সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা আসর বর্ণিত হয়েছে,
“কালের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে (নিমজ্জিত) আছে। । সূরা আসর : ১ ও ২
আর এ অবস্থাই হচ্ছে মানুষের জন্য ‘বেদনাদায়ক শাস্তি’। অর্থাৎ অনেক মুফাসসিরের মতে ‘বেদনাদায়ক শাস্তি’ বলতে সূরা আসরে উল্লেখিত ক্ষতিকেই বুঝান হয়েছে। বস্তুত মানুষের জন্য এমনটি ‘ক্ষতি’ হিসেবে গণ্য যে, যদি সে নিজের শরীর ও আত্মা -যা তার সবচেয়ে বড় পুঁজি হিসেবে বিবেচিত- থেকে কোন সুফল না পায়। এমনকি সে নিজেও ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়; যেমনভাবে বরফ গলে পানিতে পরিণত হয়। আল্লামা ফাখরে রাজী (রহ.) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে সূরা আসরের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন- আমি ‘ক্ষতি’র প্রকৃত অর্থ অমুক শহরে থাকাকালে ভালভাবে অনুধাবন করেছি। একদা আমি সেখানে দেখলাম যে, জনৈক ব্যক্তি বাজারের এক কোনায় এক খণ্ড বরফ -যা মানুষ গরমের সময় নিজেদের পানীয় কিংবা শরবত ঠাণ্ডা করার কাজে ব্যবহার করে- রেখে উচ্চস্বরে আওয়াজ করে বলতে থাকে যে, হে লোকেরা! আসুন, আমার নিকট থেকে এ বরফ ক্রয় করুন, যদি ক্রয় না করেন তবে আমি ক্ষতির শিকার হব। (কেননা বরফ গলে ধীরে ধীরে পানিতে পরিণত হবে, তখন আর বিক্রয়যোগ্য থাকবে না।) তখন আমার নিকট স্পষ্ট হল যে, ক্ষতি বলতে কি বুঝায়। যদি কোন বিক্রেতা চাল ও ডাল নিয়ে বাজারে বসে এবং লোকেরা যদি তা ক্রয় না করে তবে সে ক্ষতির শিকার হবে না। হয়তো বিক্রি হতে বিলম্ব হবে কিন্তু সেগুলো সহজে নষ্ট হবে না। যদি কোন বস্ত্র বিক্রেতা কিছু কাপড় নিয়ে বাজারে আসে এবং তার সে কাপড় যদি বিক্রি নাও হয় তবে সেগুলো খারাপ হবে না। এমনভাবে যদি অন্যান্য দ্রব্যাদি -চাই সেগুলো আহার্য কিংবা ব্যবহার্য হোক না কেন- যেগুলো নষ্ট হয় না কিংবা ক্ষয়িঞ্চু নয়, তাহলে কেউ বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হবে না। হয়তো উক্ত দ্রব্যাদির দাম কম কিংবা বেশি হতে পারে; কিন্তু তা যদি বরফ হয় তাহলে কি পরিণতি হবে? বরফ তো ক্রমান্বয়ে গলে নিঃশেষ হয়ে যায়, তখনকার সময়ে তো ফ্রিজ কিংবা শীতল কারক যন্ত্র আবিস্কার হয় নি যে, উক্ত বিক্রেতা তার বরফকে তাতে সংরক্ষন করবে। বরং সে দিনের সূর্যের আলোতে ও উষ্ণ হাওয়ায় বাজারে বরফ রেখেছে বিক্রির উদ্দেশ্যে; এ কারণেই তো সে চিৎকার করে বলছিল যে, হে লোকেরা! আমার বরফ কিনুন, নতুবা আমার পুঁজি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর তখন আমি ভালভাবে বুঝলাম যে, প্রকৃত ক্ষতি বা লোকসান মানে কি।
মানুয়ের অবস্থাও উক্ত বরফ বিক্রেতার ন্যায় এবং মানব জীবনও বরফের সাথে সমতুল্য। অর্থাৎ আমাদের জীবনের আয়ু দিনের পর দিন ক্রমান্বয়ে সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে; এমনটি নয় কি? যে দিন আপনি এ ধরনীর বুকে জন্ম নিয়েছেন -মনে করুন, আপনার আয়ুষ্কাল ২০ বছর, ৪০ বছর, ৫০ বছর, ৬০ বছর, ১০০ বছর কিংবা তার চেয়ে কম-বেশি নির্ধারিত হয়েছে- সে দিন থেকেই প্রতিটি মুহুর্তে ক্রমান্বয়ে আপনি জীবন সায়াহ্নে ছুটে চলেছেন তথা এক ধাপ কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আমরা ধীরে ধীরে এ জীবন নামের এক গুরুত্বপূর্ণ পুঁজিকে হারিয়ে ফেলছি। তাই নয় কি? সুতরাং আমাদের জীবনের আয়ুষ্কালও বরফের ন্যায় ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে; এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কি? তাই আমাদের করণী হচ্ছে- আমাদের এ পুঁজিকে সঠিক পথে বিনিয়োগ করা অথবা যথাযথ কাজে ব্যবহার করা। যদি আমরা এ পুঁজিকে সঠিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ এবং সেটাকে উপযুক্ত স্থানে ব্যবহার কিংবা তা দিয়ে সঠিক বেচাকেনা করি; তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের সে পুঁজি নষ্ট হবে না। আর মানুষের এ গুরুত্বপূর্ণ পুঁজির ক্রেতা হলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। অবশ্য আল্লাহর বান্দারাও তা ক্রয় করে। কিন্তু মানুষের জন্য এমনটি চরম দূর্ভাগ্যের বিষয় যে, তার এ পুঁজিকে সে আল্লাহর সাথে বিনিময় না করে আল্লাহর কোন বান্দার সাথে বিনিময় করে; যা অত্যন্ত দুঃখজনকও বটে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেন: উত্তম হচ্ছে মানুষ স্বীয় জান বা প্রাণকে মহান আল্লাহর প্রতি নিবেদন করবে এবং তার নিকটই সমর্পণ করবে। এমন কোন মূল্য নেই যা মানুষের জান, আত্মা ও জীবনের বিনিময় দিতে পারে; একমাত্র এর বিনিময় আল্লাহর হাতেই ন্যস্ত। আল্লাহ প্রদত্ত মূল্য ও বিনিময়ই কেবল মানব জীবনের প্রকৃত মূল্য হিসেবে স্বীকৃত।
সুতরাং আপনি যদি স্বীয় জান ও আত্মাকে সঠিক স্থানে বিনিয়োগ এবং নিজ জীবনকে যথাযথভাবে ভোগ ও ব্যবহার করতে সক্ষম হন; তবে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হন নি। পক্ষান্তরে যদি তা না পারেন তবে আপনি চরম ক্ষতির শিকার। এমতাবস্থায় এ ক্ষতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও অপূরণীয়। এ ক্ষতি বস্তুত এক বেদনাদয়ক শাস্তি। কিয়ামতের দিন মানুষ যখন দেখবে যে, এ পৃথিবীতে পূর্ণতার স্তরসমূহ অতিক্রমের জন্য তাকে একটি বিশেষ পুঁজি দেয়া হয়েছিল তা ছিল তার জীবন; যা অন্য যে কোন পুঁজি অপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার জান ও জীবন না থাকে, তবে আপনার মাল ও সন্তানাদিও কোন কাজে আসবে না। যে কোন পুঁজি ও সম্পদ কেবল তখনই কাজে আসবে যখন আপনার জীবন বহাল থাকবে। সুতরাং জান ও জীবনই এ পৃথিবীতে মানুষের প্রধান পুঁজি। এ পুঁজিকে যখন সে দুনিয়ার জীবদ্দশাতে ব্যয় করবে ও তা ঐ বরফের ন্যায় নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং এর বিনিময়ে সে কোন কিছু অর্জনে ব্যর্থ হবে; তখন উক্ত অবস্থা হবে তার জন্য কষ্টদায়ক শাস্তি।

 

Related posts

সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More