লেখকঃ মো. আলী নওয়াজ খান
আশারা মুবাশশারা (عَشْرَه مُبَشَّرَه) হাদীস অর্থাৎ তথাকথিত জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সাহাবী সংক্রান্ত হাদীস। আহলে সুন্নতের কারো কারো মতে হাদীসে উল্লেখিত দশজন তাদের জীবদ্দশায় যাই করুন না কেন অবশেষে তারা বেহেশতে প্রবেশ করবেন।
সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের হাদীস : উল্লেখিত হাদীস মাসনাদে ইবনে হানম্বাল [ইবনে হানম্বাল, আহমাদ বিন মুহাম্মদ, মুসনাদে আহমাদ, ৩য় খন্ড ২০৮ পৃ।] সুনানে তিরমিজিতে [সহি তিরমিজি, মুহাম্মদ, সুনানে তিরমিজি, ৫খন্ড, ৬৪৮ নম্বর পৃ.] বর্ণিত হয়েছে। আহলে সুন্নাতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাদীস গ্রন্থ সহি বোখারী ও সহি মুসলিম গ্রন্থে বর্ণিত হয়নি। [সুলাইমান বিন আসআশ, সুনানে আবি দাউদ, ৪র্থ খন্ড, ২১১ পৃ.] তিরমিজি শরিফে বর্ণিত হাদীসটি নিম্নরূপ-রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন: (১) আবু বকর জান্নাতী, (২) ওমর জান্নাতী, (৩) ওসমান জান্নাতী, (৪) আলী জান্নাতী, (৫) তালহা জান্নাতী, (৬) যুবায়ের জান্নাতী, (৭) আব্দুল রহমান বিন আউফ জান্নাতী, (৮) সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস জান্নাতী, (৯) সাঈদ বিন জাইদ জান্নাতী, (১০) আবু উবাইদাহ ইবনে জারাহ জান্নাতী।
উক্ত হাদীসের সমস্যা সমুহ : উক্ত হাদীসটি আহলে বাইতের (আ.)এর ধারায় কোন সূত্রে বর্ণিত হয়নি। শুধু তাই নয় বরং আহলে সুন্নাতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সহি বোখারী ও সহি মুসলিম গ্রন্থেও হাদীসটি উল্লেখ করেন নি। উল্লেখ না করার মুলত: কারণ হল রাবীদের ধারাবাহিকতায় অবিশ্বস্ত ব্যক্তির উপস্থিতি এবং হাদীসের ‘মাতন’ এর চরম দূর্বলতা।
হাদীস বর্ণনাকারীদের প্রথম সুত্র : অন্যদিকে সুনানে তিরমিজি ও মুসনাদে হানম্বাল গ্রন্থে হামিদ বিন আব্দুর রহমানের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে উক্ত বর্ণনাতে তিনি তার পিতা আব্দুর রহমান বিন আউফ থেকে হাদীসটি শুনেছেন বলে বর্ণনা করেছেন। অথচ বিশ্বস্ত ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী তার পিতার মৃত্যুর [৩২ হি. সনে] সময় তার বয়স ছিল [জন্ম ৩৩ হি.সনে] এক বছরের কম ! তাহলে তিনি ঐ বয়সে হাদীসটি কিভাবে শুনলেন ? তাই তিনি কোন ক্রমেই ঐ বয়সে হাদীসটি বর্ণনা করা বা শ্রবনের উপযোগী ছিলেন না তাই অবশ্যই অন্য কারো মাধ্যমে হাদীসটি তার কাছে এসে পৌঁছেছে উক্ত ব্যক্তির নাম ইতিহাসে বা হাদীসের সনদে উল্লেখিত হয়নি। [ইবনে হাজার আসকালানী, তাহজীব আত্ তাহজীব ৩য় খন্ড, ৪০-৪১ নম্বর পৃ. এবং ৬ষ্ঠখন্ড, ২২২ পৃ.]
হাদীস বর্ণনাকারীদের দ্বিতীয় সুত্র : উল্লেখিত হাদীসের বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় এমন ব্যক্তিদের নাম উল্লেখিত হয়েছে যাদেরকে স্বয়ং আহলে সুন্নাতেরই হাদীসবিদগণ সত্যবাদী হিসেবে গ্রহণ করেন নি। যেমন: আব্দুল আজিজ দ্বার অর্বাদি যিনি আবু হাতেম নামে প্রসিদ্ধ [জাহাবী, মিজানুল এতেদাল, ২য় খন্ড ৬৩৪ পৃ.] অথবা সুনানে আবি দাউদ গ্রন্থে সাঈদ বিন জাইদ থেকে বর্ণিত হয়েছে [সুনানে আবি দাউদ, ৩য় খন্ড, ৪০১ পৃ.]। অন্য আরেকজন আব্দুল্লাহ বিন জালিম যার নাম উল্লেখিত হয়েছে, সহি বোখারী ও সহি মুসলিমের দৃষ্টিতে তারা কাজ্জাব বা চরম মিথ্যাবাদী তাদের প্রতি বিশ্বাস করা যায় না এবং তাদের সনদে হাদিস বর্ণনা করা থেকে তারা উভয়ই বিরত থেকেছেন , এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন তাদের বর্ণিত হাদিস সহি নয়। [হাকেম নিশাপুরী , মুস্তাদরাক আল সাহিয়াইন বি জিলাতিল তালখিস লিজ জাহাবী, তৃতীয় অধ্যায়, ৩১৭ পৃ.]
অন্যদিকে যাদের নামেই সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে তাদের শেষ ব্যক্তিদ্বয় উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী আর এজন্যেই নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগ ও সুবিধার্থে হাদীসটি জাল করার সন্দেহ থেকে যায়। আব্দুর রহমান বিন আউফ ও সাঈদ বিন জাইদ যারা উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী তারা নিজেরাই হলেন ঐ তথাকথিক সুসংবাদ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। অথচ যাদের নাম ঐ হাদীসে নেই তাদের কোন একজনও উল্লেখিত হাদিসটি বর্ণনা করেন নি ! শুধু তাই নয়, মহানবী (স.) থেকে উক্ত হাদিসটি বর্ণনার কথা ঐ দুইজন ছাড়া আর কেউই বর্ণনা করেন নি অন্য কাউকে উক্ত ঘটনার সাক্ষী পাওয়া যাইনি।
বনি সাকীফাতে যখন নেতা নির্বাচনের বাজার ছিল উত্তপ্ত তখন আনসার ও মুহাজিরগণ প্রত্যেকের ফজিলত সমুহ বর্ণনা করছিলেন সেখানেও এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীসের কথা উল্লেখ করা হয়নি। হাদীসটি সর্বপ্রথম মুয়াবিয়ার যুগে দামেষ্কে আত্মপ্রকাশ করে। যেখানে ছিল হাদিস জাল করার মহা সমারোহ।
তথাকথিত হাসদীসটির আলোচ্য বিষয়বস্তুগত সমস্যা
কুরআন ও মহানবীর (স.) সুন্নাত বিরোধী হাদীস : হাদীসটির সবচেয়ে বড় আরেকটি সমস্যা হল হাদীসে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে মহানবীর তিরোধানের পরপরই তাদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী শত্রুতা চরম আকার ধারণ করে ! এমন কি কোন কোন ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি তলোয়ার ধরেছেন এবং খুন হয়েছেন ! উদহারণ স্বরূপ জনাব তালহা ও যুবায়ের ইমাম আলী (আ.) এর হাতে বাইয়াত করার পর সে বাইয়াত ভঙ্গ করেন এবং বাইয়াত ভঙ্গকারীদের দলে যোগ দেন এবং উষ্ট্রের যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন যেখানে অসংখ্য সাধারণ মুসলমান নিহত হন। অতএব যারা পরস্পরকে খুন করতে উদ্যত হন তারা কিভাবে জান্নাতের সুসংবাদ পাবেন ?
ইসলামী ইতিহাসের সোনালী যুগে আরো অনেক মহান সাহাবী ছিলেন তাদের নাম উল্লেখিত হাদিসে ঐ দশজনের মধ্যে নেই কেন? হযরত বীর হামজা, সালমান ফার্সি ,.. অতএব ঐ দশজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মধ্যে কোনো না কোনো রহস্য কি রয়েছে ?
শুধু তাই নয় আরো মজার বিষয় হল উক্ত হাদীসে মহানবীকেও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের একজন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে! رسول الله عاشر عشرة کان [সুনানে ইবনে মাজা , ১খন্ড, ৪৮ পৃ.] অতএব নিজে নিজেকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ! প্রত্যেক ব্যক্তির একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে সেই অবস্থানগত দিক থেকে নি:সন্দেহে মহানবী (স.) এর স্থান সবার উর্দ্ধে কিন্তু উক্ত হাদীসে সবার শেষে নাম আনা হচ্ছে। এছাড়া মহানবী (স.) এর জান্নাতী হওয়ার ক্ষেত্রে সুসংবাদ দেয়ার কোন প্রয়োজন আছে কি ?! সুতরাং স্পষ্টত অনুধাবন যোগ্য; এটি একটি বানোয়াট হাদীস যা বিশেষ কিছু ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির অভিসন্ধিমুলক কাজ।
হাদীসটি কোরআন বিরোধী
হাদীসে উল্লেখিত দশজন ব্যক্তিকে কেন এমন বিশেষভাবে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হল তা কারো জানা নেই তবে এটি স্পষ্ট যে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ একে অপরের সাথে রক্তাক্ত যুদ্ধ করেছেন যার ফলে নিজেরাও নিহত হয়েছেন আবার হাজার হাজার লোক খুন হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন : ্রوَ مَنْ یَقْتُلُ مُؤْمِناً مُعْتَمِّداً فَجَزاءُهُ جَهَنَّمُ خالِداً فِیها؛ [حاقة/سوره۶۹، آیه۴۴. ] “যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন ঈমানদারকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম সে চিরকাল সেখানেই থাকবে৷ আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন৷” (৪:৯৩) অতএব আপনি কিভাবে ভাবলেন নিজে খুন-খারাবী করবেন, হাজার হাজর নিরীহ ঈমানদার ব্যক্তির হত্যার কারণ হবেন, মহান আল্লাহ কোন বিচার ছাড়াই আপনাকে এমনিই ছেড়ে দিবেন ?! নি:সন্দেহে হাদীসটি একটি বানোয়াট ও মিথ্যা জাল হাদিস।
কেউ কেউ তাদের স্পষ্ট ত্রুটিগুলো লুকাতে বা অপব্যাখ্যা করতে তথাকথিত সাহাবীগণের ইজতেহাদের অবতারণা করে থাকেন কিন্তু তারা একবারও চিন্তা করেন না যে যিনি শরীয়াত এনেছেন এবং প্রচার করেছেন তাঁর প্রদত্ত শরীয়াতের বিরুদ্ধে ইজতেহাদ করলে ধর্মের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। বরং ইজতেহাদ হল শরীয়াতের অস্পষ্ট বিষয়গুলো বা নব্যসৃষ্ট সমস্যা সমূহের সমাধান প্রদানের জন্য শরীয়াতের ধারক ও প্রচারকের যথার্থ আদর্শ বা পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ থেকে তার সমাধান খুঁজে বের করা।
মহানবী (স.) বলেছেন : یا عَلِیُّ حَرْبُکَ حَرْبِی، وَ سِلْمُکَ سِلْمِی: হে আলী যেব্যক্তি তোমার সাথে যুদ্ধ করে সে আমার সাথেই যুদ্ধ করলো আর যেব্যক্তি তোমার সাথে সন্ধি করে সে আমার সাথেই সন্ধি করলো।
মহানবী (স.) আরো বলেন: مَنْ اَطاعَ عَلِیّاً فَقَدْ اَطاعَنِی، وَ مَنْ عَصی عَلیِّاً فَقَدْ عَصانِی যেব্যক্তি আলীকে আনুগত্য করে সে আমারই আনুগত্য করলো, আর যেব্যক্তি আলীর বিরোধীতা করলো সে আমারই বিরোধীতা করলো। [মানাকিব আল আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিব, ইবনে মাগাজী, ১ম খন্ড ১৯ পৃ.- মানাকিব আল খাওয়ারেজিম্মি আল মওফাক ইবনে আহমাদ ১ম খন্ড, ৩০৩ পৃ.]।
হযরত আলী ইবনে আবিতালিব উক্ত হাদিসটিকে প্রত্যাখান করেছেন : বিভিন্ন ইতিহাসে জামালের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত আলী ইবনে আবিতালিব যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে হযরত তালহা ও যোবায়েরকে ডাকলেন এবং বললেন: তোমরা কি জানো জামালের যুদ্ধের সেনাগণ অভিশপ্ত ? হযরত যোবায়ের বললেন আমরা কিভাবে অভিশপ্ত হলাম? আমরা তো জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ! আলী ইবনে আবিতালিব বললেন: আমি যদি তোমাদেরকে জান্নাতী মনে করতাম তাহলে যুদ্ধে আসতাম না। তোমাদের সাথে যুদ্ধ করাকে বৈধ মনে করতাম না। তখন হযরত যোবায়ের বললেন: আপনি কি সাঈদ বিন আমর বিন নাফিল যে হাদিস মহানবী থেকে বর্ণনা করেছেন কুরাইশদের ১০জন জান্নাতী সেটি কি আপনি শোনেন নি ? হ্যাঁ, আমি শুনেছি সাঈদ ওসমানের শাসনামলে তার নিজের স্বার্থে বর্ণনা করেছে। হযরত যোবায়ের বললেন : তাহলে এটা কি মিথ্যা হাদিস ? হযরত আলী বললেন: আপনি তাদের নামগুলো বলেন তারপর আমি বলছি। হযরত নয়জনের নাম বললেন। হযরত আলী বললেন : দশম ব্যক্তি কে ? হযরত যোবায়ের বললেন : আপনি নিজেই। হযরত আলী বললেন : তাহলে আপনি সাক্ষ্য দিলেন যে আমি জান্নাতী। তবে আপনি যা নিজের জন্য ও আপনার অনুসারীদের জন্য দাবী করেছেন তা অস্বীকৃতি জানাচ্ছি। তখন হযরত যোবায়ের বললেন: তাহলে আপনি সাঈদকে সন্দেহ করছেন যে সে মিথ্যা হাদিস বর্ণনা করেছে ? তখন হযরত আলী বললেন: আমি সন্দেহ করছি না বরং নিশ্চিতভাবেই বলছি যে সাঈদ হাদিস জাল করেছে এটা মিথ্যা হাদীস। একথা শোনার পর হযরত যোবায়ের অশ্রুসিক্ত চোখে হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের নিকট থেকে চলে গেলেন। [১- আল ইহতেজাজ তাবরেসী, ১খন্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা। ২- আল কাফায়াতু ফি ইবতাল তওবাতুল খাতিয়াহ, শেইখ মুফিদ, ২৪ পৃষ্ঠা। ৩- মুন্তাখাবুত তাওয়ারিখ, ১৪-১৫ পৃষ্ঠা ] ###