হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.): পিতৃবিয়োগের
বেদনা থেকে শাহাদাতের করুণ অধ্যায়
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর একের পর এক শোকাবহ ঘটনা ও দুঃখ-কষ্ট তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর হৃদয়ে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছিল। পিতার বিচ্ছেদজনিত অসহনীয় শোক এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তাঁর জীবনকে দুঃখ-বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তোলে। তিনি তাঁর সম্মানিত পিতাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই মহানবী (সা.)-এর চিরবিদায় তাঁর কাছে ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
একদিকে পিতার বিয়োগব্যথা তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল, অন্যদিকে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর খিলাফতকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ ও ষড়যন্ত্রকারীদের আচরণ তাঁর পবিত্র হৃদয় ও দেহে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। এসব দুঃখ-কষ্টের পাশাপাশি আরও নানা বেদনাদায়ক ঘটনা তাঁর জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল, যার বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হচ্ছে না।
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) প্রায় সর্বদাই শোকার্ত ও ক্রন্দনরত থাকতেন। কখনো তিনি পিতার পবিত্র কবর জিয়ারত করতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হতেন। (বাইতুল আহযান, মুহাদ্দিসে কোম্মী, পৃ. ১৩৭; মুনতাহাল আমাল, পৃ. ১৬৩; কানযুল ফাওয়ায়েদ, কারাজেকী, পৃ. ৩৬০) আবার কখনো শহীদদের কবরের পাশে গিয়ে গভীর শোক ও বেদনায় আহাজারি করতেন। (বাইতুল আহযান, পৃ. ১৪১; মুনতাহাল আমাল, পৃ. ১৬৪; আমালী, শায়খ সাদুক, পৃ. ১২১; কাশফুল গুম্মাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০) নিজ গৃহেও তিনি অধিকাংশ সময় পিতার স্মৃতিচারণ ও শোক পালনে অতিবাহিত করতেন।
বর্ণিত আছে, তাঁর অবিরাম ক্রন্দন ও আহাজারির বিষয়ে মদিনার কিছু অধিবাসী আপত্তি জানালে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) তাঁর জন্য জান্নাতুল বাকী কবরস্থানের এক প্রান্তে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে দেন। পরবর্তী সময়ে ঘরটি ‘বাইতুল আহযান’ বা ‘শোকের ঘর’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) প্রতিদিন সকালে তাঁর দুই প্রিয় সন্তান ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যেতেন এবং দিনভর কবরগুলোর পাশে বসে পিতার স্মরণে অশ্রুপাত করতেন। সন্ধ্যা হলে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) তাঁকে সেখান থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতেন। অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার আগপর্যন্ত তাঁর এই শোকপালন অব্যাহত ছিল। (বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ১৭৭-১৭৮; বাইতুল আহযান, পৃ. ১৩৮)
মহানবী (সা.)-এর বিচ্ছেদে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর হৃদয়ের বেদনা এতটাই গভীর ছিল যে, পিতার সামান্য কোনো স্মৃতিও তাঁকে অশ্রুসিক্ত ও ব্যাকুল করে তুলত। মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি বিষয় তাঁর মনে পিতার স্নেহ, ভালোবাসা ও সান্নিধ্যের কথা জাগিয়ে তুলত।
এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.)-এর মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল (রা.)-এর একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত বেলাল (রা.) সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর কারও জন্য আজান দেবেন না। একদিন হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) তাঁর পিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, ‘আমার পিতার মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে আজান শুনতে ইচ্ছা করছে।’
এই সংবাদ হযরত বেলাল (রা.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি দ্রুত উপস্থিত হয়ে হযরত ফাতেমা (সা.আ.)-এর সামনে আজান দিতে শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। পিতার জীবদ্দশার স্মৃতি তাঁর হৃদয়ে প্রবলভাবে জেগে ওঠে এবং তিনি কান্না সংবরণ করতে পারেননি।
অতঃপর হযরত বেলাল (রা.) যখন আজানের ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ অংশে পৌঁছালেন, তখন মহানবী (সা.)-এর নাম শুনে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) উচ্চৈঃস্বরে আর্তনাদ করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত লোকেরা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে হযরত বেলাল (রা.)-কে বললেন, ‘থামুন! রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন।’ তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন, হযরত ফাতেমা (সা.আ.) হয়তো ইহলোক ত্যাগ করেছেন। ফলে হযরত বেলাল (রা.) আজান অসম্পূর্ণ রেখেই থেমে যান।
কিছুক্ষণ পর হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) চেতনা ফিরে পেলে হযরত বেলাল (রা.)-কে আজান সম্পূর্ণ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নিবেদন করেন, ‘হে নারীদের নেত্রী! আমার আজানের ধ্বনি শুনে আপনার প্রাণহানির আশঙ্কা করছি।’ এ কারণে তিনি আর আজান সম্পূর্ণ করেননি। (বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ১৫৭; বাইতুল আহযান, পৃ. ১৪০-১৪১)
এই হৃদয়বিদারক ঘটনা থেকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর গভীর ভালোবাসা, অকৃত্রিম আবেগ এবং পিতার বিচ্ছেদে তাঁর অসহনীয় বেদনার পরিচয় পাওয়া যায়। পিতার ইন্তেকালের পর তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন শোক ও স্মৃতির ভারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
অবশেষে পিতার বিচ্ছেদজনিত গভীর শোক, মানসিক যন্ত্রণা এবং তাঁর ওপর নেমে আসা নানা দুঃখ-কষ্টের কারণে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ক্রমে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে এবং একপর্যায়ে তিনি এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন।
তাঁর শাহাদাতের তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিক বর্ণনায় মতভিন্নতা রয়েছে। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, একাদশ হিজরির ১৩ জমাদিউল আউয়াল এবং অপর একটি বর্ণনা অনুযায়ী, একই হিজরি বছরের ৩ জমাদিউস সানি তিনি শাহাদাতবরণ করেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র ৭৫ অথবা ৯৫ দিনের ব্যবধানে তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর শোকাবহ অধ্যায়। তাঁর সংক্ষিপ্ত অথচ মহিমান্বিত জীবন ছিল পিতার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, অসীম ধৈর্য এবং আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর শাহাদাত আহলে বাইত (আ.)-এর অনুসারীদের হৃদয়ে যে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে, তা যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শ এবং ত্যাগের মহিমা সত্য, ন্যায় ও আদর্শের পথে অবিচল থাকার অনুপ্রেরণা জোগাবে।
জ্যাতির্বিদ্যার বিকাশে হযরত ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) অবদান
ড. এম. এ. কাইউম
সারসংক্ষেপ
হযরত ইমাম জাফর সাদিক -আ.- (৮৩-১৪৮ হি./ ৭০২-৭৬৫ খ্রি.) ইসলামের প্রাথমিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, ধর্মতাত্ত্বিক ও শিক্ষক। তাঁর জ্ঞানচর্চা, শিক্ষাদান এবং তাঁর নামে সংরক্ষিত বিভিন্ন বর্ণনা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। জ্যোতির্বিদ্যা, মহাবিশ্বের সৃষ্টি, সূর্য-চন্দ্রের গতি এবং নক্ষত্রের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর নামে বিভিন্ন বক্তব্য ও ব্যাখ্যা প্রচলিত। তবে এসব বক্তব্যের সবেরই ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা সমান নয়। এই প্রবন্ধে কুরআনের মহাজাগতিক ধারণা, ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য, তাঁর নামে প্রচলিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বর্ণনা এবং ইসলামী জ্যোতির্বিদ্যার পরবর্তী বিকাশের সঙ্গে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাবের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় হিজরি শতক ছিল ধর্মীয় জ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত এবং প্রাকৃতিক জ্ঞানচর্চার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ছিলেন এ যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। তিনি আহলে বাইতের (আ.) একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং ইমামত ধারার ষষ্ঠ ইমাম। মদিনার মসজিদস্থ তাঁর শিক্ষাকেন্দ্রকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার মানুষের জ্ঞানচর্চার বিবরণ পাওয়া যায়।
জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে তাঁর অবদান মূল্যায়ন করতে হলে দুটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন: প্রথমত, তাঁর নামে প্রচলিত মহাজাগতিক জ্ঞান ও বক্তব্য; দ্বিতীয়ত, তাঁর সময়ের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ এবং পরবর্তী ইসলামী বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, তাঁর নামে প্রচলিত সব গ্রন্থ ও বৈজ্ঞানিক মতামতের রচয়িতা এবং প্রামাণিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অতএব, ঐতিহাসিক সতর্কতা বজায় রেখেই তাঁর অবদান মূল্যায়ন করা জরুরি।
কুরআনে মহাজাগতিক ধারণা ও জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তি
ইসলামী জ্যোতির্বিদ্যার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে কুরআনের মহাবিশ্ব সংক্রান্ত আয়াত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।” (সূরা: আম্বিয়া, ৩৩তম আয়াত।) এই আয়াতে সূর্য ও চন্দ্রের গতিশীলতা এবং তাদের নির্দিষ্ট গতিপথের কথা বলা হয়েছে। অন্যত্র বলা হচ্ছে: “আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলমান।” (সূরা: ইয়াসিন, ৩৮তম আয়াত।)
হযরত ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) সময়ের মুসলিম জ্ঞানচর্চা এই ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের মধ্যেই বিকশিত হয়েছিল। তবে কুরআনের এসব আয়াতকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কোনো তত্ত্বের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন না করে, বরং মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার ধর্মীয় প্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসংগত।
ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদান
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ধর্মতত্ত্ব, হাদিস, ফিকহসহ বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের বিস্তৃতিদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রসুলের (সা.) মদিনার মসজিদে তদীয় পিতা হযরত ইমাম বাকিরের (আ.) মাধ্যমে শুরু হওয়া শিক্ষাদান ব্যবস্থাকে তিনি ফুলে-ফলে সুশোভিত করেন। তাঁর শিক্ষা ও মতামত বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর নামে প্রচলিত কিছু বর্ণনায় প্রকৃতি, আকাশ, নক্ষত্র এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে বিস্ময়কর আলোচনা পাওয়া যায়।
মুহাম্মদ হুসাইন আলী আস্ সুওয়াইতি ও মুহাম্মদ সালেহ আল্ হাশিমি তাঁদের গবেষণা معارف الجغرافية الفلكية في مرويات الإمام جعفر الصادق (ইমাম জাফর সাদিকের বর্ণনায় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ভূগোলের জ্ঞান)-এ তাঁর নামে প্রচলিত মহাজাগতিক বর্ণনা, আকাশ, নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রসংক্রান্ত ধারণা পর্যালোচনা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয় Lark Journal, ৮ম খণ্ড, ২য় সংখ্যা, (২০১৬ খ্রি.), পৃ. ৫৬৪-৫৭৮-এ।
এ ধরনের গবেষণা থেকে বুঝা যায়, মুসলিম ঐতিহ্যে ইমামকে (আ.) শুধু ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবেই নয়, বরং প্রকৃতি ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত একজন নির্দেশক হিসেবেও স্মরণ করা হয়। তবে তাঁর নামে প্রচলিত প্রতিটি বক্তব্যকে তাঁর নিজের রচনা বা প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বলে ধরে নেওয়া যায় না।
নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর নামে প্রচলিত ধারণা
হযরত ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) নামে সংরক্ষিত কিছু বর্ণনায় মহাবিশ্বের সৃষ্টি, আকাশের গঠন, নক্ষত্রের ভূমিকা এবং সূর্য ও চন্দ্রের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা পরবর্তী মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কুরআনে নক্ষত্রের একটি ব্যবহারিক ভূমিকার কথা বলা হয়েছে: “আর (তিনি সৃষ্টি করেছেন) পথনির্দেশক চিহ্নসমূহ; আর নক্ষত্রের সাহায্যে তারা পথ খুঁজে পায়।” (সূরা: নাহল, ১৬)
প্রাচীন আরব সমাজে মরুভূমিতে ভ্রমণ, দিক নির্ণয় এবং ঋতু সম্পর্কে ধারণা লাভের ক্ষেত্রে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের ব্যবহারিক গুরুত্ব ছিল। ইসলামী সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নামাযের সময় নির্ধারণ, কিবলার দিক নির্ণয়, হিজরি মাসের হিসাব এবং ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণের জন্যেও আকাশ পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।
ইমামের (আ.) নামে প্রচলিত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বর্ণনাগুলোকে এই বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা উচিত। তবে তাঁর নামে প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট মতামতকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সমতুল্য বলতে হলে সংশ্লিষ্ট বর্ণনার মূল আরবি পাঠ, সনদ, প্রাচীনতম উৎস এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যাচাই করা আবশ্যক।
জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিষশাস্ত্রের পার্থক্য
হযরত ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) নামে কিছু জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ও গুপ্তবিদ্যাবিষয়ক গ্রন্থও প্রচলিত রয়েছে। ড্যানিয়েল দে স্মে-র Encyclopaedia Iranica-তে প্রকাশিত “ÒJaʿfar al-Ṣādeq iv. And Esoteric Sciences” প্রবন্ধে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন গুপ্তবিদ্যা, ভবিষ্যদ্বাণী এবং জ্যোতিষসংক্রান্ত ঐতিহ্য আলোচনা করা হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। জ্যোতির্বিদ্যা (علم الفلك) হলো মহাজাগতিক বস্তু, তাদের অবস্থান, গতি এবং ভৌত বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের বিজ্ঞান। অন্যদিকে, জ্যোতিষশাস্ত্র (التنجيم)-এ গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ ঘটনার সম্পর্ক স্থাপনের দাবি করা হয়। আধুনিক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে জ্যোতিষশাস্ত্রের এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিষ্ঠিত নয়।
ঐতিহাসিকভাবে এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে কখনও কখনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কোনো জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গ্রন্থ ইমামের (আ.) নামে প্রচলিত হওয়া তাঁর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অবদানের প্রত্যক্ষ প্রমাণ নয়। গবেষণায় এই পার্থক্য বজায় রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা ও গবেষণাগত সীমাবদ্ধতা
ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) বৈজ্ঞানিক অবদান নিয়ে গবেষণার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো তাঁর নামে প্রচলিত গ্রন্থ ও বক্তব্যের প্রামাণিকতা নির্ধারণ করা। Encyclopaedia Iranica-i ÒJaʿfar al-Ṣādeq ii. Teachings” প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর নামে প্রচলিত রচনা, তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে সংরক্ষিত বক্তব্য এবং পরবর্তী যুগের বিভিন্ন বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা এক রকম নয়।
মেহমেত আতালানের “ÒCafer es-SadıkÕın EserleriÓ শীর্ষক গবেষণাতেও তাঁর নামে প্রচলিত গ্রন্থসমূহের লেখকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, কোনো গ্রন্থের প্রচলিত শিরোনামে ইমামের (আ.) নাম থাকলেই সেটিকে তাঁর প্রত্যক্ষ রচনা হিসেবে গ্রহণ করা পদ্ধতিগতভাবে যথার্থ নয়।
তাই তাঁর অবদান মূল্যায়নে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, প্রাচীন উৎসের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই; দ্বিতীয়ত, পরবর্তী ঐতিহ্যে তাঁর জ্ঞানগত প্রভাব শনাক্ত করা এবং তৃতীয়ত, আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে তাঁর নামে প্রচলিত বক্তব্যের কৃত্রিম সাদৃশ্য তৈরি না করা। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদা যেমন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে, তেমনি গবেষণার বস্তুনিষ্ঠতাও বজায় থাকবে।
ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তাঁর তাৎপর্য
ইমামের (আ.) গুরুত্ব কেবল তাঁর নামে প্রচলিত কোনো বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষার ঐতিহ্য ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর নামে সংরক্ষিত মহাজাগতিক বর্ণনাগুলো পরবর্তী মুসলিম সমাজে ধর্ম, দর্শন এবং প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তার সম্পর্ক অনুধাবনের একটি মূল্যবান ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তবে ইসলামী জ্যোতির্বিদ্যার ঐতিহাসিক বিকাশকে একজন ব্যক্তির অবদানে সীমাবদ্ধ করা যায় না। পর্যবেক্ষণ, গণিত, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি, যন্ত্র নির্মাণ এবং গ্রিক, ভারতীয় ও পারসিক জ্ঞানের অনুবাদ ও সমালোচনামূলক ব্যবহারের মাধ্যমে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এ শাস্ত্র বিকশিত হয়েছে। ইমামের (আ.) বৌদ্ধিক ঐতিহ্যকে এই বৃহত্তর ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিচার করাই অধিক গ্রহণযোগ্য।
উপসংহার
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ইসলামী ইতিহাসের একজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও শিক্ষক। তাঁর নামে প্রচলিত বর্ণনায় মহাবিশ্ব, আকাশ, নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনা ইসলামী বৌদ্ধিক ঐতিহ্যে তাঁর মর্যাদা ও প্রকৃতি-সম্পর্কিত জ্ঞানচর্চার স্মৃতিকে প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে আধুনিক গবেষণা সতর্ক করে যে, তাঁর নামে প্রচলিত সব বক্তব্য ও গ্রন্থের লেখকত্ব কিংবা বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত নয়।
সুতরাং, জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশে তাঁর অবদান আলোচনা করতে হলে তাঁর শিক্ষাগত ও বৌদ্ধিক প্রভাবকে স্বীকার করার পাশাপাশি প্রাথমিক উৎসের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করতে হবে। ঐতিহাসিক প্রমাণ, আরবি মূলপাঠ এবং আধুনিক গবেষণার সমন্বিত পাঠই এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য মূল্যায়নের ভিত্তি হতে পারে।
জ্বিন-জিন্নাত: পবিত্র কুরআনের আলোকে বাস্তবতা, রহস্য ও প্রচলিত কুসংস্কার
শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে একটি তথ্যবহুল আলোচনা
ভূমিকা: জ্বিন-জিন্নাত নিয়ে আমাদের সমাজে রহস্যের শেষ নেই। গ্রাম থেকে শহর, সাধারণ মানুষের কথাবার্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন লোককাহিনি—সর্বত্র জ্বিনের উপস্থিতি যেন এক অবিচ্ছেদ্য বিষয়। কোথাও জ্বিনের আছর, কোথাও জ্বিনের বিয়ে, কোথাও জ্বিনের ধনসম্পদ পাহারা দেওয়া, আবার কোথাও জ্বিনের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প শোনা যায়। এসব গল্পের অনেকগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
অথচ জ্বিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। পবিত্র কুরআনে জ্বিনের কথা একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ‘সূরা আল-জ্বিন’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরাও নাজিল হয়েছে। অর্থাৎ জ্বিনের অস্তিত্ব নিছক লোককাহিনি কিংবা কল্পনার বিষয় নয়; বরং এটি ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি স্বীকৃত বিষয়।
তবে জ্বিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা আর জ্বিন সম্পর্কে প্রচলিত প্রতিটি গল্পকে সত্য বলে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়। বিশেষত শিয়া ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার আলোকে জ্বিন-জিন্নাত সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করা জরুরি।
জ্বিন শব্দের অর্থ ও পরিচয়
আরবি ‘জ্বিন’ (الجن) শব্দটি ‘জান্না’ (جنّ) ধাতু থেকে এসেছে। এর মৌলিক অর্থ হলো আড়াল করা, গোপন থাকা কিংবা দৃষ্টির অন্তরালে থাকা।
আরবি ভাষায় যে বস্তু বা সত্তা সাধারণ দৃষ্টির আড়ালে থাকে, তার ক্ষেত্রে এ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। ইসলামী পরিভাষায় জ্বিন বলতে এমন এক ধরনের সৃষ্টিকে বোঝানো হয়, যারা সাধারণত মানুষের দৃষ্টির অগোচরে থাকে।
জ্বিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “আর আমি জ্বিনকে সৃষ্টি করেছি আগুনের শিখা থেকে।”—সূরা আর-রহমান, ৫৫:১৫
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে: “আর জ্বিনকে তিনি সৃষ্টি করেছেন আগুনের নির্গত শিখা থেকে।”—সূরা আল-হিজর, ১৫:২৭
এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, জ্বিন মানুষের মতো মাটির তৈরি নয়; বরং তাদের সৃষ্টির উপাদান ভিন্ন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বিনের সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে কুরআন যে তথ্য দিয়েছে, তা থেকে তাদের প্রকৃত শারীরিক গঠন কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিস্তারিত বিবরণ নির্ধারণ করা যায় না। এ বিষয়ে অতিরিক্ত দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
পবিত্র কুরআনে জ্বিনের অস্তিত্ব
জ্বিন সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন স্থানে আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সূরা আল-জ্বিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “বলুন, আমার প্রতি ওহি করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে কুরআন শ্রবণ করেছে। অতঃপর তারা বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি।”—সূরা আল-জ্বিন, ৭২:১
এ আয়াত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়:
১. জ্বিনদের অস্তিত্ব বাস্তব।
২. তাদের মধ্যে কুরআন শ্রবণ ও উপলব্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে।
৩. তারা কুরআনের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
৪. তাদের মধ্যে ঈমান গ্রহণকারী ও অবিশ্বাসী উভয় শ্রেণির অস্তিত্ব রয়েছে।
সূরা আল-জ্বিনের পরবর্তী আয়াতগুলোতে জ্বিনদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তারা বলেছে, কুরআন সঠিক পথের সন্ধান দেয় এবং তারা এর প্রতি ঈমান এনেছে।
অর্থাৎ জ্বিনদেরও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, অবিশ্বাস এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে।
জ্বিন কি মানুষের মতো বিবেকসম্পন্ন?
ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে, জ্বিনদেরও মানুষের মতো স্বাধীন ইচ্ছা ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “আর আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।”—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জ্বিন ও মানুষ উভয়ের সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত।
তবে মানুষের সঙ্গে জ্বিনের পার্থক্যও রয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রা, শারীরিক গঠন এবং জাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে আমরা প্রত্যক্ষ জ্ঞান রাখি। কিন্তু জ্বিনের জগৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত।
কুরআনের আলোকে জ্বিনদের সম্পর্কে যে বিষয়গুলো জানা যায়, সেগুলো হলো:
তাদের অস্তিত্ব রয়েছে।
তাদের মধ্যে ঈমানদার ও অবিশ্বাসী রয়েছে।
তারা আল্লাহর ইবাদতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
তাদেরও বিচার ও প্রতিদানের মুখোমুখি হতে হবে।
তারা সাধারণত মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে।
জ্বিনদের মধ্যেও কি মুসলমান ও কাফির রয়েছে?
হ্যাঁ। পবিত্র কুরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছে।
সূরা আল-জ্বিনে জ্বিনদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে: “আর আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মুসলমান এবং কিছু সংখ্যক রয়েছে সত্যবিচ্যুত। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা সঠিক পথ অনুসন্ধান করেছে।”—সূরা আল-জ্বিন, ৭২:১৪
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, জ্বিনদের মধ্যেও বিভিন্ন বিশ্বাস ও মতাদর্শের অনুসারী রয়েছে।
তাদের মধ্যে কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী, কেউ অবিশ্বাসী। কেউ সৎকর্মশীল, কেউ অসৎকর্মে লিপ্ত।
অতএব, সব জ্বিনকে শয়তান কিংবা অশুভ সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা কুরআনের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইবলিস কি জ্বিন ছিল?
ইবলিস সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন তারা সিজদা করল, ইবলিস ছাড়া। সে ছিল জ্বিনদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল।”—সূরা আল-কাহফ, ১৮:৫০
এ আয়াতটি জ্বিন সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইবলিস জ্বিনদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে অহংকারের কারণে আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল।
ইবলিসের এই অবাধ্যতা থেকে বোঝা যায়, জ্বিনদেরও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে। তারা আল্লাহর আদেশ পালন করতে পারে, আবার অবাধ্যও হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ইবলিস জ্বিন ছিল বলে সব জ্বিন ইবলিসের মতো নয়। যেমন মানুষের মধ্যে সৎ ও অসৎ উভয় শ্রেণির মানুষ রয়েছে, তেমনি জ্বিনদের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে।
শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বিন-জিন্নাত
শিয়া ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, জ্বিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা কুরআনের প্রতি বিশ্বাসেরই অংশ।
আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষায় আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন, কুরআনের বক্তব্য উপলব্ধি এবং অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বিন সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. জ্বিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করা কুরআনের বক্তব্যের বিরোধী
যেহেতু পবিত্র কুরআনে জ্বিনের অস্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাই জ্বিনের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে জ্বিন সম্পর্কে কুরআনে যা বলা হয়েছে, তার বাইরে প্রতিটি প্রচলিত ধারণাকে ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করারও কোনো প্রয়োজন নেই।
২. আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষা ও যুক্তির গুরুত্ব
শিয়া চিন্তাধারায় ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কুরআন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
কোনো বিষয়কে ধর্মীয় সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে তার নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
জ্বিনের মাধ্যমে রোগ নিরাময়, জ্বিনের সাহায্যে ভবিষ্যৎ জানা কিংবা জ্বিনের মাধ্যমে অদৃশ্য জগতের খবর পাওয়ার মতো দাবিগুলোকে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় সূত্রের আলোকে যাচাই করা উচিত।
৩. জ্বিনের ভয় নয়, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা
ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, মানুষ যেন আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল থাকে এবং অযথা ভয় ও কুসংস্কারে আক্রান্ত না হয়।
জ্বিনের অস্তিত্ব স্বীকার করা মানে তাদের প্রতি অতিরিক্ত ভয় পোষণ করা নয়। বরং আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
এ প্রসঙ্গে সূরা আল-জ্বিনের ৬ নম্বর আয়াতে এমন কিছু মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা জ্বিনদের আশ্রয় গ্রহণ করত। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয় ও বিভ্রান্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এ আয়াত আমাদের সতর্ক করে যে, জ্বিনকে কেন্দ্র করে অযৌক্তিক নির্ভরতা কিংবা ভীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত নয়।
জ্বিন কি মানুষের ক্ষতি করতে পারে?
জ্বিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—তারা কি মানুষের ক্ষতি করতে পারে?
এ বিষয়ে ইসলামী ধর্মীয় সাহিত্যে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। তবে জ্বিনের ক্ষতি করার ক্ষমতা, তার প্রকৃতি এবং নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে জ্বিনের সম্পর্ক সম্পর্কে সব দাবিকে একইভাবে গ্রহণ করা যায় না।
বিশেষত কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে, মানসিক সমস্যায় ভুগলে কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করলে তাকে জ্বিনে আক্রান্ত বলে ঘোষণা করা অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ হতে পারে।
কারণ মানুষের অসুস্থতার পেছনে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক কিংবা পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণের বিরোধী নয়। বরং অসুস্থতার ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে জ্বিনে আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করার আগে তার চিকিৎসাগত কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
জ্বিনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা কি সম্ভব?
আমাদের সমাজে অনেক সময় দাবি করা হয়, কোনো ব্যক্তি জ্বিনের সাহায্যে মানুষের ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন, হারানো সম্পদ খুঁজে দিতে পারেন কিংবা অদৃশ্য জগতের খবর জানাতে পারেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: “বলুন, আসমানসমূহ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না।”—সূরা আন-নামল, ২৭:৬৫
অর্থাৎ অদৃশ্যের পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর।
কোনো ব্যক্তি জ্বিনের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করলেই তার বক্তব্য সত্য হয়ে যায় না। এমন দাবির মাধ্যমে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ, ভয় সৃষ্টি কিংবা ধর্মীয় বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।
তাই এ ধরনের বিষয়ে ধর্মীয় জ্ঞান, যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে বিচার করা প্রয়োজন।
জ্বিনকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার
আমাদের সমাজে জ্বিনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের গল্প ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। যেমন:
নির্দিষ্ট গাছের নিচে জ্বিন বাস করে।
নির্দিষ্ট স্থানে রাতের বেলা জ্বিন দেখা যায়।
জ্বিন মানুষকে বিয়ে করে।
জ্বিন মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে।
জ্বিনের মাধ্যমে গুপ্তধন পাওয়া যায়।
কোনো ব্যক্তি অস্বাভাবিক আচরণ করলেই বুঝতে হবে, তার ওপর জ্বিনের আছর হয়েছে।
এসব দাবির সবগুলোকে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
কোনো ঘটনা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণিত হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর সর্বজনস্বীকৃত ধর্মীয় সত্য এক বিষয় নয়।
এখানে আমাদের একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা উচিত: “জ্বিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা ঈমানের বিষয়; কিন্তু জ্বিন সম্পর্কে প্রচলিত প্রতিটি গল্পে বিশ্বাস করা ঈমানের শর্ত নয়।”
জ্বিন সম্পর্কে আমাদের করণীয়
জ্বিন-জিন্নাত সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জনের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত: পবিত্র কুরআনের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। জ্বিন সম্পর্কে কুরআনে যা বলা হয়েছে, তা যথাযথভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় সূত্রের অনুসরণ করতে হবে। বিশেষত আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষার আলোকে জ্বিন সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনাগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত: কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে দূরে থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি জ্বিনের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করলেই তার বক্তব্য গ্রহণ করা উচিত নয়।
চতুর্থত: অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে জ্বিনে আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করে তার চিকিৎসা বন্ধ করা কিংবা তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা সম্পূর্ণ অনুচিত।
পঞ্চমত: আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল থাকতে হবে। মানুষের জীবনে ভয়, উদ্বেগ ও বিপদের সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
জ্বিন-জিন্নাত এমন এক সৃষ্টি, যাদের অস্তিত্ব পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। তাদের সৃষ্টি, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, নৈতিক দায়িত্ব এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য সম্পর্কে কুরআনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।
কিন্তু জ্বিন সম্পর্কে আমাদের সমাজে প্রচলিত অসংখ্য গল্প, ভয় ও কুসংস্কারের সঙ্গে কুরআনের বক্তব্যকে এক করে দেখা উচিত নয়।
শিয়া ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে জ্বিন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি হওয়া উচিত জ্ঞান, প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র—ভয়, গুজব কিংবা অন্ধবিশ্বাস নয়।
জ্বিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা যেমন কুরআনের নির্দেশনার অংশ, তেমনি জ্বিনকে ঘিরে অযৌক্তিক ভয় ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকাও একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব।
শিয়াদের দৃষ্টিতে শরিয়তের মূল উৎস
মাওলানা আব্দুল লতিফ
ইমামিয়া শিয়া ফিকহশাস্ত্রের গ্রন্থাবলি গভীরভাবে অধ্যয়ন ও গবেষণা করলে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শিয়া মাযহাবের যাবতীয় ফিকহি বিধিবিধান মূলত মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর শিক্ষা ও নির্দেশনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এই শিক্ষা ও নির্দেশনা বারোজন পবিত্র ইমাম (আ.)-এর মাধ্যমে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছে। ইমামিয়া শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী, শরিয়তের মূল উৎস দুটি—মহান আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর সুন্নাত। অর্থাৎ প্রথম ও প্রধান উৎস হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং দ্বিতীয় উৎস হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত।
অতীত ও বর্তমান যুগের শিয়া আলেমদের বক্তব্য এবং আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণের (আ.) বাণী পর্যালোচনা করলে এ সত্য আরও সুস্পষ্ট হয়। পবিত্র ইমামগণ কখনো দাবি করেননি যে, তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত মতামত বা স্বাধীন চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে শরিয়তের বিধান প্রণয়ন করেছেন। বরং তাঁরা সর্বদা নিজেদের বক্তব্য ও নির্দেশনাকে মহান আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন।
ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, যখন হযরত আলী (আ.)-এর কাছে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তখন তাঁর সামনে একটি শর্ত রাখা হয়েছিল। শর্তটি ছিল, তিনি যদি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে হযরত আবু বকর ও হযরত উমরের অনুসৃত নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করেন, তাহলে তাঁকে খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করা হবে। কিন্তু হযরত আলী (আ.) এ শর্ত গ্রহণ না করে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি কেবল মহান আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত অনুযায়ী আমল করবেন।
এ ঘটনার কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইমামিয়া শিয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে হযরত আলী (আ.)-এর ইজতিহাদকে কুরআন ও সুন্নাত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো স্বাধীন মতামত হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বরং তিনি মহান আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাতের প্রকৃত জ্ঞান ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই শরিয়তের বিধান বর্ণনা করতেন।
হযরত আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলতেন, আমাদের কাছে ‘আল-জামিআ’ নামে একটি সহিফা রয়েছে, যাতে মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ের বিধিবিধান লিপিবদ্ধ আছে। এমনকি শরীরের সামান্য আঁচড় বা ক্ষতসংক্রান্ত বিধানও তাতে উল্লেখ রয়েছে। আল-জামিআ এমন একটি লিখিত সংকলন, যার বিষয়বস্তু মহানবী (সা.)-এর মুখনিঃসৃত বাণী এবং যা হযরত আলী (আ.) নিজ হাতে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
এ থেকে ইমামিয়া শিয়াদের বিশ্বাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিফলিত হয়। তা হলো, আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) শরিয়তের বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যক্তিগত অভিমতকে প্রাধান্য দেননি; বরং মহানবী (সা.) থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও শিক্ষাকেই অনুসরণ করেছেন।
হযরত আলী (আ.) ও নববী সুন্নাতের অনুসরণ
ড. মুহাম্মাদ আল-তিজানী আল-সামাভী তাঁর আলোচনায় হযরত আলী (আ.)-এর সুন্নাত অনুসরণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হলো, হযরত আলী (আ.) সর্বদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত অনুসরণ করতেন এবং কখনো তা অমান্য করতেন না। বরং তিনি মুসলিম সমাজে মহানবীর সুন্নাত পুনরুজ্জীবিত করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করতেন।
এ কারণে তৎকালীন শাসনব্যবস্থার সমর্থক কোনো কোনো ব্যক্তি তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হলেও তিনি সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর অবস্থান ছিল, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য যদি অন্যদের অসন্তুষ্টির সম্মুখীন হতে হয়, তবুও তিনি সেই পথ থেকে সরে আসবেন না।
বস্তুত হযরত আলী (আ.)-এর জীবনাদর্শের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কুরআন ও সুন্নাতের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাঁর দৃষ্টিতে শরিয়তের বিধান মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা প্রচলিত রীতিনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্ধারিত।
ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.)-এর দৃষ্টিতে শরিয়তের বিধান
পঞ্চম ইমাম হযরত মুহাম্মাদ বাকির (আ.) শরিয়তের বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে কুরআন ও নববী সুন্নাতের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।
তাঁর থেকে বর্ণিত একটি বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, আমরা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে মানুষের কাছে শরিয়তের বিধান বর্ণনা করতাম, তাহলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত, যেমন অতীতে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছিল। আমরা তোমাদের কাছে যা কিছু বর্ণনা করি, তার ভিত্তি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সেই জ্ঞান, যা তিনি তাঁর নবীকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং নবী আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
অন্য একটি বর্ণনায় ইমাম বাকির (আ.) তাঁর বিশিষ্ট সাহাবি জাবিরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে জাবির! আমরা যদি নিজেদের মতামত ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তোমাদের কাছে কোনো বক্তব্য পেশ করতাম, তাহলে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যেতাম। বরং আমরা তোমাদের কাছে সেই হাদিসসমূহ বর্ণনা করি, যা মহানবী (সা.) থেকে সংরক্ষণ করেছি। মানুষ যেমন সোনা-রুপা সযত্নে সঞ্চয় করে, আমরাও তেমনি মহানবীর হাদিসসমূহ সযত্নে সংরক্ষণ করেছি।
এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, ইমামিয়া শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) শরিয়তের বিধান বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি বা অনুমাননির্ভর মতামতের পরিবর্তে মহানবী (সা.) থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতেন।
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বক্তব্য ও শরিয়তের ভিত্তি
ষষ্ঠ ইমাম হযরত জাফর সাদিক (আ.)-ও শরিয়তের বিধান নির্ধারণে ব্যক্তিগত মতামতের পরিবর্তে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাত অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তাঁর থেকে বর্ণিত একটি বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, আল্লাহর শপথ! আমরা নিজেদের প্রবৃত্তি বা ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি অনুযায়ী কোনো কথা বলি না। আমরা যা কিছু বর্ণনা করি, তা মহান আল্লাহর বাণী ও তাঁর রাসুলের শিক্ষা থেকে গ্রহণ করি। কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়ও আমরা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করি না; বরং রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের ভিত্তিতেই উত্তর প্রদান করি।
আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণের (আ.) জীবন ও শিক্ষার ওপর গবেষণা করলে দেখা যায়, তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত মতামতকে শরিয়তের স্বতন্ত্র উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁদের শিক্ষা ও নির্দেশনার মূল ভিত্তি ছিল পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর সুন্নাত।
ইমামিয়া শিয়া ফিকহের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, আহলে বাইতের ইমামগণের (আ.) নির্ভরযোগ্য বাণী ও নির্দেশনাকে মহানবীর সুন্নাতের ব্যাখ্যা ও ধারাবাহিকতা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ কারণে শিয়া ফিকহে ইমামগণের বর্ণিত হাদিস ও নির্দেশনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
শিয়া ফিকহে ইজতিহাদ, আকল ও ইজমার অবস্থান
সমকালীন শিয়া ফিকহি চিন্তার অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ বাকির আস-সাদর তাঁর আল-ফাতাওয়া আল-ওয়াদিহা গ্রন্থে শরিয়তের বিধান নির্ণয়ের মূলনীতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
ইমামিয়া শিয়া ফিকহে শরিয়তের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাত মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তবে ফিকহি মূলনীতি বা উসুলুল ফিকহের আলোচনায় সাধারণভাবে চারটি দলিলের কথা উল্লেখ করা হয়—কুরআন, সুন্নাত, ইজমা ও আকল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইমামিয়া শিয়া ফিকহে ইজমা বা আলেমদের ঐকমত্যকে কুরআন ও সুন্নাতের মতো স্বতন্ত্র আইনপ্রণয়নের উৎস হিসেবে গণ্য করা হয় না। বরং ইজমা তখনই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তার মাধ্যমে মাসুমের (আ.) বক্তব্য বা শরিয়তের প্রকৃত বিধান উদ্ঘাটিত হয়।
অনুরূপভাবে আকল বা বিবেক-বুদ্ধির দলিল সম্পর্কেও শিয়া মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা ও মতপার্থক্য রয়েছে। ইমামিয়া উসুলি ফিকহে সুনিশ্চিত আকলি দলিলকে নির্দিষ্ট শর্তে শরিয়তের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। তবে অনুমাননির্ভর যুক্তি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দকে শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট মনে করা হয় না।
বিশেষত কিয়াস ও ইস্তিহসানের বিষয়ে ইমামিয়া শিয়া ফিকহের অবস্থান সুস্পষ্ট। শিয়া ফকিহগণ সাধারণভাবে অনুমাননির্ভর কিয়াস ও ব্যক্তিগত বিবেচনাভিত্তিক ইস্তিহসানকে শরিয়তের স্বতন্ত্র দলিল হিসেবে গ্রহণ করেন না।
অর্থাৎ শরিয়তের বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়, যা নিশ্চিত ধর্মীয় দলিলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত অনুমান বা পছন্দের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
(দ্রষ্টব্য: শহীদ আয়াতুল্লাহ মুহাম্মাদ বাকির আস-সাদর, আল-ফাতাওয়া আল-ওয়াদিহা, পৃ. ৯৮—মূল লেখায় উল্লিখিত তথ্য।)
কিয়াস সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর সতর্কবাণী
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এবং ইমাম আবু হানিফার মধ্যে কিয়াসসংক্রান্ত একটি প্রসিদ্ধ আলোচনার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আবু হানিফাকে অনুমাননির্ভর কিয়াসের মাধ্যমে ধর্মীয় বিধান নির্ধারণ করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন।
তিনি বলেন, হে আবু হানিফা! কিয়াসের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বিনের বিধান নির্ধারণ করো না। কেননা দ্বিনের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিয়াস অনুসরণ করলে মানুষ বিভ্রান্তির সম্মুখীন হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ইবলিসের উদাহরণ তুলে ধরেন। ইবলিস হযরত আদম (আ.)-এর সামনে সিজদা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যুক্তি দিয়েছিল যে, সে আদমের চেয়ে উত্তম। কারণ তাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।
পবিত্র কুরআনে ইবলিসের এ বক্তব্য উল্লেখ রয়েছে: ‘সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’ (সুরা আল-আরাফ, ৭:১২)
এই ঘটনার মাধ্যমে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ধর্মীয় বিধান নির্ধারণে অনুমাননির্ভর তুলনা ও ব্যক্তিগত যুক্তির সীমাবদ্ধতার প্রতি সতর্ক করেছেন বলে ইমামিয়া শিয়া আলেমগণ ব্যাখ্যা করেন।
তবে এখানে লক্ষণীয় যে, ইমামিয়া শিয়া ফিকহে সব ধরনের যুক্তি বা বিচার-বিশ্লেষণ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। বরং অনুমাননির্ভর কিয়াস এবং নিশ্চিত আকলি দলিলের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা হয়।
কুরআন ও সুন্নাতের প্রতি অবিচল আনুগত্য
হযরত আলী (আ.)-এর যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী ইমামগণের (আ.) শিক্ষা এবং বর্তমান যুগের ইমামিয়া শিয়া ফিকহি চিন্তাধারায় কুরআন ও সুন্নাতের প্রতি আনুগত্য একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
শিয়া ফকিহগণ শরিয়তের বিধান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআন, মহানবী (সা.)-এর সুন্নাত এবং আহলে বাইতের ইমামগণের (আ.) নির্ভরযোগ্য বর্ণনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। তাঁদের মতে, শরিয়তের প্রকৃত বিধান মানুষের ব্যক্তিগত অনুমান, প্রবৃত্তি কিংবা মনগড়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না।
ইমামিয়া শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত শিক্ষার সংরক্ষক, ব্যাখ্যাকারী ও ধারক। তাঁদের অনুসরণের উদ্দেশ্য কোনো নতুন শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং মহানবীর আনীত শরিয়তকে যথাযথভাবে জানা, সংরক্ষণ করা এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
সুতরাং বলা যায়, ইমামিয়া শিয়া ফিকহের মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত। আর ইজমা ও আকল নির্দিষ্ট মূলনীতি ও শর্তের অধীনে শরিয়তের বিধান উদ্ঘাটনের সহায়ক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইসলামি শরিয়তের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত মতামত ও প্রবৃত্তির পরিবর্তে মহান আল্লাহর নির্দেশনা এবং তাঁর রাসুলের আদর্শকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করা। ইমামিয়া শিয়া ফিকহে এই নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণের (আ.) শিক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা সর্বদা মুসলিম উম্মাহকে পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাত অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য ও নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সংরক্ষণ এবং মুসলমানদের সঠিক পথে পরিচালিত করা।
অতএব, প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং ধর্মীয় বিধান অনুসরণের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান ও প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর পবিত্র কিতাব এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নাত যথাযথভাবে অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। তিনি যেন আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে চেনার এবং তা অনুসরণ করার শক্তি প্রদান করেন।
নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। আমিন।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর বিচ্ছেদে
হযরত আলী (আ.)-এর ব্যথিত হৃদয়
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর জীবনে এক গভীর শোকাবহ অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রিয়তমা সহধর্মিণীর বিচ্ছেদে তাঁর হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যার বিদায় হযরত আলী (আ.)-এর জন্য ছিল এক অসহনীয় মর্মবেদনার ঘটনা।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-কে দাফন করার সময় হযরত আলী (আ.) মহানবী (সা.)-এর উদ্দেশে যে হৃদয়বিদারক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন, তাতে তাঁর গভীর শোক, ভালোবাসা, ধৈর্য এবং তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহের বেদনাময় চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছিলেন—“হে রাসূলুল্লাহ! আমার পক্ষ থেকে এবং আপনার সেই কন্যার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি সালাম, যিনি আপনার সান্নিধ্যে গমন করেছেন এবং আপনার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।
হে রাসূলুল্লাহ! আপনার অতি প্রিয় কন্যার বিচ্ছেদে আমার ধৈর্যশক্তি হ্রাস পেয়েছে এবং তাঁর শোকে আমার সহ্যক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে আপনার মহাপ্রয়াণ ও আপনাকে হারানোর মতো বিরাট মুসিবতে আমি যে ধৈর্যধারণ করতে পেরেছিলাম, তার মধ্যেই আমার সান্ত্বনা নিহিত রয়েছে।
আমি নিজ হাতে আপনাকে কবরে শায়িত করেছিলাম। আর আমার গ্রীবা ও বক্ষদেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানকালেই আপনার পবিত্র আত্মা দেহত্যাগ করেছিল। নিশ্চয়ই আমরা মহান আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করব।
আজ আমার কাছে গচ্ছিত আমানত ফিরিয়ে নেওয়া হলো এবং আমাকে যা প্রদান করা হয়েছিল, তা পুনরায় প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। এখন থেকে আমার দুঃখ ও শোক স্থায়ী হয়ে গেল। আমার রাতগুলো কাটবে নিদ্রাহীনতা ও নিরন্তর জাগরণের মধ্য দিয়ে, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ আমাকে সেই আবাসের জন্য মনোনীত করেন, যেখানে আপনি অবস্থান করছেন।
হে রাসূলুল্লাহ! অচিরেই আপনার কন্যা আপনাকে অবহিত করবেন, আপনার উম্মত তাঁর ওপর কী ধরনের অত্যাচার ও অবিচার করেছে। অতএব, আপনি তাঁর কাছে বিস্তারিতভাবে সবকিছু জিজ্ঞাসা করুন এবং তাঁর কাছ থেকেই প্রকৃত অবস্থা জেনে নিন।
আপনার ইন্তেকালের পর খুব বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। আপনার পবিত্র স্মৃতি এখনো মানুষের হৃদয়ে অম্লান রয়েছে।
আপনাদের উভয়ের প্রতি আমার সালাম। এ সালাম একজন বিদায় গ্রহণকারীর; তবে তা কোনো বিরক্ত, অসন্তুষ্ট কিংবা সম্পর্কচ্ছেদকারীর বিদায়ী সালাম নয়।
আমি যদি এখান থেকে ফিরে যাই, তবে তা এ কারণে নয় যে, আমি আপনাদের স্মরণে ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে পড়েছি। আর যদি এখানে অবস্থান করি, তবে তা এ কারণে নয় যে, মহান আল্লাহ তাঁর ধৈর্যশীল বান্দাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার প্রতি আমার আস্থা ও বিশ্বাসে কোনো ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।” (সূত্র: নাহজুল বালাগা, খুতবা নং ২০২ থেকে নির্বাচিত অংশ।)
ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কাছ
থেকে দূরে সরে যাওয়ার আহ্বান ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে কোনো হামলা মোকাবিলায় ইরান সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পর্কের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খতিবজাদেহ বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপ একের পর এক ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে। এখন তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে।
তার ভাষ্য, ‘ভুল নীতির’ কারণে বড় বড় বৈশ্বিক ইস্যুতে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ক্রমেই গুরুত্ব হারিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইউরোপকে নিজেদের নীতিগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
খতিবজাদেহ আরও বলেন, ইসরায়েলের ‘অপরাধ’ এবং আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইন বারবার লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে হবে। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ইউরোপের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার অবস্থান তুলে ধরা কঠিন।
ইরানের এই কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া বন্ধ না করা পর্যন্ত তাদের ওপর আস্থা রাখা কঠিন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে ইউরোপকে আন্তরিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
খতিবজাদেহর বক্তব্যে ইউরোপের প্রতি ইরানের অসন্তোষের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে তেহরানের উদ্বেগও উঠে এসেছে। ইরানের অবস্থান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে ইউরোপকে তার নীতিতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। সূত্র: আল-জাজিরা
হযরত ফাতেমার (আ.) শাহাদত ও আমাদের শিক্ষা
আলী নওয়াজ খান
আহলে বাইত (আ.)-এর প্রেমিকদের কাছে ১৩ জমাদিউল আউয়াল থেকে ৩ জমাদিউস সানি পর্যন্ত মা ফাতেমার (সা.আ.) শাহাদত দিবস উপলক্ষে বিশেষ শোকের দিন। কেননা কোনো কোনো রেওয়াতে বর্ণিত হয়েছে, মহানবীর (স.) পরলোকগমনের পর মা ফাতেমা (সা.আ.) ৭৫ দিন জীবিত ছিলেন। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় ৯৫ দিনের কথা এসেছে। আর এ জন্যই আহলে বাইত প্রেমিকগণ ১৩ জমাদিউল আউয়াল থেকে ৩ জমাদিউস সানি পর্যন্ত বিশ দিন মা ফাতেমার (সা.আ.) শাহাদত দিবস উপলক্ষে শোক পালন করে থাকেন।
হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন বিশ্বের সকল মুমিন ও মুমিনার জননী। কেননা মহানবী (স.) বলেছেন, “আমি ও আলী এই মুসলিম উম্মতের পিতা।” তাই নবীপত্নীগণ ও হযরত ফাতেমা (সা.আ.) মুসলিম উম্মাহর জননী।
মা ফাতেমা (সা.আ.) পরকালে তাঁর অনুসারীদের শাফায়াত করবেন এবং তিনি হলেন খাতুনে জান্নাত। হাদিসের এই কথাগুলোই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নিচের এই কবিতায় ফুটে উঠেছে।
বিশ্ব দুলালী নবী নন্দিনী
খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী
মদিনাবাসিনী পাপ ও তাপ নাশিনী
উম্মত তারিণী আনন্দিনী
বিশ্ব দুলালী নবী নন্দিনী
খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী
সাহারা বুকে মাগো তুমি মেঘমায়া
তপ্ত মরুর বুকে স্নেহতরু ছায়া
মুক্তি লভিল মাগো তব সুখপরশে
বিশ্বের যত নারী বন্দিনী
বিশ্ব দুলালী নবী নন্দিনী
খাতুনে জান্নাত ফাতেমা জননী
অতএব, বিশ্বের সকল মুমিন ও মুমিনার জননী, শাহিদাহ, যাঁর জীবন ছিল অলৌকিকত্বে ভরপুর, সেই ঐশী নারীর পিতা ছিলেন সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ অস্তিত্ব রাহমাতুল লিল আলামিন, যাঁর সন্তানদ্বয় ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসেন (আ.) বেহেশতবাসী যুবকদের সর্দার, যিনি নিজেই বেহেশতবাসী নারীকুলের সম্রাজ্ঞী, যাঁকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন না। তাঁর শাহাদত ও ক্ষণিকের এ জীবনের মধ্যে রয়েছে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা। তাই আজ যদি আমরা মা ফাতেমার (আ.) জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ জীবনচর্চা করতে পারি, তাহলে মহানবীর আদর্শের আলোতে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবন আলোকিত হয়ে উঠবে।
মা ফাতেমার (সা.আ.) শাহাদতের মধ্যে যে গুপ্ত রহস্যগুলো লুকিয়ে রয়েছে, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক জীবন গঠনের মূলশক্তি হিসেবে পরিচিত, আজ আমরা এখানে সে বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।
মা ফাতেমা (আ.) বিশ্ববাসীর কাছে একটি নীরব প্রশ্ন রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। সেই প্রশ্নটির মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের জন্য অনেক শিক্ষার বিষয় রয়েছে। আর এ শিক্ষা যদি আমরা গ্রহণ করতে পারি, তাহলে নিজের পারলৌকিক জীবনসহ পার্থিব জীবন ও আদর্শ সমাজ গড়ার শক্তি খুঁজে পাব। আর যদি শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হই, তাহলে ইতিহাসের দুঃখজনক অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তির জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হবে আমাদের জীবন ও জাতির ভবিষ্যৎ। ফলে মানবজাতির দুশমন ও ইবলিস শয়তানের রাজত্বের পরিধি বিস্তার লাভ করবে এবং মুমিন ও মুসলিম সমাজ ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।
মূলত প্রশ্ন হলো, মা ফাতেমাকে (সা.আ.) এই অল্প বয়সে জীবন দিতে হলো কেন?
কেন তাঁর গৃহে হানা দেওয়া হয়েছিল?
কেন তিনি অসিয়ত করে গেলেন, রাতের আঁধারে ও গোপন স্থানে যেন তাঁকে দাফন করা হয়?
মহানবীর (স.) ঐশী মিশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সে যুগে যে চক্রটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল, তার প্রমাণ সূরা তওবার ১০১ নম্বর আয়াতে মহান প্রতিপালক ফাঁস করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন: “তোমাদের চারপাশে থাকা মরুবাসীদের (আরবদের) মধ্যকার একটি দল হচ্ছে মুনাফিক এবং মদিনাবাসীদের মধ্যেও অনেকে কপটতায় সিদ্ধ। তুমি তাদের চেনো না। আমি তাদের চিনি। অচিরেই আমি তাদের দুইবার শাস্তি দেব। পরে তাদের আরও মহাশাস্তির জন্য ফিরিয়ে আনা হবে।” (৯:১০১)
অতএব, মহানবীর যুগ থেকেই একটি দল সুসংগঠিতভাবে মহানবীর ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারাই মহানবীর পরবর্তী সময়ে ইসলামের ইতিহাসে মহানবীর আদর্শকে ভুলে গিয়ে একের পর এক মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছিল এবং বনি সাকিফার ঘটনা, মা ফাতেমার (সা.আ.) গৃহে আগুন দেওয়ার ঘটনাসহ কারবালার ঘটনার মতো অতি নিকৃষ্ট ঘটনাসমূহ ইতিহাসে সৃষ্টি করেছিল। মা ফাতেমার (সা.আ.) সম্পত্তি বাগে ফাদাক ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের নেকাব উন্মোচন করেছিল।
সেই সত্য লুণ্ঠনকারীদের মা ফাতেমা (আ.) তাঁর বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ছোট একটি অসিয়তের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। তৎকালীন যুগের কপট ও ভণ্ড নবীপ্রেমিক, যারা গাদীরে খুমে রাসূলের (স.) অসিয়তকে, মা ফাতেমার (সা.আ.) বাগে ফাদাককে এবং আহলে বাইতের (আ.) সম্মানকে পদতলে পিষ্ট করেছিলেন, তাদের সকলের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। মা ফাতেমা (সা.আ.) উন্মুক্ত করে দিয়েছেন তাদের নখরগুলো। তারা যে কতখানি ভয়ংকর ও হিংস্র ছিল, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। ইসলামের ইতিহাসের সেই লুকায়িত চরম সত্যকে মা ফাতেমা (আ.) আমাদের কাছে উন্মোচিত করে দিয়ে গেলেন তাঁর করুণ শাহাদতের মধ্য দিয়ে।
উপরে উল্লিখিত পবিত্র আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মহানবীর পাশে থাকলেই কেউ আদর্শপুরুষ নন। বরং মহানবীর আদর্শ বা সিরাত অনুসরণের মাধ্যমে সাহাবি পরিভাষা সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত। অথচ ইতিহাসে সাহাবি পরিভাষার মিথ্যা সংজ্ঞা দিয়ে মহানবীর (স.) আদর্শবিরোধী ও আহলে বাইতের (আ.) শত্রুদের পাপমোচনের অপচেষ্টা করা হয়েছে। মা ফাতেমা (সা.আ.) তাদের অপচেষ্টা ও মহানবীর কপট অনুসারীদের নেকাব খুলে দিয়েছেন। কেননা মহানবীর (স.) অবর্তমানে সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের একটি বিশুদ্ধ মাপকাঠি ছিলেন হযরত ফাতেমা (সা.আ.)। মহানবী (স.) বলে গেছেন, “ফাতেমা আমার দেহের অংশ। যে তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেই কষ্ট দিল। আর যে আমাকে কষ্ট দিল, সে মহান আল্লাহকে রাগান্বিত করল।”
কিন্তু আফসোস! মহানবীর (স.) পরলোকগমনের পর মা ফাতেমার (সা.আ.) সঙ্গে তথাকথিত সাহাবিদের আচরণের ভিত্তিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কারা মহানবীর (স.) আদর্শের প্রকৃত অনুসারী ছিলেন আর কারা সুবিধাবাদী অনুসারী বা কপট সাহাবি ছিলেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মদিনায় এত মুসলমান বসবাস করা সত্ত্বেও কেন মা ফাতেমাকে (আ.) শহীদ হতে হলো?
কেন ইতিহাসের সর্বাধিক শক্তিশালী, জ্ঞানী ও আবেদ মানুষ মাওলা আলী (আ.)-এর গলায় দড়ি বেঁধে তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো?
কেন জনগণের পক্ষ থেকে আশানুরূপ কোনো প্রতিবাদ আসেনি?
কেন মা ফাতেমার (আ.) গৃহে, যেখানে আল্লাহর ওহি নাজিল হয়েছিল, সেখানে আগুন জ্বালানো হলো?
জানি না, আমার প্রশ্নগুলো আপনারা বুঝতে পেরেছেন কি না। প্রকৃতপক্ষে মা ফাতেমা (আ.) নিজেই এ প্রশ্নগুলো আমাদের কাছে উত্তরের জন্য রেখে গেছেন। তিনি চেয়েছেন, তাঁর অনুসারীরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করবেন।
নিঃসন্দেহে আপনারা জানেন, যখন মহানবীকে (স.) দাফন না করেই তথাকথিত সাহাবিরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে বনি সাকিফায় চলে গেলেন, তখনই মা ফাতেমা (আ.) মদিনায় প্রত্যেকের বাসায় বাসায় গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে ডেকে বলেছিলেন, “তোমরা কি জানো না, গাদীরে খুমে আমার বাবা রাসূলুল্লাহ তাঁর উত্তরসূরি মনোনীত করে গিয়েছিলেন? আপনারা কি জানেন না, আবুল হাসানকে তাঁর পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে গেছেন? আপনারা কি জানেন না…!”
আপনারা কি জানেন, সেদিন সদ্য পিতৃহারা মা ফাতেমাকে (আ.) তাঁরা কী জবাব দিয়েছিলেন?
“ওহে উম্মে হাসান! আমরা কিছু করতে পারব না। তুমি দেরি করে ফেলেছ। এখন আমাদের আর কিছুই করার নেই!
তুমি ফিরে যাও, নতুবা আমরা সমস্যায় পড়ব!”
শুধু তাই নয়, সেদিন মদিনাবাসী মা ফাতেমাকে (আ.) তাদের কাছে আসতে দেখে ঘরের দরজা-জানালা ঘটঘট করে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে তাঁর করুণ ফরিয়াদ শুনতে না হয়! মা ফাতেমার (আ.) কান্নার আওয়াজ শুনে কেউই জিজ্ঞাসা করতে আসেননি, কেন তিনি এত কাঁদছেন?
তারা জানতেন, ইসলামকে বিপদগ্রস্ত দেখেই তিনি কাঁদছেন। এ কান্না শুধু পিতা হারানোর কান্না নয়! বরং এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি কাঁদছেন যে, আল্লাহর দ্বীনকে তথাকথিত সাহাবিদের দ্বারা পয়মাল করা হচ্ছে, আর তিনি তা রক্ষায় কিছুই করতে পারছেন না!
এটা ছিল ইসলামের ভবিষ্যৎ ও রাসূলের অসিয়ত ভূলুণ্ঠিত হওয়ার আক্ষেপের কান্না। আর এ জন্য তিনি যত দিন বেঁচে ছিলেন, একাধারে এ দৃশ্য দেখে কেঁদে গেছেন!
এর মূল কারণ কী?
কেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুগেই এজাতীয় মহাবিপর্যয় ঘটল?
কেন মহানবীর হাতে দীক্ষা লাভকারী মুসলমানরা হঠাৎ করে পিছুটান দিলেন? কারবালার খুনে রাঙা পথের সূচনা এখান থেকেই ঘটেছিল! অন্যায়ের মোকাবিলায় দুর্বল ঈমানদারদের নীরবতা জালিমের অপরাধের পথকে সুগম করে দিয়েছিল। সেদিন যদি প্রতিবাদ করে অন্যায়কারীদের রুখে দেওয়া হতো, তাহলে কারবালার তিক্ত ইতিহাস হয়তো রচিত হতো না।
আমরা যদি এর মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হই, তাহলে মা ফাতেমার (আ.) অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারব এবং রাসূলের আদর্শ রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব কী, তা চিহ্নিত করতে সক্ষম হব।
এই চরম হৃদয়বিদারক ঘটনার মূলে তিন শ্রেণির মানুষ ছিলেন চরম অপরাধী। শুধু সেদিনই নয়, যুগে যুগে এজাতীয় মানুষদের যথাসময়ে নিজ দায়িত্ব পালন না করার অপরাধের কারণে ধ্বংস হয়েছে বহু জনপদ, হারাতে হয়েছে অসংখ্য মহাপুরুষকে এবং বিনষ্ট করা হয়েছে তাঁদের মূল্যবান জীবনের শত পরিশ্রম। অতএব, এ বিষয়টি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। তাই সকলের মনোযোগ কামনা করছি।
এজাতীয় ঘটনা সৃষ্টির মৌলিক কারণসমূহ:
এক. প্রত্যেক সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা তাঁদের চোখের সামনে অন্যায় বা অপরাধমূলক কাজ ঘটলেও নিষ্ক্রিয় থাকেন। তাঁদের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে অপরাধীরা অন্যায় কাজের অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকে। এ লোকগুলো যথাসময়ে সঠিক ভূমিকা পালন করলে অন্যায়কারীরা এতখানি উদ্ধত হতে পারত না এবং তাদের নীলনকশা মাঠেই মারা যেত। কিন্তু সমাজে বিচক্ষণতার অভাব ও দুনিয়ার মোহ জনগণকে প্রতিরোধের পথে নিস্পৃহ করে দেয়। ফলে তাঁরা একদিকে ইসলামের একটি মূল ফরজ দায়িত্ব, সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ পরিত্যাগ করেন, আর অন্যদিকে সমাজে অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করেন। মহান আল্লাহ এজাতীয় লোকদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন: “বনি ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছে, তাদের দাউদ ও মারইয়ামপুত্র ঈসার মুখে লানত করা হয়েছে। তা এ কারণে যে, তারা অবাধ্য হয়েছে এবং তারা সীমালঙ্ঘন করত।” (সূরা মায়েদা, ৭৮)
“তারা পরস্পরকে অন্যায় কাজে নিষেধ করত না। তারা যা করত, তা কতই না মন্দ!” (সূরা মায়েদা, ৭৯)
অতএব, সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ যদি কেউ না করে, তাহলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাদের প্রতি অভিশাপ দেন। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে হিকমতের সঙ্গে এ দায়িত্বটি আমাদের জীবনের সঙ্গে বেঁধে নিতে হবে।
দুই. সমাজের সবাই কিন্তু বেদ্বীন নয়। কিন্তু কিছু শয়তান লোক তাদের চক্রান্তমূলক অভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য মিথ্যা গুজব ও নানা অপপ্রচার করে থাকে। আর এই গুজবের প্রভাবে দুর্বল ঈমানের মানুষেরা প্রভাবিত হয়ে একজন ভালো ও আদর্শবান মানুষের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করতে থাকে এবং ওই ভুল ধারণাগুলো তারা মনের মধ্যে লালন করতে থাকে। আর যখনই ওই যোগ্য লোকটি কোনো চক্রান্তের শিকার হন, তখন ওই দুর্বল ঈমানের লোকগুলো ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষে চলে যায়। ফলে আদর্শ মানুষ হলেও তিনি কঠিন মুহূর্তে নিঃসঙ্গ ও একাকী হয়ে পড়েন।
আর এ জন্য পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক সন্দেহ থেকে নিজেদের রক্ষা করো। নিশ্চয় কতক সন্দেহ গুনাহ। এবং কারও গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করাকে পছন্দ করে? বস্তুত, তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরা হুজুরাত, ১২)
অতএব, আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখতে পাই, সমাজ সংশোধনের জন্য কেউ অগ্রসর হলেই সমাজের কিছু স্বার্থপর ও হিংসুক মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা ও ভিত্তিহীন অপবাদ ছড়াতে থাকে। ফলে যারা অপবাদ ছড়ায়, তারা সমাজের কোনো উন্নয়নমূলক কাজ তো করেই না, আর যিনি করতে চেয়েছিলেন, তাঁকে বাধাগ্রস্ত করার ফলে সমাজের উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয় না। আর এভাবে ধীরে ধীরে সমাজের মানুষেরা আত্মিক ও নৈতিক দিক থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সমাজ অপকর্মে ভরে যায়।
মিথ্যা অপবাদ ও ভিত্তিহীন সন্দেহের কারণে একজন যোগ্য মানুষের ব্যক্তিত্বকে হত্যা করা হয়। ফলে সমাজ তাঁর সুফল থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে। আর এ জন্যই আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই, ইমাম আলী (আ.)-এর বিরুদ্ধে এতটা অপবাদ দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি যখন মসজিদে শহীদ হলেন, তখন এ খবর শুনে দামেস্কের লোকেরা বলতে লাগল, “আলী কি নামাজ পড়তেন? তিনি মসজিদে কী করতে গিয়েছিলেন?”
আর এ জন্যই কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপ হলো গিবত বা অন্যের ব্যক্তিত্বকে ছোট করার জন্য পরচর্চা করা। অতএব, আমাদের কারও উচিত নয় পরনিন্দায় লিপ্ত হওয়া বা কান দেওয়া। কেননা এই অপরাধগুলো সমাজকে ধ্বংস করে ফেলে।
তিন. ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার বা নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য কিছু মানুষ সত্যকে জানার পরও অন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করে থাকে। অর্থাৎ সত্যের ওপর বিপদ অনুভব করলেও পার্থিব স্বার্থের কারণে এগিয়ে আসে না। এমনকি ব্যক্তিস্বার্থের কারণে অন্যায়কারীদের পক্ষ অবলম্বন করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.)-এর একটি ঘটনা এভাবে তুলে ধরেছেন যে, যখন হযরত মুসা (আ.) তাঁর জাতিকে শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে যাওয়ার আহ্বান করলেন, তখন তারা আল্লাহর নবীকে বলল, “হে মুসা! তুমি আর তোমার খোদা গিয়ে যুদ্ধ করো, আমরা এখানে বসে থাকলাম।”
“তারা বলল, হে মূসা, আমরা জীবনে কখনো সেখানে যাব না, যতক্ষণ তারা সেখানে থাকবে। অতএব, আপনি ও আপনার পালনকর্তাই যান এবং উভয়ে যুদ্ধ করে নিন। আমরা তো এখানেই বসে রইলাম।” (সূরা মায়েদা, ২৪)
অতএব, কোনো সমাজ যদি এই তিন প্রকার নৈতিক রোগে আক্রান্ত হয়, সে সমাজ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, আলোর মুখ দেখতে পাবে না।
আল্লাহর রাসূল (স.) মাত্র কয়েক মাস পূর্বে বিদায় হজের ভাষণে গাদীরে খুমের ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইমাম আলী (আ.)-কে নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করে গেলেন। আর পরলোকগমনের সঙ্গে সঙ্গে রাসূলের (স.) সেই উম্মতই মহানবীর অসিয়তকে ফেলে রেখে ভোটাভুটি করতে বনি সাকিফায় চলে গেলেন। কিন্তু কেউই তাঁদের এই অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করেননি!
সবারই পিতা মারা যান, এটাই স্বাভাবিক। নবীকন্যাও জানতেন। তাই শুধু পিতা হারানোর বেদনায় আমরণ তিনি কেঁদে যাবেন, এ কথা বিশ্বাস করা যায় না। মদিনাবাসীর সবাই জানতেন, তিনি কেন কাঁদছেন। আর এ কারণেই তাঁদের কেউ সান্ত্বনা দিতেও আসেননি। কেননা তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, নবী পরিবারের ওপর আরোপিত অন্যায়ে তাঁদের ভূমিকা ছিল অপরাধীদের পক্ষে! কী সান্ত্বনা দেবেন তাঁরা?
উল্লিখিত তিন শ্রেণির মানুষের প্রতি মহান আল্লাহ ক্রোধান্বিত। আল্লাহ বলেন: “(আল্লাহর ক্রোধের) কারণ হলো, তারা এই পৃথিবীর জীবনকে পরকালীন জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। যারা ঈমান ত্যাগ করে, আল্লাহ তাদের হেদায়েত করবেন না।” (১৬:১০৭)
“এরাই তারা, যাদের হৃদয়, কান এবং চোখে আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। তারাই (সত্য সম্পর্কে) উদাসীন।” (১৬:১০৮)
“নিঃসন্দেহে তারা পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (১৬:১০৯)
মানবসৃষ্টির শুরু থেকেই এই নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো চিরাচরিত মহান আদর্শ বাস্তবায়নের পথে বাধা হিসেবে কাজ করে এসেছে এবং শেষ পর্যন্ত এই ধারা চলতে থাকবে। আত্মিক উন্নতি ও বুদ্ধিবলে ওই সব শয়তানি জালের পরিবেষ্টন ছিন্ন করতে না পারলে কোনো সমাজই আলোকিত ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে পারবে না। তাই যুবসমাজকে আজ সমাজ গড়ার তাগিদে সৎকাজের আদেশ ও সৎকাজের পক্ষে থাকার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। আর অন্যায়ের সঙ্গে না থেকে অন্যায় কাজে বাধা দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হবে।
একইভাবে পরনিন্দা ও পরচর্চা থেকে বিরত থেকে সমাজে পরচর্চাকারীদের প্রতি ঘৃণার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ধর্ম ও সমাজকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবেই আদর্শ সমাজের রূপকার হওয়ার স্বপ্ন আমরা দেখতে পাব।
আমরা যদি এই প্রত্যয়গুলো প্রত্যেকে মেনে চলতে পারি, তাহলে আলোকিত সমাজ গড়ার পথ আমাদের জন্য সুগম হয়ে আসবে এবং আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবন হবে আলোকিত জীবন, যার পরিণতি হলো বেহেশত।
বিশ্বের মহাপুরুষগণ এবং মা ফাতেমা (আ.) এই তিন শ্রেণির লোকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। যার ফলে মা ফাতেমার (আ.) সম্পত্তি বাগে ফাদাক ছিনিয়ে নেওয়া হলেও সেদিন কেউ প্রতিবাদ করেনি। কারণ মানুষের মাঝে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো পার্থক্য ছিল না। আর যখন ধর্মীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পাবে, তখন আর মা ফাতেমার (সা.আ.) মতো মহান ব্যক্তির ডাকেও কেউ সাড়া দেবে না! পরনিন্দা ও অপবাদের দৌরাত্ম্য এত বেশি ছিল যে, মহানবীর জামাতা ইমাম আলী (আ.) মসজিদে শহীদ হওয়ার খবর শুনে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের লোকেরা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করতে থাকে, “আলী কি নামাজ পড়তেন? তাহলে মসজিদে কী করছিলেন?”
যেদিন তথাকথিত মুসলমানরা মহানবীর উত্তরসূরির মাকাম ইমাম আলী (আ.) থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেদিনও কেউই রক্ষায় এগিয়ে আসেনি! মা ফাতেমার (আ.) ঘরে আগুন জ্বললেও সেদিন তাঁরা কোনো সাহায্যকারী পাননি!
অতএব, যদি আমরা চাই ইতিহাসের ওই নিকৃষ্টতম অধ্যায়গুলো, যার কারণে মা ফাতেমা (আ.) থেকে শুরু করে সমস্ত ইমাম শহীদ হয়েছেন, তার পুনরাবৃত্তি আর না হোক, তাহলে উপরের তিনটি বিষয়ে আমাদের অতিশয় সতর্ক হতে হবে। বিবেক ও বিচক্ষণতার ভিত্তিতে সামাজিক কাজে পা বাড়াতে হবে, যাতে কেউ অতীতের মতো অপপ্রচার করে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা ধর্মের খাদেমদের চেহারাকে কলঙ্কিত করার সাহস না পায়। সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।
মা ফাতেমার (আ.) কবর আজ আমাদের কাছে অজানা রয়ে গেছে। তিনি নিজেই চেয়েছেন যে, তা অজানা থাকুক। তাহলে বুঝুন, কতখানি কষ্ট তিনি পেয়েছেন! একজন মানুষ কখন বলেন যে, আমার কবরটি অজানা রেখো! আমার মনে হয়, যখন তিনি দেখেন যে, তাঁর সবাই থাকতে কেউই নেই। কেননা, তিনি কান্নার মধ্য দিয়ে নিজের কাছে মদিনাবাসীদের ডেকে আনার চেষ্টা করেছেন, যাতে মানুষেরা এসে তাঁকে প্রশ্ন করেন, “কেন বিবি এত কাঁদছেন?” আর তিনি এই সুযোগে ওই তিন শ্রেণির মানুষের খিয়ানতের কথা বলতে পারেন। কিন্তু সেদিন শুধু যে তাঁর কাছে কেউই আসেনি, তা নয়; বরং তাঁরা তাঁকে জনবসতি থেকে বের হয়ে জনবসতিশূন্য এলাকায় গিয়ে কাঁদতে পরামর্শ দেন! হায় আফসোস! হায় আফসোস!
মা ফাতেমার (সা.আ.) অসিয়তনামা: ইমাম আলী (আ.) মা ফাতেমার (সা.আ.) মাথা কোলে আঁকড়ে ধরে বললেন, “হে ফাতেমা, তুমি অসিয়ত করো। তুমি যা কিছু অসিয়ত করবে, আমি সবই পালন করব।”
ফাতেমা (সা.আ.) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূলের চাচাতো ভাই, আল্লাহ তোমাকে অনন্ত কল্যাণ দান করবেন।”
“যারা আমার প্রতি জুলুম করেছে, আমার অধিকার হরণ করে নিয়েছে, তারা যেন আমার গোসলের সময় বা জানাজায় অংশগ্রহণ না করে। কেননা তারা আমার পিতা ও আমার শত্রু। তাদের কেউই যেন আমার জানাজার নামাজে উপস্থিত না হয়। শুধু তারাই নয়, বরং তাদের অনুসারী ও সহযোগীরাও যেন না আসে। রাতের বেলা যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, তখন আমাকে মাটি দেবে।”
(এখানে সময়ের অভাবে সংক্ষিপ্ত আকারে অসিয়তনামাটি আনা হয়েছে।) সূত্র: বিহারুল আনওয়ার, ৪৩ খণ্ড, ১৯ নম্বর পৃষ্ঠা, ২০ নম্বর হাদিস।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.): শাহাদাতের শোকগাথা ও পবিত্র জীবনাদর্শ
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর প্রায় নব্বই দিন অতিবাহিত হয়েছে। এই তিনটি মাস রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর জীবনে ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর ও কষ্টদায়ক। একদিকে পিতার বিচ্ছেদজনিত গভীর শোক, অন্যদিকে তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহে একদল মানুষের অত্যাচার ও অবিচার—সব মিলিয়ে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ক্রমেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে এবং তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
তবে এই অসহনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও একটি বিষয় তাঁকে কিছুটা সান্ত্বনা দিত। সেটি ছিল তাঁর প্রিয় পিতা মহানবী (সা.)-এর দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি। মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্তে কন্যাকে বলেছিলেন, “হে আমার কন্যা! আমার ইন্তেকালের পর আমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে।”
পিতার এই প্রতিশ্রুতি হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর শোকাহত হৃদয়ে এক বিশেষ প্রশান্তির সঞ্চার করেছিল। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, অচিরেই তাঁর প্রিয় পিতার সঙ্গে পুনর্মিলনের সময় আসন্ন।
অন্যদিকে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) এবং তাঁদের সন্তানদের জন্যও সময়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও হৃদয়বিদারক। হযরত আলী (আ.) এমন এক মহীয়সী নারীকে হারাতে চলেছিলেন, যাঁর উপস্থিতিতে তাঁর পারিবারিক জীবন জ্ঞান, ঈমান, ধৈর্য, ভালোবাসা ও আত্মিক প্রশান্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ছিলেন তাঁর পরম বিশ্বস্ত সহধর্মিণী, সুখ-দুঃখের সঙ্গী এবং জীবনের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে নির্ভরতার এক অনন্য আশ্রয়।
জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) বারবার হযরত আলী (আ.)-এর দিকে তাকাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি ধীরে ধীরে পার্থিব জীবনের সব দুশ্চিন্তা ও বেদনা থেকে মুক্ত হয়ে অনন্ত জীবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। হযরত আলী (আ.) গভীর বেদনা নিয়ে তাঁর প্রিয়তমা সহধর্মিণীর শেষ দৃষ্টিগুলো অনুসরণ করছিলেন। তিনি উপলব্ধি করছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো আর দেখতে পাবেন না সেই স্নেহময় দৃষ্টি, যা এত দিন তাঁর হৃদয়ে প্রশান্তি ও সান্ত্বনা জুগিয়েছে।
এমন সময় হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) নীরবতা ভেঙে বললেন—“হে আলী! জেনে রাখো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তোমাদের মাঝে থাকব না। আমার বিদায়ের সময় এসে গেছে। তাই আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনো।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। বেহেশত ও জাহান্নাম সত্য এবং কিয়ামতের দিন অবশ্যই সংঘটিত হবে।
আমি তোমাকে অসিয়ত করছি, আমার ইন্তেকালের পর রাতের বেলায় আমাকে গোসল দেবে এবং রাতেই দাফন করবে। আমার মৃত্যুর সংবাদ অন্য কাউকে জানাবে না।
এরপর আমার শিয়রের কাছে বসে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করবে এবং আমার জন্য দোয়া করবে। আমি তোমাকে মহান আল্লাহর হাতে সোপর্দ করছি। আমার সন্তানদের প্রতি কিয়ামত পর্যন্ত আমার সালাম ও দরুদ রইল।”
এই অসিয়তের মধ্য দিয়ে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর গভীর ঈমান, পরকালীন জীবনের প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের পরিচয় পাওয়া যায়। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি পবিত্র কোরআন, দোয়া এবং সন্তানদের কল্যাণের কথা স্মরণ করেছেন।
তাঁর পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়—“তোমার প্রতি সালাম, হে ফাতেমা! তোমার প্রতি সালাম, হে উভয় জগতের নারীকুলের শিরোমণি! তোমার প্রতি সালাম, হে মহীয়সী নারী! তোমার পবিত্র জীবন নারীজাতির মর্যাদা ও সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্যকে করেছে সমুজ্জ্বল। তোমার উন্নত মর্যাদা, পবিত্রতা এবং ঐশী মহিমার প্রতি রইল অশেষ সালাম ও দরুদ।”
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর মর্যাদা ও কোরআনের শিক্ষা: হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর মর্যাদা কেবল এ কারণে নয় যে, তিনি ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় কন্যা। বরং তিনি নিজস্ব আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলির কারণেও ছিলেন অসাধারণ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পবিত্র কোরআনের মহান শিক্ষা এবং তাঁর পিতা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হেদায়াতপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর মর্যাদা ও পবিত্রতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাফসিরের বর্ণনায় সূরা আল-কাওসারের সঙ্গে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর বিশেষ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূল (সা.)-কে যে ‘কাওসার’ বা প্রভূত কল্যাণ দান করেছেন, তার অন্যতম প্রকাশ হলেন হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) এবং তাঁর মাধ্যমে অব্যাহত নবীবংশের পবিত্র ধারা।
একইভাবে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ আহলে বাইত (আ.)-এর পবিত্রতার বিষয়টি ঘোষণা করেছেন। আয়াতটির সংশ্লিষ্ট অংশের অর্থ হলো—“হে আহলে বাইত! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৩)
বর্ণিত আছে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মহানবী (সা.) নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়ার সময় হযরত ফাতেমা (সা.আ.)-এর ঘরের দরজায় এসে আহ্বান জানাতেন, “হে আহলে বাইত! নামাজের সময় হয়েছে।” এরপর তিনি সূরা আল-আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতের পবিত্রতা-সংক্রান্ত অংশটি তিলাওয়াত করতেন।
এই বর্ণনা আহলে বাইত (আ.)-এর পবিত্র মর্যাদা এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে তাঁদের বিশেষ অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরে।
পবিত্র কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক: পবিত্র কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি কোরআনের জ্ঞানসমুদ্র থেকে মূল্যবান শিক্ষা ও হেদায়াত আহরণ করেছিলেন এবং সেই শিক্ষার আলোকে নিজের জীবন ও আত্মাকে সুসজ্জিত করেছিলেন।
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মসজিদে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি পবিত্র কোরআনের গুরুত্ব ও মর্যাদা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, পবিত্র কোরআন মহানবী (সা.)-এর রেখে যাওয়া এক অমূল্য সম্পদ এবং মহান আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার অঙ্গীকারের এক সুস্পষ্ট দলিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পবিত্র কোরআনে কোনো মিথ্যা বা সত্যের পরিপন্থী বিষয়ের স্থান নেই। কোরআন হলো ঐশী নূরের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার, যা মানবজীবনকে আলোকিত করে এবং মানুষকে সত্য ও সঠিক পথের সন্ধান দেয়।
পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও নির্দেশনা সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রত্যেক মানুষ নিজের জ্ঞান, উপলব্ধি ও যোগ্যতা অনুযায়ী এর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারে এবং সেখান থেকে উপকৃত হতে পারে।
কোরআনের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা সম্পর্কে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর বক্তব্যের মর্মার্থ হলো, যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে পবিত্র কোরআনের অনুসরণ করবে এবং এর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে, সে আত্মিক ও নৈতিক পূর্ণতার এমন উচ্চস্তরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, যা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে।
এভাবে তিনি কোরআনকে কেবল তিলাওয়াতের গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং মানবজীবনের সার্বিক দিকনির্দেশনা এবং আত্মিক উৎকর্ষ অর্জনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সন্তানদের কোরআনের আলোকে গড়ে তোলা: হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) নিজের সন্তানদেরও পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও আদর্শের আলোকে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর পারিবারিক জীবনে কোরআন ছিল শিক্ষা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রধান ভিত্তি।
হযরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন মহানবী (সা.) তাঁকে একটি কাজে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর ঘরে পাঠান। তিনি সেখানে গিয়ে অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি দেখতে পান, হযরত ফাতেমা (সা.আ.) যব পিষছেন এবং একই সঙ্গে তাঁর মুখে পবিত্র কোরআনের আয়াত তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজের মধ্যেও তিনি মহান আল্লাহর স্মরণ ও পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকতেন না। তাঁর কাছে ইবাদত ও পারিবারিক দায়িত্ব পরস্পরবিরোধী ছিল না; বরং উভয়ই ছিল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
অপর একটি বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, একদিন হযরত আলী (আ.) ঘরে প্রবেশ করে শুনতে পান, হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) পবিত্র কোরআনের সদ্য অবতীর্ণ একটি আয়াত তিলাওয়াত করছেন।
এতে বিস্মিত হয়ে হযরত আলী (আ.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “এই আয়াত সম্পর্কে তুমি কীভাবে জানতে পারলে?”
জবাবে হযরত ফাতেমা (সা.আ.) বলেন, “আমাদের পুত্র হাসান আজ আমার পিতার ওপর অবতীর্ণ আয়াতগুলো আমাকে পড়ে শুনিয়েছে।”
এই বর্ণনায় হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর পরিবারে কোরআনচর্চার সুন্দর পরিবেশ এবং সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগের পরিচয় পাওয়া যায়।
নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও সত্যের পথে অবিচলতা: হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং তাঁর সমগ্র জীবনাচরণ ছিল পবিত্র কোরআনের আদর্শে সমুজ্জ্বল। তিনি কেবল কোরআনের শিক্ষা প্রচার করতেন না; বরং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতেন।
সামাজিক জীবনে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং প্রয়োজনের সময় মিথ্যা, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ছিল তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত ঈমান কেবল মুখের স্বীকারোক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের চিন্তা, কর্ম, আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের মধ্যেও তার প্রতিফলন ঘটতে হবে।
আধ্যাত্মিকতা ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রেও হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.) ছিলেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কথাবার্তা, আচার-আচরণ, ইবাদত-বন্দেগি এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে মহান আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য ও আত্মিক পবিত্রতার প্রকাশ ঘটত।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—“কাদ আফলাহা মান তাযাক্কা।”
অর্থাৎ, “নিশ্চয়ই সে সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।” (সূরা আল-আ’লা, ৮৭:১৪)
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর পবিত্র জীবন ছিল এই কোরআনিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল বাস্তব প্রতিফলন। তিনি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ধৈর্য, সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার মাধ্যমে নিজের জীবনকে মহিমান্বিত করেছিলেন।
তাঁর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, প্রকৃত মর্যাদা ও সফলতা কেবল পার্থিব সম্মান কিংবা বংশপরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা অর্জিত হয় ঈমান, সৎকর্ম, উত্তম চরিত্র এবং মহান আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি অবিচল আনুগত্যের মাধ্যমে।
হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত মুসলিম ইতিহাসে এক গভীর বেদনাবিধুর অধ্যায় হলেও তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শ মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন শিক্ষার উৎস। তাঁর ঈমান, ধৈর্য, আত্মত্যাগ, কোরআনপ্রেম এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা যুগে যুগে মানুষকে আলোকিত পথের সন্ধান দেবে।
আল্লাহর বন্ধু ও শত্রু কে?
সংকলন: মল্লিক শিহাব ইকবাল
আল্লাহর বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য (তাওয়াল্লা) প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে এবং তাঁর শত্রুদের থেকে নিজেকে দূরে রাখতে (তাবাররা), প্রথমেই তাঁর বন্ধু ও শত্রুদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।
একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, মুসলমানরা কীভাবে সহজেই আল্লাহর বন্ধু ও শত্রুদের শনাক্ত করতে পারে:
এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি কীভাবে বুঝব যে আমার বন্ধুত্ব ও শত্রুতা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হচ্ছে? আর আল্লাহর বন্ধু কে—যাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব রাখা উচিত—এবং আল্লাহর শত্রু কে—যাকে আমার শত্রু হিসেবে গণ্য করা আবশ্যক?”
মহানবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-এর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন: তোমরা কি এই ব্যক্তিকে দেখছ?
লোকটি উত্তর দিল: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল।
মহানবী (সা.) বলেলেন: যিনি আলীর (আ.) বন্ধু, তিনি আল্লাহরও বন্ধু; তাই তোমরাও তাঁর সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করো। একইভাবে, যিনি আলীর (আ.) শত্রু, তিনি আল্লাহরও শত্রু; তাই তোমরাও তাঁকে নিজেদের শত্রু হিসেবে গণ্য করো। হযরত আলীর (আ.) বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব রাখো—এমনকি তিনি যদি তোমার পিতা বা পুত্রকেও হত্যা করে থাকেন। আর হযরত আলীর (আ.) শত্রুর সাথে শত্রুতা পোষণ করো—এমনকি সে যদি তোমার পিতা বা পুত্রও হয়। (সূরা ফাতিহা (১): ৭ এর অধীনে ইমাম হাসান আসকারী (আ.) এর তাফসীর)
অনুরূপ হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে আল্লাহর বন্ধু ও শত্রুদের চিহ্নিত করে।
যদিও আলী (আ.)-এর বন্ধুদের বিষয়টি সবার জানা, তবুও ইমাম (আ.)-এর শত্রুদের বিষয়টি মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা বিতর্ক ও দ্বিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যারা ইমাম (আ.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, তাঁর অধিকার নিয়ে বিবাদ করেছিল, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল এবং তাঁদের সম্পত্তি জবরদখল করেছিল—মুসলিমরা তাদের চিহ্নিত করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তারা তাদের আলী (আ.)-এর শত্রু এবং সেই সূত্রে আল্লাহর শত্রু হিসেবে গণ্য করতে ইচ্ছুক নয়।
এ ধরনের বর্ণনার ক্ষেত্রে মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা উচিত: আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর প্রতি শত্রুতার কারণে তাঁরা যদিও নবী (সা.)-এর সাহাবী ও স্ত্রীদের আল্লাহর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে দ্বিধাবোধ করেন, অথচ প্রকৃতপক্ষে তাঁদের নিজেদের পিতা ও পুত্ররাও যদি আলী (আ.)-এর শত্রু হন, তবে তাঁদেরকেও ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যখন নিজের পিতা বা পুত্রকেই শত্রু হিসেবে গণ্য করতে হয়, তখন নবী (সা.)-এর সাহাবী ও স্ত্রীদের বিষয়ে দ্বিধা-সংকোচের প্রশ্নই বা কোথায়?
ইয়েমেনের প্রতিরোধ: পরাশক্তির সামরিক চাপেও
কেন হার মানছে না আনসারুল্লাহ?
দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃঢ়তা—এই চারটি উপাদান ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আলোচিত সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। বছরের পর বছর যুদ্ধ, অবরোধ ও বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপের পরও আন্দোলনটির টিকে থাকা আধুনিক যুদ্ধের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ ইতিহাসে ইয়েমেনের যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অর্থনৈতিক সংকট এবং বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ দেশটিকে গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলন, যা হুথি আন্দোলন নামেও পরিচিত, নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, উন্নত যুদ্ধবিমান, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিপুল সামরিক বাজেট এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট সামরিক জোটের মোকাবিলায় অপেক্ষাকৃত সীমিত সম্পদ নিয়ে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পেরেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অস্ত্রের শক্তিতে খুঁজলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইয়েমেনের ইতিহাস, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক কাঠামো, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলার বিশেষ সক্ষমতা।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি: প্রতিরোধের প্রাকৃতিক ভিত্তি
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে সা’দা প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, আনসারুল্লাহ আন্দোলনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই অঞ্চলের পাহাড়, উপত্যকা ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে বিশেষ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
আধুনিক যুদ্ধবিমান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র কোনো বাহিনীকে ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা প্রদান করতে পারে। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সেখানে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান, চলাচলের উপযোগী পথের পরিচিতি, প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আনসারুল্লাহর বহু যোদ্ধা এই পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন। ফলে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামরিক কর্মকাণ্ডকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
ইয়েমেনের যুদ্ধ তাই দেখিয়েছে, সামরিক প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই প্রতিপক্ষের ওপর স্থায়ী রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হয় না।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পটভূমিতে আনসারুল্লাহর উত্থান
আনসারুল্লাহ আন্দোলনের শিকড় ইয়েমেনের যায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশটির উত্তরাঞ্চলে যায়দি সম্প্রদায় দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ শতকের শেষভাগে ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের অবনতি এবং ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়।
বিশেষ করে সালাফি ধারার বিস্তার এবং যায়দি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ আন্দোলনটির বিকাশে ভূমিকা রাখে।
১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইয়ুথ অব দ্য বিলিভার্স’ বা ‘বিশ্বাসী যুবসমাজ’ সংগঠনটি পরবর্তী আনসারুল্লাহ আন্দোলনের অন্যতম প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রথমদিকে ধর্মীয় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সামাজিক সংগঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও সময়ের পরিবর্তনে আন্দোলনটি রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
২০০৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহের সরকারের সঙ্গে হুথিদের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে একাধিক দফা যুদ্ধ আন্দোলনটির সাংগঠনিক ও সামরিক চরিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও সামরিক অভিযোজন
একটি সশস্ত্র আন্দোলনের টিকে থাকার ক্ষেত্রে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আনসারুল্লাহর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
২০০৪ সাল থেকে ধারাবাহিক সংঘাত এবং ২০০৯ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ আন্দোলনটিকে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে।
এরপর ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ‘অপারেশন ডিসিসিভ স্টর্ম’ শুরু করে। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু ব্যাপক বিমান হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক চাপ সত্ত্বেও আনসারুল্লাহকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি।
বরং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনটি নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের সামরিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়—যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সব সময় একই বিষয় নয়। একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারলেও প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও সংগঠন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে সক্ষম নাও হতে পারে।
সাংগঠনিক ঐক্য ও আদর্শিক প্রেরণা
আনসারুল্লাহর প্রতিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এবং সমর্থকদের মধ্যে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংহতি।
দীর্ঘদিনের সংঘাত আন্দোলনটির নেতৃত্ব ও সদস্যদের মধ্যে একটি অভিন্ন অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেছে। এই অভিজ্ঞতা তাদের কাছে সংঘাতকে শুধু সামরিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব, ধর্মীয় পরিচয় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
যখন কোনো সংঘাত একটি গোষ্ঠীর পরিচয় ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তখন কেবল সামরিক চাপ প্রয়োগ করে তার প্রতিরোধের ইচ্ছা দুর্বল করা কঠিন হতে পারে।
তবে আনসারুল্লাহর প্রতি ইয়েমেনের সব জনগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বহুমাত্রিক। বিভিন্ন অঞ্চল, রাজনৈতিক দল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্দোলনটির ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
তা সত্ত্বেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রাখা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যেও রাজনৈতিক উপস্থিতি ধরে রাখা তাদের টিকে থাকার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।
সামরিক শক্তি বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইয়েমেনের যুদ্ধ আধুনিক সামরিক সংঘাতের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তি কোনো রাষ্ট্রকে সামরিক সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু এসব উপকরণ ব্যবহার করে একটি জটিল সমাজের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করা সব সময় সম্ভব হয় না।
আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক সক্ষমতা এবং আনসারুল্লাহর সামরিক সম্পদের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
এর পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতবিরোধ।
ফলে ইয়েমেনের সংঘাতকে কেবল শক্তিশালী ও দুর্বল বাহিনীর সামরিক প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করলে এর প্রকৃত জটিলতা বোঝা সম্ভব নয়।
লাল সাগর ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইয়েমেন
ইয়েমেনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকাংশে তার ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিকটবর্তী হওয়ায় দেশটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
লাল সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে আনসারুল্লাহর হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পদক্ষেপ ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছে।
এসব হামলা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে।
একই সঙ্গে ফিলিস্তিন প্রশ্ন, ইসরায়েলের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত এবং ইরান-সৌদি আরবের সম্পর্কের মতো বিষয়ও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
এতে বোঝা যায়, ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে।
প্রতিরোধের পাশাপাশি মানবিক বিপর্যয়
আনসারুল্লাহর সামরিক ও সাংগঠনিক স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যোগাযোগব্যবস্থা এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
বোমাবর্ষণ, অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং বিভিন্ন পক্ষের আরোপিত বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে।
এই পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয়, কোনো পক্ষের সামরিকভাবে টিকে থাকা মানেই সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা বা কল্যাণ নিশ্চিত হওয়া নয়।
ইয়েমেনের স্থায়ী শান্তির জন্য তাই শুধু সামরিক সমীকরণ নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা, মানবিক সহায়তা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন পরাজয় মেনে নিচ্ছে না আনসারুল্লাহ?
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের পেছনে কোনো একক কারণ কাজ করছে না। বরং কয়েকটি উপাদান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
প্রথমত, ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান আন্দোলনটির জন্য বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয়ত, দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘাতের অভিজ্ঞতা তাদের সামরিক ও সাংগঠনিক অভিযোজনের সুযোগ দিয়েছে।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং সাংগঠনিক সংহতি আন্দোলনটির একটি অংশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের প্রেরণা সৃষ্টি করেছে।
চতুর্থত, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরস্পরবিরোধী স্বার্থ সংঘাতের একটি সহজ ও নির্ণায়ক সমাধানকে জটিল করে তুলেছে।
এসব কারণে সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও আনসারুল্লাহ নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল শুধু অস্ত্রের পরিমাণ, যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কিংবা সামরিক বাজেটের ওপর নির্ভর করে না। ভৌগোলিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক লক্ষ্য, সাংগঠনিক সংহতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলার সক্ষমতাও যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আনসারুল্লাহর প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা এই বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে সামরিক প্রতিরোধের স্থায়িত্ব এবং একটি দেশের জনগণের শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি অর্জন দুটি পৃথক বিষয়।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হবে না; বরং রাজনৈতিক সমঝোতা, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইয়েমেনের পাহাড় তাই শুধু দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের ইতিহাসই বহন করছে না; একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছে, সামরিক শক্তি দিয়ে সংঘাত শুরু করা সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কার্যকর সমাধান।
ক্ষুধার্তকে অন্নদান” আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ফাতিমা আয-যাহরা (সা.আ.)-এর মহিমান্বিত দৃষ্টান্ত
মল্লিক শিহাব ইকবাল
আল্লাহ তাআলা বলেছেন: নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলরা এমন পানপাত্র থেকে পান করবে, যাতে থাকবে কর্পূরের মিশ্রণ। এটি একটি ঝরণা, যা থেকে আল্লাহর অনুগত বান্দারা পান করবে; তারা একে তাদের ইচ্ছামতো অবাধে প্রবাহিত করতে পারবে। তারা তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এমন এক দিনের আশঙ্কা করে, যার অশুভ প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তারা আল্লাহর ভালোবাসার খাতিরে অভাবী, এতিম ও বন্দিদের অন্ন দান করে। তারা বলে, ‘আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের অন্ন দিই; আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা আশা করি না।’ ‘আমরা কেবল আমাদের রবের পক্ষ থেকে আসা সেই কঠিন ও ভয়াবহ দিনের আশঙ্কা করি।’ সুতরাং, আল্লাহ তাদের সেই দিনের অশুভ পরিণতি থেকে রক্ষা করবেন এবং তাদের ওপর বর্ষণ করবেন এক অপরূপ সৌন্দর্য ও পরম আনন্দ। তাদের ধৈর্য ও অবিচলতার পুরস্কার হিসেবে তিনি তাদের দান করবেন জান্নাত এবং রেশমি বস্ত্র। সেখানে তারা সুউচ্চ আসনে হেলান দিয়ে উপবিষ্ট থাকবে; সেখানে তারা সূর্যের প্রচণ্ড তাপ বা চাঁদের তীব্র শীতলতা—কোনোটিই অনুভব করবে না। জান্নাতের ছায়া তাদের ওপর ঝুঁকে থাকবে এবং ফলের গুচ্ছগুলো বিনম্রভাবে তাদের নাগালের মধ্যে ঝুলে থাকবে। তাদের মাঝে পরিবেশন করা হবে রৌপ্যপাত্র ও স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানপাত্র—যা মূলত রৌপ্য দিয়ে তৈরি, কিন্তু কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী সেগুলোর পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে। সেখানে তাদের এমন পানীয় পান করানো হবে, যাতে থাকবে আদার (জানজাবিল) মিশ্রণ। সেখানে একটি ঝরণা রয়েছে, যার নাম ‘সালসাবিল’।
আর তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াবে চির-তরুণ কিশোরেরা; তাদের দেখলে মনে হবে যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তা। আর তুমি যখনই সেদিকে তাকাবে, তখনই দেখতে পাবে এক পরম আনন্দ ও এক বিশাল সাম্রাজ্য। তাদের পরনে থাকবে মিহি রেশম ও পুরু কারুকার্যময় বস্ত্রের সবুজ পোশাক; আর তারা সজ্জিত থাকবে রৌপ্য-বলয়ে। তাদের প্রতিপালক তাদের পান করাবেন এক বিশুদ্ধ ও পবিত্র পানীয়। বস্তুত, এটি তোমাদের জন্য এক পুরস্কার; আর তোমাদের প্রচেষ্টা গৃহীত ও স্বীকৃত হয়েছে।”
এই আয়াতগুলো তখন অবতীর্ণ হয়েছিল যখন আলী (আ.), ফাতিমা আয-যাহরা (সা.আ.), হাসান (আ.) এবং হুসাইন (আ.) অভাবী মানুষদের দান করেছিলেন; এই ঘটনাটি যামাখশারির লেখা ‘আল-কাশশাফ’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিম্নরূপ:
ইবনে আব্বাস বলেছেন:
একবার আল-হাসান ও আল-হুসাইন (আ.) অসুস্থ হয়ে পড়লে, আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং কয়েকজন সাহাবী তাঁদের দেখতে যান। আগত ব্যক্তিরা ইমাম আলী (আ.)-কে পরামর্শ দেন যে, তিনি যেন আল্লাহর কাছে একটি মানত করেন—আল্লাহ যদি তাঁদের সুস্থ করে দেন, তবে তিনি কোনো একটি সৎ কাজ করবেন। তাই ইমাম আলী (আ.), ফাতিমা (সা.আ.) এবং তাঁদের সেবিকা ফিদাহ আল্লাহর কাছে মানত করেন যে, আল্লাহ যদি হাসান ও হুসাইনকে সুস্থ করে দেন, তবে তাঁরা তিন দিন রোজা রাখবেন।
আল্লাহ যখন তাঁদের সংকট দূর করলেন, তখন ইমাম আলী (আ.) শিমোন নামক এক ইহুদির কাছ থেকে তিন ‘আসু’ (পরিমাপের একক) যব ধার নিলেন। ফাতিমা (সা.আ.) সেখান থেকে এক ‘সা’ (একক পরিমাপ) যব গুঁড়ো করে পাঁচটি রুটি তৈরি করলেন, যা ছিল সূর্যাস্তের সময় তাঁদের পরিবারের খাবারের জন্য। সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্তে এক অভাবী ব্যক্তি দরজায় কড়া নেড়ে বললেন: “আসসালামু আলাইকুম, হে মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবার! আমি মুসলমানদের মধ্য থেকে আসা একজন অভাবী মানুষ; আমাকে কিছু খেতে দিন। আল্লাহ যেন আপনাদের জান্নাতের খাবার দিয়ে পরিতৃপ্ত করেন।” পবিত্র পরিবারটি নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে ওই অভাবী ব্যক্তির প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিলেন এবং সেই রাতটি কেবল পানি পান করেই অতিবাহিত করলেন।
দ্বিতীয় দিনেও তারা রোজা রাখলেন। এরপর সূর্যাস্তের সময়, যখন তারা খাবারের অপেক্ষায় ছিলেন, তখন এক এতিম তাদের কাছে সাহায্য চাইল; তারা আবারও নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে তাকেই অগ্রাধিকার দিলেন। তৃতীয় সন্ধ্যায় একজন যুদ্ধবন্দি তাদের কাছে সাহায্য চাইল, আর তারা আবারও নিজেদের প্রয়োজনের ওপর অভাবী ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
পরদিন সকালে ইমাম আলী (আ.) হাসান ও হুসাইনকে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাছে নিয়ে গেলেন। ক্ষুধার কারণে তাঁদের ছোট পাখির ছানার মতো কাঁপতে দেখে রাসূল (সা.) বললেন: ‘তোমাদের এই অবস্থায় দেখাটা আমাদের কাছে অপছন্দনীয়।’
এরপর তিনি তাদের সঙ্গে গেলেন, কারণ তিনি ফাতিমাকে দেখতে চেয়েছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর দেখা গেল, ফাতিমা (সা.) মেহরাবে (নামাজের স্থানে) রয়েছেন; তাঁর অবস্থা দেখে নবী (সা.) আরও ব্যথিত হলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাঈল (আ.) অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন:
‘এই অধ্যায়টি গ্রহণ করো মুহাম্মদ, -এমন একটি পরিবার পাওয়ার জন্য আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।’
এখানে উল্লেখ করা ‘উত্তম ব্যক্তিরা’ হলেন আলী (আ.), ফাতিমা আয-যাহরা (সা.আ.), হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.); তাঁরা জান্নাতের অধিকারী, কারণ তাঁরা অভাবী, এতিম ও বন্দীদের অন্নদান করেছিলেন।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, আয়াতগুলোতে জান্নাতের বিস্তারিত বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও, মহান আল্লাহ সেখানে ‘হুর’ (জান্নাতি নারী)-দের কোনো উল্লেখ করেননি। এটি মূলত ইমাম আলী (আ.)-এর সহধর্মিণী এবং হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.)-এর জননী ফাতিমা আয-যাহরা (সা.আ.)-এর সম্মান ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে বলে গণ্য করা হয়।
গণমাধ্যমে প্রচারণার জন্যই ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দেন: আইআরজিসি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত গণমাধ্যমে প্রচারের উদ্দেশ্যে বারবার ইরানকে হুমকি দেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র। একই সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার জবাব দিতে ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যকর অভিযান চালাতে পারবে না; এ বিষয়টি শত্রুপক্ষ অন্য সবার চেয়ে ভালো জানে। তারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলার সিদ্ধান্ত আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নেওয়া হবে। তবে তিনি বারবার দাবি করেছেন, নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়ে যে কোনো সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারেন তিনি।
মোহেব্বি বলেন, যুদ্ধসংক্রান্ত মার্কিন বিবৃতিগুলোর উদ্দেশ্য হলো, গণমাধ্যমে এসব বিষয় প্রচারণা ও ইরানের জনগণের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক হামলা চালালে তার জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে ইরান। এমনকি সীমিত পরিসরে কোনো পদক্ষেপ নিলেও সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান প্রস্তুতি ও কার্যপরিকল্পনার কারণে ইরানের জবাব হবে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী। তথ্যসূত্র: সিবিএস নিউজ
যুদ্ধের হুমকির মুখেও নীতি বদলাবে না ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে ইরানে হামলা চালালেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
তিনি বলেছেন, অতীতে দুইবার হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ফল পেয়েছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলেও তার চেয়ে ভিন্ন কিছু অর্জন করতে পারবে না।
তেহরানে সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে আরাঘচি বলেন, সম্প্রতি নতুন করে যুদ্ধ শুরুর বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে তিনি এরই মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধ হোক বা না হোক, আমাদের নীতি একই থাকবে।
আরাঘচি আরও বলেন, তারা এরই মধ্যে দুইবার এমন চেষ্টা করেছে এবং ফল দেখেছে। আবার চেষ্টা করতে চাইলে তারা জানে, আগেরবারের চেয়ে ভিন্ন কোনো ফল পাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানে নতুন করে হামলার হুমকি বাড়ার মধ্যেই আরাঘচি এসব মন্তব্য করেন।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে আবারও একটু এপিক ফিউরি অভিযান চালাতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের নাম দেওয়া হয়েছিল এপিক ফিউরি। সূত্র: আল-জাজিরা