লেখকঃ মো. আলী মোর্ত্তজা
ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আহলে বাইত সম্পর্কে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রেখেছেন এবং বিশ্বাস করেন যে, নবীজির আহলে বাইতকে ভালবাসা ফরজ।
ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি তার গ্রন্থে আহলে বাইত (আ.)- এর ধর্মীয় ও জ্ঞানগত মর্যাদার যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তা সম্মানিত পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হল।
মোহাম্মদ বিন ওমর ফাখরুদ্দীন রাযি ইসলামী বিশ্বের অন্যতম একজন জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব যিনি ইরানের রেই শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং আফগানিস্তানের হেরাত শহরে জ্ঞানের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। তিনি শাফেয়ী মাজহাবের অন্যতম মহান আলেম ও বিদ্বান, যিনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনাভিত্তিক বিষয়ের উপর বিস্তৃত জ্ঞান রাখতেন। এছাড়াও তিনি ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, আইনশাস্ত্র, নৈতিকতা, তাফসীর, প্রজ্ঞা, সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং গাণিতশাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তার নতুন বিষয় উত্থাপন ইসলামী দর্শন এবং ধর্মতত্ত্বকে এগিয়ে নিতে সহায়তা ও সমৃদ্ধ করেছিল। সকল ধর্মের সকল ইসলামী আলেমদের কাছে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। ইমাম ফখরে রাযির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালবাসা। এই নিবন্ধে তার উপর আলোকপাত করা হবে। তিনি ৫৪৩ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬০৬ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
ফাখরুদ্দিন রাযির দৃষ্টিতে আহলুল বাইত (আ.): ইমাম ফখরে রাযি রাসূল (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) প্রতি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রাখতেন। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করতেন এবং তাঁদের মান-মর্যাদাকে মহিমান্বিত মনে করতেন; যা মহানবীর (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) প্রতি তার গভীর ভালবাসা প্রদর্শন করা থেকে বুঝা যায়। কথা বলার সময় তিনি বিসমিল্লাহকে জোরে উচ্চারণ করতেন। মুতাওয়াতির তথা অকাট্যভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে যে, আলী ইবনে আবী তালিব (আ.) “বিসমিল্লাহ”কে উঁচু স্বরে তিলাওয়াত করতেন। আর যে কেউ তার দ্বীনে আলী ইবনে আবী তালিবের অনুসরণ করে সে অবশ্যই হেদায়েত প্রাপ্ত এবং এটি হ’ল নবীর (সা.) হাদীস। তিনি বলেছেন: হে আল্লাহ! সত্যকে সেদিকে ঘোরাও যেদিকে আলী ঘোরে। (রাযি, মাফতিহুল গাইব, ১৮৮/১) এটা প্রমাণিত যে, হযরত আলী (আ.) উঁচু স্বরে বিসমিল্লাহ পড়তেন এবং অন্যদেরকেও তা করতে বলেছেন। আর যারা ধর্মের ক্ষেত্রে হযরত আলীকে (আ.) তাদের ইমাম ও নেতা হিসাবে বেছে নিয়েছেন তারা দ্বীনকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরেছেন। (রাযি, মাফতিহুল গাইব, ১৭০/১)। পবিত্র ইমামগণ থেকে উঁচু স্বরে বিসমিল্লাহ পড়ার উপর বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন ফাখরে রাযি তার ফাতহুল বারি গ্রন্থে ইমাম রেজা (আ.) এবং তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন: আলে-মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের নিকট “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” উঁচু স্বরে পাঠ করা সম্পর্কে ঐকমত্য রয়েছে। (আমেলী, ১/৪)
শেখ সাদুক তার নিজস্ব সনদের মাধ্যমে ইমাম সাদিক (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে: নামাযে উঁচু স্বরে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব (তুসী, ২/৬০০৪)। ইমাম রেজা (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর সমস্ত দিন ও রাতের নামাজে বিসমিল্লাহ জোরে জোরে উচ্চারণ করতেন। (সাদুক, ১৮১)। এছাড়াও শেখ কুলাইনি (রহ.) সাফওয়ান জামাল থেকে উদ্ধৃত করেছেন: ইমাম সাদিক (আ.)-এর পিছনে কয়েকদিন ধরে আমি নামাজ পড়েছিলাম, যা জাহরী তথা উচ্চ শব্দে ছিল না (যোহর এবং আসরের নামাজ), তিনি উভয় সূরাতেই “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” উঁচু স্বরে পাঠ করেছেন। (কুলাইন, ৩১৫/৩)
আহলে বাইত (আ.)-এর উপর দরুদ পাঠ করা: ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি আহলে বাইতের উপর দরুদ পাঠ সম্পর্কে বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের জন্য দোয়া একটি অত্যন্ত সম্মানিত বিষয় হিসাবে প্রমাণিত, সুতরাং তিনি নামাযের শেষে এই দোয়াটি বাধ্যতামূলক করলেন: আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা মোহাম্মদ ওয়া আলে মোহাম্মদ ওয়া আহরাম মোহাম্মদ ওয়া আলে মোহাম্মদ। এই মর্যাদাটি নবীর আহলে বাইতের বাইরে অন্যদেরকে দেয়া হয় নি। আর এ কারণেই রাসূলের আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা ওয়াজিব (রাযি, মাফতিহুল গাইব, ২৬তম খন্ড, পৃ: ৫৯৬)। তিনি তার রচনায় যখনই ইমামগণের নাম ব্যবহার করেছেন “আলাইহিস সালাম” বাক্যটি এবং যখন তিনি রাসূল (সা.)-এর নাম উল্লেখ করেছেন তখন (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) বাক্যটি ব্যবহার করেছেন। দরুদ পাঠ করার এই পদ্ধতিতে ফাখরুদ্দিন রাযির দৃষ্টিতে রাসূল (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতের উচ্চ মর্যাদার ইঙ্গিত বহন করে। তিনি যখন ইমাম জাফর সাদেক (আ.)-এর কথা উল্লেখ করতেন, তখন তিনি তাকে “সাদেক” উপাধি দ্বারা উল্লেখ করতেন এবং তাঁর বরকতময় নামের পরে “আলাইহিস সাল্লাম” কথাটি ব্যবহার করতেন। ‘নাঈম’ শব্দটির তাফসীরে তিনি বলেন, “জাফর ইবনে মুহাম্মাদ সাদিক (আ.) বলেছেন: “নাঈমের” অর্থ হচ্ছে মারেফাত এবং পর্যবেক্ষণ এবং “জাহিমের” অর্থ হচ্ছে অন্ধকারসমূহ এবং কামনা-বাসনার অন্ধকার।” (রাযি, মাফতিহুল গাইব, ৩১তম খন্ড, পৃ: ৮০) উল্লেখযোগ্য ও আকর্ষণীয় বিষয়টি হ’ল তিনি ইমাগণের নামের পর “আলাইহিস সাল্লাম” শব্দটি ব্যবহার করেছেন যা স্পষ্টতঃই মহানবীর (সা.) আহলে বাইতের প্রতি তাঁর উচ্চ শ্রদ্ধার ইঙ্গিত বহন করে।
ইমাম রাযি ও আহলে বাইত (আ.) – এর প্রতি ভালবাসা: মাওয়াদ্দাতের আয়াতের ব্যাখ্যার সময়, “কাশশাফ”-এর লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি এই বিখ্যাত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন যে,
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, সে শহীদ।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করল।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, সে তওবা করে মৃত্যুবরণ করল।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, সে পূর্ণ ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করল।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, প্রথমে মৃত্যুর ফেরেশতা অত:পর মুনকার ও নাকির তাকে বেহেশতের সুসংবাদ দিবে।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করল, তাকে এমনভাবে সাজিয়ে বেহেশতে নিয়ে যাওয়া হবে যেভাবে নববধুকে সাজিয়ে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, তার জন্য কবর থেকে বেহেশতের দিকে একটি দরজা খুলে যাবে।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তার কবরকে রহমতের ফেরেশতাদের যিয়ারতগাহ বানিয়ে দিবেন।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের(সা.) প্রতি ভালবাসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে রাসূলের (সা.) সুন্নতের উপর এবং মু’মিনদের দলে অন্তর্ভূক্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন তার কপালে লেখা থাকবে যে, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে কাফের অবস্থায় মারা যাবে।
- যে ব্যক্তি আলে মুহাম্মাদের (সা.) প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, সে বেহেশতের ঘ্রাণও শুঁকতে পারবে না।
ফাখরে রাযির দৃষ্টিতে রাসূলের (সা.) আহলে বাইতের দৃষ্টান্ত: ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি বলেন: তাঁরাই হচ্ছে রাসূলের (সা.) প্রকৃত আহলে বাইত যাঁদের সাথে রাসূলের (সা.) ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আর যাঁর সাথে রাসূলের ঘনিষ্ঠতা বেশী এবং পরিপূর্ণ সেই হচ্ছে রাসূলের অন্যতম আহলে বাইত। এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, হযরত ফাতিমা, হযরত আলী, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন হচ্ছেন মহানবীর (সা.) সব থেকে ঘনিষ্ঠ ও আপন মানুষ যা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। সুতরাং তাঁরাই হলেন মহানবীর (সা.) প্রকৃত আহলে বাইত। কিছু সংখ্যকের মধ্যে আহলে বাইতের দৃষ্টান্ত নিয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়। তাদের এক দল বলেন, শুধুমাত্র রাসূলের পরিবারই হচ্ছেন তাঁর আহলে বাইত, আরেক দল বলে থাকেন রাসূলের উম্মতই হল তাঁর আহলে বাইত। অতএব যদি আহলে বাইত বলতে রাসূলের (সা.) পরিবারকে বোঝানো হয়ে থাকে তাতেও হযরত ফাতিমা যাহরা, হযরত আলী এবং ইমাম হাসান হুসাইন সবার আগেই থাকবেন। আবার যদি বলা হয় যারা রাসূলের (সা.) প্রতি ঈমান এনেছেন তারাই আহলে বাইত তাহলেও সবার আগে হযরত ফাতিমা যাহরা, হযরত আলী এবং ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.) থাকবেন। তবে অন্যরা রাসূলের (সা.) আহলে বাইত কি-না সে বিষয়ে মতপার্থক্য থেকেই যায়। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, সকল পরিস্থিতিতে আহলে বাইত বলতে কেবল হযরত ফাতিমা যাহরা, হযরত আলী এবং ইমাম হাসান ও হুসাইনকেই বোঝানো হয়েছে তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তাফসিরে কাশশাফের লেখক হতে বর্ণিত হয়েছে, যখন উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবারা প্রশ্ন করলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আপনার এই আহলে বাইত কারা, যাদের প্রতি ভালবাসাকে মহান আল্লাহ সবার উপর ফরজ করেছেন? মহানবী (সা.) উত্তরে বললেন: তারা হল:- আলী, ফাতিমা এবং তাদের দুই সন্তান হাসান ও হুসাইন। (মাফাতিহুল গাইব, ১২তম খন্ড, পৃ: ৪০১)
সুতরাং এটা প্রমাণিত হল যে, এই চার জন (হযরত ফাতিমা যাহরা, হযরত আলী এবং ইমাম হাসান হুসাইন) মহানবীর (সা.) সব থেকে নিটকতম ও প্রিয়তম ব্যক্তিত্ব। আর যখন এটা প্রমাণিত হল তখন এটাও বোঝা গেল যে, তাদের সম্মান ও মর্যাদাও সবার থেকে বেশী। আর তার কয়েকটি দলিল নিম্নে বর্ণিত হল:
প্রথমত: মাওয়াদ্দাতের আয়াত, যেখানে মহান আল্লাহ আহলে বাইতের প্রতি ভালভাসাকে সবার জন্য ফরজ করেছেন। (সূরা শুরা, আয়াত-২৩)
দ্বিতীয়ত: যেহেতু প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা.) মা ফাতিমাকে অত্যাধিক ভালবাসতেন এবং তিনি বলেছেন: ফাতিমা আমার অস্তিত্বের অংশবিশেষ যা তাকে অসন্তুষ্ট করে তা আমাকেও অসন্তুষ্ট করে। এছাড়াও মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা.) হযরত ফাতিমা যাহরা, হযরত আলী এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনকে অত্যাধিক ভালবাসতেন। এসকল দলিলের ভিত্তিতেই তাদেরকে ভালবাসা উম্মতের উপর ফরজ তথা অপরিহার্য।
এছাড়াও পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে বলা হচ্ছে: “তোমরা রাসূলের অনুসরণ কর যাতে তোমরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে পার।” (আ’রাফ-৩৫)
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আরও বলেছেন: “অত:পর যারা তার নির্দেশ অমান্য করে তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (নুর-৬৩)
মহান আল্লাহ আরও বলেছেন: “যারা আল্লাহকে পেতে চায় তাদের জন্য রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (আহযাব-২১)
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন: যদি রাসূল (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতকে ভালবাসা রাফেযি হওয়ার কারণ হয় তাহলে সমস্ত জ্বীন ও ইনসান সাক্ষি থাকুক যে, আমি একজন রাফেযি। (মাফাতিহুল গাইব, ১২তম খন্ড, পৃ: ৪০২)
রাসূলের (সা.) কাউছার: কাউছারের অর্থ হচ্ছে কল্যাণের আধিক্য। বেশিরভাগ মুফাসসিরগণ কাউছারের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত বলতে মা ফাতিমাকে বুঝিয়েছেন। কেননা, এই সূরার শানে নুযুল সম্পর্কে বলা হয়েছে, কাফেররা মহানবীকে এই বলে উপহাস করত যে, তিনি হলেন নির্বংশ। পবিত্র কোরআন তাদের এই কথাকে বাতিল উল্লেখ করে ঘোষণা দিয়েছে যে, “হে রাসূল! আমি তোমাকে কাউছার তথা অধিক কল্যাণ দান করেছি” (সূরা কাউসার)। এটা থেকে বোঝা যায় যে, পবিত্র কোরআনের এই সূরায় কল্যাণের আধিক্য বলতে মা ফাতিমা যাহরাকে বোঝানো হয়েছে। কেননা, এই কন্যার মাধ্যমেই মহানবীর বংশধারা বিস্তৃতি লাভ করেছে। আর মহানবীর এই পবিত্র বংশধারা শুধু তার বংশকেই জীবন্ত রাখে নি বরং তারা মহানবীর আনিত ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধকে রক্ষা করেছেন এবং অন্যদের কাছে প্রচার করেছেন।
ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি কাউছারের বিভিন্ন তাফসীর উল্লেখ করার পর বলেন: যেহেতু কাফির ও মুশরিকরা মহাবীর সন্তান নেই বলে তাকে নির্বংশ বলে কটাক্ষ ও উপহাস করত, সে জন্য মহান আল্লাহ এই সূরা অবতীর্ণ করার মাধ্যমে তাদের জবাব দিলেন। সুতরাং এই সূরার অর্থ দাঁড়ায় যে, মহান আল্লাহ মা ফাতিমার মাধ্যমে মহানবীকে এমন একটি বংশধারা উপহার দিয়েছেন যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। দেখুন কত পরিমাণে আহলে বাইতকে শহীদ করা হয়েছে তারপরও বিশ্ব আজ মা ফাতিমার সন্তানে পরিপূর্ণ। অপরদিকে অভিশপ্ত উমাইয়্যা বংশধারা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তারপরও দেখুন আহলে বাইতের মধ্যে কত শত আলেম ওলামা এবং আল্লাহর ওলি রয়েছেন। যেমন: ইমাম সাজ্জাদ, ইমাম বাকের, ইমাম রেজা, নাফসে যাকিয়া প্রমুখ। (রাযি, তাফসীরে কাবির, ১৭তম খন্ড, পৃ: ৩২)
তাবলীগের আয়াত: সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: “হে রাসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি তা না পৌঁছান, তাহলে আপনি তাঁর রেসালাতের কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।
ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি তার তাফসীর কাবির গ্রন্থে উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস, বারা বিন আযেব এবং মুহাম্মাদ বিন আলী থেকে বর্ণনা করেন: এই আয়াতটি হযরত আলীর শানে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূল (সা.) হযরত আলীর হাত উঁচু করে ধরে বলেন: আমি যার মাওলা তথা অভিভাবক এই আলীও তাদের মাওলা বা অভিভাবক। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালবাসে তুমিও তাকে ভালবাস আর যে আলীর সাথে শত্রুতা করে তুমিও তার সাথে শত্রুতা কর। এসময় হযরত ওমর হযরত আলীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন: এই পদমর্যাদা তোমার জন্য শুভ হোক। আজ থেকে তুমি আমার এবং সকল মু’মিন ও মোমেনাতের নেতা তথা অভিভাবক হয়ে গেলে। (রাযি, মাফাতিহুল গাইব, ১২তম খন্ড, পৃ: ৪০১)
নাজওয়ার (গোপন আলাপ) আয়াত: ইবনে জারির তাবারি নিজ সূত্রে লেইস ও মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা.) বলেছেন: পবিত্র কুরআনে এমন একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে যার উপর একমাত্র হযরত আলী (আ.) ছাড়া অন্য কেউ আমল করে নি, আর সেটি হল নাজওয়ার (গোপন আলাপের) আয়াত।
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন রসুলের সাথে গোপন আলাপ কর তখন আলাপ করার আগে কিছু সাদকা দিয়ে নাও। এটা তোমাদের জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো ও পবিত্র। তবে যদি সদকা দিতে কিছু না পাও তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াময়।(মুজাদালা-১২)
ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইবনে জারির, কালবি, আতা এবং ইবনে আব্বাসের সূত্রে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, সাহাবাদের জন্য রাসূল (সা.)-এর সাথে গোপন কথা বলতে গেলে তার পূর্বে সদকা দেয়ার নির্দেশ ছিল। কিন্তু কোন সাহাবাই এই আয়াতের উপর গুরুত্ব দেয় নি এবং আমল করে নি একমাত্র হযরত আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন যিনি রাসূলের (সা.) সাথে গোপন আলাপ করার পূর্বে এক দিনার সদকা দিয়েছিলেন। এরপর আয়াতটি মানসুখ তথা রহিত হয়ে যায় এবং রাসূলের (সা.) সাথে গোপন আলাপ করার পূর্বে সদকার বিধান তুলে নেয়া হয়। (রাযি, মাফাতিহুল গাইব, ২৯তম খন্ড, পৃ: ৪৯৬)
উপরোক্ত হাদিসটি যামাখশারিও তার কাশশাফ গ্রন্থে উক্ত আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: হযরত আলী বলেছেন, আমার নিকট এক দিনার ছিল আমি সেটাকে ১০ দিরহাম খুচরা করে রেখে ছিলাম। আর আমি যখনই কোন বিষয়ে রাসূলের (সা.) সাথে পরামর্শ বা গোপন আলাপ করতে যেতাম এক দেরহাম সদকা দিয়ে দিতাম। (যামাখশারী, কাশশাফ, ৪র্থ খন্ড, পৃ: ৪৯৪)
ইবনে জারির আরও বলেন: হযরত আলী (আ.) ১০ বার রাসূলের (সা.) সাথে গোপন আলাপ তথা পরামর্শ করেন এবং ১০ দিরহামের পুরোটাই সদকা দিয়ে দেন। হযরত আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর কাছে যে ১০টি প্রশ্ন করেছিলেন খাজা আনসারি সবগুলোই তার তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.) বলেন: এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আমার কাছে যে এক দিনার ছিল তার সবই সদকা দিয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে ১০টি প্রশ্ন করে ছিলাম। (আনসারি, পৃ: ৬৮)
সূরা দাহর বা ইনসান: সূরা ইনসানের ৮ নম্বর আয়াত আল্লাহ বলেন: “আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত (মিসকিন), ইয়াতীম ও বন্দীকে অন্নদান করে।”
ইমাম ফাখরুদ্দিন রাযি তার তাফসীরে কাবিরে উক্ত আয়াতের তাফসীরে ওয়াহেদি থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তার আল-বাসিত গ্রন্থে বলেছেন: আয়াতটি হযরত আলী ও তার পরিবারের শানে অবতীর্ণ হয়েছে। অত:পর তিনি কাশশাফের লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একদা ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন অসুস্থ ছিলেন, তখন রাসূল (সা.) সাহাবাদেরকে নিয়ে তাদেরকে দেখতে আসেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন: তাদের (হাসান ও হুসাইনের) সুস্থতার জন্য মানত করলে ভাল হয়। তখন হযরত আলী, মা ফাতিমা, ফিজ্জা মানত করলেন যে, যদি তারা দু’জন (হাসান ও হুসাইনের) সুস্থ হয়ে যায় তাহলে তারা পরপর তিন দিন রোযা রাখবেন। এরপর তারা দু’জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন। তখন হযরত আলী (আ.) তিন দিন ইফতার করা যায় এমন পরিমাণ যব ধার নিলেন। তখন মা ফাতিমা প্রথম দিনের জন্য ৫টি রুটি তৈরি করলেন এবং ইফতারের জন্য সবার সামনে রাখলেন। ঠিক ঐ সময়ে একজন ফকির এসে দরজায় কড়া নাড়ল এবং বলল: হে আল্লাহর রাসূলের (সা.) আহলে বাইত! আমি একজন মুসলমান ফকির, আমাকে খাবার দিন আল্লাহ আপনাদেরকে বেহেশতি খাবার দিবেন। রাসূলের (সা.) আহলে বাইত নিজেদের ইফতার সেই ফকিরকে দিয়ে দিলেন এবং শুধুমাত্র পানি দিয়ে ইফতার করে পরের দিনের রোযা রাখার জন্য নিয়ত করে নিলেন। দ্বিতীয় দিনে সবার সামনে ইফতার রাখলেন। ঠিক ঐ সময়ে একজন ইয়াতিম এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূলের (সা.) আহলে বাইত! আমি একজন ইয়াতিম আমাকে খাবার দিন। আজও তারা নিজেদের ইফতার ইয়াতিমকে দিয়ে দিলেন। তৃতীয় দিন ইফতারের সময় একজন বন্দি এসে খাবার চাইলে তারা আবারও নিজেদের ইফতার সেই বন্দিকে দিয়ে দিলেন এবং নিজেরা অভূক্ত থেকে গেলেন। চতুর্থ দিন সকালে হযরত আলী (আ.) হাসান ও হুসাইনের হাত ধরে রাসূলের (সা.) কাছে গেলেন। রাসূল (সা.) দেখলেন শিশুরা এতটাই ক্ষুধার্ত যে, তারা কাঁপছিল। রাসূল (সা.) এমন পরিস্থিতি দেখে বললেন: আমার জন্য এমন পরিস্থিতি দেখা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। তিনি হযরত আলী, হাসান ও হুসাইনকে সাথে নিয়ে মা ফাতিমার বাড়িতে গেলেন এবং দেখলেন ফাতিমা ইবাদতে মশগুল আছেন এবং তিনি অনাহারে থাকার কারণে শুকিয়ে গেছেন। মহানবী মা ফাতিমাসহ আহলে বাইতের সবার এমন অবস্থা দেখে খুবই কষ্ট পেলেন, ঠিক তখন জীবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন। জিবরাইল বললেন: এই সূরাটি গ্রহণ করুন, মহান আল্লাহ এমন আহলে বাইত থাকার জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অত:পর সূরাটি তিলাওয়াত করলেন। (রাযি, মাফাতিহুল গাইব, ৩য় খন্ড, পৃ: ৭৪৩)
মহানবীর (সা.) সন্তানগণ: ইমাম ফাখরে রাযি মুবাহিলার ঘটনা উল্লেখ করার পর বলেন: এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন হচ্ছেন রাসূলের (সা.) দুই সন্তান। কেননা, এই আয়াতে যখন বলা হল যে, “সন্তানদেরকে নিয়ে আসুন” মহানবী সন্তানের স্থানে হাসান ও হুসাইনকে আনলেন। সুতরাং এটা বলা ওয়াজিব যে, এই দু’জন হলেন মহানবীর সন্তান। তিনি বলেন: অপর যে আয়াত এই বিষয়টিকে প্রমাণ করে তা হল সূরা আনআমের ৮৪ নং আয়াত যেখানে বলা হয়েছে: “আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথ প্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নূহকে পথ প্রদর্শন করেছি-তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।
সূরা আনআমের ৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “আর যাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে। তারা সবাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঈসা (আ.) মায়ের দিক থেকে ইব্রাহীমের বংশধর ছিলেন। সুতরাং বোঝা গেল যে, কখনো কখনো কন্যার পুত্ররাও নিজের সন্তান হিসাবে পরিগণিত হয়। অত:পর বলেন: ইমাম বাকের (আ.) হাজ্জাজের কাছে এই দলিল উপস্থাপন করে ছিলেন। (রাযি, মাফাতিহুল গাইব, ১৩তম খন্ড, পৃ: ৫৪)
তিনি সূরা বাকারার ৩১ নম্বর আয়াতের তাফসীরে বলেন: “আর মহান আল্লাহ আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন। এরপর ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলে দাও, যদি তোমরা সত্য হয়ে থাক।”
শা’বি থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, আমি হাজ্জাজের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। তখন খোরাসানের ফকীহ ইয়াহিয়া বিন ইয়ামোর’কে শিকল দিয়ে হাত পা বেঁধে বাল্্খ (আফগানিস্তানের একটি শহর) থেকে হাজ্জাজের সামনে উপস্থিত করা হল। হাজ্জাজ তাকে বলল: তুমি কি সেই ব্যক্তি যে দাবি করে যে হাসান ও হুসাইন হচ্ছেন রাসূলের (সা.) সন্তান? ইয়াহিয়া বিন ইয়ামোর জবাব দিলেন: হ্যাঁ। হাজ্জাজ বলল: তোমার এই দাবির সপক্ষে উপযুক্ত দলিল উপস্থাপন না করতে পারলে তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করা হবে। তিনি বলেন: হে হাজ্জাজ! আমি পবিত্র কোরআন থেকে তোমার জন্য স্পষ্ট দলিল উপস্থাপন করব। বর্ণনাকারী বলেন: ইয়াহিয়া যেহেতু “হে হাজ্জাজ” বলে সম্বোধন করেছিল, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম তার সাহস দেখে। হাজ্জাজ বলল: তোমার দাবির পক্ষে আয়াতে মোবাহেলাকে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করতে পারবে না। ইয়াহিয়া বললেন: আমি অন্য আয়াত থেকে আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণ করব। তখন তিনি সূরা আনআমের ৮৪ ও ৮৫নং আয়াত তিলাওয়াত করলেন।
“আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাক এবং ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথ প্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নূহকে পথ প্রদর্শন করেছি-তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সুলাইমান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে। এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।
“আর যাকারিয়া, ইয়াহিয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে। তারা সবাই পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।”
আয়াত তিলাওয়াত করার পর হাজ্জাজকে জিজ্ঞাসা করলেন: হযরত ঈসার পিতা কে ছিলেন, আল্লাহ কিভাবে তাকে ইব্রাহীমের বংশধর হিসাবে উল্লেখ করলেন? হাজ্জাজের কাছে যেহেতু এই প্রশ্নের কোন জবাব ছিল না তাই সে লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে নিল, এরপর মাথা তুলে বলল: আমার মনে হচ্ছে আমি কোরআনের এই আয়াতটি কখনোই তিলাওয়াত করি নি। অত:পর হাজ্জাজ ইয়াহিয়া বিন ইয়ামোর’কে মুক্ত করে দিল এবং পুরস্কৃত করল। (রাযি, মাফাতিহুল গাইব, ২য় খন্ড, পৃ: ৪১৩)###