সূরা সাফফের তাফসীর

সত্য ও ন্যায় হতে বিচ্যুতি ধর্মীয় বিধানাবলি অমান্য করার প্রতিফল
নবীকে কষ্ট দিবার পরিণতি কোথায় পৌঁছেছিল (অর্থাৎ হযরত মূসাকে কষ্ট দেয়ার কারণে বনি ইসরাইল গোত্র কতইনা ভয়ানক পরিণতির শিকার হয়েছিল)! আর আমরা তো শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) উম্মত; আমাদের উদ্দেশ্যেই তো কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ.
“হে মু’মিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা কর না?” কাজেই আমাদের সজাগ থাকা প্রয়োজন এবং নিজেদের আমলনামার উপর তীক্ষ্ম নজর রাখা জরুরী; যাতে আমরাও বনি ইসরাইল গোত্রের ন্যায় অনাকাঙ্খিত ও কঠিন পরিস্থিতির শিকার না হই। তাদের কঠিন পরিণতি সম্পর্কে কুরআনে বলা হচ্ছে,
অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। ( সূরা সাফ্ফ : ৫)

অর্থাৎ বনি ইসরাইল গোত্রের লোকেরা তাদের নাফরমানি ও অবাধ্যতার দরুণ অন্তরের বক্রতার শিকার হয়। এখানে زَاغُ শব্দের অর্থ হচ্ছে বিচ্যুত হওয়া, সোজা বা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বক্র কোন পথে সরে যাওয়া। তারা হযরত মূসাকে (আ.) মানসিকভাবে কষ্ট দিত অথবা তারা এমন কোন কাজে লিপ্ত হত যা তাঁকে পীড়িত করত। হযরত মূসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য যে সহজ ও সরল পথের নির্দেশ করেছিলেন, তারা সে পথ থেকে সরে যেয়ে বক্র পথে ধাবিত হয়েছিল। আর তাদের এমন পথভ্রষ্টতা হযরত মূসার (আ.) জন্য ছিল কষ্টদায়ক। أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ ‘তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন।’ অর্থাৎ আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদের অন্তরকেও বক্র করে দিয়েছেন। যেহেতু বনি ইসরাইল নিজেরা সরল পথকে উপেক্ষা করে পথভ্রষ্টতার দিকে ধাবিত হয়েছে, সেহেতু আল্লাহ শাস্তিস্বরূপ তাদেরকে হেদায়েতের আলো থেকে বঞ্চিত এবং তাদের অন্তরকে বক্র করে দিয়েছেন। যে কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে, আল্লাহ তার অন্তরকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করবেন। আল কুরআনের ভাষায়,
“আর যে কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করে তিনি তার অন্তরকে হেদায়েত দান করেন, এবং আল্লাহ’ই সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।(সূরা তাগ্বাবুন : ১১)

যারা আল্লাহর পথে নেক কর্ম সম্পাদন করবে, আল্লাহ তাদেরকে ন্যায়ের পথে হেদায়েত দান করবেন। যারা নিজেদের উপর অর্পিত ধর্মীয় দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে আল্লাহকে সহায়তা করবে, স্বয়ং আল্লাহও তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করবেন। এক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য হচ্ছে- আল্লাহ তাদেরকে সঠিক ও সরল পথের দিকনির্দেশনা দিবেন এবং জীবনের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করবেন। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর পথে চলবে না; তারা বিচ্যুতির শিকার হবে, আল্লাহর প্রদর্শিত সরল পথ হতে দূরে সরে যাবে এবং আল্লাহও তাদের অন্তরকে বক্র করে দিবেন। আর এহেন অবস্থাই মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিনতম আযাবের অন্তর্ভুক্ত; যা অত্যন্ত সহজাত ও স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত। অবশ্য আমি এ বিষয়টি আমার ধারাবাহিক আলোচনায় বহুবার উল্লেখ করেছি- রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষ যখন কোন গুনাহে লিপ্ত হয় তখন তার অন্তরে একটি কালো বর্ণের খুত বা দাগ পড়ে; যদি সে উক্ত গুনাহের জন্য তওবা বা অনুশোচনা করে তাহলে তার অন্তর পুনরায় পূর্বের ন্যায় স্বচ্ছ ও নির্মল হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তওবার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা না করে আবার নতুন গুনাহে লিপ্ত হয় এবং এভাবে গুনাহের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে, তবে এক পর্যায়ে তার অন্তর কলুষিত হয়ে পড়বে। অবশ্য এখানে অন্তর বলতে আমাদের বুকের বাম পার্শ্বের (রক্ত-মাংসের) হৃৎপিণ্ড নয়; বরং তা হচ্ছে মানব আত্মা যা সহজাতভাবে ন্যায় ও বাস্তবতাকে শ্রবণ এবং গ্রহণ করে। পাশাপাশি তা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে বিষয়াবলি অনুধাবন, অনেক রহস্য উন্মোচন এবং সঠিক ও খোদায়ী পথ বিশ্লেষণ এবং তদনুযায়ী আমল সম্পাদনে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে যদি তা বারংবার আল্লাহর অবাধ্যতা ও গুনাহে লিপ্ত হয়, তাহলে পরিণতিতে খোদাপ্রদত্ত উক্ত স্বচ্ছ অবস্থা ও অন্তরদৃষ্টির সক্ষমতা থেকে দূরে সরে যাবে।

Related posts

সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More