লেখকঃ সাঈদ মোস্তফা হাসান
সর্বশেষ নবী ও রাসুল হিসাবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ঐশী ধর্ম ইসলামকে পূর্ণতা দান করেন। সূচনা করেন একটি কল্যাণধর্মী পূর্ণাঙ্গ নতুন সভ্যতা ও সংস্কৃতির। হিজরি বর্ষের সূচনা তাঁরই অবদান।
“কোন জাতির মধ্যে যে মহাঘটনা সংঘটিত হয় এবং কখনো কখনো যা ধর্মীয় ভিত্তিমূল এবং কখনো কখনো জাতীয় ও রাজনৈতিক ভিত্তিমূলের অধিকারী তা সাধারণ জনগণের আশ্চর্য ও বিস্ময়বোধের কারণে তারিখ ও গণনার সূচনা বা উৎস বলে গণ্য হয়। যেমন ইয়াহুদি জাতির মুক্তির জন্য হযরত মুসা (আ.) -এর আন্দোলন, খ্রিস্টানদের জন্য হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম তারিখ এবং মুসলমানদের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.)- এর হিজরত হচ্ছে তারিখ গণনার উৎস। যা দিয়ে প্রতিটি ধর্মের অনুসারিগণ তাদের জীবনের ঘটনাসমূহের উদ্ভবের সময়কাল নির্ণয় ও পরিমাপ করে থাকে।
কখনো কখনো কোন জাতি মৌলিক ইতিহাস ও তারিখের অধিকারী হওয়ার কারণে কিছু কিছু ঘটনাকেও তাদের তারিখ গণনার ভিত্তি ও উৎস হিসাবে নির্ধারণ করেছে। যেমন পাশ্চাত্যের দেশসমূহে মহান ফরাসী বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে কম্যুনিস্ট আন্দোলন ঐ সব দেশে যেসব ঘটনাপ্রবাহের উদ্ভব হয় সেগুলোর আনেক কিছুর তারিখ গণনার ভিত্তি বা উৎস হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। যে সব অনগ্রসর জাতি এ ধরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন থেকে বঞ্চিত সে সব জাতি স্বাভাবিকভাবে অসাধারণ ঘটনাবলীকে তাদের ইতিহাস ও তারিখ গণনার ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে। এ কারনে জাহেলি আরবগণ সঠিক কৃষ্টি ও সভ্যতার অধিকারী না হওয়ায় যুদ্ধ, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ অথবা অলৌকিক ঘটনাবলীকে নিজেদের ইতিহাস ও তারিখ গণনার উৎস হিসাবে গণ্য করেছে। এ কারণেই ইতিহাসের পাতায় পাতায় আমরা আরব জাতির তারিখ গণনার ভিন্ন ভিন্ন ভিত্তি দেখতে পাই। এসব ভিত্তির মধ্যে সর্বশেষ ভিত্তি হচ্ছে হাতির বছরের ঘটনা এবং পবিত্র কাবাগৃহকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে আবরাহার মক্কা আক্রমনের ঘটনা যা অন্যান্য ঘটনার তারিখ গণনার ভিত্তি হিসাবে গণ্য হয়েছে।”
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের পূর্বে ঐ বছরই ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা হস্তীবাহিনীসহ পবিত্র কাবা শরীফ ধ্বংস করতে এসে নিজেই সমূলে ধ্বংস হয়েছিল। যে দিনটিতে এ বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটে সে দিনটি দীর্ঘদিন আরবদের নিকট তাদের দিনপঞ্জীর প্রথম দিবস হিসাবে গণ্য হতো। তারা একে ‘হস্তী বর্ষ’ বা ‘হাতির বছর’ হিসাবে আখ্যায়িত করতো।
৬১০ খ্রিস্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নবুয়ত ঘোষণার মাধ্যমে প্রথমে আরবদের অতঃপর বিশ্ববাসীকে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসাবে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানান। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় তাঁর হিজরতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার শুভ সূচনা হয়। একটি অভিনব সমাজ ও রাষ্ট্র বিপ্লবের প্রবল অভিঘাতে খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে অতীতের পুঁতিগন্ধময় শোষণমূলক গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, ইতিহাস যাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াত’ বা অন্ধকার যুগ। সত্য ও সোনালী আলোর তীব্র ঝলকানিতে যে নয়া জামানার সূচনা হলো, মদিনার সন্নিকটে অবস্থিত ‘সানিয়াতুল বিদা’ নামক স্থানে রাসুলুল্লাহ (সা.) পৌঁছলে মদিনাবাসীর বিপুল স্বাগত সম্বর্ধনার মাধ্যমে তার উদ্বোধনী ঘোষিত হলো। অপার্থিব আনন্দে মদিনাবাসীরা সমস্বরে গেয়ে উঠলোঃ “ তালায়াল বাদরু আলাইনা———”
অর্থাৎ- সানিয়াতুল বিদা হতে চন্দ্র উদিত হয়েছে, আমাদের ওপর এ নেয়ামতের শোকর করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। হে সেই মহান যাঁকে আল্লাহ আমাদের হেদায়েতের জন্য পাঠিয়েছেন এবং যাঁর নির্দেশ আমাদের নিকট অবশ্য পালনীয়।” (প্রাগুক্ত, পৃ.৩৯৪);
এ প্রসঙ্গে পশ্চিমা ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টি বলেন, “The Hijrat, with which the Makkan period ended and the Madinese period began, proved a turning point in the life of Muhammad. Leaving the city of his birth as despised prophet he entered the city of his adaption as an honourerd chief.”
অর্থাৎ “হিজরতের সাথে সাথে হযরতের (সা.) মক্কা জীবনের অবসান এবং মদিনা জীবনের সূচনা হয় এবং এখানেই হযরত মুহাম্মদ (সা.) -এর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। অবহেলিত নবী হিসাবে জন্মভূমি পরিত্যাগ করে তিনি তাঁর বরণীয় শহরে সম্মানিত মেহমান হিসাবে প্রবেশ করেন।”
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রচলিত হস্তীবর্ষকে তো নয়ই তাঁর পবিত্র জন্মদিন বা নবুয়্যত ঘোষণার দিনকেও নয়, তিনি হিযরতের বছরকেই হিজরি বর্ষ হিসাবে গ্রহণ করেন।প্রচলিত ধারনা মোতাবেক প্রায় সকলেই জানেন যে, দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর হিজরি সনের প্রবর্তন করেন। এ সব প্রচলিত ধারনার পিছনে কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবনে কাছীর তাঁর ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ কিতাবে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা মোটামুটি এরকমঃ দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের নিকট এক ব্যক্তি তার হিসাবের বিবরণ পেশ করলে তিনি পড়ে দেখলেন তাতে লিখা রয়েছে এ হিসাবের সময়সীমা শাবান মাস পর্যন্ত। হযরত ওমর তাঁর কাছে জানতে চান, এর সময়সীমা এ বছরের শাবান মাস, নাকি গত বছরের, নাকি আগামী বছরের ? জবাব যাই হোক না কেন হিসাবনামায় বছরের উল্লখ থাকা আবশ্যক। তখন হযরত উমর রাসুলুল্লাহ (সা.)-র সাহাবিদের নিকট পরামর্শ আহবান করেন। কোন কোন সাহাবি প্রস্তাব করলেন ফার্সি বর্ষপঞ্জি অনুসরনের, আবার কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার প্রবর্তিত রোমীয় বর্ষপঞ্জি অনুসরনের। আবার সাহাবিগণের একটি দল প্রস্তাব করলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) নবুওয়াতপ্রাপ্তির বছরের ভিত্তিতে বর্ষপঞ্জি অনুসরনের।
সকলের প্রস্তাব শ্রবন করার পরে হযরত আলী (আ.) প্রস্তাব করেন, রাসুলে কারিম (সা.)-এর হিজরতের বছর থেকে বর্ষ গণনা করা হকো। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন নবী (সা.)- এর জন্ম ও নবুয়াতপ্রাপ্তির বর্ষ অপেক্ষা হিজরতের বর্ষ সকল দিক বিবেচনায় অধিকতর গুরুত্ববহ। হযরত উমর এ প্রস্তাবটি পছন্দ করেন এবং নবীজি (সা.)-র হিজরতের বর্ষকে বর্ষপঞ্জি হিসাবে গ্রহণ করে মেনে চলার জন্য বিভিন্ন প্রদেশ ও দফতরে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন। এ ফরমানে বলা হয় সরকারি চিঠি, পত্র, আদেশ, নিষেধ এবং দলিলসমূহে হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে দিন-তারিখ লিপিবদ্ধ করতে হবে।
“ইতিহাসের এ অংশটি মহানবী (সা.) কর্তৃক হিজরি বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের দলিলের বিপরীতে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও ইতিহাসের বর্ণনা সঠিক বলে ধরি তবে বলতে হবে, নবী (সা.) যে হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রবর্তন করেছিলেন তা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাপক প্রচলন লাভ করেনি এবং বিষয়টি দ্বিতীয় খলিফার সময়ে আনুষ্ঠানিকতা লাভ করে।”
কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)’র সীরাত ও হাদিস গ্রন্থসমূহ পাঠ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ই হিজরি বর্ষের সূচনা করেন। যেমনঃ ‘হাদিসবেত্তাগণ মুহাদ্দিস জুহরি থেকে বর্ণনা করেছেন, যখন মহানবী (সা.) মদিনায় প্রবেশ করেন (রবিউল আউয়াল মাসে) তখন স্বয়ং হিজরতের ভিত্তিতে দিনপঞ্জি নির্ধারণের নির্দেশ দান করেন।
‘হাকিম নিশাবুরি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, হিজরি সাল নবীর (সা.) হিজরতের বছরই প্রবর্তিত হয় এবং সে বছরই আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর জন্মগ্রহণ করেন।’
হযরত সালমান ফার্সী তাঁর ভাই ও পরিবারবর্গের উদ্দেশ্যে উপদেশমূলক একটি পত্র লেখার আহবান জানালে মহানবী হযরত আলীকে (আ) ডেকে পাঠান ও উপদেশমূলক একটি পত্র তাঁর দ্বারা লেখান যে পত্রের শেষে লেখা রয়েছে : “এ পত্রটি রাসুলের নির্দেশে আলী ইবনে আবি তালিব কর্তৃক লিখিত যা হিজরতের নবম বর্ষের রজব মাসে লেখা হলো।”
রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আলী নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পাদিত যে সন্ধিপত্রটি লিখেন তাতে পঞ্চম হিজরি সাল সংযোজিত রয়েছে। পত্রে এরূপ লেখা রয়েছে : “তিনি আলীকে লেখার নির্দেশ দেন, এ সন্ধি পত্রটি পঞ্চম হিজরিতে লিখিত হয়েছে।” এ বাক্যটি প্রমান করে যে, স্বয়ং রাসুলই হিজরি বর্ষের প্রবর্তক এবং তিনিই আলীকে পত্রসমূহের শেষে হিজরি তারিখ লেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বিভিন্ন হাদিসের রেওয়ায়েত থেকে জানা যায়, রাসুল (সা.) উম্মুল মুমেনিন সালমা (রা.)-কে বলেছেন, “ আমার সন্তান হুসাইন হিজরতের ষাট বছরের মাথায় শহিদ হবে।” রাসুলুল্লাহ (সা.)-র সাহাবিগণ (রা.) তাঁর জীবদ্দশায় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাকে তাঁর হিজরতের সাােথ সম্পৃক্ত করে বর্ণনা করতেন। যেমন তাাঁরা বলতেন, মসজিদুল আকসা থেকে কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তন হিজরতের সতেরতম বা আঠারতম মাসে সংঘটিত হয়েছিল।
রমজান মাসের রোজা হিজরতের আঠারতম মাসে ফরজ করা হয়। এমন তারিখ সম্বলিত বর্ণনা থেকে সহজেই বলা যায় যে, সাহাবিগণ (রা.) পঞ্চম হিজরি অবধি বিভিন্ন ঘটনা হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর হিজরতের সঙ্গে তুলনা করে সময় গণনা করতেন। পঞ্চম হিজরি থেকে নবীজী (সা.)-র নির্দেশ অনুসারে বর্ষপঞ্জি হিসাবে হিজরি সাল গণনা শুরু হয়। যেমন নাজরানের খ্রিস্টানদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিনামাটি হজরত আলী (আ.) নবীজী (সা.)-র নির্দেশ মুতাবেক হিজরি বর্ষ হিসাবে লিখেন।
উপর্যুক্ত বর্ণনা অনুসারে প্রমানিত হয় যে. বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রথম মদিনায় এসেই তাঁর হিজরতের ঐতিহাসিক বছরকে হিজরি বর্ষ শুরু বলে ঘোষণ করেন। এ কারনেই তামাম জাহানের মুসলিমগণ হিজরতকে তাদের ইতিহাসের সূচনা হিসাবে গ্রহণ করেছে। আজ অবধি মুসলিমগণ হিজরতের চৌদ্দটি শতাব্দী অতিক্রম করেছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশে প্রয়োজনে আঞ্চলিক বর্ষ এবং ইংরেজি বর্ষ অনুসরণ করা হলেও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হিজরি বর্ষ হিসাবে পালন করা হয়। এ দিক বিবেচনায় হিজরি সাল তামাম জাহানের মুসলমানদেরকে একই ঐক্য সূত্রে গ্রথিত করেছে।
(কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ নিবন্ধটিতে উল্লেখিত অধিকাংশ তথ্য, প্রমান আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানী কর্তৃক লিখিত এবং মোহাম্মদ মুনীর হোসেন খান কর্তৃক অনূদিত ‘ চিরভাস্বর মহানবী (সা.)’১ম খন্ড শীর্ষক গ্রন্থ হতে চয়ন করা হয়েছে।)###