লেখক ও গবেষক- মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন ক্বাদরী
খৃষ্টপূর্ব ১৬০০ অব্দের দিকে মিশরের অধিবাসী আমালিকারা স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে ইয়াসরাবে (বর্তমান মদিনা শরীফ) বসতিস্থাপন করে। এদের নেতার নাম ছিল থারমাস। তার নামানুসারেই এ এলাকার নামকরণ করা হয় ইয়াসরাব। আমালিকগণ যখন স্বৈরাচার হয়ে উঠল তখন হযরত মুসা (আঃ) কর্তৃক প্রেরিত একদল প্রচারক এ এলাকায় আসে এবং বহু যুদ্ধ বিগ্রহের পর তারা আমালিকদের পরাভ‚ত করে বনি ইসরাঈলদের বসতি স্থাপন করে। বুখতনসর কর্তৃক ব্যবলিন অধিকৃত হলে পরাজিত ইহুদিরা ব্যাপকভাবে ইয়াসরাবে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর ইয়েমেনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিল সেখানকার অধিবাসী হযরত ইসমাইল (আঃ) এঁর বংশধর আওস ও খাজরাস গোত্রদ্বয় ইয়াসরাবে বসতিস্থাপন করে। এভাবেই ইয়াসরাব আবাদ হয়। খৃষ্টপূর্ব ১১৫ সনে ইয়েমেনের সম্রাট আদাম ইবনে কারব (ইয়েমেনের সম্রাটের উপাধি ছিল তুব্বা) সিরিয়া অভিমুখে অভিযান পরিচালনা কালে পথিমধ্যে ইয়াসরাব দখল করেন এবং তার এক পুত্রকে ইয়াসরাবের শাসক হিসাবে নিয়োগ করে তিনি সম্মুখের দিকে অগ্রসর হন। তুব্বা চলে যাবার পর ইয়াসরাবের জনগণ তাঁর পুত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তুব্বা খবর পেয়ে পুনরায় ইয়াসরাবে ফিরে আসেন এবং এ জনপদের সকল অধিবাসীকে হত্যা করে সমগ্র গাছপালা কেটে এলাকাটি বিরান করে দেয়ার নির্দেশ দেন। নগরবাসীর এ ঘোর দুর্দিনে কয়েকজন সংসারত্যাগী তওরাতের অনুসারী বৃদ্ধ সাধক সাহসে ভর করে নতজানু হয়ে তুব্বার সামনে এলেন এবং বলতে লাগলেন, হে মহান সম্রাট! আমাদের হাতে তওরাত রয়েছে। এতে লেখা রয়েছে আখেরি নবি আল্লাহ্র হাবিব তাজেদারে কায়েনাত দোজাহানের বাদশাহ আহাম্মাদে মুজতবা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা তাঁর জন্মস্থান ত্যাগ করে পবিত্র স্থানে বসত করবেন সে স্থান হবে তাঁর প্রধান কর্মকেন্দ্র এবং তিনি সেখানে চির বিশ্রাম নেবেন। আমরা নানা প্রকার লক্ষণ ও গায়েবি ইশারায় নিশ্চিত হয়েছি যে এটাই হবে সে মহিমাময় জনপদ। তুব্বা বাদশাহ বললেন, তাঁর আগমনের বিষয়টি আমাদের গ্রন্থে আছে বলে আমি জানি এবং তাঁর আগমনে আমিও বিশ্বাসী। সাধকগণ বললেন, সেই হুজুর এঁর ওসিলায় আমাদের জনগণকে ক্ষমা করে দিন এবং তাঁর শেষ বিশ্রাম স্থলকে বিরান করবেন না। এতে তুব্বা বাদশাহ তাঁর নির্দেশ তুলে নিয়ে আল্লাহ্র হাবিব তাজেদারে কায়েনাত দোজাহানের বাদশাহ আহাম্মাদে মুজতবা হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা এঁর মুহাব্বাতে ঈমানের সাথে সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। সুবহানাল্লাহ।
এরপর তুব্বা বাদশাহ একটা ঘর তৈরি করলেন এবং তাঁর বংশের একজন লোককে একটা জায়গির দিয়ে বললেন, তুমি বংশানুক্রমে এ জায়গিরের আয় ভোগ করবে আর আমার এ ঘরটি রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং আমার এ অছিয়ত নামাটির হেফাজত করবে। যে দিন হুজুর এঁর কদম মুবারক ইয়াসরাবে মুবারকময় হবে সেদিন তাঁকে এ ঘরে বা হুজরা শরীফে থাকতে দেবে এবং এ অছিয়ত নামাটি তাঁর দাস্তে কুদরাতে বা হাত মুবারকে দিবে।
এরপরে তুব্বা বাদশাহ সাধকগণকে জিজ্ঞেস করলেন হুজুর এঁর জন্মস্থান কোথায় হবে? তারা বললো বাক্কায় বা মক্কায়। তখন তুব্বা বাদশাহ সিরিয়া অভিযানের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে একদল সাধক নিয়ে মক্কা শহর অভিমুখে যাত্রা করলেন এবং মক্কায় উপস্থিত হয়ে হুজুর এঁর স্মরণে পবিত্র ক্বাবা গৃহকে ইয়েমেনি গিলাফ পাক বা চাদর দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। সে থেকে ক্বাবাগৃহ ইয়েমেনি গিলাফ পাক বা চাদর দ্বারা আচ্ছাদনের নিয়ম প্রচলিত হয়।
এদিকে হুজুর রাসূলুল্লাহ মক্কার কুরাইশদের অত্যাচারে মদিনা শরীফে (ইয়াসরাবে) হিজরত করে যখন কুবা পল্লীতে উপস্থিত হলেন তখন সকলেই তাঁর উষ্ট্রীর রশি ধরে টানাটানি শুরু করে দিলো যেন হুজুর রাসূলুল্লাহ সেখানে অবতরণ করেন। তখন হুজুর রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমরা ওটাকে ছেড়ে দাও। আল্লাহ্ যেখানে নির্ধারণ করে রেখেছেন উষ্ট্রী নিশ্চয়ই সেখানে থামবে। উষ্ট্রীটি চলতে চলতে তুব্বা বাদশাহ কর্তৃক প্রায় সাত শত পঞ্চাশ বছর পূর্বে নির্মিত ঘরটির সামনে গিয়ে বসে পড়েছিল।
হুজুর রাসূলুল্লাহ সেখানে অবতরণ করলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে এলো হযরত আবু আইয়ুব আনসারি (রাঃ)। ইনিই তুব্বা বাদশাহর অছিয়ত নামা বংশানুক্রমে তখনকার হেফাজতকারী। তিনি হুজুর রাসূলুল্লাহ এঁর হাতে তুব্বা বাদশাহর অছিয়ত নামাটি দিলেন।
অছিয়তনামাতে লেখা ছিলঃ
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আহম্মদ আল্লাহ্র রাসূল। যদি আমি জীবিত থাকি এবং সাক্ষাৎ পাই, তবে অবশ্যই আমি তাঁর একজন সেবক ও সহায়তাকারী হবো। তাঁকে আমার লাখো সালাম। ইয়াসরাবে এলে তিনি যেন আমার এ ক্ষুদ্র ঘরটিতে থাকেন। মদিনায় পৌঁছার দিন থেকে সাত মাস হুজুর রাসূলুল্লাহ এ ঘরে বসবাস করেছেন।###