সাঈদ মোস্তফা হাসান
পবিত্র কুরআনের তাফসীর করার প্রধান শর্ত হলো এক আয়াতের তাফসীর অন্য আয়াত দ্বারা করতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো সহিহ হাদিস। যদি কোনো হাদিসের বক্তব্য পবিত্র কুরআনের বক্তব্যের বিপরীত হয় তাহলে সেই হাদিস বাতিল বলে গণ্য হবে। পবিত্র কুরআনের সুরা আল বাক্বারার ১৮৭ নং আয়াতে সেহরী এবং ইফতার সম্পর্কে বলা হয়েছে: “প্রত্যুষে কৃষ্ণ সূত্র হতে শুভ্র সূত্র প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা খাও ও পান কর, অত:পর রাত্রি সমাগম পর্যন্ত তোমরা রোজা পূর্ণ কর।” পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি যদি অন্য আয়াতসমূহ দ্বারা তাফসির করি এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)- এর হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করি তাহলে বুঝা যায় যে, ইফতার সম্পর্কে আমাদের বৃহত্তর সমাজে প্রচলিত সময়, পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত সময় এবং হুকুমের বিপরীত। ইফতারির সময় সম্পর্কে যাতে মুসলিম সমাজের মধ্যে সন্দেহ বা দ্বিধা- বিভক্তির সৃষ্টি না হয় তার সকল দলিল, প্রমান এবং ব্যাখ্যা আল কুরআনেই বিদ্যমান রয়েছে। মহান আল্লাহ দিবা-রাত এবং মধ্যবর্তী বিভিন্ন সময়ের উল্লেখ করতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দমালার ব্যবহারের মাধ্যমে সেই সকল সময়কে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। যেমন ‘লাইল’ অর্থ রাত, তা পবিত্র কুরআনে ১৬২টি স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। তাছাড়া বাংলাতেও ‘লাইল’ অর্থ যে রাত বুঝায় তা বহুল প্রচলিত যেমন: প্রত্যেকটি মুসলমান ‘লাইলাতুল বরাত’ (ভাগ্য রজনী), ‘লাইলাতুল ক্বাদর’ (মহিমান্বিত রজনী) শব্দের সাথে পরিচিত এবং তারা ‘লাইল’ অর্থ কোনোভাবেই সন্ধ্যাকে বা সূর্যাস্তের সময়কে মনে করেন না। পবিত্র কুরআনে বিকালের সময় সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা ‘আল আছর’ রয়েছে। সন্ধ্যা সম্পর্কে “আছিল” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, প্রভাতকাল সম্পর্কে সুরা মুদাচ্ছিরের ৩৪ নং আয়াতে “সুব” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সূর্যাস্তের সময়কে পবিত্র কুরআনে “গুরুবে শামস” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (সুরা কাহ্ফ ৮৬, সুরা ত্বাহা ১৩০ এবং সুরা কা‘ফ ৩৯ দ্রষ্টব্য)
সূর্যাস্তের পরে পশ্চিম আসমানে যে রক্তিম আভার সৃষ্টি হয় এবং যা প্রায় ১৬ থেকে ১৮ মিনিট বিদ্যমান থাকে সেই সময়কে সূরা ইনশিক্বাক্ব এর ১৬ নং আয়াতে “শাফাক্ব” উল্লেখ করা হয়েছে এবং শাফাক্বের পূর্ণ পরিসমাপ্তির পরেই যে লাইল বা রাতের শুরু তাও সুরা ইনশিক্বাক্বের ১৬ এবং ১৭ নং আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। যাতে রাত সম্পর্কে বা রাতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো রকম সন্দেহের অবকাশ না থাকে সে জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ রাতের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে আমি কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছিঃ “এবং আমরা রাত ও দিনকে দু‘টি নিদর্শন করেছি। পরে আমরা রাতের নিদর্শনকে মুছে ফেলি এবং দিনের নিদর্শনকে করি সমুজ্জল যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পার। (সুরা বনি ইসরাইলঃ ১২)
এ আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে দিন সমুজ্জল। সূর্যাস্তের পরে সমুজ্জল দিনের আলো বিদ্যমান থাকায় তা কখনো রাত নয় এবং ইফতারের সময়তো নয়ই।
“এবং তাদের জন্য এক নিদর্শন রজনী,যা হতে আমরা দিবালোক অপসারিত করি, তখন তারা সব তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। (সুরা ইয়াসিনঃ ৩৭) “শপথ রজনীর যখন সে (পৃথিবীকে) আচ্ছন্ন করে।” (সুরা লাইলঃ ১)
উপর্যুক্ত সুরা ইয়াসিন এবং সুরা লাইলের আয়াত দুটি থেকে মহান আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে রাত বলতে তাকেই বুঝাবে যখন দিনের আলো সম্পূর্ণরূপে অপসারিত হবে এবং অন্ধকার পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করবে। অনুরুপভাবে রাতের ব্যাখ্যা আমরা সুরা যোহার ২নং আয়াত, সুরা ফুরকানের ৫, ৪৭, ৬২ নং আয়াত, সুরা নুরের ২৪, ৩৬, ৪৪ এবং সুরা নাযিয়াতের ২৯, সুরা আরাফের ২০৫, সুরা রাদের ১৬, সুরা দাহারের ২৫ ও ২৬ এবং সুরা বনি ইসরাইলের ৭৮ নং আয়াত থেকেও পেতে পারি। উল্লেখিত সমগ্র আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে, ‘লাইল’ বা ‘রাত্র’ হলো এমন একটি সময় যা পরিপূর্ণভাবে বা সম্পূর্ণরুপে অন্ধকারাচ্ছন্ন। যেখানে দিনের আলোর উপস্থিতির কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। লাইল বা রাত অর্থ শাফাক্ব, গুরুবে শামস, আছর বা আছিল কোনোটাই নয়। আল্লাহর কুরআনের আয়াত অনুযায়ী যারা সন্ধ্যা বা গুরুবে শামসের সময় ইফতার করে তা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ আল্লাহ ‘লাইল’ পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করতে হুকুম দিয়েছেন ‘গুরুবে শামস’ পর্যন্ত নয়। এখানে আরবি অভিধান খুলে সন্ধ্যাকে রাতের শুরু বলে ধরে নিয়ে আত্মপ্রবঞ্চণার সুযোগ নেই।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আমাদেরকে রোজা রাত্রি পর্যন্ত পূর্ণ করার আদেশ দিয়েছেন। গুরুবে শামস্ (সূর্যাস্ত), আছিল (সন্ধ্যা) বা শাফাক্ব (সুর্যাস্তের পরে পশ্চিম আকাশে সৃষ্ট লালিমা) পর্যন্ত নয় যা উল্লেখিত আয়াতসমূহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আল্লাহর কুরআন অনুযায়ী যারা সন্ধ্যা বা সূর্যাস্তের সময় ইফতার করেন তারা ভুলের মধ্যে রয়েছেন।
সবচেয়ে প্রাচীন তাফসিরকারক হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাত ভাই ছিলেন। তিনি নবিজির (সা.) রাত্রিকালীন ইবাদত বন্দেগি নিজ চোখে দেখেছেন। তিনি তাঁর তাফসীরে রাতের আগমন হলে ইফতার করার কথাই লিখেছেন। (তাফসিরে ইবনে আব্বাস, ১ম খন্ড, ই.ফা. পৃ. ৮৮)।
অপর একজন প্রাচীন তাফসির কারক মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি (রহ.) তাঁর জন্ম ২২৪হি. এবং ইন্তেকাল ৩১০হি.। তিনি উম্মুল মুমেনিন আয়েশার (রা.) বাচনিক রেওয়ায়েত উল্লেখ করে লিখেছেন- “তাই রাত হলে রোজাদারের জন্য ইফতার জায়েজ হয়ে যায়।” (তাবারি শরিফ, ৩য় খন্ড, ই.ফা. পৃ.২৬৫)
এখন যদি আমরা কুরআনিক ব্যাখ্যার সাথে হাদিসের সহায়তা গ্রহণ করি তাহলে তা থেকেও প্রমাণিত হয় যে আমাদেরকে রোজা রাত্রি পর্যন্ত পূর্ণ করতে হবে। “আবু আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে রওয়ানা দিলাম এবং তিনি রোজাদার ছিলেন। সুর্যাস্ত যেতেই তিনি বললেন তুমি সওয়ারি থেকে নেমে আমাদের জন্য ছাতু গুলিয়ে আন। তিনি বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ “আর একটু সন্ধ্যা হতে দিন। তিনি বললেন: তুমি নেমে যাও এবং আমাদের জন্য ছাতু গুলিয়ে আন। তারপর তিনি সওয়ারি থেকে নামলেন এবং ছাতু গুলিয়ে আনলেন। এরপর রাসুলুল্লাহ আংগুল দ্বারা পূর্বদিকে ইশারা করে বললেন: যখন তোমরা দেখবে যে, রাত এদিক থেকে আসছে তখনই ইফতারের সময় হয়ে যায়। (বুখারি শরিফ ৩য় খন্ড, ই.ফা. হাদিস নং ১৮৩২, ১৮৩৪);
এ হাদিস আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে সূর্যাস্তের পরে প্রিয় নবি (সা.) ছাতু গুলিয়ে আনার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। সূর্যাস্তের সাথে সাথেই যদি ইফতারের সময় সুনির্দিষ্ট থাকতো তাহলে তিনি (সা.) সুর্যাস্তের পূর্বে ছাতু গুলিয়ে প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দিতেন। [অথচএখন অধিকাংশ মুসলিমগণ পবিত্র কুরআনের বিধান ভঙ্গ করে সূর্যাস্তের পূর্বেই শরবত প্রস্তুত করে রাখেন এবং সুর্যাস্তের সাথেই সাথেই শরবতের পেয়ালায় চুমুক দেন]। নবিজির (সা.) সাথে তাঁর ছাহাবাগণ অনেকেই ছিলেন। তাদের সকলের জন্য ছাতু গুলিয়ে পরিবেশন করার জন্য বেশ একটু সময়ের প্রয়োজন ছিল। তখনো দিনের আলো বিদ্যমান থাকায় হযরত আবু আওফা (রা.) বিষয়টি বুঝতে না পেরে দুই বার আপত্তি করেন। কিন্তু নবিজি (সা.) জানতেন ছাতু গুলিয়ে পরিবেশন করার সময় রাত হয়ে যাওয়ায় ইফতারের সঠিক সময় হয়ে যাবে এবং তখন আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না। এ জন্য তিনি অপর একটি হাদিসে বলেন- “লোকেরা যতদিন যাবত ওয়াক্ত হওয়ামাত্র ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।” (বুখারি শরিফ, ৩য় খন্ড, ই.ফা. হাদিস নং ১৮৩৩)।
এ বিষয়টি আরো পরিস্কার হয়ে যায় হযরত মালিক ইবনে আনাসের (রহ.) সংকলিত হাদিসের কিতাব “মুয়াত্তা” পাঠ করে। হযরত মালিক ইবনে আনাস (রহ.) ৯৩ হিজরিতে মদিনায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি সাহাবিদের জামানা পেয়েছিলেন। তিনি এমনই এক সাবধানি ও নির্ভরযোগ্য হাদিস সংকলক ছিলেন যিনি হাদিস সংগ্রহের জন্য দারুল হিজরত মদিনার বাহিরে কখনো সফর করেননি। শুধু তাই নয় মদিনায় অবস্থানরত বর্ণনাকারী ব্যতীত আর কারো বর্ণনা গ্রহণ করেননি। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত মুয়াত্তা ইমাম মালিক(রহ.), ১ম খন্ড ৩৫৮ পৃষ্ঠায় রেওয়াযেত-৮ এ লিখা হয়েছেঃ “হুমায়দ ইবনে আব্দুর রহমান(রা.) হইতে বর্ণিত – উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এবং উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) উভয়ে মাগরিবের নামাজ পড়িতেন, এমন সময় তখন তাহারা রাত্রির অন্ধকার দেখিতে পাইতেন। (আর ইহা হইত) ইফতার করার পূর্বে। অতপর তাঁহারা (উভয়ে) ইফতার করিতেন। আর ইহা হইত রমজান মাসে।”
ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত জামে আত তিরমিজির ১ম খন্ডের ১৪৫ পৃষ্ঠার ১৪৯ নং হাদিসে বলা হয়েছেঃ নবি করীম (সা.) বলেন: “জিব্রাইল(আ.) বাইতুল্লাহর কাছে দুই দিন আমার ইমামতি করেছেন। তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করেছেন যখন সূর্য ডুবে যায় এবং রোজাদার ইফতার করে।”
উপর্যুক্ত হাদিসগুলো হতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে ইফতার মাগরিবের নামাজের পরে এবং যখন রাতের আঁধার ঘনিয়ে আসে। এরপরে আর বিলম্ব করা উচিত নয় বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
সাহল ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ(সা.) বলেছেনঃ লোকেরা যতদিন যাবত ওয়াক্ত হওয়ামাত্র ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে। (হাদিস নং ১৮৩৩/ই.ফা.) ;
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কোনো কোনো প্রকাশক এ হাদিসের অনুবাদে বন্ধনির মধ্যে “সুর্যাস্তের সাথে সাথে” শব্দগুলো জুড়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় তাঁরা এ হাদিসের টিকায় লিখেছেন- ‘আহলে কিতাবদের ইফতারের সময় হল আসমানের তারকাসমূহ যখন স্পষ্ট উঠে তখন।’
পাঠক এবার বুঝতে পারছেন কিছু ভোগবাদী ও সুবিধাবাদী শাহী আলেম এবং কুচক্রী মহলের কারসাজিতে ইফতারের প্রকৃত সময় নিয়ে কেন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে! আহলে কিতাব বলতে খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের বুঝায়। খবর নিয়ে জেনে দেখুন উল্লেখিত হাদিসের টিকার বক্তব্য কতটুকু সত্য। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে খ্রিস্টানগণ বসবাস করে থাকেন। তাদের সাথে কথা বলে দেখুন। আসল সত্যটা কি এবার জেনে নিন। “What time, How Long and when Christians Should Fast” শিরোনামে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করে দেখুন সেখানে কি লিখা রয়েছে -A time set apart for fasting is completely personal and circumstantial. Fasting can take place at any time in the day or over the course of however many days one chooses. -অর্থাৎ “উপবাসের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করা পুরোপুরি ব্যক্তিগত এবং পরিস্থিতিগত। রোজার জন্য যে কোনও দিন ও সময় বেছে নেওয়া হলেও চলবে।” এ বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে একজন খ্রিস্টান কখন রোজা শুরু করবেন এবং কখন তা পূর্ণ করবেন এটা তার ব্যক্তিগত এবং পরিস্থিতিগত বিষয়ের উপর নির্ভর করে। তারা কেহ আসমানের তারকাসমূহ স্পষ্ট হওয়ার সময় অবধি অপেক্ষা করেন না। যদি কেহ করে থাকেন এটা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। আবার Jewish fasting system.
শিরোনামে ইন্টারনেটে কি লিখা রয়েছে দেখুনঃ During a Jewish fast, no food or drink is consumed, including bread and water. The major fasts last over 25 hours,from before sundown on the previous night until after sundown on the day of the fast. Four other shorter fasts during the year begins at dawn and end after sunset “অর্থাৎ, “রোজা পালনকালে ইহুদিরা রুটি ও পানিসহ অন্য কোন খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করেন না। তাদের প্রধান রোজাগুলো পূর্ববর্তী রাতের সূর্যাস্তের পূর্ব হতে শুরু করে রোজা রাখার দিনটির সূর্যাস্তের পরে মোট ২৫ ঘন্টা ব্যাপী স্থায়ী হয়। বছরের অন্য চারটি রোজা শুরু হয় ভোর বেলায় এবং শেষ হয় সূর্যাস্তের পরে।” আমি যতদূর জেনেছি ইহুদিরা বছরে মোট ছয়টি রোজা পালন করে। এর মধ্যে দুটি প্রধান। এ দুটি রোজা তারা সূর্যাস্তের পুর্বে শুরু করে পরের দিন সূর্যাস্তের পরে ঘন্টা ব্যাপী অপেক্ষার পর পূর্ণ করে। আর বাকী চারটি রোজা ভোর বেলা শুরু করে সূর্যাস্তের পরেই পূর্ণ করে। পবিত্র কুরআন মোতাবেক মুসলমানদের রোজা পূর্ণ করতে বলা হয়েছে সূর্যাস্তের পরে রাতের আঁধার নেমে আসা পর্যন্ত। এ সময়টা ঘন্টাব্যাপী তো নয়ই, অনধিক সূর্যাস্তের পরে ৩০ মিনিট। কিন্তু ইহুদিরা ছয়টির মধ্যে চারটি রোজা পূর্ণ করে সূর্যাস্তের সাথে সাথেই। যেমন অধিকাংশ মুসলমানেরা সুর্যাস্তের পর পরই ইফতার করে থাকেন।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে কি কোনোভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব যে ‘সত্বর’ বা ‘শিঘ্র’ বলতে সূর্যাস্তের সাথে সাথেই (মাগরিবের আজানের) সময়কেই বুঝায়? বরঞ্চ পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ এবং হাদিসসমূহের আলোকে এটাই উত্তমরূপে প্রমাণিত হয় যে, মুসলমান দেরকে রোজা রাত্রি পর্যন্ত পূর্ণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনের হুকুমকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা জেনেও না জানার ভান করা, বা অনুসরণ না করার কোন পথই মুসলমানদের জন্য খোলা নেই। রাতের আঁধার নেমে এলে ইফতার করতে হবে এ বিধান পবিত্র কুরআন এবং হাদিস চষে হাল জামানায় গবেষণা করে বের করা কোনো বিষয় নয়। আরব জাহানের বহু নিষ্ঠাবান মুসলমান সংখ্যায় কম হলেও প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদের (সা.) জামানা থেকে রাতে ইফতার করে থাকেন। এখনো বাংলাদেশসহ তামাম দুনিয়ার বহু নিষ্ঠাবান, অনুসন্ধানি মুসলমান রাতের আঁধার নেমে এলে ইফতার করে থাকেন। তাহলে প্রশ্ন উঠে যে সময়ের আগে বৃহত্তর মুসলিম সমাজে ইফতার করার প্রচলন কখন থেকে শুরু হলো? এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মাদের (সা.) বিখ্যাত সাহাবি হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)। তিনি বলেন, “আজকাল কোন জিনিসই সে আবস্থায় পাই না, যেমন নবী (সা.) -এর যুগে ছিল। প্রশ্ন করা হলো সালাতও কি? তিনি বললেন, সে ক্ষেত্রেও যা হক নষ্ট করার তা-কি তোমরা করনি? (বুখারী শরীফ, দ্বিতীয় খন্ড, ই.ফা.হাদিস নং ৫০৪)
যুহরি (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দামেশ্কে আনাস ইবনে মালিক (রা.) -এর নিকট উপস্থিত হলাম, তিনি তখন কাঁদছিলেন্ আমি তাঁেক জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এ-এর যুগে যা কিছু পেয়েছি তার মধ্যে কেবলমাত্র সালাত ছাড়া আর কিছুই বহাল নেই। কিন্তু সালাতকেও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বাক্র (র.) বলেন, আমার কছে মুহাম্মাদ ইবন বক্র বুরসানী (র.) উসমান ইবন আবু রাওওয়াদ (র.) সূত্রে আনুরূপ বর্ণনা করেছেন। (ঐ, হাদিস নং ৫০৫)
এ হাদিস সুস্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সব কিছু যার মধ্যে সিয়াম বা রোজাও রয়েছে এসবের বিধি বিধান আগেই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এবং সবশেষে সালাতকেও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এজন্যই আজ ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবে ভিন্ন ভিন্ন রকম সালাত বা নামাজের নমুনা দেখা যায়। তবে এখানে একটি কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যারা সূর্যাস্তের পরে রাতের অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ইফতার করেন তাদের রোজা ভঙ্গ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত সুরা আল বাকারার ১৮৭ নং সুস্পষ্ট আয়াতের বিরোধীতা ঈমানহীনতারই পরিচয় বহন করে। এদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বক্তব্য হচ্ছেঃ “যারা আমাদের আয়াতসমূহের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা চালায় তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তির নির্যাতন।” (সুরা সাবাঃ ৫);
“সুতরাং যে কেউ অবিশ্বাসী হবে তার অবিশ্বাসের দায় তার ওপরেই বর্তাবে: এবং অবিশ্বাসীদের অবিশ্বাস তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ ব্যতীত কিছুই বৃদ্ধি করে না, আর অবিশ্বাসীদের অবিশ্বাস তাদের ক্ষতি ভিন্ন অন্য কিছু বৃদ্ধি করে না। (সুরা সাবা৩৯): পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর ভিত্তিতে এটাই প্রমানিত হয় যে, আমাদেরকে লাইল অর্থাৎ রাতে(মাগরিবের নামাজের আজানের ২৫ থেকে ৩০ মিনিট পর) ইফতার করতে হবে। বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং সাহাবিগণ রাতে ইফতার করেছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় ইজমা, কিয়াস, ফিকাহ এবং ফিরকার ধু¤্রজালে ভোগবাদী ও সুযোগসন্ধানীগণ অনেক দূর সফল হয়েছে। এই সুযোগ সন্ধানীরাই দারুল খিলাফতকে দারুল মুলুকিয়াতে পরিণত করেছে। বাঘা বাঘা ইমাম, বড় বড় বুজুর্গানেদ্বীন এবং দারুল মুলুকিয়াত আমাদের আদর্শ নয়। আমাদের আদর্শ পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)।####