শিয়া হওয়ায় আমি গর্বিত

লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা সাইয়েদ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী, অধ্যক্ষ, ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র, খুলনা।

মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের খাতিরে আজ বলা হয়ে থাকে যে, নিজেকে শিয়া অথবা সুন্নি বলে পরিচয় দিও না বরং বল আমরা মুসলমান। শিয়া ও সুন্নি শব্দ থেকে মতপার্থক্য ও অনৈক্যের গন্ধ আসে। একটি ভুল উক্তিও এ সম্পর্কে উলে­খ করা হয়। ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর বরাত দিয়ে বলা হয় যে, তিনি বলেছেন “আমি শিয়াও নই, সুন্নিও নই বরং মুসলমান”। যদিও ইমাম খোমেনী (রহঃ) ঐক্যের মুর্ত প্রতীক ছিলেন এবং যুগ ও কালের দাবিকে খুব ভালভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু তিনি একথা কখনই বলেননি যে, “আমি শিয়াও নই, সুন্নিও নই, আমি মুসলমান”। বরং ইমাম খোমেনী (রহঃ) মতপার্থক্য সৃষ্টিকারী দুশমনদের প্রত্যুত্তরে বলেন, শিয়া ও সুন্নি একসাথে দুশমনের মোকাবিলায় ঐক্য গড়ে তুলে তাদেরকে বলো যে, আমরা মুসলমান। অর্থাৎ, শিয়া শিয়া অবস্থানে এবং সুন্নি সুন্নি অবস্থানে থেকে যাবতীয় ফেক্হী মতপার্থক্য সত্তে¡ও ঐক্যবদ্ধ আছি এবং আমরা মুসলমান।

শত্রুদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ কিন্তু পাশাপাশি ফেক্হী মতপার্থক্যসমূহের উপর বাহাস হওয়াও উচিৎ। এক তরফা ভাবে কোন একটি ফিকাহ অথবা মাযহাবকে দেখে ফায়সালা করা যে এটাই ইসলাম তা ঠিক নয়। এর কারণে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এক বৈঠকে তিন তালাক দেয়া। অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করছে। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মের অপর এক মাযহাব শিয়া, এ ধরনের তালাকে বিশ্বাস রাখে না। বরং এক বৈঠকে তিনবার কেন দশবার তালাক শব্দ উচ্চারণ করলে এক তালাকই হবে এবং তা হবে রাজয়ী অর্থাৎ প্রত্যাবর্তনযোগ্য এবং শর্তসাপেক্ষ। এতে করে পুরুষের রুজু করার অধিকার থাকবে।

শিয়া মাযহাব এটাও প্রমাণ করতে সক্ষম যে, এ ধরনের তালাক রসুল (সাঃ) এর যুগে ছিল না বরং পরবর্তী সময়ে উদ্ভাবিত হয়েছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে কন্যার উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও ভিন্ন মাসআলা পরিলক্ষিত হয়। যদি কেউ পিতার একমাত্র কন্যা হয় তাহলে সে উত্তরাধিকার সুত্রে হাক্কান অর্থাৎ নির্ধারিত ইরসের অধিকারী হবে, এর পাশাপাশি যেহেতু উত্তরাধিকারী হিসেবে আর কেউ অবশিষ্ট নেই সুতরাং অবশিষ্ট সম্পদ বা সম্পত্তির রাদ্দান বা অনির্ধারিত সম্পত্তির সে অধিকার লাভ করবে। অন্য কেউ যেমন, উক্ত কন্যার চাচা বা ফুফু অর্থাৎ, তার পিতার ভাই অথবা বোন উক্ত সম্পদের অধিকারী হবেন না। সুতরাং একটি মাযহাবের আইনের উপর ভিত্তি করে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ফয়সালা করা সঠিক হবে না। বরং উচিত হবে ইসলাম ধর্মের অন্য ফেকাহ সম্পর্কেও দৃষ্টি দেয়া যাতে ইসলাম ধর্মের সঠিক চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। সুতরাং এ প্রশ্ন ওঠা অবান্তর যে, আমি আমার শিয়া নাম পাল্টে দিই বরং আমরা নিজেকে শিয়া বলে গর্ববোধ করি। স্বয়ং হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) স্বীয় মাযহাব সম্পর্কে গর্ব করতেন। তাই আমরা দেখতে পাই যে, ইমাম খোমেনী (রহঃ) তাঁর অসিয়ত নামায় বলেছেন, “আমরা গর্বিত যে, আমরা এমন এক মাজহাবের অনুসারী, যা আল্লাহ্‌ তায়ালার নির্দেশে স্বয়ং হযরত রাসুলে আকরাম (সাঃ) প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সমস্ত রকমের নিগড় থেকে মুক্ত (আল্লাহ্‌র) বান্দাহ আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) সকল প্রকার নিগড় ও বন্দীত্ব থেকে মানবতাকে মুক্তি দানের জন্যে দায়িত্বশীল (হিসাবে মনোনীত)।

আমরা গর্বিত যে, নাহজুল বালাগাহ-যা কুরআন মজিদের পরে মানুষের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুক্তি বিধানকারী গ্রন্থ এবং যার নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও রাষ্ট্রীয় বিধানসমূহ উন্নততর মুক্তিপথ, সেই নাহজুল বালাগা (আমিরুল মুমিনীন হযরত আলীর (আঃ) বাণী, ভাষণ ও চিঠিপত্রের সংকলন।) আমাদেরই মাসুম ইমামের অবদান।

আমরা গর্বিত যে, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) থেকে শুরু করে মানবতার মুক্তিদূত হযরত ইমাম মাহদী সাহেবে জামান পর্যন্তযিনি পরম ক্ষমতাবান আল্লাহ্‌ তায়ালার কুদরতে জীবিত রয়েছেন ও কাজকর্মাদির পর্যবেক্ষণ করছেন নিষ্পাপ ইমামগণ (তাদের প্রতি হাজার হাজার দরুদ ও সালাম) আমাদেরই ইমাম।

আমরা গর্বিত যে, প্রাণ সঞ্জীবনী যে দোয়াসমূহকে উর্ধ্বগামী কোরআনরূপে অভিহিত করা হয়েছে, তাও আমাদের মাসুম ইমামগণ (আঃ) থেকে এসেছে। (এও আমাদের গৌরবের বিষয় যে), ইমামগণের (আঃ) শাবানের মুনাজাত, হযরত ইমাম হোসাইনের (আঃ) আরাফাতের দোয়া আলে মুহাম্মাদের (আহলে বাইতের) যবুর (হিসাবে গণ্য), “ছহিফায়ে সাজ্জাদিয়া” (হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন ওরফে ইমাম সাজ্জাদের (আঃ) দোয়া ও মুনাজাতের সংকলন।) ছহিফায়ে ফাতেমিয়া, যা আল্লাহ্‌ তায়ালার পক্ষ থেকে হযরত জাহরা মার্জিয়ার (আঃ) (হযরত ফাতেমার) প্রতি ইলহাম হয়েছে তা (ছহিফায়ে ফাতেমিয়াহ) আমাদেরই।

আমরা গর্বিত যে, বাকেরুল উলুম (আঃ) (হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীনের (আঃ) পুত্র ইমাম বাকের) হচ্ছেন ইতিহাসের এমন এক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, স্বয়ং আল্লাহ্‌ তায়ালা, হযরত রাসুলে আকরাম (সাঃ) ও মাসুম ইমামগণ (আঃ) ছাড়া কেউ যাঁর মর্যাদা অনুধাবন করতে পারেনি এবং পারবেও না তিনিও আমাদেরই। আমরা গর্বিত যে, আমাদের মাযহাব জাফরী মাযহাব। আমাদের এই ফিকাহ শাস্ত্র যা এক সীমাহীন সমুদ্র; তাও হচ্ছে তাঁরই (ইমাম বাকেরের (আঃ)) অন্যতম অবদান। আমরা সকল মাসুম ইমামের (আঃ) জন্যে গর্বিত এবং তাঁদেরই অনুসরণের জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আমরা গর্বিত যে, আমাদের মাসুম ইমামগণ (আঃ) যাঁরা দ্বীন ইসলামের সমুন্নতির পথে ও কোরআনে করিমের বাস্তব রূপায়ণের পথে, (যে কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইনসাফ ভিত্তিক হুকুমত প্রতিষ্ঠা) কারাগারে ও নির্বাসনে জীবন কাটিয়েছেন এবং শেষ সমকালীন জালেম, তাগুতী ও খোদাদ্রোহী হুকুমতসমূহের উৎখাতের লক্ষ্যে সংগ্রাম করে শাহাদাতবরণ করেছেন।”

উপরোক্ত বক্তব্যকে যদি বিচার বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে কখনই তাঁর শীয়াতকে অস্বীকার করা যাবে না। প্রত্যেক ব্যক্তি যে আহলে বাইত (আঃ) এর মাযহাব ও মাক্তাবের অনুসারী সে নিজেকে শিয়া পরিচয় দিতে পছন্দ করবে।

আজকে যখন ফেকাহ ও মাযহাবগত চিন্তা ও পথের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং জাফরী ফেকাহর (শিয়া) ন্যায় অন্য কোন ফেকাহ পরিপূর্ণ ও যথার্থ নয় তাই অন্যান্য মাযহাবে মারেফাত ও তরীকত পৃথক পৃথক দেখা যায়। শিয়া মাযহাবই হচ্ছে একমাত্র মাযহাব যে মাযহাবের ফকীহ ও আলাম এবং মারজা একদিকে যেমন ফেকাহ শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ আলাম বা জ্ঞানী ব্যক্তি, অপরদিকে শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারীও বটে।

ইমাম খোমেনী (রহঃ) একদিকে যেমন মারজায়ে তাকলীদ ও ফেকাহ শাস্ত্রের আলাম ছিলেন অপরদিকে ইরফান বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানেরও উচ্চস্তরে তিনি ছিলেন সমাসীন। শিয়া মাযহাব একমাত্র মাযহাব যেখানে প্রেম ও ভালবাসাকে মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। আমরা পবিত্র আহলে বাইতকে (আঃ) ভালবাসি এবং সে ভালবাসার পথ ধরেই আমরা ভালবাসতে শিখেছি। সন্ত্রাসবাদের অনুমতি ও সুযোগ আমাদের মাযহাবে নেই। আমরা তো মজলুমের উপর ক্রন্দন করি এবং জালিমের প্রতি ক্রোধান্বিত হই। আমাদের পরিচয় হলো ভালবাসা যা আহলে বাইত (আঃ) থেকে শিখেছি।

আমরা বিশ্বাস রক্ষা করতে জানি যা বিশ্বস্ততার মূর্তপ্রতীক হযরত আব্বাস (আঃ) থেকে শিখেছি। আমাদের নারীরা অপ্রাপ্তির অনুভূতিতে ভোগেন না কারণ আমাদের ইতিহাসে নারীদের একটি সোনালী অধ্যায় বিরাজমান যাদের মাধ্যমে কারবালা থেকে বেরিয়ে ইসলাম আমাদের কাছে পৌঁছেছে। এমন মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত থাকতেই আমরা নিজেদেরকে সম্মানিত মনে করি।

অনেকেই আমাকে এ বলে পরামর্শ দিয়ে থাকেন যে, আমরা আপনার সাথে আছি। আপনারা বিশ্বব্যাপি ইসলামী বিপ্লবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু আপনাদের সাথে একটি সমস্যা আছে আর তাহলো আপনারা নিজেদেরকে শিয়া বলে পরিচয় দেন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি বলুন, নিজেকে শিয়া না বলে কী বলব?”

তিনি বললেন, “কোরানিক মুসলিম বলুন।”

আমি বললাম, “এতো সকল মুসলমানকে বলা যেতে পারে যাদের কোরআনের উপর ঈমান আছে।”

“তাহলে মুসলমান বলুন”-তিনি উত্তর দিলেন।

তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বেশ, নিজেকে শুধু মুসলমান বললে কেউ যদি জানতে চায় আপনি কোন ধরনের মুসলমান? এজিদ ও মুয়াবিয়ার অনুসারী মুসলমান নাকি আলী (আঃ) ও হোসাইনের অনুসারী মুসলমান? হারুন-আর-রশীদ ও মামুন-আর-রশীদের অনুসারী মুসলমান নাকি মুসা কাজিম (আঃ) ও আলী রেজা (আঃ) এর অনুসারী মুসলমান?

এক্ষেত্রে আমি কী উত্তর দেব? প্রত্যেকের কাছে কী এর ব্যাখ্যা দিতে থাকব? নাকি আমি এককথায় উত্তর দেয়া সমীচীন মনে করব যে আমি শিয়া যাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে মুয়াবিয়া, এজিদ ও হারুন ও মামুন-আর-রশীদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই বরং আমরা প্রিয় নবী মোহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) ও চৌদ্দ মাসুমীন (আঃ) এর অনুসারী এবং তাঁরাই আমাদের পথপ্রদর্শক। হযরত মোহাম্মাদ মোস্তফা (সাঃ) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং আম্বিয়া কেরামের নেতা। তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা (সাঃ আঃ) নারীকুলের শিরোমনি এবং আলী (আঃ) আ-ইম্মা ও ওলী-এ-কেরামের সর্দার এবং প্রথম ইমাম।

তাঁর পুত্রদ্বয় হাসান ও হোসাইন (আঃ) জান্নাতে যুবকদের সর্দার এবং আমাদের ইমাম। এভাবে ইমাম আলী (আঃ) থেকে শুরু করে আমাদের দ্বাদশ ইমাম মাহদী (আঃ) পর্যন্তযাঁরা সকলেই দ্বীনের সংরক্ষক। যাঁরা নবী মোহাম্মাদ (সাঃ) কর্তৃক হালাল ও হারাম ঘোষিত সবকিছুকে কেয়ামত পর্যন্তহালাল ও হারাম রাখার জিম্মাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত। ইমামতের সিলসিলার সর্বশেষ সদস্য আমাদের দ্বাদশ ইমাম যিনি ইমাম মাহদী (আঃ ফাঃ শঃ) নামে পরিচিত, আমরা তাঁর পুনঃ আবির্ভাবের অপেক্ষায় অপেক্ষমান। যিনি পৃথিবীকে জুলুম অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি দান করবেন এবং পৃথিবীর বুকে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আমি আমার মাযহাবকে নিয়ে গর্ব করি।

হে আল্লাহ্‌ তোমার লাখো কোটি শুকরিয়া! যেমন মাওলা ও পথপ্রদর্শক আমাদের জন্য প্রয়োজন ছিল তুমি তা দান করেছ। যেমন অনুসারী হওয়া দরকার তেমন অনুসারী হওয়ার তৌফিক তুমি আমাদেরকে দান কর।###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More