টাকার নোটের মধ্যে যে সুতার মত অংশটি যোগ করা হয়, তা না থাকলে যেমন নোট অচল বা মূল্যহীন বলে গণ্য হয়, তেমনি ফাতিমা ছাড়া আলী হয়ে পড়তেন অপূর্ণ, আলী ছাড়া মহানবী হয়ে পড়তেন অপূর্ণ, এবং মহানবী ছাড়া মহান আল্লাহর সৃষ্টি-জগত হয়ে পড়ত অপূর্ণ!
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হযরত ফাতিমাকে শাহাদাত বরণ করতে হয়েছে খুব কম বয়সে এবং আরও বেশি দুঃখজনক হল তাঁর কবরও আজও অচিহ্নিত। রাতের আঁধারে অত্যন্ত গোপনে তাঁকে দাফন করা হয়েছিল।
আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বলেছেন, হযরত ফাতিমার শানে সুরা কাওসার নাযিল হয়েছে। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, অনেক অত্যাচার সত্তে¡ও হযরত ফাতিমার বংশধারা পৃথিবীতে টিকে আছে, অন্যদিকে বনু উমাইয়্যা ধ্বংস হয়ে গেছে।
অবশ্য পরবর্তী যুগে বনু আব্বাসও রাসূলের পরিবারের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছিল। অবশেষে তারাও ধ্বংস হয়ে গেছে। যারা রাসূলের বিরুদ্ধে কথা বলত, তাদের বংশধরদের কোন খবর পৃথিবীর মানুষ জানে না, নেয় না। রাসূলের বংশধরদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করেও তারা সফল হয়নি। একের পর এক রাসূলের বংশধরদের শহীদ করা সত্তে ও যারা পুত্রসন্তান নিয়ে গর্ব বোধ করত, তাদের কোন খবর আজ বিশ্ববাসী জানে না। অথচ রাসূলের বংশধারা হযরত ফাতিমার মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত বজায় থাকবে। এ বংশেই ইমাম মাহদী (আ.) আবির্ভূত হবেন এবং তিনি সারা বিশ্বে আল্লাহর ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।
হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ) ছিলেন মানবজাতির চিরন্তন গৌরব ও আদর্শ মানুষের প্রতীক। তিনি ছিলেন মানবজাতির জন্য অসাধারণ ত্যাগ, বিশ্বস্ততা, অন্যায়ের ব্যাপারে আপোসহীনতা, সততা, দানশীলতা, ধৈর্য, চারিত্রিক পবিত্রতা, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিসহ অনেক মহান স্বর্গীয় গুণের আদর্শ। স্নেহময়ী জননীর মতো বিশ্বনবীর সেবা-যত্ন করা এবং বিপদের সময় তাঁর সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য মহীয়সী নারী ফাতিমার অন্য একটি উপাধি ‘উম্মে আবিহা’ বা পিতার জননী।
বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁকে সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ নারী বলে উল্লেখ করেছেন। রাসুলে খোদা বলেছেন: “ফাতিমা আমার দেহের অংশ, যা কিছু তাঁকে সন্তুষ্ট করে তা আমাকে সন্তুষ্ট করে এবং যা কিছু আমাকে সন্তুষ্ট করে তা আল্লাহকেও সন্তুষ্ট করে। আর যা কিছু ফাতিমাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকে কষ্ট দেয়, এবং যা আমাকে কষ্ট দেয়, তা আল্লাহকেও কষ্ট দেয়।”
রাসূলের পুত্র সন্তানরা মারা যাওয়ায় ইসলামের শত্রু কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকরা এ নিয়ে ঠাট্টা করত। আস ইবনে ওয়ায়েল রাসূলকে ‘আবতার’ বা ‘লেজকাটা’ তথা নির্বংশ বলে গালি দিত। ফলে মনে মনে খুব কষ্ট পেতেন রাসূলুল্লাহ্ (সা.)। মহান আল্লাহ্ তাঁর এ কষ্ট দূর করার জন্য যে অমূল্য নেয়ামত তাঁকে দান করেন, তিনিই হলেন হযরত ফাতিমা (সা.আ)। এর প্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআনে সুরা কাওসার নাযিল হয়।
মর্যাদার দিক থেকে মহামানবদের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ স্থানে সমাসীন হযরত ফাতিমা সালামুল্লাহ আলাইহা। অর্থাৎ মহানবী (সা.) ও আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলীর পরই তাঁর অবস্থান। অথচ আধুনিক যুগের মুসলিম নারী সমাজেরও এক বিশাল অংশের কাছে হযরত ফাতিমার চেয়ে বস্তুবাদী ও ভোগবাদী পশ্চিমা নারী সমাজই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমন কোনো নারীর কথা কি কল্পনা করা যায়, যিনি তাঁর দুই শিশু-সন্তানসহ তিন দিন ধরে ক্ষুধার্ত হওয়া সত্তে¡ও স্বামীকে খাবার সংগ্রহের কথা বলছেন না, যেন ইসলামের জন্য তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ বিঘিœত না হয়? অথবা এমন নারীর কথা কি চিন্তা করা যায়, যিনি পরপর তিন দিন শুধু পানি পান করে রোজা রাখা সত্তে¡ও ইফতারের সময় ক্ষুধার্ত সাহায্যপ্রার্থীকে খাদ্য দেওয়ার জন্য সেই তিন দিন কেবল পানি দিয়েই ইফতার করেন?
হযরত ফাতিমা যাহরা ছিলেন মানবজাতির চিরন্তন গৌরব ও আদর্শ মানুষের প্রতীক তথা মানবতা ও মনুষ্যত্বের পূর্ণতার অন্যতম মডেল। এ ধরনের মানুষ পৃথিবীতে জন্ম না নিলে আদর্শের দিক থেকে মানবজাতির মধ্যে বিরাজ করত ব্যাপক অপূর্ণতা এবং আদর্শিক শূন্যতা।