ক) শিক্ষা
কারবালা কুফা ও শামের দীর্ঘ সফরে বিভিন্ন সময়ে অত্যাচারী শাসকদের কিংবা জন সাধারণের সম্মূখে যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে অতি সহজে বোঝা যায় যে এই মহান বিবির শিক্ষা কত উচ্চমানের যদিও তিনি কোন শিক্ষকের নিকট হতে তা গ্রহণ করেননি,
এর সমর্থন হযরত জয়নুল আবেদীন (আঃ) এর নিম্নোক্ত বাক্য থেকে বোঝা যায়। যে বাক্য হজরত জয়নাব (আঃ) এর জন্য এরশাদ করেছেন:
أنت بحمدالله عالمة غير معلمة وفهيمة غير مفهمة.
অর্থাৎ: আলহামদুলিল্লাহ আপনি বিনা শিক্ষকে শিক্ষিত ও বিনা ওস্তাদে বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষার জলসায় ও কুরআনের তাফসিরের জলসায় কুফাবাসি মহিলাদের নিকট থেকে এনার শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায়।
খ) বাগ্মিতা ও বাকপটুতা
যে বক্তব্য যেখানে উপযোগী সেখানে সেই বক্তব্য রেখেছেন, বক্তব্যে গাম্ভীর্য, ও বাগ্মিতা দিয়ে জনসাধারনের নিকট হৃদয়গ্রাহী করেছেন। এই সমস্ত ভাষণ থেকে বোঝা যায় যে হজরত জয়নাব (আঃ) বাগ্মী ছিলেন, আর জানতেন কোথায় কেমন বক্তব্য রাখতে হয়, সামঞ্জস্য বজায় রাখা, যেন কেউ অপছন্দ না করে, কেউ যেন রাগ না করে, যেন ভাষন সময় ও অবস্থার বিপরীত না হয় …।
কিন্তু আমরা দেখছি যে হযরত যায়নাব (আঃ) কুফা ও শামের পথের মাধ্যমে চারুবাক ও বাগ্মি খোৎবা দিয়েছেন, এমন দুঃখে ও ক্লেশের মাঝে এমন ভাষন দেওয়া বাকপটুতা ও বাগ্মিতার পরিচয় বহন করে। হযরত যায়নাব (আঃ) এমন এক মহিলা যার চোখের সামনে বাহাত্তর জন প্রিয়কে শহীদ করা হয়েছে। বাকি অবশিষ্টদের বন্দী করা হয়েছে, শহীদদের শিরগুলি যাত্রিদলের সামনে বর্শার আগায় গেঁথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ক্ষুধার্থ অবস্থায়, অনিদ্রা অবস্থায়, শত্রুদের অসম্মান জনক আচরণ এবং অশিক্ষিত ও মূর্খদের কটু বাক্য হযরত যায়নাব (আঃ) এর অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত ও ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল তবুও এমনই ভাষণ দিয়েছেন যে তার প্রভাব শত্রু ও অত্যাচারিদের অন্তরে তীরের মত গেঁথে দিয়েছে।
গ) আল্লাহর পথে জেহাদ ও উৎসর্গ
হজরত যায়নাব (আঃ) যখন অনুভব করিলেন যে আল্লাহর পথে দ্বীন ইসলামের জন্য জীবন, জান ও মাল দ্বারা জেহাদ করতে হবে ক্ষনিকের জন্যও অলসতা করলেন না, বরং পূর্ণঙ্গ উৎসর্গের আকাঙ্খা নিয়ে নিজের শহর ও স্বামীর ঘরকে ছেড়ে নিজের কর্তব্যকে পালন করেছেন। আর গুরুত্বপূর্ণ উৎসর্গগুলি এই যে তিনি নিজে এবং নিজের দুই পূত্র সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ইমাম হুসায়েন (আঃ) এর কাফেলার (যাত্রীদের) সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন। সম্ভবত বলা যেতে পারে যে, যদি তাঁর এই উৎসর্গ ও বীরত্ব না থাকত তাহলে ইমাম হুসায়েন (আঃ) এর উদ্দেশ্য এবং বক্তব্য প্রচারই হত না।
এমনকি এক দুঃখিনি মা যে সমস্ত যাত্রার পথে সমস্ত ওয়াজ–নসিহতে ইমাম হুসায়েন (আঃ) এর সঙ্গে ছিলেন এবং ইমাম হুসায়েনের শাহাদতের পর কাফেলার নেতৃত্বের ভার হযরত ইমাম (সাজ্জাদ) জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাঁধে নিলেন এবং আশুরার বার্তাকে সকলের কাছে পৌঁছাতে লাগলেন। যদি ইতিহাসের পাতা পাল্টানো যায় তো দেখা যাবে যে এই কর্তব্যকে কত সুন্দর ভাবে পালন করেছেন এবং সর্ব কালের জন্য দুনিয়া বাসিদের হয়রান ও হতভম্ব করে দিয়েছেন।
ঘ) ইবাদত
বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের থেকে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত যায়নাব (আঃ) সমস্ত জীবন রাত জেগে ইবাদত করেছেন। এ পর্যন্ত যে দশই মহারমের পরে যে রাত এসেছে সেই রাতেও রাতের ইবাদতকে পালন করেছেন।
হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) এরশাদ করেছেন: এগারো মহারমের রাতে আমার ফুফিআম্মা জনাবে যায়নাবকে নামাজরত অবস্থায় দেখেছি। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে ইমাম জয়নুল (আঃ) এরশাদ করেছেন: আমার ফুফিআম্মা যায়নাব (আঃ) এত বালা মসিবত সত্যেও কারবালা থেকে শাম পর্যন্ত নফল নামাজকে ছাড়েননি বরং সকল মসিবত সহ্য করেও নফল নামাজ পড়েছেন। এছাড়াও বর্ণিত হয়েছে যে যখন ইমাম হোসায়েন (আঃ) শেষ বিদায় চান তখন নিজের বোনের উদ্দেশ্যে একটি বাক্য উপদেশ স্বরূপ বলেছিলেন তা এই বাক্য ছিল: ‘يا اختاه لا تنسيني في صلاة اليلঅর্থাৎ: হে বোন! তুমি আমাকে ‘ নিজের তাহাজ্জুদ নামাজে ভুলে যেওনা অর্থাৎ আমাকে তুমি তাহাজ্জুদ নামাজে স্মরণ রেখ।
ঙ) মুসিবতে ধৈর্যশীল
হজরত যায়নাব অনেকগুলি বালা ও মসিবত সহ্য করেছেন যার মধ্যে নিম্নে কিছু দেওয়া হইল:
ক:- হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ওফাতের মসিবত।
খ:- হযরত আলী (আঃ) এর শাহাদতের ক্লেশ।
গ:- হযরত ফাতিমা (সাঃ) এর শাহাদতের কষ্ট।
ঘ:- হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এর শাহাদতের যন্ত্রনা।
ঙ:- হযরত ইমাম হুসায়েনের সঙ্গে যাত্রাকালিন কষ্ট ও পরিশ্রম সয্য করা। এবং দশই মহারমে ইমাম হুসায়েন (আঃ) এর শাহাদতের দুঃখ।
চ:- নিজের দুই নয়ন তারাকে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে দেখা। যাদের নাম: ১) আওন ২) মুহাম্মাদ।
ছ:- কুফা ও শামের মসিবত…
কিন্তু ইনি এই সকল মসিবতের সময় নিজের কর্তব্যকে পালন এবং ইসলামকে সাহায্য করেছেন এবং ইমাম হুসায়েনের সম্মানকে সকলের নিকট সুন্দরভাবে সুস্পষ্ট করেছেন এবং ৫৩ বৎসর বয়সে ৬১ হিজরীতে সম্মানিত অবস্থায় এই দুনিয়া থেকে পরলোক গমন করেছেন।
চ) সফর সমূহ
হজরত জয়নাব নিজের জীবনে (আঃ) অনেক জায়গায় সফর করেছেন যার মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সফরগুলী উল্লেখ করা হল:
১। মদীনা থেকে কুফা যখন হজরত ইমাম আলী (আঃ) খলীফা হন।
২। কুফা থেকে মদিনা নিজের পিতার শহীদ হওয়ার পর।
৩। মদীনা থেকে মক্কা ভাইয়ের কাফেলার ( যাত্রীদলের ) সাথে।
৪। মক্কা থেকে কারবালা ইমাম হুসায়েন (আঃ) এর সাথে।
৫। ইমাম হুসায়েন (আঃ) এর শাহাদতের পর কারবালা থেকে কুফা।
৬। বন্দী অবস্থায় কুফা থেকে শাম শহরে।
ফজর/ ইয়াসিন