও মদীনার মাঝে একটি জায়গায় অবস্থান করছিলাম। এক ভিক্ষুক আসলো, ইমাম নির্দেশ দিলেন একে দেয়া যাবে। পরে দ্বিতীয়জন আসলো, বললেনঃ একেও কিছু দেয়া যাবে। অতঃপর তৃতীয়জন আসলো, বললেনঃ একেও দেয়া যাবে। তারপর চতুর্থজন আসলো, বললেনঃ আল্লাহ তোমাকে তৃপ্ত করুক এবং আমাকে সম্বোধন করে বললেনঃ আমার কাছে এখনো দেয়ার জন্যে আছে তবে আমার ভয় হচ্ছিল যে এমন না হয় আমি তাদের অর্ন্তভুক্ত হলাম যাদের দোয়া কবুল হয় না।
- প্রথমতঃ সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিল আর সে ইহা অনধিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যয় করলো এবং পরে আল্লাহর কাছে দোয়া করলো যে আমাকে রিজিক দাও, তার দোয়া কবুল হবে না।
- দ্বিতীয়তঃ সেই ব্যক্তি, যে নিজের স্ত্রীর জন্যে দোয়া করে সে যেন মারা যায় যদিও তাকে তালাক দেয়ার অধিকার রয়েছে।
- তৃতীয়তঃ সেই ব্যক্তি, যে প্রতিবেশীর জন্যে বদ দোয়া করে যদিও আল্লাহ এই শক্তি দিয়েছে যে, সে এই প্রতিবেশীকে ত্যাগ করতে পারবে এবং নিজের জায়গা বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে পারবে।
ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ চার ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না:
(১) যে নিজের ঘরে বসে থাকে এবং বলে আল্লাহ আমাকে রিজিক দাও। একে বলা হবে আমি তোমাকে রিজিকের জন্যে চেষ্টা করতে নির্দেশ দেইনি?
(২) যে নিজের স্ত্রীর জন্যে বদ দোয়া করে, তাকে বলা হবে আমি কি তোমাকে তালাক দেয়ার অনুমতি দেইনি?
(৩ ) যে নিজের সম্পদ ভুল পথে খরচ করে পরে আল্লাহর কাছে রিজিকের প্রার্থনা করে, তাকে বলা হবে, আমি কি তোমাকে মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ দেইনি? ও সংশোধন হতে নির্দেশ দেইনি?
(৪) ঐ ব্যক্তি যে সাক্ষী ছাড়া কর্য দেয়, তাকে বলা হবে আমি কি তোমাকে সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দেইনি? (কেতাবুশ শাফী, খন্ড ৫, পৃ. ১৪৮-১৪৯)###