যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে উম্মাহ, ঐক্যের বন্ধন কতটা মজবুত?

by Syed Yesin Mehedi

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে উম্মাহ, ঐক্যের বন্ধন কতটা মজবুত?

হাওজা নিউজ এজেন্সিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা সৈয়দ ইব্রাহিম খালিল রাজাভী (বাংলাদেশ)
যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে উম্মাহ, ঐক্যের বন্ধন কতটা মজবুত?’-এই প্রশ্ন নিয়েই সম্প্রতি বাংলাদেশ উলমা কাউন্সিলের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভীর মুখোমুখি হয়েছেন হাওজা নিউজ সাংবাদিক মাজিদ। সাক্ষাৎকারে আলোচিত হয়েছে গাজা, সুদান, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম জনতার অবস্থা ও মুসলিম নেতৃত্বের কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ। একসঙ্গে উঠে এসেছে ঐক্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য পথরেখাও।
হাওজা নিউজ এজেন্সি:
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আজ আমরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটময় বিষয় নিয়ে কথা বলব-যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য কতটা মজবুত, নাকি তা শুধুই একটি আদর্শিক স্বপ্ন। এই আলোচনায় আমাদের বিশেষ অতিথি, বিশিষ্ট ধর্মীয় আলেম হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রিজভী। তাঁকে স্বাগত জানাই।
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
ওয়ালাইকুমুস সালাম। আপনাদের সবাইকে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের শুভেচ্ছা। আপনার আমন্ত্রণের জন্য শুকরিয়া।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: উম্মাহর বর্তমান দুরাবস্থা
মাওলানা সাহেব, গাজা থেকে শুরু করে সুদান, সিরিয়া, ইয়েমেন-প্রায় প্রতিটি মুসলিম অঞ্চলেই যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। এই অবস্থায় আপনি কীভাবে ‘উম্মাহ’ ধারণাটি বাস্তবসম্মত দেখছেন?
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
আপনার প্রশ্নটি যথার্থ। ‘উম্মাহ’ শব্দটি কুরআনের একটি বাস্তবতা-“” (নিশ্চয় এটাই তোমাদের উম্মাহ, একক উম্মাহ)। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় দুঃখের বিষয়, এই ‘একত্ব’ কেবল নামে সীমাবদ্ধ। গাজায় আমাদের ভাইয়েরা নিহত হচ্ছে, অথচ মুসলিম দেশগুলোর সীমানা খোলা নেই। সুদানে মুসলিমরা মুসলিমদের হাতে আহত হচ্ছে। কারণ, জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক দলাদলি উম্মাহর বন্ধনকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তবে আমি হতাশ নই-আমি মনে করি, জনতার স্তরে এখনও সেই ঐক্যের আগুন জ্বলছে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: প্রতিরোধের কৌশলে ত্রুটি
আপনি জনতার ঐক্যের কথা বললেন, কিন্তু নেতৃত্বের জায়গা থেকে মুসলিম দেশগুলো কেন কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ?
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম নেতৃত্ব আজ স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ। একটি পক্ষ মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপে নতি স্বীকার করে, আরেক পক্ষ মুনাফায় লিপ্ত। কেউ তুরস্কের মতো আপেক্ষিক সোচ্চার, কিন্তু সেখানেও সীমাবদ্ধতা আছে। ইরান প্রতিরোধ অক্ষকে লালন করে, কিন্তু আরব দেশগুলোর অনেকে তা স্বাগত জানায় না। সংক্ষেপে-ঐক্যের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মঞ্চের অভাব, যেমন ছিল উসমানীয় খিলাফতের সময়। আজকের ওআইসির (OIC) সিদ্ধান্তগুলো কার্যত অকার্যকর।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: পশ্চিমা বিশ্ব ও দ্বিমুখী নীতি
পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম দেশগুলোকে বিভক্ত রাখতে চায়-এটা কি অতিরঞ্জিত ধারণা?
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
মোটেও অতিরঞ্জিত নয়। ইতিহাস সাক্ষী-মুসলিম জগৎ যখন ঐক্যবদ্ধ ছিল (যেমন আন্দালুস বা উসমানীয় আমলে), তখন পশ্চিমা শক্তি দুর্বল ছিল। আজ তাঁরা ইচ্ছেমতো গাজায় বোমা ফেলছে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, আবার সৌদি-ইরান সম্প্রীতিও সহ্য করছে না। তাঁদের কৌশল হলো: “বিভক্ত করো এবং শাসন করো” (Divide and Rule)। দুঃখজনক, কিছু মুসলিম দেশ সরাসরি এই কৌশলের অংশ হয়ে গেছে-উদাহরণস্বরূপ, কিছু আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি করছে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: তরুণ প্রজন্ম কি বাঁচাতে পারবে?
গাজার ঘটনার পর পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ মুসলিম ও অমুসলিমরাও প্রতিবাদ করছে। এই প্রজন্ম থেকে আপনি কী প্রত্যাশা রাখেন?
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
এই প্রশ্নটি আমাকে আশা দেয়। হ্যাঁ-আজকের তরুণরা টিকটক, ফেসবুক, এক্স (টুইটার) দিয়ে পৃথিবীজুড়ে সত্য পৌঁছে দিচ্ছে। তাঁরা আর প্রোপাগান্ডায় ধোঁকা দেয় না। গাজার শিক্ষার্থীরা যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের পরও কুরআন হাতে দাঁড়িয়েছে, তা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। তবে একা প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়-আমাদের তরুণদের ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’ গড়তে হবে, মুসলিম পণ্য ব্যবহার বাড়াতে হবে, সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল শিখতে হবে। হাসান, আমি বলব-এই প্রজন্মই উম্মাহর শেষ অস্ত্র।
হাওজা নিউজ এজেন্সি: ভবিষ্যতের করণীয়
সবশেষে, আপনি মুসলিম উম্মাহর জন্য তিনটি জরুরি পদক্ষেপের নাম বলুন।
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
অবশ্যই। প্রথম: নৈতিক ও ধর্মীয় জাগরণ-প্রতিটি মুসলিমকে বুঝতে হবে যে ইহুদি-খ্রিস্টান জোটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা ঈমানের অংশ।
দ্বিতীয়: অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা-মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি বাড়ানো, তেলের বিনিময় মুসলিম মুদ্রায় করা।
তৃতীয়: একটি যৌথ সামরিক ও গুপ্তচরবৃত্তি চুক্তি-ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাকে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোটে রূপান্তর করা।
যদি আমরা এই তিনটি করতে পারি, তাহলে ‘ঐক্যের বন্ধন’ শুধু বইয়ের পাতায় থাকবে না-বাস্তব ময়দানে প্রমাণিত হবে।
হাওজা নিউজ এজেন্সি:
মাওলানা সাহেব, আমাদের সময় ও পরিস্থিতি খুবই জটিল, কিন্তু আপনার কথায় আমরা নতুন শক্তি অনুভব করলাম। আপনার মূল্যবান সময় ও দিকনির্দেশনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
মাওলানা ইব্রাহিম খালিল রাজাভী:
শুকরিয়া মাজিদ। আল্লাহ আমাদের উম্মাহকে সত্যিকারের ঐক্য দান করুন-যে ঐক্য কুরআনের আয়াতের মতো মজবুত, নিছক বক্তৃতার মতো দুর্বল নয়। আসসালামু আলাইকুম।
সাক্ষাত্কার গ্রহণ: মাজিদুল ইসলাম শাহ

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔