হযরত ঈসার বিজয় হচ্ছে সমস্ত নবী-রাসূলের (আ.) বিজয়
আমরা জানি যে, নবী-রাসূলগণ (আ.), আল্লাহর নেক ও উত্তম বান্দাদের অর্জিত বিজয় শুধুমাত্র তাদের জন্য কিংবা তাদের যুগের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোন বিজয় হিসেবে গণ্য নয়| বরং তাদের বিজয় হচ্ছে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সফলতা| এ কারণে আমরা নবুয়্যতের ক্ষেত্রে বলে থাকি যে, সমস্ত নবীগণ বিজয়ী| কোন নবীই পরাজয়ের শিকার হন নি; এমনকি ঐ নবী যাকে করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিল| কেননা ঐ নবীও তাঁর উপর অর্পিত গুরুদায়িত্বকে স্বীয় জীবদ্দশায় নিজের সামর্থ, সক্ষমতা ও সাধ্যানুযায়ী যথাযথভাবে সম্পন্ন করেছেন এবং পরিশেষে উক্ত দায়িত্বের মিশনকে আল্লাহর মনোনীত পরবর্তী নবীর কাছে হস্তান্তর করেছেন| উদাহরণ স্বরূপ- মনে করুন, এক হাজার মিটার দীর্ঘ কোন রাস্তায় একটি ভারী বস্তু বহন করতে হবে এবং উক্ত বস্তুটি ঐ রাস্তার শেষ প্রান্তে ব্যবহৃত হবে| এমতাবস্থায় কোন এক জন এসে উক্ত ভারী বস্তুটি সে রাস্তার দশ মিটার পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যায় কিন্তু তা অত্যন্ত ভারী হওয়াতে তার পক্ষে আর সামনে এগুনো সম্ভব হয় না এবং সে ব্যক্তি সেখানেই মারা যায়| অতঃপর অপর এক ব্যক্তি এসে সে বস্তুটি বহন করে বিশ কিংবা ত্রিশ মিটার পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার পর তারও জীবনাবসান ঘটে| এভাবে পর্যায়ক্রমে একের পর এক লোক এসে তা বহন করে নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী কিছু দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়; অবশেষে সে বস্তুটি ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছে যায়| এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঐ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উক্ত বস্তুটি বহনের ক্ষেত্রে কী কেউ ব্যর্থ হয়েছে? এটা বলা সম্ভব যে, বস্তুটি বহন করে যে ব্যক্তিগুলো এক হাজার মিটার দীর্ঘ বিশিষ্ট রাস্তার দশ মিটারের মাথায় মারা গিয়েছে সে কী ব্যর্থ কিংবা পরাজিত হয়েছে? না সে আদৌ ব্যর্থ হয় নি; বরং একজন মানুষের স্বাভাবিক সক্ষমতা ছিল ঐ বস্তুটি দশ মিটার রাস্তা পর্যন্ত বহন করা, এর চেয়ে বেশি নয়| কারণ বস্তুটি ছিল মাত্রাতিরিক্ত ভারী| বরং এক্ষেত্রে তার কৃতিত্ব হচ্ছে সে বস্তুটি কিছু পথ বহন করে এনে পরবর্তী ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর করেছে| যেমন- প্রাচীনকালে পত্রবাহক ও কাসেদরা পর্যায়ক্রমে কোন বস্তু কিংবা বার্তা বহন করত| তখনকার সময়ে শাসকদের কোন বার্তা কিংবা বস্তুকে এক অঞ্চল বা দেশ থেকে অপর অঞ্চল বা দেশে কাসেদরা বহন করে নিয়ে যেত| এক্ষেত্রে একজন কাসেদ ও বার্তা বাহকের পক্ষে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কোন বস্তু বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না| এ কারণে তারা একজন নির্দিষ্ট কোন জংশন পর্যন্ত সে বস্তুকে বহন করে পরবর্তী কাসেদের নিকট হস্তান্তর করত, এর পর সে আবার সেটাকে পরবর্তী জংশনে অপর একজনের নিকট সোপর্দ করত; এভাবে পালাক্রমে সে বস্তুটি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়া হত| সুতরাং উক্ত বস্তু বা বার্তাটি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ঐ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় যারাই অংশ নিয়েছে তারা সবাই এ কাজের অংশিদার এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পন্নের ক্ষেত্রে সফল|
সুতরাং এ পৃথিবীর জমিনে যখন আল্লাহর বিধান সকল নবী-রাসূলের (আ.) নবুয়্যতি মিশনের পরিসমাপ্তির পর এমন এক কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছাবে, যে পর্যায়কে আল্লাহর দ্বীন ও তওহীদের চূড়ান্ত বিজয়ের পর্যায় বলা হবে; তখন অবশ্যই এমনটি বলা যেতে পারে যে, এ বিজয়ে হযরত আদম (আ.) থেকে সর্বশেষ নবী পর্যন্ত -হযরত মুহাম্মাদের (সা.) পূর্ব পর্যন্ত- সমস্ত নবী-রাসূলের (আ.) অংশিদারিত্ব রয়েছে| কেননা তাদের উপর নবুয়্যতের যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত ছিল তারা প্রত্যেকেই সে দায়িত্বকে জীবদ্দশায় যথাযথভাবে সম্পন্নের পর পরবর্তী নবীর নিকট হস্তান্তর করেছেন; এভাবে তারা পর্যায়ক্রমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানব জাতির নিকট তওহীদের বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং পরিশেষে আল্লাহর বিধানের চূড়ান্ত বিজয় সুনিশ্চিত করেছেন| কাজেই এ বিজয় তাদের প্রত্যেকের জন্য| সুতরাং হযরত ঈসা (আ.), সকল নবী-রাসূল এবং মানবেতিহাসের সকল মু’মিনের প্রকৃত সফলতা ও চূড়ান্ত বিজয় কিভাবে সম্ভব হয়? উত্তরে বলা যায়- হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যখন তওহীদের পতাকা সুউচ্চে উড্ডীন করেন ও মানব জাতিকে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে অবহিত করেন এবং বিশ্বের পূর্ব-পশ্চিমের মানুষের নিকট আল্লাহর সত্য দ্বীনকে তুলে ধরতে সক্ষম হন, তখন সে চূড়ান্ত বিজয় সম্ভব হয়েছিল|
অবশ্য সময়ের আবর্তে আল্লাহর এ বিধান বারংবার উত্থান-পতনের শিকার হয়েছে; কখনও কখনও একশ্রেণীর মুসলমান ও এ মতাদর্শের অনুসারীরা কিংবা তওহীদের অনুসারীরা বিভিন্ন যুগের নানাবিধ প্রেক্ষাপটে বিচ্যুতির শিকার হয়েছে এবং আল্লাহর দ্বীনের শত্রুরা, কাফির ও তাদের দোসর তাগুত ও জালিম শাসকরা ঐ সব যুগে ঐশ্বরিক বিধানের অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে| শত্রুরা এহেন অপতৎপরতাসমূহ কখনও খ্রিষ্টধর্মের লেবাসে, ইসলামের লেবাসে আবার কখনও অন্য কোন ঐশ্বরিক ধর্মের দোহায় দিয়ে চালিয়ে দিয়েছে| কিন্তু বাস্তবে তারা ছিল কাফির, ধর্মদ্রোহী, অবাধ্য ও তাগুত|
মানবেতিহাসের প্রত্যেক যুগে যখন কোন জাতি কিংবা জনগোষ্ঠী আল্লাহর নামকে সুউচ্চে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে -যেমনভাবে এ যুগে ইরানি জাতি আল্লাহর নামকে সুউচ্চে তুলে ধরেছে, ইসলামকে সারা বিশ্বে সম্মানিত করেছে এবং কুরআনের বাণীকে পুনরায় সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে-, ঈমানদারদের মধ্যে বিশেষ কোন গোষ্ঠী যখন এমন তৌফিক ও সফলতা অর্জন করেছে; তখন এটা সুস্পষ্ট যে, এমনটি মু’মিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং এমন বিজয় ও সফলতার অধিকর্তা হলেন সকল মু’মিন ও নবী-রাসূল| অবশ্য কেউ কেউ এমন ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘ফলে যারা ঈমান এনেছিল তাদের আমরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করলাম; সুতরাং তারা বিজয়ী হল’ এ আয়াতটিতে হযরত মুহাম্মাদের (সা.) সময়ের প্রতি ইশারা করা হয়েছে; এটিও একটি সম্ভাব্য ধারণা হিসেবে গণ্য হতে পারে|
5
আগের পোস্ট
