মানুষের সম্মানহানী করা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

অনুবাদঃ মোঃ কবির হোসেন

স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিজীব হচ্ছে মানুষ জাতি। যাকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মানুষের কাঠামো অত্যন্ত নিখুঁত কারুকার্যমন্ডিত। বলতে গেলে আল্লাহপাক নিজেই তার অপরূপ এই সৃষ্ট প্রাণীটির সুউচ্চ প্রশংসা করেছেন নিজ জবানীতে। কোরআনের ভাষ্য, ‘অবশ্যই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে পয়দা করেছি।’ (সুরাঃ তীন আয়াত ৪) তাহলে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আশরাফুল মাখলুকাত তথা মানুষজাতির একটা বিশেষ উচ্চ মাকাম ও মর্যাদা রয়েছে পবিত্র ইসলামে। অন্যের মান সম্মানে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপকারী ব্যক্তিকে পবিত্র ইসলাম তিরষ্কার জানিয়েছে। শরিয়ত এটাকে কখনোই বৈধতা দান করে না যে এক মুসলমান অন্য মুসলমানের মান সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। আর যে ব্যক্তি অন্যের মর্যাদায় আঘাত হানবে তার ধ্বংস অনিবার্য। দ্বীনের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন, আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোন বন্ধুর মান সম্মান ভূলন্ঠিত করে সে প্রকৃতপক্ষে আমার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করছে।’ (সূত্রঃ বিহারুল আনোয়ার খ. ৭৫, পৃ. ১৫৫)

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মোমিন ভাইকে খাটো করে (চাই সে মোমিন মিসকিন হোক বা সামর্থবান) আল্লাহপাক ততক্ষণ সেই অপরাধীকে নিস্তার দিবেন না যতক্ষণ না তাকে হীন ও খাটো করবেন।’ (কাফি খ.২, পৃ. ৩৫১) এ সংক্রান্ত অসংখ্য রেওয়ায়েত, হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে যা বিভিন্ন পুস্তকাদিতে লিপিবদ্ধ আছে।

আল্লাহ ও তার বান্দার মাঝে একটি বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান যদি এ বিষয়টি কেউ উপলব্ধি করতে পারে অর্থাৎ সে যদি বুঝতে পারে যে, কোন বান্দার সম্মানহানী ঘটানোর অর্থ হলো তার মালিকের (আল্লাহর) সম্মানহানীর শামিল তাহলে অনুশোচনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। তাই প্রত্যেক বুদ্ধিমানের বিষয়টি সর্বদা স্মরণ রাখা জরুরী। আল্লাহর বান্দাদের লাঞ্ছিত করা, সম্মানহানী করার শরিয়তী বাণী, তার যে পরিণাম সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিতে রাখা। পাশাপাশি মোমিনদের প্রশংসা ও তাযিমের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। নিজেকে সার্বক্ষণিক এই নোংরা ও অপছন্দনীয় কর্ম থেকে দূরে রাখবে যাতে এমন না হয় যে সে নিজেই ইহকাল ও পরকালে লাঞ্ছনার শিকার হয়।

আল্লাহর বান্দাদের প্রতি সম্মান দেখানোর ফজিলত ঃ কারো সম্মানহানী ঘটানোর বিপরীত সিফাত হলো কারো প্রতি সম্মান দেখানো যা অত্যন্ত ভদ্রোচিত ও উৎকৃষ্ট আমল। হাদীসে কুদসিতে আল্লাহপাক বলেন, ‘ ঐ ব্যক্তি আমার ক্রোধ থেকে অবশ্যই নিরাপদ থাকবে যে আমার মোমিন বান্দার প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করবে।’ (বিহারুল আনোয়ার খ.৬৭, পৃ.৭১) মহানবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমার উম্মাতের মাঝে এমন কোন বান্দার সন্ধান পাওয়া দুষ্কর যে তার স্বীয় মোমিন ভাইয়ের সাথে কোমল ও নম্রাচরণ করে আর আল্লাহপাক তার এই গুণের জন্য জান্নাতী খাদেমদের মাধ্য থেকে একটি খাদেম তার সেবার জন্য নির্বাচিত করবে।’ (কাফি খ.২পৃ.২০৬)

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) থেকে বর্ণিত যে, ‘যে তার মোমিন ভাইয়ের উপর থেকে যিল্লত বা লাঞ্ছনাকে অপসারণ করে আল্লাহপাক তার জন্য দশটি নেকী লিপিবদ্ধ করেন এবং যে মোমিন ভাইয়ের সম্মানহানীর জন্য হাসি তামাশা করে আল্লাহপাক তখন সেই মোমিন ভাইয়ের আমলনামায় নেকী লিপিবদ্ধ করেন।’ (বিহারুল আনোয়ার খ.৭৪, পৃ. ২৯৭)
তিনি আরো বলেন, ‘যে তার মোমিন ভাইকে অভিনন্দনজ্ঞাপন করবে আল্লাহপাক তার জন্য কিয়ামত সংগঠিত হওয়া পর্যন্ত অভিনন্দনপত্র লিখে রাখবেন।’ (বিহারুল আনোয়ার খ.৭৪, পৃ.২৯৮)

অন্যত্র ইমাম বলেন, ‘যখনি কোন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের নিকটে গমন করে এবং তাকে যথার্থ সম্মান দেখায় প্রকৃতপক্ষে সে মহান আল্লাহপাককে সম্মান দেখাল।’(বিহারুল আনোয়ার খ.৭৪ পৃ.২৯৮) একদিন ইমাম ইসহাক বিন আম্মারকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘হে ইসহাক! তুমি আমার অনুসারীদের সাথে সামর্থ্য অনুযায়ী উদারতা দেখাও। কোন মোমিন অপর মোমিন ব্যক্তির সাথে উদারতা না দেখিয়ে থাকতে পারেনা তবে সে ব্যতীত শয়তান যার চেহারায় ক্ষত সৃষ্টি করেছে এবং হৃদয়কে ব্যধিগ্রস্ত করে ফেলেছে।’ (কাফি খ.২, পৃ২০৭)

একটি বিষয় গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত যে, যে ব্যক্তি অন্যকে যে পরিমাণ সম্মানের চোখে দেখবে জনতাও তদ্রুপ তার প্রতি সে পরিমাণ সম্মানের চোখে তাকাবে এবং তাকে সে ভাবেই অবলোকন করবে।

উল্লেখিত আলোচনা থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হলো যে, মোমিন মুসলমান ভাই বোনদেরকে সম্মান করা, তাদের ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা একটি উত্তম আমলের অন্তর্গত। তবে আরো বেশি রেওয়ায়েত ও হাদীসে তাগিদ এসেছে যে যারা জ্ঞানী, আল্লাহওয়ালা, মুত্তাকী, আল্লাহ ভক্ত তাদের প্রতি বিশেষভাবে শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা। নিম্নে দুই শ্রেণীর লোকের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করার জোর তাকিদ এসেছে হাদীসসমূহে।

১) বর্ষীয়ান ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন: বয়োবৃদ্ধ এবং যাদের চুল দাঁড়ি পেকে শুভ্রাকার ধারণ করেছে যুবকশ্রেণীর উচিত তাদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো এবং তাদের সম্মান করে চলা। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কারো বয়স বেশি হওয়ার কারণে তার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রাধান্য দেয় এবং তাকে যথাযোগ্য সম্মানপ্রদর্শন করে তাহলে আল্লাহপাক সে বান্দাকে কিয়ামতের দিন ভয় ভীতি থেকে নিরাপদ রাখবেন।’ (বিহারুল আনোয়ার খ.৭৫, পৃ.১৩৭)

ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বলেন, ‘বয়োবৃদ্ধদের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করার অর্থ হলো মহান আল্লাহপাকের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন।’ (কাফি খ.২, পৃ.১৬৫) তিনি আরো বলেন, ‘ঐ ব্যক্তি আমাদের মধ্যে থেকে নয় যে আমাদের বয়োবৃদ্ধদের প্রতি সম্মান করেনা এবং ছোটদের প্রতি অনুগ্রহ করেনা।’ (কাফি খ.২, পৃ. ১৬৫) মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেন, ‘যখন কোন গোত্রের কোন সম্মানিত ব্যক্তি তোমাদের নিকট আসে তাকে সম্মান কর।’ ( মুহাজ্জাহুল বাইযা খ.৪, পৃ.৩৭২)

২) সা’দাত বা সৈয়দ বংশের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করা: সৈয়দ বংশের ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করা অতিব জরুরী। যারা বংশ পরম্পরায় আলী (আঃ) এর সন্তানদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। যাদেরকে মুহাব্বত করা অর্থাৎ রিসালাত ও নবুয়াতের পারিশ্রমিক আদায় করা। (হে নবী আপনি বলে দিন আমি তোমাদের কাছে এই দ্বীন প্রচারের বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক চাইনা একমাত্র আমার নিকটাত্বীয়দের ভালবাসা ব্যতীত। সুরাঃ শুরা আয়াত ২৩) মহানবী (সাঃ) বলেন, ঐ ব্যক্তি আমার শাফায়েত পাবে যে নিজের মাল সম্পদ, হাত ও জবান দ্বারা আমার বংশধরদের সাহায্য সহায়তা করে।’ (জামিউল আখবার পৃ.১৪০)

তিনি আরো বলেন, কিয়ামত দিবসে আমি চার প্রকারের লোককে শাফায়েত করব। যদিও তারা দুনিয়াবাসীর সমপরিমাণ গোনাহ নিয়ে উপস্থিত হয়।

  • ক) যারা আমার বংশধরদের সম্মান করবে।
  • খ) যারা আমার বংশধরদের চাহিদাকে পুরা করবে।
  • গ) যারা তাদের বন্দীদশায় অর্থাৎ বিপদ আপদের সময় তা নিরাময় করতে প্রচেষ্টা করবে।
  • ঘ) যারা মুখে ও অন্তরে তাদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রকাশ করবে এবং ভালবাসবে। (আল খেসাল শেখ সুদুক, পৃঃ ১৯৬)

সা’দাতদের ফজিলত, তাদের প্রতি সম্মান জানানো সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস বর্ণণা করা হয়েছে। সুতরাং উপরোক্ত বর্ণিত বিষয়গুলো ঈমানদারদের বুঝার জন্য যথেষ্ট।

(সূত্রঃ ইন্টারনেট)###

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More