সৃষ্টিজগতের তাসবিহ’র উদ্দেশ্য

এখন আমরা এ সূরার আয়াতসমূহের অর্থ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরব এবং পাশাপাশি এ আয়াতসমূহের সাথে সম্পর্কিত কিছু বাস্তব বিষয়ের প্রতিও ইশারা করব। আয়াতের শুরুতে এক বিস্তীর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়; যেমনটি সূরা জুমুআ’ এবং সূরা হাশরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এ সূরাসমূহের প্রতিটিতে মহান আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা, সৃষ্টিজগতের উপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য এবং এ সম্পর্কিত বিষয়াবলি উল্লেখ করা হয়েছে। সূরার শুরুতেই আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং তার প্রতি সৃষ্টিজগতের চূড়ান্ত বিনয়াবত থাকার বিষয়টি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে,
“আকাশমন্ডলী ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সেগুলো সবই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।”

অনুরূপভাবে সূরা জুমুআ’র প্রথম আয়াতে বর্ণিত হয়েছে,
“আকাশমন্ডলী ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।”
সৃষ্টিজগতের তাসবিহ বলতে বুঝায় আসমান ও জমিনে বিদ্যমান সৃষ্টিসমূহ মহান প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা ও গুণকীর্তনে ব্যস্ত। আমি সূরা হাশরের প্রথম আয়াতের তাফসীরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি (যেহেতু সূরা সাফ্ফ ও সূরা হাশর উভয় সূরার প্রথম আয়াত একই টেক্সট ও অভিন্ন ভাবার্থের)। উল্লেখ করেছি যে, আসমান ও জমিনে বিদ্যমান সমগ্র সৃষ্টিজগত অব্যাহতভাবে আল্লাহর সত্তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণায় মগ্ন। তারা আল্লাহর সত্তাকে সব ধরনের অপূর্ণতা, অমঙ্গল ও দোষত্রæটি থেকে মুক্ত ও নিষ্কলুষ হিসেবে ঘোষণা করে। অবশ্য তাদের এ তাসবিহ কোন্ ভাষাতে কিংবা কোন্ প্রক্রিয়াতে সম্পন্ন হয় তা সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, সৃষ্টিজগতের যাবতীয় বস্তু প্রতিনিয়ত মহান প্রতিপালকের মহিমা ঘোষণা ও গুণকীর্তনে মগ্ন রয়েছে। মানব জাতি কোন্ প্রক্রিয়াতে তাসবিহ তথা মহিমা ঘোষণা ও গুণকীর্তন করে তা তো স্পষ্ট। অনুরূপভাবে প্রাণীজগত তাদের নিজস্ব ভাষাতে মহিমা ঘোষণা করে। উদ্ভিদজগত ও জড়বস্তুসমূহও তাদের স্ব স্ব ভাষাতে মহিমা ঘোষণা ও গুণকীর্তন করে থাকে।
যদিও আমরা বুঝতে পারি না, কিন্তু যারা অন্তরদৃষ্টির অধিকারী তারা পানি ও মাটির ভাষা বুঝতে সক্ষম। আমরা বলব না তাদের প্রাণ রয়েছে, কিন্তু জড়বস্তুর জন্য নির্ধারিত বিশেষ ভাষা তো রয়েছে। জড় কিংবা প্রাণহীন বস্তুসমূহের বিশেষ ভাষা কি ও কেমন? এখনও পর্যন্ত মানব জাতি এ বিষয়ে তেমন কিছু আবিস্কার করতে সক্ষম হয় নি; কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, এক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু বিদ্যমান।
কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেছেন যে, সৃষ্টিজগতের তাসবিহ হচ্ছে তাদের অস্তিত্বের উপস্থিতি। অর্থাৎ যখন কোন পাথরের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করি, তখন উক্ত বস্তুর উপস্থিতি এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে যে, ¯্রষ্টা রয়েছেন যিনি এক ও অদ্বিতীয় এবং তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কেননা নিশ্চয়ই কোন ক্ষমতাবান স্বীয় প্রজ্ঞা ও ক্ষমতার মাধ্যমে এ পাথরকে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং এখন যখন এ পাথর রয়েছে ও এ পাথরের অস্তিত্ব বিদ্যমান, তখন তার অস্তিত্বের মাধ্যমে মহান প্রতিপালকের সত্তার পরিচয় তুলে ধরছে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হচ্ছে এমনটি নয়; বরং সৃষ্টিকুলের তাসবিহ তাদের অস্তিত্বের মাধ্যমে প্রকাশ ঘটানোর তুলনায় আরও ব্যাপক ও বিস্তীর্ণ অর্থ বহন করে। কেননা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
“আর এমন কিছুই নেই যা তাঁর (আল্লাহ) সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করছে না, কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা ঘোষণা অনুধাবন করতে পার না। (  সূরা বনি ইসরাইল : ৪৪ )

সৃষ্টিসমূহের অস্তিত্বের ফলশ্রুতির বিষয়টি আমাদের জানা আছে। আমরা যারা জ্ঞান ও বিচক্ষণতার অধিকারী, বুদ্ধি-বিবেচনার সাথে কাজ করি এবং আমাদের বিবেকসমূহ বিকারগ্রস্থ নয়; তারা খুব ভালভাবেই বুঝতে সক্ষম যে, প্রতিটি বস্তুই স্বীয় অস্তিত্বের মাধ্যমে মহান স্রষ্টার প্রমাণ বহন করে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে কেন বলা হচ্ছে আমরা বুঝতে পারি না কিংবা অনুধাবন করতে পারি না? সুতরাং কুরআনে যে বলা হয়েছে ‘তোমরা অনুধাবন করতে পার না’; এক্ষেত্রে ভিন্ন কোন বিষয়ের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। তাহলে সে বিষয়টি কোনটি? তা হচ্ছে তাসবিহ বা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা; যা সৃষ্টিসমূহ (চাই তা জড়বস্তু হোক কিংবা প্রাণবিশিষ্ট) তাদের স্ব স্ব ভাষাতে প্রকাশ করে। কিন্তু আমরা তা বুঝতে আদৌ সক্ষম নই। বরং যখন আমাদের পার্থিব চর্ম চক্ষুর পর্দা অপসারিত হবে, যখন মানুষ জ্ঞান আধ্যাত্মিকতা ও খোদাপ্রদত্ত পরিশুদ্ধি অর্জনে সক্ষম হবে এবং আল্লাহ মনোনীত মহামানবদের দিকনির্দেশনায় মানবীয় জ্ঞানের উত্তরণ ঘটবে; তখন হয়তো এ বিষয়ও -যা আজও আমাদের কাছে অজ্ঞাত ও অপ্রকাশিত- অন্যান্য বিষয়সমূহের ন্যায় প্রকাশিত ও সুস্পষ্ট হবে। আর এ বিষয়টিই হচ্ছে সৃষ্টিজগতের তাসবিহ’র মর্মার্থ।

Related posts

সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

সূরা সাফফের তাফসীর

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More