পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ঘটনার আলোকে ঈমান

লেখকঃ মাওলানা শহিদুল হক

আয়াতসমূহ

১- উত্তম পুরস্কারঃ

“যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ এবং মনোরম প্রত্যাবর্তনস্থল।” (সূরা রা’দঃ ২৯)

২- ঈমানের উপকারিতাঃ

“আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং পরহেযগারী অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানী ও পার্থিব নেয়ামতসমূহ উম্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের বদলাতে।” (সূরা আল-আ’রাফঃ ৯৬)

৩- সৃষ্টির সেরাঃ

“যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির সেরা।” (সূরা বাইয়্যিনাহঃ ৭)

৪- আল্লাহ সৃষ্টিকুলের বন্ধুঃ

“যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালবাসা দেবেন।” (সূরা মারইয়ামঃ ৯৬)

৫- সবচেয়ে সফলকাম ব্যক্তিরাঃ

“মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-ন¤্র; যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত, যারা যাকাত দান করে থাকে” (সূরা আল-মু’মিনূনঃ ১-৪)

হাদীসসমূহঃ

১- কর্মবিহীন ঈমান কবুল হয় নাঃ

হযরত মুহাম্মাদ (স.) বলেছেনঃ “কর্মবিহীন ঈমান ও ঈমানবিহীন কর্ম কবুল হয় না।” (কানযুল আম্মাল, খন্ড ১, পৃ. ৬৮)

২- একনিষ্ঠতাঃ

হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ “ঈমান কর্মকে বিশুদ্ধ করে।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১১৬)

৩- ঈমানদার ব্যক্তিকে কেউ ক্ষতি করতে পারে নাঃ

ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেনঃ “ঈমানের সাথে কোন কর্ম করলে ক্ষতিগ্রস্থ হয় না এবং কুফূরের সাথে কোন কর্ম করলে উপকারে আসে না।” (কিতাবুশ শাফি, খন্ড ৫, পৃ. ৭৮)

৪- মুক্তিঃ

হযরত আলী (আ.) বলেছেন ঃ “ঈমানের সাথে মুক্তির সম্পর্ক।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃ. ১১৭)

৫- বেহেশতের পথঃ

মাওলায়ে মুত্তাকিয়ান হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (আ.) বলেছেনঃ “তোমার ওপর অপরিহার্য যে ঈমানকে বিশুদ্ধ কর কারণ ইহা বেহেশতের পথ ও দোযখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পদ্ধতি।” (গুরারুল হিকাম, খন্ড ১, পৃৃ. ১২০)

বিশ্লেষণঃ

ঈমানের মূল উদ্দেশ্য হল মানুষ অন্তরের অন্তস্থল থেকে সত্যকে স্বীকার করে নেয়া, যখন স্বীকার করে নেবে তখন ঈমানের দাবিসমূহের উপর আমল করা অপরিহার্য্য হয়ে যাবে। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত ঈমানের দাবী, যাহা ব্যতীত ঈমান স্বীকার করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে সৎকর্ম হচ্ছে ঈমানের দাবী। ঈমান এবং আমলে সালেহের প্রভাব শুধুমাত্র পরকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেটি ইহকালেও প্রকাশ পেয়ে থাকে তবে সেটি বস্তুজগতের কোন ফলাফল নয়। বস্তুগত সরঞ্জামগুলি শুধুমাত্র পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে কাজ করে থাকে, এবং যমিন ও আসমানের কুদরাতের সরঞ্জামগুলির বরকতসমূহকে সরবারহ করতে থাকে। মহান আল্লাহ ঈমানদার ব্যক্তিকে কারোর মুখাপেক্ষি হতে দেন না আর না তার দুনিয়ার অবস্থার সাথে অন্য কোন দুনিয়ার অবস্থার সাথে তুলনা করা যায়। ঈমানদার ব্যক্তির সাহায্যকারী হচ্ছেন শুধুমাত্র আল্লাহ। ঈমানদারগণ স্রষ্টা ও সৃষ্টির উভয়ের প্রিয়পাত্র। ঈমান যত মজবুত হবে আমল ততো দৃঢ় হবে। যদি আমলে দুর্বলতা প্রকাশ পায় তাহলে বুঝে নিতে হবে তার ঈমানে দুর্বলতা রয়েছে।

আল্লাহর কাছে দোয়া করি ইমামুল মুত্তাকিন আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (আ.)-এর অসিলায় আমাদের সবার ঈমানকে দিনের পর দিন বৃদ্ধি করেন। (আমিন)

ঘটনাবলীঃ
১- হযরত আবুযার গিফারী (রা.)-এর ঈমানের মহত্তঃ

কথিত আছে একদিন হযরত আবুযার গিফারী (রা.) রাসূল করীম (স.) এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। সালাম করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স.) আমি জঙ্গলে আমার ভেড়া চরাচ্ছিলাম এবং যখন নামাযের সময় হল তখন নামায পড়া শুরু করলাম। তখন একটি নেকড়ে বাঘ এসে একটি ভেড়া তুলে নিল, হঠাৎ একটি সিংহ এসে ঐ নেকড়ে বাঘের ওপর হামলা করল এবং ঐ ভেড়াটিকে ছাড়িয়ে এনে আমার ভেড়াগুলোকে পাহারা দিতে লাগল। যখন আমি নামায সমাপ্ত করলাম তখন সিংহ আমাকে বলল, হে আবুযার (রা.) এখন যাও ও আল্লাহর রাসূল (স.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে আস। আমি তোমার ভেড়াগুলোকে রক্ষা করব। আল্লাহর রাসূল (স.) মুচকি হেসে বললেন, হে আবুযার (রা.) এসবই তোমার ঈমানের বদৌলতে হয়েছে।

এছাড়া রেওয়ায়েতে উল্লেথ রয়েছে যে, বিশজন মুনাফিক বলেছিল আবুযার আমাদের সামনে নিজের বড়াই করে থাকে, চল আজ জঙ্গলে গিয়ে আবুযারের ভেড়াগুলো চরাবো। যখন এই মুনাফিকরা জঙ্গলে পৌঁছাল তখন দেখল যে আবুযারের ভেড়াগুলো একটি সিংহ চরাচ্ছে, যখন ভেড়ারপাল থেকে একটি ভেড়া পৃথক হয়ে যাচ্ছিল তখন সিংহ ডাক দিয়ে ভেড়াকে ভেড়ারপালের মধ্যে নিয়ে আসছিল। মুনাফিকদের দেখে সিংহ আল্লাহর কুদরতে বলে উঠল, হে মুনাফিকদের দল! এটা আবুযার (রা.)-এর ঈমান ও প্রজ্ঞার মহাত্ত যে আমি তাঁর পশুদের চরাচ্ছি। জেনে রাখ! যদি আবুযার (রা.) আমাকে নির্দেশ দেয় যে মুনাফিকদের পাকড়াও করতে, আল্লাহর কসম! এক মুহুর্তে সবাইকে ঐভাবেই গিলে ফেলব যেভাবে মুসা (আ.)-এর যুগে যাদুকরদের তৈরী সিংহদেরকে মুসা (আ.)-এর বিশাল অজগারটি গিলে ফেলেছিল। (মাজালিসে বনি হাশিম, পৃ. ৯৭)

২- ঈমানের নূরে নূরান্বীত অন্তরঃ

ঈসহাক বিন আম্মার থেকে বর্ণীত, হযরত আবু আব্দুল্লাহ (রা.) বলেছেনঃ আল্লাহর রাসূল (স.) লোকজনের সাথে ফজরের নামায আদায় করছিলেন, তিনি (স.) সিজদারত অবস্থায় এক যুবককে দেখলেন সে তার মাথা এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে, তার মুখের রঙ হলুদ, শরীর দুর্বল ও ক্ষীণ, চোখ গর্তের মধ্যে ডুবে আছে।

হযরত (স.) নামাযের পর বললেন, হে বৎস তোমার এ কি অবস্থা? সে বলল, আমি বিশ্বাসের ওপর রয়েছি।

রাসূল করীম (স.) তার কথা শুনে বিস্মিত হলেন এবং বললেন, বিশ্বাসের একটি সত্যতা থাকে তোমার বিশ্বাসের সত্যতা কি?
সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! ঐ বিষয় যা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, রাতগুলোতে জাগ্রত রেখেছে, দিনের কঠিন গরমে পিপাসার্ত করেছে, সেটা পরকালের কষ্ট। বলা যায় আল্লাহর আরস আমার চোখের সামনে আর আমি হিসেবের অবস্থায় আছি, লোকজনের পুনরুত্থান হচ্ছে। আমিও এর মধ্যে এবং বলা যায় আমি যেন বেহেশতবাসীদেরকে দেখছি তারা বেহেশতের নেয়ামত উপভোগ করছে এবং বিছানায় হেলান দিয়ে পরস্পরের সাথে পরিচিত হচ্ছে। বলা যায় দোযখবাসীদেরকে দেখছি তারা আল্লাহর আযাবে নিমজ্জিত হয়ে চিৎকার করছে। বলা যায় আমি এখন দোযখবাসীর চিৎকার শুনছি আর ঐ চিৎকার আমার কানে বাজছে।

আল্লাহর রাসূল (স.) তাঁর সাহাবিদেরকে বললেন, এ হল সেই বান্দা যার অন্তরকে আল্লাহ তায়ালা ঈমানী নূরে নূরন্বিত করেছেন। হযরত (স.) তাকে বললেন, তুমি তোমার অবস্থার ওপর অটল থাক।

সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.) আপনি দোয়া করুন যেন আল্লাহ তায়ালা আমাকে শাহাদাতের মর্যাদায় উত্তীর্ণ করেন। হযরত (স.) দোয়া করলেন, পরে সে একটি যুদ্ধে নব্বই জন শহীদের পর একশ নম্বরে শহীদ হন। (কিতাবুশ শাফী, খন্ড ৩, পৃ. ৩১৮)####

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More