মূল: ডা: মোহাম্মাদ ইয়াকুব বাশাভি
অনুবাদ: মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান, সামসুল ইসলাম (কোম, ইরান)
পূর্বকথা
বিশিষ্ট ও খ্যাতনামা মুফাসসিরগণ পবিত্র কোরআনের সূরা কাউসারের প্রথম আয়াতে
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
বর্ণিত কাউসার শব্দের অর্থ ও উপমা প্রসঙ্গে নানাবিধ মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। অবশ্য সেগুলোর মধ্যে বেহেশতি ঝর্ণা, প্রস্রবণ, অফুরন্ত কল্যাণ প্রভৃতি অর্থসমূহ মনীষীগণের নিকট তুলনামূলক ভাবে বেশি পরিচিত। কিন্তু বাস্তবতার দিক থেকে এ অর্থগুলো যদি কাউসারের ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করি, তবে সূরা কাউসার নাযিলের প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে বর্ণিত শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে বড়ধরনের তারতম্য আমাদের চোখে পড়ে। অনেক তাফসিরবিদ এক্ষেত্রে বেহেশতি ঝর্ণা বা নদ বিষয়ক যে সব রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে সনদের দিক থেকে দূর্বল হিসেবে অভিহিত করেছেন। অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা, মূল আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক হাদীস ও রেওয়ায়েত বর্ণনা, নাযিল সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে বৈপরিত্য প্রভৃতি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সুতরাং, এ ধরনের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গী কখনো সূরা কাউসার নাযিলের বিদ্যমান বাস্তব অবস্থার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয় এবং এগুলো কাউসারের প্রকৃত অর্থ, উপমা ও দৃষ্টান্ত হতে পারে না। উপরন্তু এ সম্পর্কে অনেক মুফাসসিরের বক্তব্য আলোচিত আয়াতের সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না। বরং এক্ষেত্রে তারা এক ধরনের মিশ্রিত বর্ণনা নিয়ে এসেছেন। এসব অভিমতগুলোর মাঝে কিছু অভিমত কাউসারের পরকালীন দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
অনেক দলিল ও সাক্ষ্য এটা প্রমাণ করে যে, কাউসারের প্রকৃত অর্থ এবং নাযিলের সময়ের প্রেক্ষিত বিবেচনায় এ সূরার বর্ণিত কাউসার মূলত রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সন্তানগণ বা বংশধরকেই বুঝান হয়েছে। আর এই অভিমতের দুটি বিশেষ দিক রয়েছে-
ক- ধর্মীয় মূল্যবোধের সংরক্ষণ ও অক্ষুন্নতা বজায় রাখা
খ- ধর্ম বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যর্থ করে দেওয়া
আবার কেউ কেউ কাউসারের পরিপূর্ণ উপমা হিসেবে নবী নন্দিনী হযরত ফাতিমা যাহরাকে (আ.) বুঝিয়েছেন এবং বংশক্রমধারা অনুযায়ী বিষয়টি বিশ্বনবীর (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতের ১১ জন মাসুম ইমামগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
শব্দমূল : আল্লাহ, কাউসার, শিয়া ও সুন্নী, তাফসীর, কোরআন
ভূমিকা
কাউসার শব্দটি পবিত্র কুরআনের বহুল অর্থবিশিষ্ট ও উপমাসমৃদ্ধ শব্দগুলোর একটি, যে বিষয়ে শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের তাফসীরে ত্রিশটিরও অধিক অভিমত বর্ণিত হয়েছে। বেশিরভাগ অভিমতগুলো তাবেয়ীগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। তাদের সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি অক্ষুন্ন রেখেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জ্ঞানগত প্রমাণাদি ও বিদ্যমান তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে তাদের অভিমতগুলোর অকাট্যতার জন্য যথেষ্ট নয়। এখানে একটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা জরুরী, আর তা হচ্ছে পবিত্র কোরআনের আয়াতের তাফসির বোঝার লক্ষ্যে আয়াতে ব্যবহৃত শব্দাবলী ও বাক্যাবলীর অর্থ ও ব্যাখ্যার প্রতি গভীর ও সু²ভাবে মনোযোগ রাখতে হবে।
এখানে মূল প্রশ্ন হল, শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের শীর্ষ মুফাসসিরদের দৃষ্টিতে কাউসারের প্রকৃত অর্থ কি? আর আমাদের বক্ষ্যমাণ গবেষণামূলক প্রবন্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো নাযিলের সময়কার কাউসারের প্রকৃত অর্থ, উপমা বা দৃষ্টান্ত উদঘাটন করা।
অত্র গবেষণাটি তিনটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানগত নিয়মের উপর ভিত্তি করে সম্পাদিত হয়েছে; যথা: আয়াত ও রেওয়ায়েতের মূল ভাবধারা, নাযিলের প্রেক্ষাপট এবং হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে কোরআনকে মানদন্ড হিসেবে গ্রহণের নিয়ম।
এক- নহর বা ঝর্ণা
কাউসার এর অনেকগুলো অর্থের মধ্যে একটি হল বেহেশতের ঝর্ণা। শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের কিছু কিছু মনীষী এ অর্থের প্রতি বিশেষভাবে ইঙ্গিত করেছেন। সুন্নী মাযহাবের সূত্রে বর্ণিত বিভিন্ন রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আয়েশা (রা.), ইবনে আব্বাস (রা.), আনাস ইবনে মালেক (রা.) ও ইবনে ওমর (রা.) কিছু রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, কাউসার বেহেশতের একটি ঝর্ণা যা মহান আল্লাহ তার রাসূলকে (সাঃ) দান করেছেন।
সহীহ বোখারীর রেওয়ায়েতে (যা আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের বর্ণনা সম্বলিত) কাউসারকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নবীর (সাঃ) জন্য অফুরন্ত কল্যাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর আবু বাশার ও সায়ীদ ইবনে জাবেরের বক্তব্য বর্ণনা করে তুলে ধরা হয়েছে যে, আবু বাশার কাউসারকে নহর বা ঝর্ণা অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন; যা কোন কোন ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত এবং ইবনে জাবের কাউসারকে কল্যাণের প্রস্রবণধারা হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এক প্রকার আবু বাশারের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। তিনি দ্বিতীয় হাদীসকেও উপরোক্ত হাদিসের মতো হাউস বা জলরাশি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রথম রেওয়ায়েতে কাউসারকে কল্যাণ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তার প্রিয়নবীকে (সাঃ) দান করেছেন। আর দ্বিতীয় রেওয়ায়েতে কাউসারকে অফুরন্ত কল্যাণ বলেছেন যা মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে (সাঃ) দান করেছেন। এ দু’টি রেওয়ায়েতে কাউসার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তদানীন্তন (রেওয়ায়েত বর্ণনার) সময়ে মানুষ ভাবতো যে, কাউসার হলো বেহেশতের একটি ঝর্ণা এবং এ রেওয়ায়েতে এ সম্পর্কে মহানবীর (সাঃ) বক্তব্যের প্রতি কোন প্রকার ইশারা বা ইঙ্গিত করা হয় নি। এছাড়া এখানে সূরা কাউসারের মূল ভাবার্থের প্রতিও কোন গুরুত্বারোপ করা হয় নি।
ইবনে আব্বাসের (রা.) বর্ণনা ও বাচনভঙ্গি থেকে বুঝা যায় যে, এটা ছিল তার ব্যক্তিগত ইজতিহাদ বা গবেষণার ফল। যদি এই বিষয়ে মহানবীর (সাঃ) থেকে কোন বাণী থাকত, তাহলে সেটা তিনি উল্লেখ করতেন। কারণ আবু বাশার-এর বক্তব্যের আলোকে বুঝা যায় যে, এ ধরণের কল্পণাপ্রসূত ধারণা মানুষের মধ্যে বিরাজমান ছিল এবং ইবনে আব্বাসের (রা.) উচিত ছিল এমন ধারণার অপনোদন করা। কিন্তু তা করা হয় নি।
তাবেয়ীদের যুগে কাউসারের অর্থ বলতে বেহেশতী ঝর্ণাকে বুঝান হত; তখনকার সমাজে প্রচলিত একটি সম্ভাব্য অর্থ এবং সেই সময়ে সকলের বিশ্বাস এমনটি ছিল না। বরং, এটা ছিল কতিপয় তাবেয়ীদের ধারণা। মজার বিষয় হলো (আবু বাশার) প্রশ্নকারী নিজেই ঝর্ণাকে কাউসারের অর্থ হিসেবে মানতেন না। যেভাবে তার বর্ণিত রেওয়ায়েতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। সাঈদ ইবনে জাবিরও আবু বাশারের উত্তরে বলেছেন, বেহেশতের ঝর্ণা অফুরন্ত কল্যাণসমূহের একটি, আর সেটি কাউসারের প্রকৃত অর্থ নয়।
কাউসারকে বেহেশতের ঝর্ণার অর্থে সীমাবদ্ধ করা আয়াতের ভাবধারা, রেওয়ায়েত, বুদ্ধি-বিবেচনা, পবিত্র কোরআনের অন্যান্য আয়াত এবং হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে কোরআনের সম্মুখে হাদীসের উপস্থাপন রীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ, পবিত্র কোরআনে বেহেশতে মুত্তাকিদের জন্য অনেকগুলো ঝর্ণার কথা বলা হয়েছে। যে কোরআন মানুষকে গভীর বুদ্ধি-বিবেচনার আহবান জানায়, এটা কিভাবে সম্ভব যে, সে কোরআন মহানবী (সাঃ) এবং ইসলামের বিরুদ্ধে দুশমনদের আরোপিত উপর্যপুরি অপবাদ ও ষড়যন্ত্রের জবাবে শুধুমাত্র আখেরাতে একটা ঝর্ণা দেওয়ার প্রতিশ্রæতিকে যথেষ্ট মনে করবে এবং তাতে গর্ববোধ করবে!
হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে কোরআনের সম্মুখে হাদীসের উপস্থাপনরীতির সাথে এমন বিষয়টি মোটেও সামঞ্জস্যতা রাখে না।
সুতরাং এমনটি আদৌ যুক্তিসংগত নয় যে, প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ বেহেশতে শুধুমাত্র একটি ঝর্ণার প্রতিশ্রæতির কারণে মহানবীর (সাঃ) উপর এতো অনুকম্পার কথা বলবেন; তাও আবার ভবিষ্যত প্রতিশ্রæতির বদলে। শুধু তাই নয়, বিনিময়ে তার নিকট শুকরিয়া প্রকাশ, নামাজ আদায় ও কুরবানী দানের ওয়াদা তার কাছ থেকে চাইবেন। কারণ, শোকর বা কৃতজ্ঞতার বিষয়টি নিয়ামত হস্তগত হওয়ার পরই আসে, হস্তগত হওয়ার পূর্বে নয়। যদি কোন নেয়ামত হস্তগত হয়, তারপর কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন আসে। এই সূরায় প্রথমে কাউসার দানের কথা বলা হয়েছে। তারপর অনতিবিলম্বে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিমিত্তে নামাজ আদায় ও কুরবানী করার কথা বলা হয়েছে। এটা প্রমাণ করে যে, কাউসার এমন জিনিস যা ইতিপূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবীকে (সাঃ) দেয়া হয়েছে। এমন নয় যে ভবিষ্যতে দান করা হবে। এই বিষয়টি ঝর্ণা প্রদানের প্রতিশ্রæতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাছাড়া বেহেশতের ঝর্ণার সাথে রাসূলের (সা.) সন্তানের মৃত্যু কিংবা দুশমনদের কটু কথার কি সম্পর্ক রাখে? সূরা কাউসার নাযিলের প্রেক্ষাপটের রেওয়ায়েতসমুহ মহানবীর (সাঃ) সন্তানের মৃত্যু ও শত্রুদের কটু কথার প্রেক্ষিতে মহানবীকে (সাঃ) সান্ত¡না দিয়ে নাযিল হওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে। শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের কিছু কিছু রেওয়ায়েতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সূরা কাউসার নাযিলের অন্যতম কারণ হিসেবে দ্বীনের ভবিষ্যৎ এবং এক্ষেত্রে উমাইয়া শাসকদের নীল নকশা সম্পর্কে মহানবীর (সা.) স্বপ্নে দেখার পর তাকে আশ্বস্ত করার জন্য এ সূরাটি নাযিল হয়।
রেওয়ায়েতসমুহে এমন ঝর্ণার অস্তিত্ব সম্পর্কে পৃথিবীর আকাশে, নীলনদ ও ফোরাত নদীর তীরে, সপ্তম আকাশে এবং বেহেশতে আছে বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব রেওয়ায়েত আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত হয়েছে, যা অবাঞ্ছিত বিষয়বস্তুর বহনকারী; যেমন, মেরাজের রাতে মসজিদুল হারামে মহানবীর (সা.) হৃদয় উন্মোচন (সার্জারী), পৃথিবীর আকাশে ফুরাত, নীলনদ ও কাউসারের অস্তিত্ব। এসব রেওয়ায়েত ইসরাইলিয়্যাত তথা ইসলামের শত্রু ও ইহুদিচক্রকর্তৃক কল্পিত হওয়ার সমুহ সম্ভবনা রয়েছে। কেননা মহানবীর (সাঃ) মেরাজের সময় আনাস ইবনে মালেকের জন্মই হয় নি; কিভাবে সে সরাসরি মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করে? মহানবীর (সাঃ) হিজরতের সময় আনাস এর বয়স ছিল ৮/১০ বছর। আর মেরাজের ঘটনা নবুয়্যতের দ্বিতীয় বছরে সংঘটিত হয়। তাছাড়া নীলনদ ও ফোরাত নদী মিশর ও ইরাকে অবস্থিত, না কি পৃথিবীর আকাশে? সুতরাং এসব রেওয়ায়েতের জাল ও বানোয়াট হওয়ার ব্যাপারটি খুবই স্পষ্ট। নহর বা ঝর্ণার রেওয়ায়েতে সবচেয়ে ভাবার বিষয় হল, এসব রেওয়ায়েত সংঘটিত ও সম্পাদিত ঘটনার পর্যবেক্ষক নয়। কাউসার সম্পর্কে দুটি প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে এবং দুটিই একে-অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর তা হলো- ইসলাম ও মহানবীর (সাঃ) রিসালাতের সাথে উভয় গোষ্ঠির (মুশরিক ও বনি উমাইয়ার) শত্রুতা কিয়ামতঅবধি বিদ্যমান থাকবে। অপরদিকে মুশরিকরা একে অপরকে সুসংবাদ দিতো যে, মুহাম্মাদ নির্বংশ (নাউজুবিল্লাহ!) এবং তার বিদায়ের পর তাঁর ধর্ম নিঃচিহ্ন হয়ে যাবে, তার নির্দেশনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এ কারণে মহানবী (সাঃ) দ্বীনের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুতরাং, এটা কিভাবে যুক্তিসংগত হয় যে, মহান আল্লাহ শত্রুদের হাত থেকে ইসলামের হেফাজত ও বিরাজমানতা নিয়ে তাঁর নবীর (সাঃ) উদ্বিগ্নতাকে একটা ঝর্ণা প্রদানের প্রতিশ্রæতির মাধ্যমে সান্ত¡না দিয়ে বলবেন যে, তুমি দ্বীনের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ো না। কারণ, আমি তোমাকে বেহেশতে ঝর্ণা দান করব। ঝর্ণা কিভাবে মহানবীর (সাঃ) বিষন্নতা ও উদ্বিগ্নতা দূর করবে? অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট এটাই যে, তা আয়াত বা সূরার অবতীর্ণের ঘটনার পর্যবেক্ষক হবে। যদি আয়াত বা সূরার মাঝে সংঘটিত ঘটনার প্রতি কোন ইশারা না থাকে, তাহলে তা অবতীর্ণের কারণ বা প্রেক্ষাপট হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, অবতীর্ণের প্রেক্ষাপটের সাথে আয়াত বা সূরার সম্পৃক্ততা কি?
মহানবী (সাঃ) ইসলাম বা দ্বীন বিলুপ্ত হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আর কাউসারকে এমন কিছু হতে হবে যা মহানবীর (সাঃ) উদ্বিগ্নতা দূর করবে এবং দ্বীনের ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে। কিন্তু এ নিশ্চয়তা পরকালের ঝর্ণা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। সুতরাং কাউসারকে এমন কিছু হতে হবে যা এই দুনিয়াতেই মহানবীর (সাঃ) দ্বীনের জিম্মাদার হবে।
শিয়া মাযহাবের কিছু কিছু রেওয়ায়েতেও কাউসারকে ঝর্ণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রেওয়ায়েতসমূহ মাসুম ইমামগণের মধ্যে যেমন- ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব, ইমাম জাফর সাদীক্ব থেকে এবং সাহাবীদের মধ্যে যেমন- ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। মেরাজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সংক্রান্ত ইমাম জা’ফর সাদীক্ব আলাইহিস সালামের একটি দীর্ঘ হাদিসে কাউসারকে বাইতুল মামু’র এর নিকট অবস্থিত ঝর্ণা হিসেব উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব থেকেও বর্ণিত হয়েছে যাতে কাউসারকে বেহেশতি ঝর্ণা হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে। কিন্তু এ রেওয়ায়েতগুলোতে সনদ ও মূলপাঠ (ঞবীঃ) এর দিক থেকে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।
বস্তুত এ রেওয়ায়েতগুলো আয়াতের ভাবধারা, শানে নুযুল সংক্রান্ত রেওয়ায়েত, হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে কোরআনের সম্মুখে হাদীসের উপস্থাপন নীতিধারা, বুদ্ধি-বিবেচনা, কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে না। ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত এবং ইমাম জাফর সাদীক্বের (আঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত রেওয়ায়েতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ও তাতে বিষয়বস্তুগত দুর্বলতা রয়েছে। একজন ঝর্ণার অস্তিত্বের কথা বায়তুল মামুর এ বলেছেন; আর অন্যজনের উদ্ধৃতিতে বেহেশতের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত রেওয়ায়েতের সনদ ও বিষয়বস্তুগত দুর্বলতা রয়েছে। ইবনে আব্বাস এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে, যেন তিনি নিজেই সূরা কাউসার অবতীর্ণ হওয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। যদিও তিনি তা নিজে প্রত্যক্ষ করেন নি। তিনি কিভাবে সুরা কাউসার নাযিলের প্রত্যক্ষদর্শী হবেন? কিভাবে তিনি সুরা কাউসার অবতীর্ণের পরবর্তী ঘটনা সরাসরি বর্ণনা করেন? যখন ইবনে আব্বাস মাত্র দেড় বছর মহানবীর (সাঃ) সান্নিধ্যে ছিলেন এবং মহানবীর হিজরতের সময় তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সূরা কাউসার নবুয়্যতের প্রথমদিকে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন ইবনে আব্বাস পৃথিবীতেই আসেন নি। তবে, তিনি সূরা কাউসার নাজিলের কারণ যদি কারো কাছে জেনে বা শুনে থাকেন এবং তা বর্ণনা করে থাকেন সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু স্পষ্টভাবে এমন কোন প্রমাণাদি আমাদের হাতে নেই। অবশ্য একটি রেওয়ায়েত অনুসারে ইবনে আব্বাস কোরআনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জ্ঞান রাখতো। আর এটা ছিল তার প্রতি মহানবীর (সাঃ) দোয়ার বরকতে। কিন্তু এই বিষয়টি তখনই সঠিক বলে বিবেচিত হবে যখন তার সাথে রেওয়ায়েতের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হবে। তার সাথে রেওয়ায়েতের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়া সত্তে¡ও শুধুমাত্র একটি অর্থে তা গ্রহণযোগ্য।
ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েতে মিম্বারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ সে সময়কার শ্বাসরুদ্ধকর ও অসহনীয় পরিস্থিতিতে মক্কাতে কোন প্রকার মেম্বারের অস্তিত্ব আদৌ কল্পনা করা যায় না। তবে ইবনে কাসীর মদীনার জীবনে মেম্বারের উপস্থিতি ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। এখন যেহেতু মুসলমানদের সমস্ত মাযহাবের মুফাসসিরগণ ও পন্ডিতগণ সুরা কাউসারকে মক্কী সূরা বলে অভিহিত করেছেন এবং মক্কায় কোন মেম্বার এর অস্তিত্ব ছিল না। সেহেতু রেওয়ায়েতে বর্ণিত মক্কায় মিম্বাবের অস্তিত্ব উক্ত রেওয়ায়েত জাল হওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে। অপরপক্ষে সূরা কাউসার মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে আব্বাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত রেওয়ায়েতে সনদগত সমস্যাও রয়েছে; তিনি একটি রেওয়ায়েতে ঝর্ণা এবং অন্য রেওয়ায়েতে কল্যাণ বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে জারীরও বিভিন্ন রেওয়ায়েত বর্ণনার পর বেহেশতের ঝর্ণাকে কাউসারের প্রথম অর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এর দলিল হিসেবে মহানবী (সাঃ) থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস উপস্থাপন করেছেন। ইবনে জারীর এবং তার মতো অন্যরা উল্লেখিত রেওয়ায়েতসমূহকে সনদ ও বিষয়বস্তুগত কোন যাচাই-বাছাই ছাড়াই গ্রহণ করেছেন, আর এমনটি তাফসিরের ক্ষেত্রে অনেক বড় ভুল এবং অগ্রহণযোগ্য। আবার আহলে সুন্নাতের কিছু মুফাসসির ঝর্ণা’র জায়গায় কাউসারের প্রকৃত অর্থ হিসেবে হাউজকে প্রসিদ্ধ ও মুতাওয়াতির বলে উল্লেখ করেছেন।
শিয়া ও সুন্নী মাযহাবের সূত্রে বর্ণিত এ ধরনের রেওয়ায়েতগুলো সহীহ হিসেবে ধরে নেওয়া হলে কাউসার হবে একটি ঝর্ণা যার অবস্থান পরকালে, দুনিয়াতে না। আর এমনটি কেবল ইঙ্গিতসূচক ও ব্যাখ্যামূলক বিষয়ে সীমাবদ্ধ, মূল আয়াতের মূল তাফসীরে না । কারণ পবিত্র কোরআন বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ, তাফসির ও তা’বীল তথা ইঙ্গিতসূচক ব্যাখ্যা, মুহকাম (অকাট্য ও সুদৃঢ়) ও মুতাশাবিহাত (রূপক) প্রভৃতি আয়াতসমূহের সমন্বয়ে গঠিত।
বস্তুত:পক্ষে শানে নুযুলের প্রেক্ষাপটে কাউসারের প্রকৃত অর্থ বা উপমা যাই হোক সেটাকে অবশ্যই দু’টি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে-
১- কাউসারকে অবশ্যই কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনের অক্ষুন্নতা ও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা দানকারী হতে হবে।
২- শত্রুদের ষড়যন্ত্র নস্যাত ও মুলোৎপাটনকারী হতে হবে।
অথচ বাস্তবিক অর্থে বেহেশতী ঝর্ণার এ বৈশিষ্ট্য দু’টির কোনটিও নেই। অবশ্য কিছু রেওয়ায়েতে বেহেশতী ঝর্ণা ও হাউজের মাঝে এক ধরণের সম্পর্ক দেখা যায়। কিন্তু সেটা অন্য বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিতসূচক হতে পারে।
সূন্নী মাযহাবের কিছু আলেম কাউসারের প্রকৃত অর্থ হিসেবে বেহেশতী ঝর্ণাকে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই অভিমতটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এমন রেওয়ায়েত সহীহ হিসেবে গ্রহণ করা হলে বেহেশতী ঝর্ণা হবে কাউসারের পরকালীন অর্থসমূহের একটি, এমনটি নয় যে কাউসার এর অর্থই ঝর্ণা। অনুরূপভাবে তা পার্থিব কোন অর্থে হতে পারবে না। কিছু মুফাসসির কাউসারের অর্থ ও উপমা এবং ইঙ্গিতসূচক ব্যাখ্যা ও তাফসীরের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন, যা এ বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।
দুই- হাউজ
কাউসারের অপর একটি অর্থ হিসেবে কিয়ামতে হাউজের কথাও বর্ণিত হয়েছে। কেউ কেউ হযরত আনাস ও আত্বা থেকে এমন অর্থ বর্ণনা করেছেন। হযরত আনাসের রেওয়ায়েতে একই সময়ে কাউসারের অর্থ হিসেবে ঝর্ণা ও হাউজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাফসীরে কাবীরের প্রণেতা ফাখরুদ্দীন রাজী কাউসারের অর্থ হাউজ সম্পর্কে বলেছেন, কাউসার সম্পর্কে দ্বিতীয় অভিমতটি হচ্ছে- কাউসার হলো হাউজ এবং এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত রয়েছে।
প্রথম অভিমতটি (ঝর্ণা) ও এই অভিমতের সমন্বিত অর্থ হলো, ঝর্ণা হাউজে পৌঁছায় বা ঝর্ণাসমূহ হাউজ থেকে প্রবাহিত হয়। বলা হয় যে, হাউজ ঝর্ণার উৎস। তাফসিরে তিবইয়ানের প্রণেতা হযরত আত্বা হতে বর্ণিত রেওয়ায়েতকে এনেছেন (সেখানে কাউসারের অর্থ হিসেবে হাউজকে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ কাউসারের অর্থ হিসেবে হাউজকে মুতাওয়াতির সূত্রে দাবি করেছেন।
মূলত: কাউসারকে হাউজ হিসেবে বর্ণনাকারী রেওয়ায়েতসমূহ তা’ভিল বা ব্যাখ্যাসূচকভাবে এসেছে। আর একটি আয়াতের কয়েকটি তা’ভিল বা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। যেমনভাবে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সূরা ও আয়াতের প্রাসঙ্গিক ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে।
কাউসার পরকালে মহানবী (সাঃ) ও আল্লাহর ওলীদের সাথে মিলিত হওয়ার স্থান এবং তাঁদের মাধ্যমে মানুষের পিপাসা মিটানো হবে। অপরপক্ষে কাউসার হবে কাফির, মুশরিক, বিপথগামী ও মুনাফেকদের সাথে মহানবীর (সাঃ) চিরবিচ্ছেদ ও দূরত্ব তৈরি হওয়ার স্থান। সেই সাথে তাদের কাউসারের মাধ্যমে তৃষ্ণা নিবারণ থেকে বঞ্চিত হওয়া ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হবে। আর তাই আহলে সুন্নাতের বিশুদ্ধতম হাদীস গ্রন্থাবলী, তাফসির ও রেওয়ায়েতের গ্রন্থসমূহে শত শত রেওয়ায়েত এসেছে যে, কিয়ামতের দিন কিছু ব্যক্তি হাউজে প্রবেশের সময় বাঁধার সম্মুখীন হবে। ইমাম বোখারী এ ব্যাপারে কতিপয় রেওয়ায়েত নিয়ে এসেছেন। উদাহরণস্বরূপ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ মহানবীর (সাঃ) উদ্ধৃতি দিয়ে সহীহ বোখারী শরীফে উল্লেখ করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত; তিনি রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন: আমি হাউজে কাউসারে তোমাদের অগ্রগামী প্রতিনিধি। তোমাদের মধ্যকার কিছু ব্যক্তিকে আমার সম্মুখে হাজির করা হবে। অত:পর তাদেরকে আমার নিকট থেকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি তখন বলব, হে আমার প্রতিপালক: এরা তো আমার সাহাবী। আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে এরা কত নতুন কাজ করেছে।
একই বিষয়বস্তু অপর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে,
يرد علي الحوض رجال من أصحابي فيحلؤون عنه فأقول يا رب أصحابي ؟ فيقول إنك لا علم لك بما أحدثوا بعدك إنهم ارتدوا على أدبارهم القهقرى
‘তোমাদের মধ্যকার কিছু ব্যক্তিকে হাউজে কাউসারে আমার সম্মুখে হাজির করা হবে। অত:পর তাদেরকে আমার নিকট সরিয়ে দেয়া হবে। আমি তখন বলব, হে আমার প্রতিপালক: এরা তো আমার সাহাবী। আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে এরা কত নতুন কাজ করেছে। এরা বিচ্যুতির শিকার হয়েছিল’।
এ সম্পর্কে বর্ণিত রেওয়ায়েতগুলোর অধিকাংশ মুতাওয়াতির এবং হাশরের ময়দানে হাউজে কাউসারের এ দৃশ্য সম্পর্কে প্রায় সকলেই অভিন্ন কথা বলেছেন এবং এক্ষেত্রে কেউ দ্বিমত পোষণ করেন নি।
হাউজের নিকটবর্তী হওয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে বক্তব্য ও আমলগত দিক থেকে কোরআন ও আহলে বাইতকে আঁকড়ে ধরা, যা হাউজ পর্যন্ত একে-অপরের সাথে অবস্থান করবে। এ সব রেওয়ায়েতে কোরআন ও ইতরাতকে আঁকড়ে ধরে রাখার মাধ্যমে গোমরাহি ও বিচ্যুতি থেকে মুক্ত থাকার উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে কোরআন ও ইতরাতে আহলে বাইত হাউজের নিকটবর্তী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পরস্পর থেকে পৃথক হবে না বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত অর্থে হাউজে কাউসার রেসালাতের বন্ধু ও শত্রুদের প্রবেশ ও পরিচিতির জায়গা এবং শিয়া ও সুন্নী উভয় মাযহাবের রেওয়ায়েতগুলোতে এ বিষয়টির উপর অনেক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু রেওয়ায়েতে আলী ইবনে আবু তালিবকে (আ.) হাউজে কাউসারের দায়িত্বশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দ্বীনের শত্রুদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করবেন। সেই হাউজের উৎসও আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) এর ঘর।
ইমাম আলী ইবনে আবু তালেবও (আঃ) একটি দীর্ঘ হাদীসে হাউজের গুণাগুণ বর্ণনা করার পর সেটাকে কাউসার হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন।
আহলে সুন্নাতের কিছু আলেম কাউসারের অর্থ হিসেবে হাউজকে একটি খন্ডনযোগ্য অভিমত বলে মনে করেছেন; তারা উল্লেখ করেন- যদি কাউসার বলতে হাউজে কাউসারকে ধরে নিই, তাহলে এটা আবশ্যক হয়ে পড়বে যে, মহানবীকে (সাঃ) বেহেশতের একটি খন্ডাংশ দান করা হয়েছে। আর এটা কিভাবে সম্ভব? কেননা পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় যে কেউ মহান আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাঁকে দুটি বেহেশতের ওয়াদা দিয়েছেন। কোরআনের ভাষায়,
وَ لِمَنْ خافَ مَقامَ رَبِّهِ جَنَّتان
‘আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের মর্যাদাকে ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দু’টি জান্নাত’।
এটা কতটা আশ্চর্যজনক কথা যে, যদি কোন ব্যক্তি সাধারণ উম্মত হয়, তাহলে তাকে দু’টি বেহেশত দেওয়া হবে। অথচ যিনি সমস্ত মানুষ এমনকি নবী-রাসূলদেরও মধ্যমণি, তাকে মাত্র বেহেশতের খন্ডাংশ দেওয়া হবে? এখানে মাহাল্লে ইহসান এবং যখন কাউকে উপকার করার পর তাকে সে উপকারের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তার অর্থ এই যে ইতিপূর্বে কাউকেই তেমন উপকার করা হয় নি। কিন্তু, এখানে বিষয়টা ভিন্ন। এক দিকে বলা হচ্ছে সাধারণ উম্মতকে দু’টি বেহেশত দেওয়া হবে। অন্য দিকে বলা হচ্ছে মহানবীকে (সাঃ) বেহেশতের খন্ডাংশ দেওয়া হবে। সুতরাং এমনটি কখনো যুক্তিসংগত হতে পারে না।
কিছু রেওয়ায়েতে কাউসারকে ঝর্ণা ও হাউজ দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ক্ষেত্রেও কাউসার এর অর্থকে এই দু’টি অর্থে (ঝর্ণা ও হাউজ) সীমাবদ্ধ করা সঠিক নয়। যেমনিভাবে উপরোক্ত রেওয়ায়েতে হাউজকে কাউসার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সূরা কাউসারে এমন কোন কথা আসে নি। কাউসার হাউজ বা ঝর্ণা হওয়াতে বা উভয়টি হওয়াতে কাউসারের অর্থকে সীমাবদ্ধ হওয়ার দলিল হতে পারে না। হাউজ বা ঝর্ণাকে পরকালীন কাউসারের অর্থ বা উপমাসমূহের একটি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। আমাদের আলোচনার বিষয় হলো নাযিলের সময় সূরা কাউসার এর প্রকৃত অর্থ বা উপমা কি ছিল? যার জন্য মহানবীর (সাঃ) উপর দুটি আমল ওয়াজিব হয়েছে এবং কাউসার প্রদানের মাধ্যমে শত্রুরা কিয়ামত পর্যন্ত নির্বংশ হয়েছে। কেননা, আয়াত দুনিয়াতেই কাউসার প্রদানের বিষয়টি সুস্পষ্ট করে। এ কারণেই মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে (সাঃ) দ্রæত দু’টি আমল তথা শোকরানা নামাজ ও কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ দু’টি আমলই শোকর বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, আর শোকর সবসময় নিয়ামত লাভের পরই প্রকাশ করা হয়। হাউজ বা ঝর্ণা পরকালে নবীকে (সাঃ) দেওয়া হবে। আর তাই, নেয়ামত লাভের পূর্বে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন আদৌ যুক্তিসংগত নয়।
তিন- অফুরন্ত নিয়ামত
কিছু তাফসীরে কাউসারের অর্থ ও দলিল সম্পর্কে মিশ্রিত আলোচনায় এসেছে। এই মিশ্র আলোচনায় সেটার প্রকৃত ভাব অনুধাবনে সমস্যার সৃষ্টি করেছে। শিয়া ও সুন্নী তথ্যসূত্রে কাউসার এর অর্থগুলোর মধ্যে অফুরন্ত কল্যাণ উল্লেখ করা হয়েছে এবং কিছু কিছু রেওয়ায়েত থেকে একই অর্থ দেয়া হয়েছে। আহলে সুন্নাতের অনেক মুফাসসির এ সম্পর্কে সহী বোখারীতে বর্ণিত রেওয়ায়েতকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে, সেগুলোতে ইবনে আব্বাস কাউসারের অর্থ হিসেবে অফুরন্ত কল্যাণ বলে উল্লেখ করেছেন, যা মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে (সাঃ) দান করেছেন।
অধিকাংশ মানুষ বেহেশতী ঝর্ণাকে কাউসার হিসেবে জানতেন, আবু বাশারের এই অভিমতের উত্তরে সাঈদ ইবনে জাবের বলেছেন,
النهر الذي في الجنة من الخير الذي أعطاه الله إياه
এ রেওয়ায়েতে কাউসার এর অর্থ করা হয় নি। বরং কাউসারকে পরিচয় করানো হয়েছে যে, কাউসার এমন কল্যাণ যা মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে (সাঃ) দান করেছেন। অতঃপর বেহেশতী ঝর্ণাকে এই কল্যাণসমূহের একটি বলেছেন। বুখারীর অপর একটি রেওয়ায়েতে হাউজ সম্পর্কে কাছির (অতিশয়) শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস বলেছেন,
الكوثر، الخير الكثير الذي أعطاه الله إياه
অতঃপর, পূর্বের রেওয়ায়েতের মতোই এ সম্পর্কে সাঈদ ইবনে জাবেরকে আবু বাশারের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি হয়েছে এবং তার উত্তরও পূর্বের মতোই এসেছে। প্রথম রেওয়ায়েতে কাউসার এর অর্থ হিসেবে কল্যাণ, আর দ্বিতীয় রেওয়ায়েতে অফুরন্ত কল্যাণ উল্লেখ করা হয়েছে যা মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে (সাঃ) দান করেছেন।
ইবনে আব্বাস কাউসারকে অফুরন্ত কল্যাণ অর্থে তাফসীর করেছেন। অনুরূপভাবে এই দু’টি রেওয়ায়েত থেকে এটা স্পষ্ট যে, তাবেঈনদের যুগে কাউসারের অর্থ হিসেবে বেহেশতী ঝর্ণা ছিল সেই সময়ের কিছু মানুষের চিন্তাগত একটি সম্ভাব্য বিষয়। এই বিশ্বাস বা আকিদা সেই সময়ের সকল মানুষের বিশ্বাস ও আকিদা ছিল না। বরং কতিপয় তাবেয়ীদের ধারণা ছিল এটা। এমনকি প্রশ্নকারী নিজেই (আবু বাশার) কাউসার এর অর্থ হিসেবে ঝর্ণাকে স্বীকার করেন নি।
যেমনিভাবে এই রেওয়ায়েত থেকে স্পষ্ট হয় যে, إن أناسا يزعمون أنه نهر في الجنة সাঈদ ইবনে জাবের আবু বাশার এর উত্তরে বলেছেন, বেহেশতী ঝর্ণা কল্যাণসমূহের একটি, কাউসার এর অর্থ নয়। এই বিষয়টি কাউসার এর অর্থ বুঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাঈদ ইবনে জাবের নিজেই ইজতিহাদ ও তাফসীরী বয়ান করেছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বেহেশতী ঝর্ণাকে কল্যাণসমূহের একটি বলেছেন। কিন্তু এই বক্তব্যটি মহানবীর (সাঃ) সাথে কোন সম্পর্ক রাখে না। এই রেওয়ায়েতে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, এই কথোপকথন দুইজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও তাবেয়ীদের মাঝে হয়েছে। একজন কাউসার এর অর্থ হিসেবে বেহেশতে ঝর্ণাকে কতিপয় এর সাথে সম্পৃক্ত করেছেন যে, তারা বিশ্বাস করতেন যে কাউসার একটি বেহেশতের ঝর্ণা। দ্বিতীয়জন সাঈদ ইবনে (আবু বাশার) এর জবাবে ইবনে আব্বাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন الخير الذي أعطاه الله إياه এই বাক্যটি হুবহু উল্লেখ করেছেন এবং ঝর্ণাকে কাউসার এর দলিল হিসেবে মনে করেন না। বরং, কল্যাণ এর অর্থ হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন।
এই রেওয়ায়েতটি শীয়া তাফসীরে ক্বিল (قیل) বা বাহাস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য শিয়া মুফাসসিরগণের একটি অংশ যেমন: আল্লামা তাবারসি, কাউসার সম্পর্কে অফুরন্ত কল্যাণ এর অর্থ গ্রহণ করেছেন। আহলে সুন্নাতের কিছু রেওয়ায়েতে কাউসারের অর্থ হিসেবে বেহেশতী ঝর্ণার এর জায়গায় অফুরন্ত কল্যাণ এর উপস্থিতি সম্পর্কে কথা এসেছে।এই রেওয়ায়েতে সূরা কাউসার এর নাজিলের স্থান হিসেবে মদিনাকে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, রেওয়ায়েতে মসজিদ বলতে মদিনার মসজিদে নববীকে বুঝানো হয়। সূরা কাউসার এর শানে নুযুল হিসেবে কতিপয় সাহাবীর উপস্থিতিতে মহানবীর (সাঃ) স্বপ্ন বা ঘুমকে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ কেউ এই রেওয়ায়েতকে সূরা কাউসার মাদানী হওয়ার দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই রেওয়ায়েতটি সামান্য শব্দগত পার্থক্য নিয়ে শীয়া সূত্রসমূহেও এসেছে। আনাসের এই রেওয়ায়েতের বিপরীতে আরেকটি রেওয়ায়েত আনাস থেকেই বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আহলে বাইত ও কাউসার এর মধ্যকার ঘনিষ্ঠতা ও সম্পৃক্ততার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া অতীব জরুরী যে, সূরা কাউসার মাক্কী সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত যা বে’সাতের (রাসূলের নবুয়্যত ঘোষণার) প্রথমদিকে নাযিল হয়েছে এবং সেই প্রথম সময়ে মহান আল্লাহ কতিপয় বিদ’আতীদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, যারা মহানবীর (সাঃ) ওফাতের অপেক্ষা করছিল। আর এ খবরটি ছিল পবিত্র কোরআনের মুজিযাসমূহের একটি।
আপাতত দৃষ্টিতে দেখা যায় যে, অফুরন্ত কল্যাণ অর্থটি কাউসার এর জন্য যুক্তিযুক্ত নয়। যদি কাউসার এর অর্থ হিসেবে অফুরন্ত কল্যাণ গ্রহণ করা হয়, তাহলে কাউসার এর প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট বা নির্দিষ্ট করা সম্ভবপর হবে না। বরং যা কিছু কল্যাণকর তাই কাউসার বলে বিবেচিত হবে। আর এটা সূরা কাউসারের শানে নুযুল এবং এ সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট সম্পর্কিত বর্ণিত রেওয়ায়েতের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই অভিমতটি গ্রহণ করা হলে (الکوثر) আল কাউসার শব্দের শুরুতে আলিফ ও লাম অক্ষরদ্বয়ের মাধ্যমে এ শব্দটি বিশেষ শ্রেণীর অর্থ বহন করবে। এমতাবস্থায় কাউসারের অর্থ হবে বেহেশতের ঝর্ণাসমূহের মধ্যে অন্যতম। অনুরূপভাবে নবুওয়াত, কোরআন, ইসলাম ও অন্যান্য সেই কল্যাণসমূহের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর এটা কাউসার এর প্রকৃত অর্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
সুরা কাউসারে উল্লেখিত আল-কাউসার (الکوثر) শব্দটি একটি বিশেষ ও নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। যেমন- রাজুল (رجل) শব্দটি অনির্দিষ্ট অর্থে ও সর্বসাধারণকে বুঝায়। কিন্তু আর-রাজুল (الرجل) শব্দটি একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন- হাযা আর-রাজুল (هذا الرجل)। অনুরূপভাবে আল-কাউসার এর অর্থ হবে হাযা আল-কাউসার (هذا الکوثر) এভাবে। আর তা হবে দুনিয়ার জীবন ও সকল কল্যাণের উৎস।
কাউসার ফাউয়াল (فوعل) এর স্থলে বিশালতার শান ও মানের অর্থ বহন করে। এমন নয় যে বিশালতার অর্থগুলোর প্রতি নির্দেশ করে। এই দুই বিষয়ে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। অফুরন্ত কল্যাণ অনেক অর্থ বহন করে। তবে শান ও মানের বিশালতা শুধুমাত্র একটি অর্থ বহন করে। কিন্তু সেই অর্থ অনেক অসাধারণ বিষয়ের ধারণ ক্ষমতা রাখে, যার অস্তিত্ব থেকে হাজারো কল্যাণ বিচ্ছুরিত হয়। আর এই অর্থ ও অস্তিত্ব কাউসার এর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কাউসার এর জন্য অফুরন্ত কল্যাণের অর্থটি সমস্যার নিরসন করে না। কারণ পবিত্র কুরআনে অফুরন্ত কল্যাণের কতিপয় অর্থ ও অস্তিত্ব সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। যেমন- হেকমাত শব্দটি অফুরন্ত কল্যাণের অর্থসমূহের একটি যা নবীদের ছাড়া অন্যদেরও সাথেও সম্পৃক্ত হয়েছে।
মহানবীকে (সাঃ) প্রেরণের উদ্দেশ্যই হলো হেকমাত বা প্রজ্ঞার শিক্ষাদান। আর তাই কাউসারকে অবশ্যই অফুরন্ত কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু হতে হবে। অন্যথায় সূরাতে মহান আল্লাহকর্তৃক নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শোকরানার নামাজ ও বিশেষ কুরবানী করার নির্দেশ অফুরন্ত কল্যাণের সাথে কোন সামঞ্জস্যতা রাখে না।
যদি কাউসার বলতে শুধু অফুরন্ত কল্যাণ হয়ে থাকে, তাহলে তাতে মহানবীর (সাঃ) বিশেষ বৈশিষ্ট্য কি? অথচ কোরআনে সাধারণ মু’মিনদেরকেও অফুরন্ত কল্যাণ দান সম্পর্কে অবগত করা হয়েছে। অনুরূপভাবে অবশ্যই এটা জানতে হবে যে, কাছির শব্দটি বহুবচন অর্থে নয়। বরং এ শব্দটি কোন কিছুর আধিক্যতা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। আর کثیر বা কাসির (আধিক্য) শব্দটি قلیل বা কালীল (স্বল্প) এর বিপরীত। এ বিষয়টির প্রতি অবশ্যই মনোযোগ রাখতে হবে যে, তাফসীরের ক্ষেত্রে কোন একটি কোরআনী শব্দের অর্থ উদঘাটন করার জন্য শুধুমাত্র উক্ত শব্দের শব্দগত অর্থ প্রকৃত মাপকাঠি নয়। যদিও কোন একটি শব্দ শাব্দিক দিক থেকে একাধিক অর্থ রাখতে পারে। তবে পবিত্র কোরআনে এগুলোর কোনটিই উদ্দেশ্য করা হয় নি।
উদাহরণস্বরূপ امت উম্মাত শব্দটি শাব্দিক দিক থেকে উদ্দেশ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে পবিত্র কুরআনে শব্দটির জন্য একাধিক অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: পথপ্রদর্শকগণ, জাতি, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, কাল, দ্বীন ইত্যাদি। এসব অর্থের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এটা যুক্তিযুক্ত হবে না যে, পবিত্র কুরআনের যেখানেই امت শব্দটি দেখবো শাব্দিক অর্থের দিক থেকে সেটাকে উদ্দেশ্য অর্থ হিসেবে মনে করব। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের একাধিক শব্দ রয়েছে। এরূপ ক্ষেত্রে কোন শব্দের প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করার জন্য উক্ত শব্দের সাথে সম্পৃক্ত ইশারা-ইঙ্গিতকেও বিচার-বিবেচনা করা জরুরী। এ মূলনীতিটি এ ধরনের সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর তাই আল-কাউসার শব্দটিও এই মূলনীতির ব্যতিক্রম নয়। আল-কাউসার শব্দটি একাধিক ইশারা-ইঙ্গিতের ভিত্তিতে হযরত ফাতিমাকে (আঃ) প্রকৃত অর্থ হিসেবে নির্দেশ করে।
আপাতত দৃষ্টিতে এমনটি মনে হয় যে, কাউসার এর অর্থ হিসেবে অফুরন্ত কল্যাণ সম্পর্কে কিছু কিছু শীয়া ও সুন্নি মুফাসসিরদের অভিমত সঠিক নয়। কারণ کثیر শব্দের একটি নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র অর্থ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে কোন জায়গাতেই کثیر শব্দটি আলিফ লাম (الکثیر) যোগে আসে নি। আর کوثر শব্দটি আলিফ লাম (الکوثر) যোগে এসেছে। সুতরাং, কাউসারকে کثیر বা কল্যাণ অর্থ গ্রহণ করার যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা কি? রেওয়ায়েত গুলোতে কিছু কিছু জায়গায় خیر বা কল্যাণ শব্দটি আলাদাভাবে এসেছে। এ দুটি শব্দ পৃথক পৃথকভাবে স্বতন্ত্র শব্দ এবং প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র অর্থ রয়েছে। خیر শব্দটি কোন অবস্থাতে کثیر শব্দ নয়। আবার کثیر শব্দের অর্থ خیر নয়। যদি আল-কাউসার (الکوثر ) অর্থ আল খাইরুল কাছির (الخیر الکثیر) হবে, তাহলে কেন (الکوثر) এর জায়গায় (الخیر الکثیر) ব্যবহার করা হয় নি? প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহর বাণী হেকমাত ও প্রজ্ঞাহীন নয়। কাউসার শব্দের উচ্চতা ও ধারণ ক্ষমতা خیر کثیر বা অফুরন্ত কল্যাণ এর চেয়ে অনেক বেশি।
চার- মহানবীর (সাঃ) সন্তানাদি
শীয়া মাযহাবের শীর্ষ মুফাসসিরগণ ঐকমত্যের সাথে বিশেষভাবে মহানবীর (সাঃ) সন্তানগণ তথা ফাতিমা যাহরা (আঃ) ও তাঁর এগারজন মাসুম সন্তানকে কাউসার এর প্রকৃত অর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও কতিপয় শীয়া মুফাসসির কাউসারের অর্থ হিসেবে অন্যান্য অর্থও উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে আহলে সুন্নাতের কতিপয় মুফাসসির কাউসারের অর্থ হিসেবে হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) ও তাঁর গর্ভজাত মহানবীর (সাঃ) বংশধারায় সন্তানদিগকে উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে কতিপয় হযরত ফাতিমা যাহারা (আঃ) কে কাউসারের অর্থগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এতে দুটি গোষ্ঠীর উদয় হয়েছে। একটি গোষ্ঠী সরাসরি বিবি ফাতিমা যাহরা (আঃ) এর নাম উল্লেখ করেছে। অন্য গোষ্ঠীটি মহানবীর (সাঃ) সন্তানগণ বা কন্যা সন্তান শব্দের উল্লেখকে যথেষ্ট মনে করেছে।
ফখরুদ্দীন রাযী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে সূরা কাউসারের তাফসীরে কাউসারের অর্থ হিসেবে মহানবীর (সাঃ) সন্তানগণকে উল্লেখ করেছেন। তিনি নাযিলের প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত রেওয়ায়েতকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর মতে, সূরা কাউসার তাদের বিরুদ্ধে নাজিল হয়েছে, যারা মহানবীর (সাঃ) সন্তানহীনতাকে একটি ত্রুটি হিসেবে দেখতো । সুতরাং, সূরা কাউসার এর অর্থ এই যে, মহান প্রভু তাঁর প্রিয় নবীকে (সাঃ) এমন সন্তান দান করবেন যার মাধ্যমে তাঁর বংশধারা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। দেখুন মহানবীর (সাঃ) বংশধর থেকে কতসংখ্যক শাহাদাত বরণ করেছেন! তারপরও পৃথিবী মহানবীর (সাঃ) সন্তানে পরিপূর্ণ এবং এক্ষেত্রে উমাইয়াদের বংশধারা মহানবীর (সাঃ) বংশের সাথে তুলনা যোগ্য নয়। দেখুন, কিভাবে মহানবীর (সাঃ) সন্তানদের থেকে যেমন; ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ:), ইমাম জাফর সাদেক (আঃ), ইমাম মুসা কাজেম (আ:), ইমাম আলী রেযা (আ:) ছাড়াও অন্যান্য মাসুম ইমামগণ ইসলামের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে অতুলনীয় ব্যক্তিবর্গ; যাদের প্রত্যেকেই ইসলামের আকাশে অত্যুজ্বল নক্ষত্রের ন্যায় দীপ্তমান।
কাউসারের অর্থসমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে নিজামুদ্দিন নিশাপুরী সরাসরি হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) এর নাম নিয়ে এসেছেন এবং তাঁকে মহানবীর (সাঃ) বংশের কেন্দ্রস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মহানবীর (সাঃ) বংশের ধারাবাহিকতা হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) থেকে বলেও স্বীকার করেছেন। দেওবন্দীরা হযরত ফাতিমা যাহরার (আ:) নাম নিয়ে আসে নি। তবে বিষয়বস্তুর দিক থেকে এ বিষয়ের প্রতি ইশারা করেছে। আবুল আলা মওদুদী স্বীয় তাফসীরে এ বিষয়ে লিখেছেন, “বরং একজন কন্যা সন্তান হযরত ফাতিমা যাহরার (আঃ) মাধ্যমে মহানবীর (সাঃ) বংশধারাকে বিদ্যমান রাখা হয়েছে, যারা পৃথিবীর সকল জায়গায় বিদ্যমান এবং তাদের সকল কৃতিত্ব হযরত ফাতিমা যাহরার (আঃ) সাথে সম্পৃক্ত।” খ্যাতনামা সুন্নী মুফাসসির মোহাম্মদ শাফিও নাযিলের প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত রেওয়ায়েতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, মহানবীর (সাঃ) বংশধারার বিদ্যমানতা হযরত ফাতিমা যাহরার (আঃ) মাধ্যমে বহাল রয়েছে। মাক্কী নাসেরী কাউসার সম্পর্কে আলে মোহাম্মাদ তথা মহানবীর (সাঃ) বংশধরকে ইঙ্গিতসূচকভাবে উল্লেখ করে এ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন। কাউসার এর অর্থ হিসেবে আহলে বাইতকে গ্রহণ করার পাশাপাশি হক্বের পথে আহলে বাইতকে কিয়ামত অবধি বিরাজমান থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
কাসেমী কাউসারকে আধিক্য অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং এ আধিক্য বলতে হযরত ফাতিমা যাহরার (আঃ) বংশধারার আধিক্যকে বুঝিয়েছেন। শানক্বিতী কাউসারের অনেক অর্থ বর্ণনার এক পর্যায়ে আবতার (ابتر) নির্বংশ শব্দটির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার পর এই সত্যের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে উল্লেখ করেছেন- এখানে আল্লাহ রাসূলকে (সা.) স্বীয় কন্যা ফাতিমা যাহরার (আ.) মাধ্যমে তার বংশধারার ধারাবাহিকতার সুসংবাদ দিয়েছেন। এছাড়াও আহলে সুন্নাতের অন্যান্য তাফসীরে যেমন; আল-বাহরুল মাদীদ, তাফসিরে বায়যাভী, তাইসিরুত তাফসির, হাশিয়াতুল ক্বানাভী, তাফসিরে আবি সাউদ, রুহুল মায়ানী কাউসারের অর্থ হিসেবে মহানবীর (সাঃ) সন্তানগণকে উল্লেখ করেছে। উল্লেখিত সুন্নী মনীষীবর্গের প্রতিটি তাফসীরে কাউসারের অর্থ হিসেবে হযরত ফাতিমা যাহরাকে (আঃ) ও তার সন্তানাদিকে স্বীকার করেছেন। এদিক থেকে বুঝা যায় যে, উপরোক্ত অভিমত ও ব্যাখ্যা কাউসারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও যৌক্তিক তাফসির হিসেবে বিবেচিত। আয়াতের ভাবধারা, সূরা কাউসার নাযিলের প্রেক্ষাপট ও শানে নুযুল এবং এ সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহও বিশেষ গুরুত্বের সাথে উপরোক্ত অভিমতকেই সমর্থন করে।
খ্যাতনামা মুফাসসির আল্লামা তাবাতাবায়ি এ সূরার তাফসীরে উল্লেখ করেন, যদি সন্তানাদি কিংবা বংশধারার বিষয়টি প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বর্ণিত না হত, তাহলে
اًّنَّ شانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ
(নিশ্চয় তোমার শত্রুরাই নির্বংশ। ) এ আয়াতে اًّنَّ বা নিশ্চয় শব্দটি উল্লেখের কোন প্রয়োজনই ছিল না। কেননা নিশ্চয় শব্দটি কোন বিষয়ের নিশ্চয়তা দানের পাশাপাশি সেটির কারণ ও প্রতিশ্রুতির প্রতিও ইঙ্গিত দেয়া হয়। সুতরাং এহেন উক্তির কোন অর্থই রাখে না যে, বলা হবে- আমি তোমাকে হাউজে কাউসার দান করেছি, কেননা তোমার বিরোধীরা নির্বংশ।
ইবনে আবিল হাদিদ মুতাযেলী ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন; যার মাধ্যমে কাউসার সম্পর্কে উপস্থাপিত অনেক অভিমতের যথাযথ জবাব দেওয়া সম্ভব। কারণ ইমাম আলী ইবনে আবী তালিব (আঃ) ছিলেন সুরা কাউসার নাজিলের প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি আমর ইবনে আসকে তার পত্রের জবাবে (কেন তিনি নিজের ঔরসজাত ইমাম হাসান ও হুসাইনকে মহানবীর (সাঃ) সন্তান মনে করতেন) বলেছেন, যদি এই দু’জন মহানবীর (সাঃ) সন্তান না হয়, তাহলে মহানবী (সাঃ) আবতার বা নির্বংশ হবেন, যা তোমার বাবা মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে ভাবতো। এই রেওয়ায়েতটি যে বিষয়টি প্রমাণ করে তা হলো, যে ব্যক্তি মহানবীকে (সাঃ) আবতার বা নির্বংশ বলতো সে ছিল আমর ইবনে আসের পিতা। সে প্রতিনিয়ত মহানবীকে (সাঃ) এভাবে কষ্ট দিতো। এমন অপবাদ আরোপ প্রমাণ করে যে, মহানবীর (সাঃ) বংশের সাথে এই বংশের শত্রুতা শুধু তাঁর সন্তানদের সাথে শত্রুতা দ্বারাই শেষ হবে না। বরং প্রত্যেক যুগেই এদের উত্থান হবে। মহান আল্লাহ ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের (আ:) মাধ্যমে তাঁর প্রিয় নবীকে (সাঃ) আবতার বা সন্তানহীনতার অপমান থেকে মুক্ত করেছেন। অর্থাৎ যদি ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (আ:) না থাকতেন, তাহলে মহানবী (সাঃ) নিঃসন্তান হতেন। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, কাউসার হচ্ছে আহলে বাইতের তথা হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) ও তাঁর নিষ্পাপ সন্তানগণ। মহানবীর (সাঃ) বংশধারা হযরত আলী ইবনে আবি তালিব ও হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) এর ঔরসে অব্যাহত রয়েছে। মহানবী (সাঃ) নিজেও সরাসরি স্পষ্টভাবে হযরত ফাতিমা যাহরার (আঃ) সন্তানদের বাবা ভাবতেন। যেমনভাবে ঐতিহাসিক মুবাহেলার ঘটনায় তিনি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনকে (আ:) স্বীয় সন্তানদ্বয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
এখানে বিশেষ গুরুত্বের বিষয় হচ্ছে যে, কোরআন একটি পথ নির্দেশক গ্রন্থ এবং এ আসমানি কিতাবে এমন কোন সূরা বা আয়াত নেই যা সরল পথ নির্দেশক নয় কিংবা বিশেষ বার্তা বহন করে না। সেই সাথে প্রতিটি আয়াত ও সূরা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে অনুসরণ করে। সুরা কাউসার নাযিলের প্রেক্ষাপট হিসেবে মহানবীর (সাঃ) সন্তানদের মৃত্যু নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মহানবীর (সাঃ) সন্তানদের মৃত্যুর সাথে হেদায়াতের সম্পর্ক কি? পূর্ববর্তী নবীগণও (আ:) তাঁদের পুত্র সন্তান হারিয়েছেন। কিন্তু মহান আল্লাহ সে ব্যাপারে কোন আয়াত বা সূরা নাযিল করেন নি।
প্রকৃত বিষয় হলো- কাফেররা মহানবীর (সাঃ) সন্তানহীনতাকে বাহানা হিসেবে ব্যবহার করে তার রিসালাতের দায়িত্বের ক্ষেত্রে তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করার অপচেষ্টা করতো। আর কাফিররা এটা ভেবে খুশি হতো যে, মহানবীর (সাঃ) ওফাতের পর তাঁর দ্বীন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ তাঁর পর তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কেউ নেই। মহান আল্লাহ তাদের জবাবে বলেন নি যে, আমি আমার নবীকে (সাঃ) পুত্র সন্তান দান করেছি। বরং বলেছেন, আমি আমার নবীকে (সাঃ) আল-কাউসার দান করেছি যা কিয়ামত পর্যন্ত আমার দ্বীনের যিম্মাদার হবে। সেই সাথে এ কন্যা সন্তানের মাধ্যমে বংশ পরম্পরা নীতিকে পরিবর্তন করেছেন। অতঃপর মহানবীর (সাঃ) বংশের বাতি হিসেবে পুত্র সন্তানের স্থলে হযরত ফাতিমা যাহরাকে (আঃ) প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সুতরাং দুনিয়াতে কাউসারের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) এবং তাঁর গর্ভজাত মাসুম ইমামগণ (আ:)। আবার কেউ কেউ এই বিষয়কে অনেক বিস্তৃত করেছেন। তারা মহানবীর (সাঃ) বংশধারায় সকল সন্তানদিকে বুঝিয়েছেন। তবে পবিত্র কোরআন, হাদীস ও মানবিক দৃষ্টিতে এহের অভিমত বা ধারণা মোটেও সঠিক নয়। কারণ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অনেক সাইয়্যেদ নানাবিধ অন্যায় ও অবৈধ কাজে জড়িত হয়েছেন। এমনকি আজকের যুগে হিংস্র হায়েনার মতো কাজ করা দায়েশরা তথা আইএসের অনেক সদস্য নিজেদেরকে সাইয়্যেদ বলে দাবি করে। এটা কি করে সম্ভব যে, এহেন হিংস্রতা ও মানবাধিকার লংঘন করেও তারা কাউসার এর অর্থ, উপমা বা দৃষ্টান্ত হবে! আর এ জন্যই মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে হযরত নূহের (আঃ) ছেলের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। হযরত নূহের (আঃ) ছেলে ঈমান না আনার কারণে তাঁর বংশধারা থেকে বের হয়ে গেছে। তার সাথে হযরত নূহ (আ:) নবীর নবুয়্যাত ও রেসালতের কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ তাকে হযরত নূহের (আ:) সন্তানদের পুত্রত্ব হতে আলাদা করেন নি। বরং তাঁর বংশধর (اهل) থেকে বের করে দিয়েছেন। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক বহাল থাকলেও ঈমানি, আদর্শগত ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে কোন সম্পর্ক নেই। মানুষ রক্তের সম্পর্কের মাধ্যমে নাজাত বা মুক্তি লাভ করে না। বরং ঈমানী সম্পর্কের মাধ্যমে নাজাত বা মুক্তি লাভ করে এবং সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হয়।
মহানবীর (সাঃ) সাথে মানুষের ঈমানী সম্পর্ক যতই মজবুত ও গভীর হবে, ততই তারা মহানবীর (সাঃ) সাথে সান্নিধ্য লাভ করবে এবং তার নৈকট্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। হযরত ফাতিমা যাহরার (আঃ) দাসী ফিজ্জার মতো মর্যাদা দ্বিতীয় কেউ অর্জন করতে পারে নি। হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) গভীর আধ্যাত্মিকতা অর্জনের মাধ্যমে মহানবীর (সাঃ) আহলে বাইত পর্যন্ত পৌঁছে ছিলেন। অনুরূপভাবে কাউসার দ্বারা মহানবীর (সাঃ) সন্তান বলতে তাদেরকেই বুঝান হয়েছে যারা তাঁর সাথে রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও ঈমান ও আকিদাগত দিক থেকেও মজবুত ও সুদৃঢ় সম্পর্ক রাখবে, যে সন্তানরা ইমামতের নেতৃত্ব দিবে এবং রিসালাতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে অব্যাহত রাখবে। মহান আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতের নেতৃত্বকে মহানবীর (সাঃ) বংশধরের উপর সোপর্দ করেছেন। আর তা হচ্ছে একজন কন্যা সন্তানের মাধ্যমে। মেরাজ সফরের কারণগুলোর অন্যতম একটি হলো মহানবীকে (সাঃ) এমন একজন কন্যা সন্তান দান করা।
কাউসারের আরও কিছু অর্থ
সুন্নী মাযহাবের তাফসিরগুলোতে উপরোক্ত অর্থগুলো ছাড়াও কাউসারের আরো কিছু অর্থ বর্ণিত হয়েছে; যেমন: তাওহীদ, নবুয়্যাত ও কোরআন, সাহাবীদের আধিক্যতা, ওহী, ইলম, নামাজ, কালিমা, শরীয়তের সরলতা, কুরবানী, ইসলাম, মুজিজাসমূহ, আলেমগণ, মাকামে মাহমুদ, দাওয়াত কবুল, মহৎ কাজসমূহ ইত্যাদি। এসব অভিমতগুলোর মধ্যে কোনটিও মহানবী (সাঃ) পবিত্র আহলে বাইতের মাসুম ইমামগণ (আ.) এমনকি একজন সাহাবীর বর্ণনা কিংবা মতামতের সাথে মোটেও সম্পৃক্ত নয়। বরং এহেন অভিমতগুলো ব্যক্তি গবেষণা ও কল্পনাপ্রসূত, কাজেই সেগুলোর কোন বৈধতা নেই।
অনুরূপভাবে এগুলো কাউসারের তাফসিরের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখে না এবং সূরা কাউসারের শানে নুযুল ও এ প্রেক্ষিতে বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহের সাথে আদৌ কোন ধরনের অসামঞ্জস্যতা খুজে পাওয়া যায় না। এটা কিভাবে সম্ভব যে, ইসলামের শত্রুরা মহানবীকে (সাঃ) আবতার বা নির্বংশ বলে সম্বোধন করবে, আর আল্লাহ তাদের এহেন ধৃষ্টতার জবাবে বলবেন, আমি আপনাকে নবুয়্যাত, কোরআন, মুজিযা, দ্বীনী জ্ঞান, ইসলাম বা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ দিয়েছি!!! এ দু’টি বিষয়ের মধ্যে আদৌ কোন সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা নেই।
অবশ্যই আবতার (ابتر) ও কাউসার (کوثر) এ দুটি বিষয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামঞ্জস্যতা থাকতে হবে। কিন্তু এ কাংখিত সম্পর্ক উপরোক্ত অভিমতগুলোর মাঝে দেখা যায় না। শুধু তাই নয়, বরং এ অভিমতগুলো সূরা কাউসারের শানে নুযুলের সাথে সম্পর্কহীন এবং শানে নুযুল সম্পর্কে বর্ণিত রেওয়ায়েতগুলোরও বিপরীত। আল্লাহ মহানবীকে (সাঃ) কাউসারের বিশেষত্ব সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন এবং দ্বিতীয় কেউ এ বিষয়ে মহানবীর (সাঃ) সাথে অংশীদারিত্ব রাখে না। কিন্তু উপরোক্ত অর্থগুলোর (কাউসারের অন্যান্য উপমাগুলো) অনেক কিছুই মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলদের মধ্যে অন্যান্যদেরকেও দিয়েছেন। সুতরাং, অনুরূপ কিছু দেওয়াতে মহানবীর (সাঃ) জন্য বিশেষ কোন কৃতিত্ব ও বৈশিষ্ট্য নেই। বরং কাউসার সম্পর্কে এহেন ব্যাখ্যা ও তাফসির হলো সম্পূর্ণ নিজস্ব গবেষণামূলক তাফসীর। আর ইসলামের দৃষ্টিতে যদি কেউ সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই কোরআনের আয়াতের মনগড়া তাফসীর করে, তাহলে সেও বিপথগামী ও জাহান্নামী।
নি:সন্দেহে এ ধরনের তাফসির পবিত্র কোরআনের বাণীকে হালকাভাবে নেয়ার দোষে দুষ্ট। আর এমনটি মুসলিম সমাজের জন্য মারাত্মক অশনি সংকেত হিসেবে বিবেচিত। বানোয়াট ও মনগড়া দলিল উপস্থাপন, রূপক অর্থ তৈরি, জাল হাদীস ও রেওয়ায়েত বর্ণনা এবং কাল্পনিক কেচ্ছা-কাহিনী তুলে ধরার মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের আয়াত বা সূরার মনগড়া কথিত তাফসীর; একদিকে এ আসমানি কিতাবের প্রতি চরম অবমাননা এবং অপরদিকে কোরআনের সুউচ্চ বাণী ও মর্মার্থকে হালকাভাবে নেয়ার শামিল। আর এ বিষয়টি সূরা কাউসারের তাফসীরের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়।
উপসংহার
সূরা কাউসার নাযিলের পরিবেশ, নাযিলের প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত রেওয়ায়েত, আয়াতের ভাবধারা এবং আমর ইবনে আসের জবাবে ইমাম আলী ইবনে আবী তালিব (আঃ) থেকে বর্ণিত তাফসীরী রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে বলা যায় যে, কাউসার বলতে নবীনন্দিনী হযরত ফাতিমা যাহরাকে (আঃ) বুঝান হয়েছে এবং তারই পবিত্র সত্বা ও অস্তিত্বই হচ্ছে আল কাউসার। যিনি ছিলেন হেদায়েতের মধ্যমণি ও এগার জন মাসুম ইমাম ও মহানবীর (সাঃ) স্থলাভিষিক্তদের সম্মানীতা জননী। আর এ যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর তাফসীর গ্রহণ করলে কাউসারের শাব্দিক তথা আভিধানিক অর্থ সঠিক থাকবে। তবে অন্যান্য অর্থ যেমন; বেহেশতের ঝর্ণা ও হাউজ যা শুধুমাত্র পরকালীন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত ও পরকালীন অর্থ গ্রহণ করে থাকে, তা আয়াতের প্রকৃত তাফসির ও কাউসারের প্রকৃত ও সামগ্রিক অর্থ প্রকাশ পায় না। অপর দিকে অফুরন্ত কল্যাণের অর্থটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবীর (সাঃ) প্রতি দানকৃত কাউসারের বিশেষত্বের সাথে বৈপরিত্য সৃষ্টি করে এবং তা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যান্য অর্থও আয়াতের তাফসীরের সাথে সম্পর্ক রাখে না এবং আয়াতের মূল ভাবধারা, নাযিলের প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত রেওয়ায়েত এবং হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপণে কোরআনকে মানদন্ড হিসেবে গ্রহণের নিয়মের সাথে কোনরূপ সম্পৃক্ততা রাখে না ও পরস্পর বিরোধী।
সূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
- ১- আল কোরআন
- ২- ইবনে আবিল হাদীদ প্রণীত শারহে নাহজুল বালাগা, আয়াতুল্লাহ মারআশি নাজাফী লাইব্রেরী প্রকাশনী, কোম ইরান।
- ৩- ইবনে আবি হাতাম প্রণীত তাফসীরুল কোরআনুল কারীম, মাকতাবাতুল আসরিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৪- আহমাদ ইবনে আজিবাহ প্রণীত আল বাহরুল মাদীদ ফী তাফসীরুল কোরআনুল মাজীদ, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৫- আবু হাইয়ান আন্দলুসী প্রণীত আল বাহরুল মুহিত, দারুল কুতুবুল ইলমী প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৬- আহমাদ বিন হাম্বল আবু আব্দুল্লাহ প্রণীত ফাজায়েলুস সাহাবাহ, মোয়াসসেসেহ রেসালাহ প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৭- মাহমুদ আলুসী প্রণীত রুহুল মায়ানী ফী তাফসীরুল কোরআনুল আজীম, ইনতেশারাতে জাহান প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ৮- বাহরানী প্রণীত আল বোরহানুল ফী তাফসীরুল কোরআন, মোয়াসসেসে আল আলামী লিল মাতাবুয়াত প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৯- ইসমাইল বোখারী প্রণীত সহীহ আল বোখারী, দার ইবনে কাসীর প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১০- ইসমাঈল হাক্কী প্রণীত তাফসীরুল রুহুল মায়ানী, দারুল তুরাস আল আরাবী প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১১- আলাউদ্দীন আলী বিন মুহাম্মাদ বাগদাদী প্রণীত আল বাবুল তাবীল ফী মায়ানিত তানজীল, দারুল কুতুবুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১২- নাসেরুদ্দীন বেইজাভী প্রণীত তাফসীরুল বেইজাভী, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১৩- ইবরাহীম বোকায়ী প্রণীত নাজমুত্ দোউর, দারুল কুতুবুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১৪- আব্দে আলী বিন জুমআ আরুসী হোয়াইজি প্রণীত তাফসীরে নুরুল সাকালাইন, ইনতেশারাতে ইসমালিয়ান প্রকাশনী, কোম ইরান।
- ১৫- ইসমাঈল ইবনে কাসীর দামেশকি প্রণীত তাফসীরুল কোরআনুল আজীম, দারুল মায়ারেফাহ প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১৬- মাহমুদ হাসান দেউবন্দী প্রণীত তাফসীরে কাবলী, নাশরে এহসান প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ১৭- ফাখরুদ্দীন রাজী প্রণীত তাফসীরুল কাবীর, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১৮- মাহমুদ জামাখশারী প্রণীত আল কাশশাফ আন হাকায়েকু গাওমাযুত তানযীল, দারুল মায়ারেফাহ প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ১৯- ইবরাহীম সামারকান্দি প্রণীত তাফসীরে সামারকান্দি, দারুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ২০- জালালুদ্দীন সিয়ুতি প্রণীত তাফসীরে দুররুল মানসুর, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ২১- মুহাম্মাদ সাফী প্রণীত তাফসীরে মায়ারেফুল কোরআন, এদারেহ আল মায়ারেফ প্রকাশনী, করাচি, পাকিস্তান।
- ২২- মুহাম্মাদ আমীন শানকাইতি প্রণীত আজ’য়া আল বায়ান ফী ইজাহুল কোরআন বিল কোরআন, দারুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ২৩- শেখ সাদুক মুহাম্মাদ বিন আলী বিন বাবুয়ে কুম্মী প্রণীত আল খেসাল, জামেআ মুদার্রেসীন কর্তৃক প্রকাশিত, কোম, ইরান।
- ২৪- মুহাম্মাদ হুসাইন তাবাতাবায়ী প্রণীত তাফসীরে আল মিযান, দপ্তারে ইনতেশারাতে ইসলামী প্রকাশনী, কোম ইরান।
- ২৫- ফাজল বিন হাসান তাবারসী প্রণীত তাফসীরে জামেউল জামে, তেহরান ভার্সিটির প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ২৬- ফাজল বিন হাসান তাবারসী প্রণীত আল বায়ান ফী তাফসিরুল কোরআন, ইনতেশারাতে নাসের খসরু প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ২৭- ইবনে জারীর তাবারী প্রণীত জামেউল বায়ান, দারুল ফিকর প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ২৮- ফাখরুদ্দীন তুরাইহী প্রণীত মাজমাউল বাহরাইন, মুরতাজাভী প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ২৯- মুহাম্মাদ বিন হাসান তুসী প্রণীত আত তীবইয়ান ফী তাফসীরুল কোরআন, দার আহইয়াউর তুরাস প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৩০- মোল্লা মোহসেন ফাইজে কাশানী প্রণীত তাফসীরে সাফী, ইনতেশারাতে সাদর প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ৩১- মুহাম্মাদ তাহেরুল কাদেরী প্রণীত মায়ারেফুল কাউসার, মিনহাজুল কোরআন পাবলিকেশন্স, লাহোর, পাকিস্তান।
- ৩২- মুহাম্মাদ জামালুদ্দীন কাসেমী প্রণীত তাফসীরুল কাসেমী, দারুল কুতুবুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৩৩- আহমাদ কুরতুবী প্রণীত আল জামে ফী আহকামুল কোরআন, দার আহইয়াউর তুরাস প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৩৪- আলী ইবনে ইবরাহীম কুম্মী প্রণীত তাফসীরে কুম্মী, দারুল কিতাব প্রকাশনী, কোম, ইরান।
- ৩৫- মুহাম্মাদ বাকের মজলিসি প্রণীত বিহারুল আনওয়ার, দারুল ওফা প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৩৬- হাসান মুস্তাফাভী প্রণীত আত তাহকিক ফী কালামাতুল কোরআনুল কারীম, তরজমা ও নাশরে কিতাব প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ৩৭- নাসের মাকারেম শিরাজী প্রণীত তাফসীরে নমুনা, দারুল কুতুবুল ইসলামীয়্যাহ প্রকাশনী, তেহরান, ইরান।
- ৩৮- মুহাম্মাদ মাক্কী নাসেরী প্রণীত আত তাইসীর ফী আহাদীসিত তাফসীর, দারুল আগরাবুল ইসলামী প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৩৯- নিজামুদ্দীন নিশাপুরী প্রণীত গারায়েবুল কোরআন, দারুল কুতুবুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৪০- আবুল আলা মওদুদী প্রণীত তাফহীমুল কোরআন, তারজুমানুল কোরআন প্রকাশনী, লাহোর, পাকিস্তান।
- ৪১- নিজামুদ্দীন নিশাপুরী প্রণীত গারিবুল কোরআন, দারুল কুতুবুল ইলমিয়া প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।
- ৪২- আবিল হাসান আলী ওয়াহেদী প্রণীত আস-বাবুল নুযুল, দারুস সাকাফাতুল ইসলামীয়্যাহ প্রকাশনী, রিয়াদ, সৌদি আরব।
- ৪৩- নুরুদ্দীন মিসামী প্রণীত মাজমাউল জাওয়েদ ওয়া মানবাউল ফাউয়ায়েদ, দারুল কুতুবুল আরাবী প্রকাশনী, বৈরুত, লেবানন।###