মসজিদ মানুষকে খোদামুখী এবং মানুষের মানবীয় উৎকর্ষতা সাধনে সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা রাখে। মসজিদ মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, যখন নামাযে কিবলামুখী হয়ে দন্ডায়মান হয়, তখন একমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং তারই দিকে সেজদাবনত হবে। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে সৃষ্টি করে এ পৃথিবীতে বিশেষ কিছু দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন; যাতে সেসব দায়িত্বাবলি যথাযথভাবে সুসম্পন্ন করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে। সুতরাং, আল্লাহ মানুষকে এ পৃথিবীতে যেসব সক্ষমতা ও নেয়ামতসমূহ দান করেছেন; মানুষ সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করেছে কিনা- সে সম্পর্কে পরকালে তাকে অবশ্যই আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।
মসজিদের শিক্ষা: মসজিদ আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং তিনিই সমস্ত সম্মান, মর্যাদা আর প্রশংসার একমাত্র অধিপতি। আল্লাহ ছাড়া কেউ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী নয়; একমাত্র তারা ব্যতীত যাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সম্মানিত করেছেন। কেননা, তিনিই যাকে ইচ্ছা সম্মানিত এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।
আমাদের উচিত নিজেদের জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে মসজিদ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কখনও যেন এমন কোন কাজে নিজেদেরকে কলুষিত না করি, যাতে মসজিদের দরজা আমাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিশ্চয় সিজদার স্থানগুলো (মসজিদ) হচ্ছে আল্লাহর জন্য। সুতরাং, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে আহ ব্বান ন কর না।”(সূরা জিন : ১৮ )
মসজিদ আমাদেরকে তওহীদের শিক্ষা দেয়। তওহীদের মূলমন্ত্র হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য ও পালনকর্তা নেই। অর্থাৎ, কারও এমন অধিকার নেই যে, নিজেকে মানবজাতির অধিপতি মনে করবে কিংবা মানুষের চেয়ে বড় কিছু ধারণা করবে। এমনকি সৃষ্টিজগতের মধ্যমণি এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল তথা হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সত্তাগত ও বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে পবিত্রতম ও শ্রেষ্ঠতম হওয়া সত্তে ও বাহ্যিকরূপে তিনি একজন মানুষ ও আল্লাহর সৃষ্টি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ
তুমি বল, (দৈহিক দৃষ্টিতে) আমি তো তোমাদের মতই মানুষ, (তবে আত্মিক উৎকর্ষ ও ঐশী ধারণক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কারণে) আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, আমার ও তোমাদের উপাস্য কেবল এক ও অদ্বিতীয় উপাস্য।”( সূরা কাহাফ : ১১০) অর্থাৎ, বাহ্যিক অবয়বে রাসূলুল্লাহ (সা.) একজন মানুষ; কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে কিছু মহিমান্বিত বৈশিষ্ট্যাবলি ও ফজিলতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি ওহী বা প্রত্যাদেশ নাযিলের মাধ্যমে মানবজাতিকে হেদায়েত ও দিকনির্দেশনা দান করেছেন। সে-ই হচ্ছে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা যে আল্লাহর যাবতীয় আদেশ ও নিষেধাবলি যথাযথভাবে সম্পন্ন করে এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পাবে না। একজন খোদাভীরু ঈমানদার বান্দা পৃথিবীর কোন শয়তানি ও সা¤্রাজ্যবাদী অপশক্তিকে মোটেও তোয়াক্কা করে না। মানুষ যতই আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল হবে, ততই খোদাদ্রোহী অপশক্তিগুলো থেকে বিমুখ হবে।
মসজিদের গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর সর্বপ্রথম যে উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তা ছিল মসজিদ নির্মাণ। কেননা, এক্ষেত্রে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র মসজিদকে ঘিরে সমস্ত মুসলমানদেরকে একই কেন্দ্রবিন্দুতে সমবেত করা; যেখানে থাকবে না কোন বৈষম্য ও ভেদাভেদ। আরবের জাহেলী প্রথাসমূহের অবসান ঘটবে এবং সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করবে; সেখানে থাকবে না কোন ধনী-গরীব, বর্ণ-বৈষম্য কিংবা গোত্রজ পরিচয়।
মসজিদে সবার একই পরিচয়, তা হচ্ছে তারা সবাই আল্লাহর বান্দা। সবাই একই আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হয় এবং এক ও অভিন্ন নিয়মে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়। যেমনভাবে সূরা ফাতিহাতে বর্ণিত হয়েছে, (হে আল্লাহ!) আমরা তোমারই উপাসনা করি এবং তোমার থেকেই সাহায্য প্রার্থনা করি।” (সূরা ফাতিহা : ৫) অর্থাৎ, মসিজদে গমণকারী প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান একমাত্র মহান আল্লাহকে ইবাদত ও উপাসনার উপযুক্ত মনে করে এবং শুধুমাত্র তার নিকটই সাহায্য কামনা করে। তারা আদৌ আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া অন্য কারও আনুগত্য স্বীকার করে না। আমাদের সমাজে একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা বাহ্যিকভাবে আল্লাহর উপাসনা করলেও গোপনে অনেক প্রতাপশালী ও পরাশক্তিকে নিজেদের প্রভূ মনে করে। কিন্তু প্রকৃত ঈমানদাররা কখনও একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে প্রভূ মনে করতে পারে না। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘মানুষের মধ্যে কতিপয় লোক আছে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের তাঁর সদৃশ (সমকক্ষ) গ্রহণ করে থাকে (এবং) আল্লাহর প্রতি যেমন প্রীতি রাখা প্রয়োজন তেমন প্রীতি তাদের সাথে রাখে। তবে যারা ঈমানদার তারা আল্লাহর প্রতি তীব্র ভালবাসা পোষণ করে।”( সূরা বাকারা : ১৬৫ )
মু’মিন ব্যক্তি কখনও আল্লাহর ন্যায় অন্য কাউকে ভক্তি ও ভালবাসতে পারে না। কেননা, এ সৃষ্টিজগতের সবকিছুই আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের নিশানা মাত্র। সবকিছুরই উৎসমূল ও দাতা হলেন তিনি। আর আমাদের অস্তিত্বও তার প্রতি মুখাপেক্ষী।
মসজিদ সমস্ত মুসলমানের তীর্থ স্থান: আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, আল্লাহ আমাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে আমরা যথাযথভাবে বুদ্ধি-বিবেচনা ও যাচাই-বাছাই করতে পারি। অথচ একশ্রেণীর সুবিধাবাদি গোষ্ঠী রয়েছে যারা আমাদেরকে বলে থাকে যে, আপনাদের চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন নেই; আমরাই আপনাদের স্থলে চিন্তা-ভাবনা করব!! আসলে এ শ্রেণীর লোকেরা মানুষকে শুধু নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। তারা চায় মানুষ তাদের পিছু পিছু চলবে, তাদের তোষামোদি করবে এবং তাদের কাজে হাততালি দেবে। তারা কখনও এটা চায় না যে, মানুষ সজাগ ও সচেতন হোক।
কিন্তু আল্লাহ চায় আমরা সর্বদা সজাগ, সচেতন ও সক্রিয় থাকি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের একমাত্র প্রতিপালক; তাই আমাদেরকে অবশ্যই জানতে হবে যে, তার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি কোথায়। মসজিদ পৃথিবীর জমিনে আল্লাহর ঘর হিসেবে পরিচিত। তাই আমাদের উচিত মসজিদকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত রাখা। সেখানে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এমন কিছুতে মশগুল থাকা জরুরী। মসজিদকে কোন অবস্থাতে দলীয়, গোত্রগত, মাযহাবগত কিংবা বংশগত প্রভৃতি গন্ডিতে সীমাবদ্ধ করা জায়েয নয়। কেননা, মসজিদ দল, মত, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের তীর্থ স্থান।
মসজিদ আল্লাহর ঘর এবং ইসলাম সমস্ত মুসলমানদের প্রতি আদেশ করেছে যে, এ পবিত্র ঘরে উপস্থিত হয়ে এক কাতারে নামায আদায় করবে, পাশাপাশি ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে এবং ধর্মীয় ওয়াজ-নসিহতসমূহ একাগ্রতার সাথে শ্রবণ করবে। যাতে ধর্মীয় জ্ঞান ও ধর্মচর্চার বিস্তার ঘটে। কিন্তু শয়তানি প্ররোচনা এবং গোঁড়ামি মানসিকতার কারণে একশ্রেণীর লোকেরা এসব মসজিদের মধ্যেও পার্থক্য ও ভেদাভেদ তৈরি করে থাকে। তারা এভাবে গুঞ্জন তৈরি করে যে, এটা সুন্নী মসজিদ শিয়া মাযহাবের লোকদের প্রবেশ করা যাবে না কিংবা এটা শিয়া মসজিদ এখানে সুন্নী মাযহাবের লোকদের নামায পড়া যাবে না। অবস্থা এতই শোচনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে যে, এক মাযহাবের অনুসারী যদি অন্য মাযহাবের মসজিদে প্রবেশ করে, তবে সে সেখানে নিজেকে একাকী ও আগন্তুক মনে করে।
মসজিদ সমস্ত মুসলমানের তীর্থ স্থান। মুসলমানরা যখন মসজিদে পাশাপাশি এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে এবং ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হয়; তখন নিজেদের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও স্বর্গীয় অনুভূতির উন্মেষ ঘটে এবং পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ, স¤প্রীতি ও সহমর্মিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়। এমন সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে মুসলমানরা যখন আন্তঃধর্মীয় ও মাযহাবগত আলোচনা ও সংলাপে মিলিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম উম্মাহর মাঝে সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি গড়ে উঠবে।
হয়তো কখনও কখনও কোন কোন বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিতে পারে; অবশ্য সেক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও রয়েছে।
কুরআনের ভাষায়, অতঃপর যদি কোন বিষয়ে মতভেদ কর তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি সমর্পণ কর।” (সূরা নিসা : ৫৯) অর্থাৎ, যদি মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদের শিকার হয় তখন তাদের ঈমানি দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ ও রাসূলের (সা.) শরনাপন্ন হওয়া এবং পবিত্র কুরআনের দিকনির্দেশনা মেনে চলার মাধ্যমে উক্ত মতভেদের অবসান ঘটানো। কেননা, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য ও পালনকর্তা নেই এবং মহানবী (সা.) হলেন তাঁরই প্রেরিত ও মনোনীত রাসূল; আর আল-কুরআন হচ্ছে মানবজীবনের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। কাজেই তাঁদের প্রতি শরনাপন্ন হওয়া ও তাঁদের দিকনির্দেশনা মেনে চলার মধ্যেই উদ্ভূত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নিহিত।