মাহে রমযানে কুরআন পাঠের গুরুত্ব

মাহে রমযানে কুরআন পাঠের গুরুত্ব পবিত্র কুরআন নাযিলের মাস রমযানে অধিক মাত্রায় এ আসমানি কিতাব তেলাওয়াত ও অনুধাবনের উপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলামের শুরু থেকেই মুসলমানদের মাঝে এ মাসে অধিক কুরআন তেলাওয়াতের প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে এটা কোন গতানুগতিক প্রথা ছিল না; বরং এ প্রথার সাথে মুসলমানদের ঈমান ও আকিদার সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যহ সকাল ও সন্ধ্যায় গভীর মনোযোগের সাথে কুরআন তেলাওয়াত করা উচিত। কুরআন আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে যেন কোন অবস্থাতে অদৃশ্য না হয়ে যায়, সেদিকে কঠোর মনোনিবেশ করা জরুরী। বস্তুতঃ আমাদের চিন্তা-চেতনা, মন-অন্তর, আবেগ-অনুভূতিসহ যাবতীয় বিষয়াদির সাথে পবিত্র কুরআনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। আর এমনটি কেবল তখনই সম্ভবপর হবে যখন আমরা কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি এ আসমানি কিতাবের আদেশাবলিকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করব। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে গভীর মনোযোগের সাথে কুরআন তেলাওয়াতের আদেশ দিয়েছেন।

আল কুরআনের ভাষায়, أفلا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرآن ولو كان من عند غير الله لَوَجَدُوا فيه اختلافا كثيرا “তারা কি কুরআনের প্রতি মনোনিবেশ করে না? যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারও নিকট হতে হত তবে তারা এতে বহু অসঙ্গতি পেত। ” ( সূরা নিসা : ৮২ )

আমাদের উচিত নিজেদের অন্তরকে কুরআনের প্রতি উন্মুক্ত করা। এখানে অন্তর বলতে মানুষের অভ্যন্তরীণ বুদ্ধি-বিবেচনা ও আবেগ-অনুভূতিকে বুঝান হয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে পবিত্র কুরআনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। কুরআনের আয়াতসমূহের অর্থ ও তাফসীরসমূহের প্রতিও লক্ষ্য রাখা জরুরী; যাতে এক্ষেত্রে কোনরূপ মনগড়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেয়া না হয়। কেননা, কুরআনের মনগড়া তাফসীর সমাজের মানুষকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনার পরিবর্তে বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেয়। কুরআন পাঠের পূর্বে এ আসমানি কিতাবের প্রতি আমাদের মন-অন্তর ও বিবেক-বুদ্ধিকে নিবদ্ধ করা উচিত; যাতে কুরআনের বাণীকে আমরা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারি। আমিরুল মু’মিনিন আলী (আ.) তাকওয়াসম্পন্ন ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন, إذا قرأوا القرآن ومرت بهم آيات النار أحسوا بلهيب النار في وجوههم، وإذا مرت بهم آيات الجنة فكأنهم فيها منعمون. “যখন তারা (তাকওয়াসম্পন্ন ব্যক্তিরা) কুরআন পাঠ করে এবং দোজখ বিষয়ক আয়াতসমূহে পৌছায়, তখন জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডের শিখা নিজেদের চোখে প্রত্যক্ষ করে। আর যখন বেহেশত বিষয়ক আয়াতসমূহে পৌছায়, তখন তারা নিজেদেরকে জান্নাতের নেয়ামতসমূহের মধ্যে অনুভব করে।” অর্থাৎ তারা এতই গভীর মনোনিবেশের সাথে কুরআন তেলাওয়াত করে যে, কুরআনের প্রতিটি আয়াতের বাণীর প্রতিফলনকে নিজেদের মধ্যে অনুধাবন করে। সুতরাং, ইসলাম আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনের শিক্ষাকে যথাযথভাবে বাস্তবায়নের আদেশ দেয়। ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তি ও সমাজ জীবন যেন কুরআাননাত হয় এবং মানব জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে যেন কুরআনের আদর্শ প্রতিফলিত হয়। কুরআনের দৃষ্টিতে তওহীদ মাহে রমযান হচ্ছে আমাদের জন্য খোদামুখী ও কুরআন নির্ভর জীবন গড়ে তোলার সর্বোত্তম সময়। আর আল্লাহকে চেনার সর্বপ্রথম স্তর হচ্ছে তার একত্ববাদ তথা তওহীদের প্রতি সুদৃঢ় ঈমানপোষণ করা। মানবজাতিকে হেদায়েতের উদ্দেশ্যে আল্লাহ যুগে যুগে যেসকল নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের দাওয়াতী কার্যক্রমের মূখ্য বিষয় হচ্ছে তওহীদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা। স্বয়ং নবী-রাসূলগণও (আ.) নিজেদের বাস্তব জীবনে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি গভীর ঈমানের পরিচয় দানের পাশাপাশি তাদের দাওয়াতী কার্যক্রমের শুরুতে একমাত্র আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও নির্ভরতার ঘোষণা দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا “নিশ্চয় যারা বলেঃ আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ অতঃপর অবিচল থাকে।”( সূরা হা-মীম সেজদাহ :৩০ )  এ আয়াতে নবী-রাসূলগণের (আ.) বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে । তথা ‘আল্লাহ আমাদের প্রতিপালক’ বাক্যের মধ্যে নবুয়্যাত ও রেসালতের সারাংশ এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় ও সর্বশক্তিমান। সৃষ্টিজগতের সব কিছুই একমাত্র তারই ইচ্ছাধীন। প্রকৃত মুসলমান কখনও আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও বশ্যতা স্বীকার করে না এবং কেবলমাত্র তারই উপাসনায় মশগুল থাকে। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বর্ণিত কিছু আয়াত আমরা এখানে তুলে ধরছি- وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾ “আর এটাই আমার সরলপথ, সুতরাং এরই অনুসরণ কর। আর (অন্য) পথসমূহ অবলম্বন কর না, করলে তা তোমাদের আল্লাহর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তিনি এসব নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার। ( সূরা আনআম : ১৫৩ )

“১ وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ “তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, ‘তোমরা আমার নিকট প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের প্রার্থনা গ্রহণ করব।( সূরা মুমিন : ৬০ )

“২ আল্লাহ মানুষের দৃষ্টিসমূহের অন্তরালে এবং দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে তাকে দর্শন করা সম্ভব নয়। অথচ সৃষ্টিজগতের কোন কিছুই তার দৃষ্টি ও জ্ঞানের বাইরে নয়। কুরআনের ভাষায়, لا تُدْرِكُهُ الأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ “দৃষ্টিসমূহ তাঁর নাগাল পেতে পারে না, কিন্তু তিনি দৃষ্টিসমূহকে নাগাল পান এবং তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।( সূরা আনআম : ১০৩ )

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More