হজরত ফিজ্জা ছিলেন হজরত ফাতেমা (সা. আ.)’র দাসী। তিনি হজরত ফাতেমা (সা. আ.)’র কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছুই শিখেন এবং তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই তার জীবনচরিতে।
হজরত ফিজ্জা ছিলেন একজন বুদ্ধিমতি নারী। হজরত ওমর তাঁর সম্পর্কে বলেন, যেসব ব্যক্তি হযরত আবু তালিবের বংশে লালিতপালিত হয়েছেন তারা আদ গোত্রের সকল ব্যক্তির চেয়েও বেশী জ্ঞানী। (রিয়াহিনুশ্ শারিয়াহ, ২য় খন্ড, পৃ. ৩১৭।)
আল্লামা মাজলিসি (রহ.) হজরত ফিজ্জা সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। উক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, হজরত ফাতেমার (সা. আ.) জ্ঞানে লালিতপালিত ফিজ্জা আধ্যাত্মিকতা এবং ইসলামি জ্ঞানের এক উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছান।
বর্ণিত হয়েছে যে, কাবা শরীফের একজন জিয়ারতকারী তার কাফেলা থেকে দূরে পড়ে যায়। উক্ত ব্যক্তিটি হঠাৎ একটি নারীকে দেখতে পাই এবং বুঝতে পারে যে, সেও পথ হারিয়ে ফেলেছে এবং বুঝতে পারছে না, কোথায় যাবে। লোকটি তাঁকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কে?
ফিজ্জা তার উত্তরে কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে বুঝাতে চান যে, কেন সে সালাম ব্যতীত কথাবার্তা শুরু করে। ফিজ্জা বলেন: “এবং বলুন, সালাম। তারা শীঘ্রই জানতে পারবে।” (সূরা যুখরুফ, ৮৯তম আয়াত।) লোকটি বলে: “সালামুন আলাইকে।” লোকটি বলে: “তুমি এ মরুভুমিতে কি করছ?” ফিজ্জা বলেন: “আর আল্লাহ যাকে পথপ্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই।” (সূরা যুমার, ৩৭তম আয়াত।)
লোকটি বলে: তুমি কি জ্বিন নাকি মানুষ? ফিজ্জা বলেন: “হে বনী আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও।” (সূরা আরাফ, ৩১তম আয়াত।) লোকটি বলে: তুমি কোথা থেকে আসছো? ফিজ্জা বলেন: “তাদেরকে যেন দূরবর্তী স্থান থেকে আহবান করা হয়।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪৪তম আয়াত।) লোকটি বলে: তুমি কোথায় যাবে? ফিজ্জা বলেন: “আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য।” (সূরা আলে ইমরান, ৯৭তম আয়াত।) লোকটি বলে: তুমি কখন তোমার কাফেলা হারিয়ে ফেলেছ? ফিজ্জা বলেন: “আমি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতোদ্ভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা ক্বাফ, ৩৮তম আয়াত।
লোকটি বলে: তুমি কি খাবার খাবে? ফিজ্জা বলেন: “আমি তাদেরকে এমন দেহ বিশিষ্ট করিনি যে, তারা খাদ্য ভক্ষণ করত না।” (সূরা: আম্বিয়া, ৮ম আয়াত।) খাবার খাওয়ার পরে লোকটি ফিজ্জাকে বলে: একটু তাড়াতাড়ি পথ চলতে হবে। ফিজ্জা বলেন: “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না।” (সূরা: বাকারা, ২৮৬তম আয়াত।) লোকটি বলে: তাহলে তুমি আমার বাহনে আরোহণ কর। ফিজ্জা বলেন: “যদি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে উভয়েই ধ্বংস হয়ে যেত।” (সূরা: আম্বিয়া, ২২তম আয়াত।) লোকটি তার বাহন থেকে নিচে নেমে আসে এবং ফিজ্জাকে আরোহণ করায়। ফিজ্জা বলেন: “যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন তিনি কতইনা পবিত্র!” (সূরা যুখরুফ, ১৩তম আয়াত।)
লোকটি বলে: আমি তাঁকে এভাবে তার কাফেলাতে পৌছে দেই। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কাফেলার কাউকে কি চিন? ফিজ্জা বলেন: “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি।” (সূরা: সোয়াদ, ২৬তম আয়াত।) আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! (আলে ইমরান, ১৪৪তম আয়াত।) হে ইয়াহইয়া, দৃঢ়তার সাথে এই গ্রন্থ ধারণ কর! (সূরা: মরিয়ম, ১২তম আয়াত।) “অতঃপর যখন তিনি আগুনের কাছে পৌঁছলেন, তখন আওয়াজ আসল, হে মূসা!” (সূরা তাহা, ১১তম আয়াত।)
এ আয়াতসমূহের তেলাওয়াত করে তার চার সন্তানের নামকে বুঝিয়ে দেন। আমি উক্ত কাফেলাকে থামতে বললাম এবং উক্ত নামগুলিকে উদ্দেশ্যে করে ডাক দিলাম। তখন চারজন যুবক আমার কাছে আসে। আমি ফিজ্জাকে জিজ্ঞাসা করি এরা কারা? ফিজ্জা বলে: “ধনৈশ্বর্য ও সন্তানসন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।” (সূরা কাহাফ, ৪৬তম আয়াত।) যে এরা হচ্ছে আমার সন্তান।
তার সন্তানরা তাদের মাকে পেয়ে অনেক খুশি হয়। তখন ফিজ্জা আবার কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে তাদেরকে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আদেশ দেয়। ফিজ্জা বলে: “আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যাতে আপনি যে আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন, তার বিনিময়ে পুরস্কার প্রদান করেন।” (কেসাস, ২৫তম আয়াত।) আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি যে, এ নারীর পরিচয় কি?
তার সন্তানরা জবাব দেয়, তিনি হচ্ছেন আমাদের মা ফিজ্জা এবং তিনি ছিলেন হজরত ফাতেমা (সা. আ.)’এর দাসী। আর তিনি এভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে তার মনের ভাবকে কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দেন।