লেখকঃ সাঈদ মোস্তফা হাসান
মাহে রমজান মুসলমানদের কাছে ইবাদত বন্দেগী, ত্যাগ, তিতিক্ষা, দান খয়রাত এবং আত্মশুদ্ধির সাধনার মাস। এ মাস আগমনের সাথে সাথে তামাম মুসলিম জাহানের ঘরে ঘরে পড়ে যায় বিপুল সাড়া। মুসলিমগণ সারা দিন রোজা রাখেন এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অর্থাৎ সুন্নী মুসলিমগণ রাতের প্রথমভাগে মসজিদে মসজিদে এশার নামাজের পরে তারাবী নামাজ পড়ে থাকেন। কোন এলাকা বা মহল্লায় যদি মসজিদ না থাকে তাহলে অস্থায়ী ভিত্তিতে ইমাম নিয়োগ দিয়ে মুসুল্লীগণ কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে তারাবী নামাজ পড়ে থাকেন। তারাবী নামাজ পড়ানোর জন্য মুসুল্লীগণ ইমাম সাহেবদের বিশেষ হাদিয়া প্রদান করেন। তবে সামর্থবান ও আগ্রহী মুসুল্লীগণ খতমে তারাবী নামাজ পড়তে বেশী পছন্দ করেন । এজন্য হাফেজে কুরআন বাছাই করে তারাবী নামাজের ইমাম হিসাবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। কখনো দরকষাকষি করে আবার কখনো পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে এসব সম্মানিত হাফেজে কুরআনগণের হাদিয়া নির্ধারিত হয়ে থাকে। যেসব মসজিদে খতমে তারাবী নামাজ পড়া হয় সেসব মসজিদের হাফেজ নন এমন স্থায়ী ইমামগণ রমজান মাস উপলক্ষ্যে বাড়তি আয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মনে কষ্ট নিয়ে রমজান মাস এবং ঈদ-উল-ফিতর পার করেন ।
তারাবী নামাজের মুসুল্লীগণের মধ্যে এ নামাযের রাকাত সংখ্যা নিয়ে ব্যাপক মত-পার্থক্য রয়েছে। এ মতপার্থক্য কখনো কখনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়ে থাকে। “তারাবী নামাজ কত রাকআত, এ নিয়ে ইমামদের মাঝে মতভেদ আছে। ইমাম আবু হনিফা, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমাদ প্রমুখ ইমামদের মতে তারাবীর নামায ২০ রাকআত। ইমাম মালেকের মতে ২০ এবং ৩৬ রাকআত। অধিকাংশ ওলামা ২০ রাকআতের মতকেই অগ্রগণ্য বলেছেন এবং এতে ইজমা হয়েছে, তাঁদের দলীলঃ হযরত ওমরের (রাঃ) খেলাফতকালে ২০ রাকআত নামায পড়ার নিয়ম চালু হয় (মুওয়াত্তা)। আরো দালায়েল দ্বারা তাঁরা ২০ রাকআত প্রমাণ করেছেন। কিছুসংখ্যক আলেম বলেছেন, তারাবীহ ৮ রাকআত। তাঁদের দলিল আয়শা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস।” (সহীহ আল বুখারী ২য় খন্ড, ২৮ নং টিকা দ্রষ্টব্য, পৃ.২৭৯, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, একাদশ প্রকাশ, জুন ২০১২)
“হযরত আল্লামা ইমাম বদরুদ্দিন আইনি হানাফি (রাহ) বুখারি শরিফের ভাষ্য গ্রন্থে লিখেছেন- ৪৭, ৪১.৩৯, ৩৬, ৩৪, ২৮, ২৪, ২০, ১১ এ হচ্ছে তারাবিহের রাকাত সংখ্যা, এর উপর আমল ছিল। (প্রমাণ : উমদাতুল কারি শায়হু সহিহিল বুখারি ৭ম খন্ড, ২০৪ পৃ.। আরও দেখুন- তুহফাতুল আহওয়াজি ৩য় খন্ড, ৪৩৯ পৃ.)
বর্তমান মুসলিম বিশ্বে শুধু দুটি সংখ্যা চালু আছে। বাকিগুলো বিলুপ্তির পথে। আর সে দুটি হচ্ছে- ৮ রাকাত ও ২০ রাকাত। [দেখুনঃ হাদিস শরিফের আলোকে তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা- শাইখ সৈয়দ এ.এ. গোলাম মোহাম্মদ ইবনে সৈয়দ, এ.এ.জি.কে. মতিউর রহমান হানাফি, প্রকাশকাল, জানুয়ারি, ২০১৫। পরিবেশক, র্যামন পাবলিশার্স, ২৬ বাংলাবাজার (২য় তলা) ঢাকা-১১০০ পৃ. ১২]
বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ-প্রবচন রয়েছে ‘চিলে ঠোকর দিয়ে কান নিয়ে গেছে শুনেই চিলের পেছনে দৌড় না দিয়ে আগে কানে হাত দিয়ে দেখ’। এবার আসুন কানে হাত দিয়ে দেখা যাক আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদিতে তারাবী নামাজের উৎপত্তি, রাকাত সংখ্যা এবং জামাতের সাথে আদায়ের ব্যাপারে কী বলা হয়েছে।
“উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে রসূলুল্লাহ (স.) মসজিদে নামাজ আদায় করলেন। লোকেরাও তাঁর সাথে নামাজ আদায় করলো। পরবর্তী রাতেও তিনি নামাজ আদায় করলেন এবং বহু লোক সমাগম হলো। এরপর তৃতীয় অথবা চতুর্থ রাতে লোকেরা সমবেত হলে রসূলুল্লাহ (স.) বাড়ী থেকে তাদের কাছে বেরিয়ে এলেন না। সকালবেলা তিনি লোকদেরকে বললেন, (গতরাতে) তোমরা যা করেছ তা সবই আমি দেখেছি তোমাদের ওপর (এ নামায) ফরয করে দেয়া হবে বলে আমি আশংকা করেছিলাম। সে কারণেই আমি আসিনি। এ ঘটনাটি রমযান মাসে সংঘটিত হয়েছিল। (সহীহ আল বুখারী, ১ম খন্ড, অধ্যায়ঃ তাহাজ্জূদ নামাযের বর্ণনা, হাদীস নং-১০৫৮, পৃ. ৪৯৮, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১৭শ প্রকাশ, জানুয়ারী ২০১২)
এ ঘটনার পরে রসূলুল্লাহ (স.) আর কখনো রমযান মাসে এশার নামাযের পরে মসজিদে এসে নামায পড়েননি। কারণ তাঁর সাহাবীগণের (রা.) নামাযের প্রতি আসক্তি লক্ষ্য করলেও তিনি ফরয নামায ছাড়া আর সব নামায বাড়ীতে ব্যক্তিগতভাবে আদায় করা পছন্দ করেছেন এবং নসীহতও করেছেন।
“যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (স.) রমযান মাসে একটি কামরা তৈরী করেছিলেন। (বর্ণনাকারী বুশর ইবনে সাঈদ বলেন) মনে হয় সাহাবী যায়েদ ইবনে সাবেত আমার কাছে হাদীসটি বর্ণনা করার সময় বলেছিলেন যে, কামরাটি ছিল চাটাই নির্মিত। এ কামরায় নবী (স.) বেশ কয়েক রাত নামায (তাহাজ্জুদ) আদায় করেছিলেন। তখন তাঁর কিছু সাহাবীও তাঁর এ নামাযে ইক্তেদা করতেন তিনি তা জানতে পেরে (এক রাতে) বসে থাকলেন। সকালে তিনি তাদের কাছে বললেন, আমি তোমাদের কাজ-কর্ম অর্থাৎ নামাযের প্রতি আসক্তি দেখেছি ও তা অনুধাবন করেছি। হে লোকেরা, তোমরা নিজ নিজ বাড়ীতেই নামায আদায় কর। কেননা, ফরয নামায ছাড়া মানুষের নামাযের মধ্যে সবচেয়ে ভাল নামায হচ্ছে তা, যা তার বাড়ীতে পড়া হয়।’’ (সহীহ আল বুখারী, ১ম খন্ড, কিতাবুল আযান, হাদীস নং-৬৮৭, পৃ.৩৪৪, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১৭শ প্রকাশ, জানুয়ারী ২০১২)
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ফরয নামায ছাড়া আর কোনো নামায জামাআতবন্দী হয়ে মসজিদে আদায় করা রসূলুল্লাহর (স.) সুন্নাত তো নয়ই বরং তাঁর নসীহতের বিরুদ্ধাচারণ। মহান সাহাবীগণ (রা.) রসূলুল্লাহর (সা.) এ নসীহত অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছিলেন তবে ল্যাঠা বাধে বা বিতর্ক সৃষ্টি হয পরবর্তী কয়েক বছর পরে। সহীহ আল বুখারীতে ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে যে ভাবে, আসুন তা দেখে নেয়া যাক।
“ইবনে শিহাব বলেছেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ (সঃ) ইন্তেকাল করলেন। আর হুকুমও এ অবস্থায়ই রয়ে গেল। তারপর আবু বকর (রা.)-এর গোটা খিলাফতকাল এবং উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম ভাগ এ অবস্থায়ই কেটে গেল (অর্থাৎ সকলেই একা একা তারাবীহ পড়তো)।
ইবনে শিহাব (র) উরওয়া ইবনে যুরাইর (র) থেকে বর্ণনা করেছেন, আবদুর রহমান ইবনে আবদুল কারী বলেছেন, আমি রমযানের এক রাতে ওমর ইবনে খাত্তাবের সাথে মসজিদের দিকে বের হলাম।। দেখলাম, বিভিন্ন অবস্থাায় বহু লোক। কেউ একা একা নামায পড়ছে। কোথাও এক ব্যক্তি নামায পড়ছে আর কিছু লোক তার সাথে নামায আদায় করছে। তখন উমর (রা.) বললেন, আমার মনে হয়, এদের সবাইকে একজন কারীর সাথে জামাআতবন্দী করে দিলে সবচাইতে ভাল হবে। অতঃপর তিনি (তা করার) মনস্থ করলেন এবং উবাই ইবনে কা’ব (রা.) এর পিছনে জামাআতবন্দী করে দিলেন। এরপর আমি দ্বিতীয় রাতে আবার তাঁর সাথে বের হলাম দেখলাম, লোকজন তাদের ইমামের সাথে নামায পড়ছে। উমর (রাঃ) বললেন, এটি উত্তম ‘বিদআত’ বা সুন্দর ব্যবস্থা।’’ (সহীহ আল বুখারী, ২য় খন্ড, কিতাবুস সাওম, হাদীস নং-১৮৬৮, পৃ. ২৭৭-৭৮, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১১শ প্রকাশ, জুন, ২০১২)
তারাবী নামায জামআতবন্দী হয়ে আদায় করার এ ঘটনা বহু প্রশ্ন, বহু বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এখানে রাকআতের প্রশ্ন অবান্তর। পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর অনুশাসন অক্ষুন্ন রাখার অতন্দ্র প্রহরী আহলে বায়াতের মাসুম ইমামগণের (আঃ) অনুসারী ফিকাহবিদগণ দ্ব্যার্থহীন ভাষায় এ ঘটনার প্রতিবাদ করে বলেছেন- “রমযান মাসের রাতগুলোতে মোট এক হাজার রাকআত নামায পড়া মোস্তাহাব, কিন্তু এ নামাযগুলো জামায়াতে আদায় করা বেদআত”। (দেখুনঃ ইমামিয়া বিশ্বাসের সনদ- আয়াতুল্লাহ জা’ফর সুবহানী, অনুবাদঃ মোঃ মাঈনউদ্দিন, পৃ. ২৩১, প্রকাশনায়ঃ দারুল কুরআন ফাউন্ডেশন, ঢাকা, মে ২০০৭)।
মুসলিম সমাজে একটি দল রয়েছে যারা সব কিছুর মধ্যে বিদাতের গন্ধ খুঁজে বেড়ায়। তারা গর্বের সাথে হামেশা বলে থাকেন ‘ভাল বিদাত বা মন্দ বিদাত বলে কোনো কথা নেই তামাম বিদাতই পথভ্রষ্টতা আর তামাম পথভ্রষ্টতার পরিণতি হলো জাহান্নাম।’ তারা হযরত উমর (রা.) কর্তৃক স্বয়ং ঘোষিত এ বিদাতকে বলে থাকেন, রসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাতের পুনরুজ্জীবন। একেই বলে ‘গোয়ালার দই গোয়ালা নিজে টক বললেও দালাল বলে আরে না না এ দই মিষ্টি।’ বিষয়টি সেরকম। উপরে যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বর্ণিত হাদীস থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পেরেছি যে, ফরয নামায ছাড়া অন্য যে কোনো নামায রসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে জামাআতবন্দী হয়ে পড়তে নিষেধ করেছেন। এখন কেউ সওয়াল করতে পারেন, হযরত উমর (রা.) তাহলে কেন তারাবী নামায জামাআতবন্দী হয়ে পড়তে আদেশ করলেন? এর জবাব হযরত উমর (রা.) এবং তাঁর নির্দেশ যারা মেনেছিলেন শুধুমাত্র তাঁরাই বলতে পারেন। তবে বক্ষমান হাদীস থেকেই জানা যাচ্ছে যে, হযরত উমর (রা) নিজে কিন্তু জামাআতবন্দী হয়ে তারাবী নামায পড়েননি। এবার আসুন দেখা যাক পরম করুণাময় আল্লাহ কী বলেনঃ “(হে মুসলমানরা!) তোমাদের জন্য অবশ্যই আল্লাহর রাসুলের (জীবনের) মাঝে (অনুকরণযোগ্য) উত্তম আদর্শ রয়েছে।” -(সূরা আল- আহযাবঃ ২১)।
“হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এর সামনে (কখনো) তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” -(সূরা আল-হুজুরাতঃ ১)
“(আল্লাহর) রাসূল তোমাদের যা কিছু (অনুমতি) দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং তিনি যা কিছু নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো, আল্লাহ পাককেই ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক কঠোর শাস্তিদাতা।” (সুরা আল-হাশরঃ ৭)
পবিত্র কুরআনের উপর্যুক্ত সুস্পষ্ট নির্দেশের পরেও যারা অন্য কোনো সাহাবী (রা.) বা বুযুর্গের নসীহত বা পরামর্শ অনুসরণ করে তারা কোন্ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত তা অবশ্যই সচেতন মুসলমানদের ভেবে দেখতে হবে, কারণ এটা ঈমানের দাবী। এ দেশের আহলে হাদীসগণের মশহুর লেখক মুফতী মুহাম্মদ আব্দুর রউফ লিখেছেন- “যে ব্যক্তি সাহাবীর সুন্নাত, তাবেয়ীর সুন্নাত, বিনা দলীলে মুসলমানদের সুন্নাত বর্জন করে রসূল (সাঃ) এর হাদীসকে অনুসরণ করে তারা আহলে হাদীস।” (দেখুনঃ আহলে হাদীস কি ও কেন ? পৃ. ১, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ৯০, হাজী আবদুল্লাহ সরকার লেন, বংশাল, ঢাকা-১১০০)
জমঈয়তে আহলে হাদীসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল্লামা মুহাম্মদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কুরায়শী (রহঃ) লিখেছেন “শাসনকর্তাদের শরয়ী মাসআলা সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত জনমন্ডলীর জন্য প্রতিপালনীয় নয় এবং কাহারও ইজতেহাদ আইনের পর্যায়ভুক্ত হইতে পারে না।” তিনি আরো লিখেছেন-“তাবেয়ীকুল গৌরব সালিম হযরত আয়শা প্রমুখা বর্ণিত রসূলুল্লাহর (সা.) হাদীসের দরুণ স্বীয় পিতামহ ও ইসলাম জগতের সর্বাধিনায়ক উমর ফারুকের‘ তাওয়াফে-ইফাযার পূর্বে সুগন্ধির ব্যবহার নিষেধ বিষয়ক’ফত্ওয়া বর্জন করিয়াছিলেন।” (দেখুনঃ ফিরকাবন্দী বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি- আল্লামা মুহাম্মদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কুরায়শী, ৯৮ নবাবপুর রোড, ঢাকা-১১০০, তৃতীয় সংস্করণ, জুন ২০০৬, পৃ.৪২)।
আমাদের আহলে হাদীস বা সালাফী ভাইগণ জামাআতবন্দী হয়ে আট রাকআত তারাবী নামায পড়ার যে দলিল পেশ করে থাকেন তা সুস্পষ্টরুপে তাদের দাবীর বিপক্ষে রায় দেয়। পাঠকদের সুবিবেচনার জন্য আমি সেই দলিলটি এখানে তুলে ধরলামঃ
“আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়েশাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রসূলুল্লাহ (সঃ) রমযান মাসে (রাতের বেলা) কিভাবে নামায পড়তেন? জবাবে তিনি (আয়েশা) বললেন, রমযান বা অন্যান্য সময়ে রসূলুল্লাহ (সঃ) (রাতের বেলা) এগার রাকআতের অধিক নামায পড়তেন না। প্রথমে তিনি চার রাকআত নামায আদায় করতেন। তাঁর (নামায) দীর্ঘ হওয়া ও (তাঁর নামায) সর্বাঙ্গীন সুন্দর হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। (অর্থাৎ এতো দীর্ঘ ও সর্বাঙ্গীন সুন্দর যা প্রশ্নের অতীত।) পরে তিনি আরো চার রাকআত নামায আদায় করতেন। এরও সর্বাঙ্গীন সুন্দর ও দীর্ঘ হওয়া সম্পর্কে কিছু জানতে চেয়ো না। অর্থাৎ (প্রশ্নাতীতভাবে তা দীর্ঘক্ষণস্থায়ী ও সর্বাঙ্গীন সুন্দর) এরপর তিনি তিন রাকআত নামায আদায় করতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল ! আপনি কি বিতর আদায়ের পূর্বে ঘুমান? জবাবে তিনি বললেন, হে আয়েশা, আমার দু‘চোখ ঘুমায় কিন্তু কলব (আত্মা) ঘুমায় না।“ (সহীহ আল বুখারী, ১ম খন্ড, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, হাদীস নং-১০৭৬, পৃ.৫০৫, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১৭শ প্রকাশ, জানুয়ারী, ২০১২)। “রাতের বেলা নবী (স.) এতক্ষণ নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর পা দু‘টি অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) পায়ের নলা দু‘টি ফুলে যেত।” (ঐ, হাদীস নং-১০৫৯)
উপর্যুক্ত হাদীস থেকে যে দুটি সত্য বেরিয়ে আসে তাহলো প্রথমতঃ এ নামায রমযান মাসের জন্য অতিরিক্ত কোনো নামায নয়। দ্বিতীয়তঃ এ নামায রসূলুল্লাহ (সঃ) নির্জনে গৃহকোণে একাকী আদায় করেছেন। অতএব এ হাদীস কি করে জামাআতবন্দী হয়ে তারাবী নামায পড়ার দলিল হতে পারে? আমরা উপরে আলোচিত হাদীস থেকে আরো জানতে পেরেছি এ নামায রসূলুল্লাহ (সঃ) মসজিদে আদায় করতে গেলে সাহাবীগণ (রা.) তাঁর পিছনে ইক্তেদা করলে তিনি এক রাতে বসে থাকলেন এবং সাহাবীগণকে পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিলেন ফরয নামায ছাড়া আর সকল নামায ঘরে পড়া ভালো। এরপরেও রসূলুল্লাহর (সা.) আনুসারী দাবী করা সত্ত্বেও মুসলমানদের এক বিরাট অংশ কেন তারাবী নামায জামাআতে আদায় করাকে এত গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন তা বোধগম্য নয়। আশা করি এ কথা সকল ফেরকার মুসলিমগণ স্বীকার করবেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) মনোনীত বিষয়ে বিপরীত ব্যাখ্যা দেওয়ার অধিকার কোনো মুসলমানের নেই। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) সিদ্ধান্তের বিপরীত কুট ব্যাখ্যা দেয়, তারা পরিস্কার গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ভাইগণ তাদের অনুসরণীয় ইমামগণের অভিমতের চাইতে সিহাহ-সিত্তা এবং সহীহ হাদীসের উপর আমল করাকে উচিত বলে মনে করে থাকেন। এর মধ্যে বুখারী শরীফের হাদীসকে তাঁরা পবিত্র কুরআনের পরেই স্থান দিয়ে থাকেন। আমরা এখানে বুখারী শরীফ থেকেই জামাআতবন্দী হয়ে তারাবী নামায পড়া যে, সুন্নাহ বিরোধী তার প্রমাণ তুলে ধরেছি। “মূল আরবি ভাষায় সিহাহ-সিত্তা (বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ) অর্থাৎ হাদিস শরিফের বিশুদ্ধ ছয় কিতাবের মধ্যে ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজের উপর মারফু (যে হাদিসের সনদ বা বর্ণনানুক্রম ঊর্ধ্বদিকে রসূলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে মারফু হাদিস বলে), মাওকুফ (যে হাদিসের সনদ বা বর্ণনানুক্রম ঊর্ধ্বদিকে কোন সাহাবি পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে মাওকুফ হাদিস বলে), ও মাকতু (যে হাদিসের সনদ বা বর্ণনানুক্রম ঊর্ধ্বদিকে তাবেঈ পর্যন্ত পৌঁছেছে তাকে মাকতু হাদিস বলে), কোন একটি হাদিসেও লিপিবদ্ধ নেই।
ইমাম মুহিউস সুন্নাহ বাগাবি (রাহ) (ইন্তিকাল ৫১০ হিজরি) এবং আল্লামা ওলিউদ্দিন আল খাতিবুত তাবরিজি (রাহ) (ইন্তিকাল ৭৪১হিঃ) এর মিশকাতুল মাসাবিহ অর্থাৎ মিশকাত শরিফ একটি সহজ-সরল ও নির্ভরযোগ্য সংকলন-হাদিসগ্রন্থ। এতে প্রায় ছয় হাজার হাদিস লিপিবদ্ধ আছে। এ কিতাবে চার মাজহাবের আমল ভিত্তিক প্রায় সব হাদিসই একত্রে পাওয়া যায়। তাই এ হাদিসগ্রন্থ সর্বমহলে সমাদৃত। গ্রন্থটি উপমহাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সব মাদ্রাসায় পাঠ্য। অথচ এ হাদিস গ্রন্থে ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজের পক্ষে একটি বর্ণনাও আসেনি। ইমাম আজম আবু হানিফার (রাহ) সংগৃহীত হাদিস সমূহের পরবর্তীতে লিখিত হাদিস গ্রন্থ “মুসনাদ ইমাম আবু হানিফা” হানাফি মাযহাবের একটি নির্ভরযোগ্য কিতাব। অথচ ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজের পক্ষে উক্ত গ্রন্থে কোন বর্ণনা আসেনি।
তাছাড়া হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠ হাদিস গ্রন্থ শারহু মাআনিল আসার অর্থাৎ তাহাবি শরিফেও তারাবিহ অধ্যায়ে রাকাত সংখ্যা সম্বন্ধীয় কোন বর্ণনা আসেনি।
হজরত আল্লামা মোল্লা আলি কারি হানাফি (রাহ) (ইন্তিকাল ১০১৪ হিঃ) বলেন, “ আমাদের কোন ইমামের অভিমত হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (দ.) লোকজন নিয়ে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। হয়তো তিনি মুসান্নাফ ইবন আবি শাইবা থেকে তা গ্রহণ করেছেন। যেমন বলা হয়েছে- রাসুলুল্লাহ (দ.) রমজান মাসে বিতর ছাড়াই ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ আদায় করেছেন। বাইহাকি ও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (দ.) দুই রাতে দশ সালামে ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ আদায় করেছেন। আর তৃতীয় রাতে রাসুলুল্লাহ (দ.) বেরিয়ে আসেননি। কিন্তু এ দুটি বর্ণনাই যইফ।”[ হাদিস শরিফের আলোকে তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা শাইখ সৈয়দ এ.এ. গোলাম মোহাম্মদ ইবনে সৈয়দ এ.এ.জি.কে. মতিউর রহমান হানাফি, প্রকাশকাল, জানুয়ারি, ২০১৫। পরিবেশক, র্যামন পাবলিশার্স, ২৬ বাংলাবাজার (২য় তলা) ঢাকা-১১০০ পৃ.৪৬- ৪৭ এবং ৫৫।]
বিভিন্ন হাদীস থেকে রাসুলুল্লাহর (সা.) রমযান মাসে মসজিদে গিয়ে এশার নামাযের পরে অতিরিক্ত নামায পড়ার এবং তাঁর (সা.) পশ্চাতে সাহাবীগণের (রা.) ইক্তেদা করার যে বর্ননা পাওযা যায় তা ছিল তাহাজ্জুদের নামায, তারাবীহ নামায নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে হাদীসগুলো পাঠ করলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তারাবীহ নামায ব্যক্তিগতভাবেই পড়ার কথা বলেছেন। যেমন আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি রমযানে (রাতে তারাবীহর নামাযে) ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় দাঁড়ায় তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (সহীহ আল বুখারী, ২য় খন্ড, কিতাবুস সাওম, হাদীস নং-১৮৬৭, পৃ.২৭৭, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১১শ প্রকাশ, জুন, ২০১২)।
যারা পুর্বপুরুষ এবং বুযুর্গানেদ্বীনের দোহাই দিয়ে জামাআতবন্দী হয়ে তারাবীহ নামায পড়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকেন তাদের মধ্যে অশিক্ষিতগণ হযতো রাসুলুল্লাহর (সা.) নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার দায় এড়াতে পারবেন কিন্তু শিক্ষিত মুসলিমগণ পারবেন না। কারণ পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণীই হচ্ছে- “পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আলাকঃ ১)
পরিশেষে আবারো সুন্দরতম অনুপম আদর্শের প্রতীক আমাদের প্রিয়তম নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রাসঙ্গিক হাদীসটি উল্লেখ করছিঃ
“হে লোকেরা, তোমরা নিজ নিজ বাড়ীতেই নামায আদায় কর। কেননা, ফরয নামায ছাড়া মানুষের নামাযের মধ্যে সবচেয়ে ভাল নামায হচ্ছে তা, যা তার বাড়ীতে পড়া হয়।’’###