পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে হিংসা

অনুবাদ: হুজ্জাতুল ইসলাম মোঃ শহিদুল হক

আয়াতসমূহঃ

  • ১- হিংসার অনিষ্ট থেকে আশ্রায় প্রার্থনা করাঃ “হে রাসূল বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে, অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।” (সূরা ফালাক্বঃ ১-৫)
  • ২- কাবিলের হিংসাঃ “অতঃপর তার অন্তর তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে গেল।” (সূরা মায়েদাহঃ ৩০)
  • ৩- ইউসূফ (আ.)-এর ভাইদের হিংসাঃ “নিশ্চয় আমাদের পিতা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে আছে। (সুতরাং) ইউসূফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোন (দূরবর্তী) ভূমিতে ফেলে দাও, তাহলে পিতার দৃষ্টি কেবল আমাদের প্রতি নিবিষ্টি হবে।” (সূরা ইউসূফঃ ৮,৯)
  • ৪- মুসলমানদের সাথে হিংসাঃ “আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশতঃ চায় যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কোন রকমে কাফির বানিয়ে দেয়।” (সূরা বাকারাহঃ ১০৯)
  • ৫- উত্তম মানুষের সাথে হিংসা করাঃ “নাকি যাকিছু আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন সে বিষয়ের জন্য মানুষকে হিংসা করে। অবশ্যই আমি ইব্রাহীমের বংশধরদেরকে কিতাব ও হেকমত দান করেছিলাম আর তাদেরকে দান করেছিলাম বিশাল রাজ্য।” (সূরা নিসাঃ ৫৪)

হাদীসসমূহঃ

  • ১- হিংসা দ্বীনের বিপদ স্বরূপঃ ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “দ্বীনের দুর্দশা ও বিপদ হল হিংসা, অহংকার ও গর্ব করা।” (সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ২, পৃ. ১৭৬, কিতাবুশ শাফী, খন্ড ৪, পৃ. ২৭৬)
  • ২- হিংসা ঈমানকে খেয়ে ফেলেঃ ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “হিংসা ঈমানকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমনভাবে আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।” (সাফিনাতুল বিহার, খন্ড ২, পৃ. ১৭৫, কিতাবুশ শাফী, খন্ড ৪, পৃ. ২৬৬)
  • ৩- মন্দ কাজের ভিত্তিঃ হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “মন্দ কাজের ভিত্তি হল হিংসা করা।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ২৬২)
  • ৪- হিংসা শয়তানের স্বভাবঃ মাওলা আলী (আ.) বলেছেনঃ “সাবধান হিংসার নিকটে যেওনা, ইহা অত্যাধিক হীনমনা স্বভাব ও অধিকতর খারাপ অভ্যাস, ইহা শয়তানের রীতি-নীতি।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ২৬১)
  • ৫- সুখ ও শান্তি নেইঃ হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) বলেছেনঃ “হিংসুকের কোন সুখ ও শান্তি নেই।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ২৬৬)

বিশ্লেষণঃ হিংসা করা হলো কারো ক্ষতি চাওয়া। ঘৃণা, ক্ষোভ ও বিদ্বেষকেও হিংসা করা বুঝায়। এটা একটি স্বার্থপরতার বিষয়। হিংসুক অন্যদের পরির্পণূতা ও প্রাচুর্যের ক্ষতির আশা করে। মানুষ যত পরিপূর্ণতার অধিকারী হবে তাকে ততো হিংসা করা হবে। অপরিপূর্ণ ব্যক্তি হিংসুক হতে পারে কিন্তু সে অন্য কারও হিংসার পাত্র হবে না। এ কারণে ইমাম মুহাম্মাদ বাকের (আ.) বলেছেন, প্রকৃত হিংসার পাত্র হলাম আমরা আহলে বাইত (আ.)।

হিংসা এমন একটি রোগ যা থেকে মুক্তি ও নিস্কৃতি পাওয়া খুবই কঠিন, এই খারাপ গুণ দুনিয়ার প্রতি ভালবাসার একটি চি‎হ্ন। এই খারাপ গুণ ঈমানকে নিঃশেষ করে দেয়। সর্বদা অন্যদের ধন-সম্পদ ও পরিপূর্ণতার প্রতি দৃষ্টি দেয়, সর্বদা তাদের অধঃপতন সম্পর্কে চিন্তা করে ও নিজের জন্য ধন-সম্পদ জমা করার চিন্তা করে, আর এই হিংসা দ্বীনের জন্য বিপদ এবং অন্তরের ব্যধিও। হিংসা নেক আমল ও সৌন্দর্যকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি চৌদ্দ মাসুম (আ.)-এর অসিলায় আমাদেরকে এই খারাপ গুণাবলী থেকে দূরে থাকার তৌফিক দান করেন। যদি আমাদের ভিতরে তা থেকে থাকে সেগুলো যেন খতম করে দেন। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- হযরত ঈসা (আ.)-এর শিষ্যের হিংসাঃ বর্ণনাকারী বলেন, আমি হযরত ইমাম সাদেক (আ.) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহকে ভয় কর ও একে অপরকে হিংসা কর না। হযরত ঈসা (আ.) তাঁর যুগে বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করতেন। একবার তিনি ভ্রমণের জন্য রওনা হলে তাঁর এক শিষ্য তাঁর সাথে রওনা হল, অধিকাংশ সময় সে হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথে থাকত। যখন হযরত ঈসা (আ.) সাগরের তীরে পৌঁছালেন তখন আল্লাহর সত্তার ওপর পূর্ণ আস্তা রেখে বিসমিল্লাহ বলে পানির ওপর হাঁটা শুরু করলেন। শিষ্য যখন এ অবস্থা দেখল সেও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্তা রেখে বিসমিল্লাহ বলে পানির ওপর হেঁটে হযরত ঈসা (আ.)-এর নিকটে পৌঁছাল। ঐসময় তার মনে অহমিকা সৃষ্টি হল ও বলতে লাগল যেভাবে আল্লাহর রুহ হযরত ঈসা (আ.) পানির ওপর হেঁটে যান আমিও সেভাবে হাঁটবো। সুতরাং তিনি আমার থেকে কিসের শ্রেষ্ঠ? এই কথা ভাবতেই সে পানির মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল, তখন সে হযরত ঈসা (আ.)-এর কাছে ফরিয়াদ করল। হযরত (আ.) তাকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করে বললেনঃ তুমি কি বলেছ? সে বললঃ আমি মনে মনে বলেছি যেভাবে ঈসা (আ.) পানির ওপর হেঁটে যান আমিও সেভাবে হাঁটবো, এভাবে আমার মধ্যে অহংকার প্রবেশ করল।

হযরত ঈসা (আ.) বললেনঃ তুমি মনে মনে ঐ কথা ভেবেছ যার অধিকারী তুমি না। এ জন্য আল্লাহ তোমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। এখন তুমি আল্লাহর কাছে তওবা কর, এরপর সে তওবা করল, আল্লাহ তার তওবা কবুল করে পুনরায় তাকে পূর্বের মর্যাদা ফিরিয়ে দিলেন।

ইমাম (আ.) বলেছেনঃ আল্লাহকে ভয় কর, একে অপরকে হিংসা কর না। (উসুলে কাফি, খন্ড ২, পৃ. ২৯১, গাঞ্জিনেয়ে মায়ারেফ, খন্ড ১, পৃ. ৩৮০, একসাদ ওয়া পাঞ্জা মাওযু আজ কুরআনুল কারীম ওয়া হাদীসে আহলে বাইত (আ.), পৃ. ৪০৯)

২- ইমাম মুহাম্মাদ ত্বাকী (আ.)-এর সাথে হিংসাঃ হযরত ইমাম মুহাম্মাদ ত্বাকী (আ.)-এর যুগে এ ঘটনাটি ঘটেছিল যা মনোযোগের সাথে পড়ার মত।

ঐ যুগে আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কেল এর প্রধান বিচারপতি আবু লাইলা খেলাফতের সকল আইন সংক্রান্ত বিষয় যা ইসলামী রীতি বলে গণ্য করা হত, তা বাস্তবায়ন করত।
একদিন এই প্রধান বিচারপতি তার প্রতিবেশী দোকানদার বন্ধু জারকা এর ঘরে আসলো তখন সে বেশ চিন্তিত ছিল। জারকা জিজ্ঞেস করলঃ প্রধান বিচারপতি সাহেব! আজ তুমি এত চিন্তিত কেন? প্রধান বিচারপতি বললঃ তুমি কি শুনতে চাও আজ খলিফার দরবারে আমার ওপর কত বড় মুসিবত এসেছিল?

এক চোরকে আনা হল, তার অন্যায় প্রমাণিত হল, এখন তার শাস্তির পরিমাণ নিয়ে কথা হল। খলিফা আমাকে জিজ্ঞেস করল তার হাতের কোন স্থান থেকে কাটা হবে?
আমি বললামঃ কুরআন মজীদে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন যে, চোরের হাত কাটা আর ওজুর হুকুম বর্ণনা করার আয়াতে বলা হয়েছে যে, কনুহসহ পুরা হাত ধৌত কর, অতএব স্পষ্ট যে হাত কনুহ পর্যন্ত কাটতে হবে।

খলিফা দরবারে উপস্থিত অন্য একজনকে জিজ্ঞেস করলে সে বললঃ চোরের হাতের কব্জী পর্যন্ত কাটতে হবে কারণ তায়াম্মুম সম্পর্কিত আয়াতে হাত বলতে, হাতের কব্জীকে বুঝানো হয়েছে। পরে খলিফা শিয়াদের ইমাম হযরত মুহাম্মাদ ত্বাকী (আ.)কে জিজ্ঞেস করলে হযরত বললেনঃ অন্যরা তো তাদের মতামত প্রকাশ করেছে।

খলিফা পীড়াপীড়ি করলে অবশেষে বাধ্য হয়ে হযরত ইমাম মুহাম্মাদ ত্বাকী (আ.) বললেনঃ চোরের আঙ্গুল কাটতে হবে কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন “মাসাজিদ আল্লাহর জন্য।” মাসাজিদ, মসজিদ শব্দের বহু বচন আর এর দ্বারা ঐ সকল অঙ্গ বুঝানো হয়েছে যেগুলো সিজদার সময় জমিনে রাখা হয়। এই চোরও যখন নামাজ পড়বে তখন সেও সিজদার সময় ৭টি অঙ্গ জমিনে রাখবে অর্থাৎ দুই হাতের তালুও রাখবে। সুতরাং তার দুই হাতের আঙ্গুল কাটতে হবে।

যখন শিয়াদের ইমাম (আ.) এই কথা বললেন তখন খলিফা বললঃ খুব ভাল! সাবাস! এরপর সে দ্রুত হুকুম দিল যা ইমাম (আ.) বলেছেন সেই মোতাবেক আমল করতে এবং পরে চোরের হাতের আঙ্গুল কেটে দিল।

তুমি হে জারকা! তুমি কি চিন্তা করতে পার এ সময় আমার অবস্থা কি হতে পারে, যখন ঐ ২৫ বছরের যুবককে আমার ওপর প্রাধান্য দিল! বস্তুতঃ এ কারণে আমি বেশ চিন্তিত এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রতিশোধ নিবো আরামে বসতে পারবো না। যদিও আমি জানি যে, যে ব্যক্তি এই যুবককে হত্যা করার জন্য অংশীদার হবে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে কিন্তু তারপরও যতক্ষণ সে নিহত না হবে আমি তাকে ছাড়বো না।

জারকা বললঃ আমি তাকে উপদেশ দিয়েছি কিন্তু সে ঐ উপদেশ মানতে অস্বীকার করল।

প্রকৃতপক্ষে প্রধান বিচারপতি আবু লাইলা হিংসার আগুনে জ্বলছিল, পরের দিন সে খলিফার নিকটে গিয়ে বললঃ জানতে চাও তুমি গতকাল কি করেছিলে? ঐ ব্যক্তি যাকে মুসলমানদের মধ্যে অনেকেই তাঁকে ইমাম মনে করে ও তাঁকে পয়গম্বার (স.)-এর উত্তরসূরী মনে করে এবং তারা আপনাকে মিথ্যা ও বাতিল জানে, আপনি তাদেরকে আরো শক্তিশালী ও মজবুদ করলেন। ঐ লোকজনই বলবে যে, তিনি সত্য পথে আছেন, তারা বলবে যে, খলিফা নিজেও একথা মেনে নিলো এবং অন্যদের মতামতের ওপর তার মতকে অগ্রার্ধিকার দিলো! একটু ভাবুন! আপনি রাজনৈতিকভাবে কত বড় ভুল করেছেন!

মোটকথা আবু লাইলা (হিংসার কারণে) খলিফার কানকে এতই ভারী করেছিল যে, সে ইমাম মুহাম্মাদ ত্বাকী (আ.)কে হত্যা করতে প্রস্তুতি নিলো ও অবশেষে ইমাম (আ.) কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিল। (বাকরে মাওতি, খন্ড ১, পৃ. ৭৫)

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More