আমার দেখা ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম

by Rashed Hossain

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ড. এম. এ. কাইউম

অধুনা বিশ্বের প্রায় সবারই জানা যে, বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও ইরানি জাতি আজ হতে ৪৩ বছর পূর্বে এক পরাধীন দেশ ও জাতি হিসেবে পরিচিত হত। সেখানকার তৎকালীন মোহাম্মদ রেজা শাহের সরকার ছিল মূলতঃ আমেরিকা, বৃটেন ও ফ্রান্সের হাতের খেলনা। ইরানের বাজারগুলো ওদেরই পণ্যদ্রব্য দ্বারা পরিচালিত হত। শাহের সরকার ইরানের যাবতীয় খাদ্যদ্রব্য ফ্রান্স থেকে আমদানি করত। এমনকি “খাতেরাতি আজ খান্দানে পাহলাভি” শীর্ষক বইয়ের সাক্ষ্য অনুসারে, শাহের পোষা কুকুরের খাবারও ফ্রান্স থেকে আনা হত। এ বিষয়ে, একদিকে হাস্যকর এবং অপরদিকে পরাধীনতার গভীর মাত্রার এক চিত্র ফুটে উঠে। এমনই এক ঘটনার সূত্রপাত হয় যা এরূপ:

একদা একটি ঔষধ ও শাহের পোষা কুকুরের খাবার আনার জন্যে একজন পাইলটকে যাত্রীবাহী একটি সরকারী খালি বিমান দিয়ে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। বেশ কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বিমানটি নিয়ে সেই পাইলট তেহরানে ফিরে এসে অবতরণের পর তার স্মরণে আসে যে, সে কুকুরের খাবার নিতে ভুলে গেছে এবং বিষয়টি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানায়। তখন সেই কর্মকর্তা তাকে শুধুমাত্র কুকুরের খাবার আনার জন্যে পুনরায় উক্ত বিমান নিয়ে ফ্রান্সে যেতে বলে। পাইলট তার ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ মোতাবেক পুনরায় সম্পূর্ণ খালি বিমান নিয়ে ফ্রান্সে গিয়ে কুকুরের খাবার নিয়ে তেহরানে প্রত্যাবর্তন করে!

বিষয়টি শুনতে সাধারণ মনে হলেও যারা বিমানের জ্বালানির ব্যয়ভার সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তারা অনুমান করতে পারবেন যে, এ ঘটনায় কত পরিমাণ সরকারী বা দেশের জনগণের অর্থের অপব্যবহার হয়েছে! অথচ, দেশেই আর দশজন নাগরিকের খাবারের বন্দোবস্ত হচ্ছে আর কুকুরের খাবারের বন্দোবস্ত হবে না- এটা কি কেউ মানবে!? তাহলে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মূলতঃ মোহাম্মদ রেজা শাহ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার চিত্রই ফুটে উঠে। আর ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার কবর রচিত হয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকেই বিস্তৃত ইরানের আনাচে-কানাচে আল্লাহর রসুলের (সা.) পরবর্তী বংশের অনেকেরই কবর বা মাযার রয়েছে এবং সর্বদাই সেসব মাযারে যিয়ারতকারীদের ভিঁড় লেগে থাকে। যিয়ারতকারীরা বিভিন্ন কারণে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মাযারসমূহের দানবাক্সগুলোতে আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন।

তবে উপরিউক্ত বইয়ের বর্ণনা অনুসারে, ইরানে ইসলামি হুকুমত গঠন তথা ইসলামি বিপ্লবের বিজয় অর্জনের পূর্বে এসব মাযারে জনগণের দানকৃত এসব অর্থ, শাহের সরকার বস্তায় পুরে আমেরিকা, ফ্রান্স ও বৃটেনের মত দেশে পাচার করে নিজের খেয়াল-খুশি মত ব্যয় করত! দেশ ও দেশের জনগণের কোনো উপকার বয়ে আনত না। অথচ ইসলামি বিপ্লবের বিজয় অর্জনের পর মাযারের এসব অর্থ দিয়ে বহু গঠনমূলক কাজ করা হচ্ছে, যেমন: এতিমখানা পরিচালনা, গরিব-দুস্থদের আর্থিক সাহায্যদান, দূরারোগ্য রুগীদের চিকিৎসা সহায়তা, ভূমিকম্প ও বন্যার ন্যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ- প্রভৃতি।

ইসলামি বিপ্লবের বিজয় অর্জনের পর দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদাগুলোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এছাড়াও দেশটির এমন কোনো অঞ্চল নেই [সমতল ভূমিই হোক কিংবা দূরারোহ-পাহাড়ি ভূমি] যেখানে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানির পাইপলাইন বসানোসহ জীবনযাপনের যাবতীয় সুবিধা দেয়া হয়নি।

শাহ সরকারের আমলে দেশের নাগরিকদের কে খেতে পেল আর কে পেল না তা তাদের মাথা ব্যথার কোনো কারণ ছিল না; কিন্তু ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের অব্যবহিত পরেই ইসলামি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে এ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে এবং এখন দেশটির কোনো নাগরিকেরই না খেয়ে দিনাতিপাত করার কোনো প্রশ্নই উঠে না। বয়ঃপ্রাপ্ত প্রত্যেক নাগরিক এবং পরিবার প্রধানের ব্যাংক হিসাব রয়েছে যেখানে প্রতি ফার্সি মাসের প্রথম সপ্তাহেই সরকারি বরাদ্দ [রেশন] দেয়া হয়। ইরানে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে যাওয়া বিদেশি ছাত্ররাও এ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

প্রত্যেক নাগরিকের জন্যেই জীবনবীমার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব বীমার মাধ্যমে চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই রোগীকে প্রদান করা হয়। একইভাবে গাড়ির বীমাও রয়েছে যা গাড়ির বিভিন্ন দুর্ঘটনার নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে; কিন্তু তাই বলে কেউ লাগামহীনভাবে গাড়ি চালাবেন তারও সুযোগ নেই। রাস্তা প্রশস্তকরণের পাশাপাশি কোথায় কোন্ গাড়ির গতিবেগ কত হবে তারও বিধিবিধান করা হয়েছে এবং পুরো রাস্তাকে সি.সি. ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। কাজেই কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে যতক্ষণ যাবৎ সেখানে পুলিশ গিয়ে সুরাতহাল প্রতিবেদন তৈরী না করবেন ততক্ষণ যাবৎ কেউ সেখান থেকে সরতে পারবেন না। কিন্তু তাই বলে, দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ নাজেহাল অবস্থায় পড়ে থাকবেন তাও না। বরং সেখানে ডাক্তার বা মেডিকেল দল পৌঁছে তার সুব্যবস্থা করবেন।

দেশটিতে শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক নয়া বিপ্লব সাধিত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা-পড়ার যাবতীয় সুব্যবস্থা করার পাশাপাশি “শিক্ষাঋণ” নামে এক সুদবিহীন লোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে যা একজন ছাত্র-ছাত্রী তার বাড়তি কোনো গবেষণাকর্মের জন্যে নিতে পারবেন এবং শিক্ষাজীবন উত্তীর্ণ হওয়ার পর কোনো কর্মে যোগদান করে, স্বীয় আয় থেকে নিজের সুবিধা মত কিস্তিতে তা প্রদান করবেন।

ইরানী নাগরিকদের বাসা-বাড়ির মালিক হওয়ারও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। “মেহের ব্যাংক” এবং “মাসকান ব্যাংক” নামক ইরানের দু’টি লোকাল ব্যাংক দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে আবাসিক কলোনি নির্মাণ করে, বাসাহীন ব্যক্তিদেরকে বাসা প্রদান করে থাকে এবং খুবই স্বল্পমাত্রার মুনাফা সহকারে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে এর মূল্য পরিশোধ করার সুব্যবস্থা রেখেছে।

এভাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বিজয় অর্জনের পর দেশটির প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দেশের কোনো নাগরিকই অনাহারে-অর্ধাহারে কিংবা কোনো বিশেষ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে দিনাতিপাত করবেন- এমনটি কল্পনাই করা যায় না। এছাড়াও সে দেশের ঔষধ, চিকিৎসা, তেল, গ্যাস, ন্যানো, পরমাণু, শিল্প, কল-কারখানা, টেকনোলজি, সমরাস্ত্র, উপগ্রহসহ আরও শত শত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম রয়েছে যার বিবরণ তুলে ধরতে গেলে বড় বড় কয়েক খণ্ড গ্রন্থ রচনা হয়ে যাবে। যাইহোক, কলেবর সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে এখানেই সমাপ্ত করলাম।###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔