“আমার বিল মারুফ ওয়া নাহী আনীল মুনকার” “সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ”

by Rashed Hossain

মোহাম্মাদ নাজির হোসাইন (লেখক ও গবেষক)

“আর তোমাদের মধ্যে এমন এক দল থাকা আবশ্যক যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে, এরাই হল সফলকাম।” (সূরা-আলে-ইমরান, আয়াত-১০৪)
“আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহ্ রজ্জুকে আঁকড়ে ধর পরস্পর বিচ্ছিন্ন (ফেরকাবন্দী) হইও না।” (সূরা-আলে ইমরান, আয়াত-১০৩)
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই যে, প্রত্যেকটি সচেতন ব্যক্তির জিজ্ঞাসা।

  • (১) আমি কোত্থেকে এলাম? (জন্মের উৎস সন্বন্ধে জিজ্ঞাসা)।
  • (২) আমি কোথায় এলাম? (জন্মের উদ্দেশ্য সন্বন্ধে জিজ্ঞাসা)
  • (৩) আমি কোথায় যাব? (জন্মের গন্তব্য বা জীবনের শেষ পরিণতি সন্বন্ধে জিজ্ঞাসা)।

জীবনের এই তিনটি মৌলিক জিজ্ঞাসাই মানবকে ধাবিত করে অর্থবহ জীবনের সন্ধানে। আর এগুলোর সঠিক সমাধানের উপর নির্ভর করে তার স্বার্থক জীবন। মানব জীবন হয়ে ওঠে তাৎপর্যমন্ডিত পরিপূর্ণ। প্রকৃত ঐশী ধর্মের আবির্ভাব মূলত মানব সন্তানের জীবন জিজ্ঞাসার যথার্থ সমাধান দানের উদ্দেশ্যই। “নিশ্চয় আমরা আল্লাহর নিকট থেকে এসেছি এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করব।” (সূরা-বাকারা, আয়াত-১৫৬)

খবর এলো, আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আঃ)-এর একজন সহচর দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন এ সংবাদে ব্যথিত হন এবং আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বেশ কিছুদিন পর জানা গেল যে, তাঁর মৃত্যুর সংবাদটি সঠিক নয়। তিনি জীবিত আছেন। পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত জনেরা এ সংবাদে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে উঠেন………। এ উভয় সংবাদ হযরত আলী (আঃ)-এর নিকট পৌঁছুলে, তিনি তাঁর সহচরের জন্য নিম্মক্ত চিঠি লিখেনঃ

তোমার সম্পর্কে এমন একটি সংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছেছিলো যা তোমার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে অত্যন্ত শোকাহত করেছিল এবং তাদেরকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এর কিছুদিন পর অন্য একটি সংবাদ এলো যা পূর্বের সংবাদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনকে আনন্দিত করেছিল। এ দুটো সংবাদ সম্পর্কে তুমি কি ভাবছো? তুমি কি ভাবছো যে, “এ খুশী ও আনন্দ সব সময় থাকবে?” কিংবা ভাবছো যে, “এ খুশী ও আনন্দ এক সময় আবারও বিলীন হয়ে যাবে?”

আচ্ছা, প্রথম খবরটি যদি সত্যি হতো, আর তুমি যদি এতক্ষণে পরকালে থাকতে তাহলে আল্লাহর কাছে কি চাইতে? তুমি কি যথেষ্ট পাথেয় ও সঞ্চয় সহকারে পরকালে হাজির হতে? কিংবা তুমি কি চাইতে, আল্লাহ তোমাকে আবারও দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনুন এবং সৎকর্ম করার ফুরসত দিন?

মনে কর যে প্রথম সংবাদটি বাস্তবিকই ঘটেছিল আর তুমি পরকালে গমনের মাধ্যমে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করেছ। এবার পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে এসেছ সৎকাজ করার জন্য। এমনটি ভাবো যে, আল্লাহ পাক তোমার ইচ্ছা পূরণ করেছেন এবং তোমাকে পার্থিব জগতে ফিরে আসার সুযোগ দান করেছেন। এখন তুমি কি করবে? “ক্ষিপ্রতা ও মনোযোগ সহকারে প্রকৃত জীবনের জন্য সম্বল ও পাথেয় সঞ্চয় করবে?” তোমার পরকালের চিরন্তন আবাসস্থলের জন্য কি কিছু প্রেরণ করছো? সৎ কর্ম, উত্তম কাজ, দান-খয়রাত, দোয়া প্রার্থনা, ইবাদত………ইত্যাদি কি প্রেরণ করছো?

কিন্তু জেনে রাখো যে, “পার্থিব জীবনে কিছুই সঞ্চয় না করে শূন্য হাতে পারলৌকিক জীবনে যদি গমন কর, সেখান থেকে ফিরে আসবার কোন পথ আর খুঁজে পাবে না”। তখন দুঃখ, আফসোস ও অনুশোচনা করা ছাড়া কোন গতি থাকবে না। মনে রাখবে অতি দ্রুত বহমান দিনরাত্রির একমাত্র চেষ্টা ও সাধনা হচ্ছে আয়ু কমিয়ে আনা ও মৃত্যুকে নিকটবর্তী করা এবং মানুষকে তার শেষ পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া। “প্রত্যেকের জীবনে এ অন্তিম মুহূর্ত অবশ্যই আসবে এবং তাকে পরকালীন জীবনে পদার্পণ করতেই হবে”।

সুতরাং নিজ হীন ও বস্তুবাদী আশা আকাঙ্খাগুলোকে কমিয়ে একমাত্র আল্লাহ পথে ও খোদায়ী মূল্যবোধের দিকে ফিরে এসো। “পারলৌকিক জীবনে যাত্রার জন্য তাকওয়া ও সৎ কর্মের দ্বারা পুণ্যের বোঝা ভরতি কর”।

জেনে রাখো যে, “মৃত্যু পরবর্তী জীবনের যাত্রা পথে অবশ্যই অনেক কষ্ট ও দুঃসময়ের মুখোমুখি হতে হবে”। তোমার পাথেয় যদি তাকওয়া না হয় তাহলে পদস্খলন ঘটবে ও জাহান্নামের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে। গুনাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখো যাতে করে “বেহ্শেতে রেজওয়ানে বিশ্বাসী ও সৎ ব্যক্তিদের সাথে মিলিত হতে পারো”।

আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আঃ) তাঁর এ বক্তব্যে পরকালের যাত্রা পথের বিভিন্ন ভয়ংকর দৃশ্যাবলী, বিপদ সংকুল স্থানের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তাঁর বক্তব্য বাস্তবিকই কেবল ইঙ্গিত মাত্র। কেননা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করা ছাড়া উপায় নেই। এর স্বরূপ ও ঘটনাবলী ভালো করে জানতে ও বুঝতে হলে “পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সাঃ)-এর পবিত্র ইতরাত, আহলে বাইত (আঃ) থেকে সাহায্য নিতে হবে”। কোরআনের দৃষ্টিতে কিয়ামতের ঘটনা ও দৃশ্যাবলীকে অবলোকন করতে হবে। তারপরও কিয়ামত বা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সত্যিকার স্বরূপ উপলব্ধি বা উদঘাটন করা সম্ভব নয়। তাই শুধুমাত্র ক্ষুদ্র ইঙ্গিত শুনে থাকি যাতে করে অন্ততঃ এতটুকু উপলব্ধি করতে পারি যে, যে কঠিন দিনটি আমাদের সম্মুখে রয়েছে তা আমাদের ব্যক্ত ও উপলব্ধি শক্তির উর্ধ্বে। তাই নিজেদেরকে অবশ্যই ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে যাতে সেই কঠিন ও ভয়ংকর পথটি অতিক্রম করা আমাদের পক্ষে সহজ হয় এবং সহজেই চিরকালীন বেহেশত ও মহান আল্লাহ্ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।

আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই আমল দ্বারা প্রতি মুহুর্তে ‘জান্নাত’ অথবা ‘জাহান্নাম’ নির্মাণ করে যাচ্ছে। এই পার্থিব জীবনের পর আরো একটি জীবন রয়েছে, আজকের শেষে আগামীকাল সম্মুখে রয়েছে এবং এই ইহজীবনের পর মানুষকে অপর একটি চিরন্তন জীবনে প্রবেশ করতে হবে। পার্থিব জীবনের মত সেখানেও সে তার স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করবে। মানুষের পরলৌকিক, জীবনের সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য তার ইহজীবনের কর্মের উপর নির্ভরশীল। এ দুনিয়া আখেরাতের ক্ষেত্র স্বরূপ। মানুষ এ দুনিয়ায় তার নফস অর্থাৎ অন্তর নামক ক্ষেতে যা কিছু চাষ করবে কিংবা রোপন করবে আখেরাতে সে তারই ফসল লাভ করবে। আজ সে কিসের বীজ বপন করবে, যাতে আগামীকাল সে উত্তম ফল লাভ করতে পারে? কোন পথটি অতিক্রম করলে সে পরজীবনে অপরিমিত কল্যাণ লাভ করবে? তার কর্মপদ্ধতিতে সে কোন কর্মসূচির অনুসরণ করবে? কিভাবে সে অগণিত ভ্রান্তপথ থেকে “সিরাতে মুস্তাকিমের” পথ বেছে নিতে পারবে? “বর্তমানে তার পথ প্রদশকই বা কে?”

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন-“স্মরণ কর, সেদিনের (কেয়ামতের) কথা যখন আমি সকল মানুষকে তাদের ইমামসহ আহবান করব।” (সূরা-বনী ইসরাঈল, আয়াত-৭১)

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজের যুগের ইমামের মারফত ছাড়াই মৃত্যুবরণ করল, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করলো।” সূত্র:-মুসনাদে হাম্বাল- খঃ, ৪, পৃঃ, ৯৬)

আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের প্রতি আমরা সজাগ ও সচেতন হই। “নিজের যুগের ইমামের মারেফাত অর্জনের চেষ্টা করি। অন্যথায় কুফ্রের মৃত্যু থেকে পরিত্রাণ পাবো না। কুফ্রের মৃত্যুর পরিণাম জাহান্নাম ছাড়া অন্য কিছু নয়।”

মানুষের কর্মই তার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের কারণ। তাই সে তার জীবন চলার পথে এমন এক সূক্ষ্ম ও পরিপূর্ণ কর্মসূচির প্রয়োজন বোধ করে। যে কর্মসূচি তার দুনিয়া ও আখেরাতের এবং দেহমন উভয়ের স্বার্থ ও মঙ্গলের প্রতি দৃষ্টি রাখবে। তার পার্থিব জীবনের কর্মসূচি এরূপ হবে, যা একদিকে তার পারলৌকিক জীবনের ও রূহের ধ্বংস বা ক্ষতির কারণ হবে না আর অপরদিকে তার রূহ বা নফসের কর্মসূচিকে নির্ধারণ করবে, যা তাকে নিরাপদ বাসস্থানে পৌঁছে দেবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভে সহায়ক হবে। মানুষ কি নিজেই তার সৌভাগ্য লাভের জন্য এরূপ একটি পরিপূর্ণ ও সুক্ষ্ম কর্মসূচি “ঐশী সংবিধান” নিজ বুদ্ধি চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে নির্ধারণ করতে পারে? সে কি তার আত্মিক ও পরকালের চাহিদা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত? আচ্ছা মানুষ কি দেহ ও আত্মা সম্পর্কে পূর্ণভাবে অবহিত? সে কি জানে যে, কোন বিষয় এবং কোন কাজটি তার ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ? কোন সব কাজ মানুষের অন্তরকে নি®প্রভ ও কলুষতাময় করে তোলে? মানুষ কি একাকী তার “সিরাতে মুস্তাকিম” ও সৌভাগ্যের পথটিকে অসংখ্য ভ্রান্ত পথ থেকে বেছে নিতে পারে? না…..সে পারে না! তার জ্ঞান এত বিস্তৃত নয়। মানুষ তার এ স্বল্প আয়ু ও সংকীর্ণ চিন্তাবুদ্ধির দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্য লাভের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারে না। তাহলে কে করতে পারে? একমাত্র মহান স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়া আর কারও সে ক্ষমতা নেই। কেননা তিনিই হচ্ছেন মানুষ ও সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা। তাই একমাত্র তিনিই এ সৃষ্টিজগৎ ও মানুষের সব রহস্য ও জটিলতার পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন এবং তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের সৌভাগ্য লাভের পন্থা ও উপায় সম্বলিত কর্মসূচি নির্ধারণ করেন। অতঃপর তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘নবী, রাসূল, খলিফা, ইমাম বা এক কথায় হাদীর’ দ্বারা তা পৌঁছান। যাতে সে আল্লাহর কাছে কোন রকম অজুহাত দেখাবার প্রয়াস না পায়।

যেমন আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন “সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে রাসূলদের আমি এজন্য প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর সামনে মানুষের কোন ওজর আপত্তি না থাকে।” (সূরা-নিসা, আয়াত-১৬৫); “আমিই আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর এমন কোন উম্মত ছিল না যাদের মধ্যে কোন সতর্ককারী আসেনি।” (সূরা-ফাতির, আয়াত-২৪); “আপনি তো কেবল সতর্ককারী মাত্র। আর প্রত্যেক কওমের জন্য আছে পথ প্রদর্শক।” (সূরা-রাদ, আয়াত-৭); “আমি প্রত্যেক কওমের মধ্যেই কোন না কোন রাসূল প্রেরণ করেছি…..।” (সূরা নাহাল, আয়াত-৩৬) “আমি এ কিতাবের (কোরআনের) অধিকারী (ওয়ারিশ) করেছি তাদেরকে যাদেরকে আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে পছন্দ করেছি।” (সূরা ফাতির, আয়াত-৩২)

মানব সৃষ্টির প্রথম হেদায়াতকারী ছিলেন ঐশী মানব হযরত আদম (আঃ) অতএব সৃষ্টি জগৎকে সার্বিকভাবে পরিবেষ্টন করে রেখেছে ঐশী আলো। আর সৃষ্টি জগতের পরিসমাপ্তিতেও থাকবেন একজন ঐশী মানব যিনি ‘ইমাম মাহদী (আঃ)’ নামে পরিচিত। হয়ত বা-এর মূল কারণ হল মানব জাতি সত্য পথে চলার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সম্মুখে অজুহাত উপস্থাপনের কোন প্রকার অবকাশ না পায়। হেদায়েতের এই দুই বন্ধনীর মধ্যে অবস্থান করছে মানব জাতি। সুতরাং মানুষ কখনো ঐশী পথ প্রদর্শক শূন্য অবস্থায় থাকবে না। মহানবী (সাঃ) দুনিয়াতে আগমন করে নবুয়তের পরিসমাপ্তি ঘটান। তিনি হলেন শেষ নবী তাঁর পরে আর কোন নবী আগমন করবেন না। কিন্তু প্রশ্ন হল তাঁর অবর্তমান কাল থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সময়ে মানব জাতিকে সত্যের “সিরাতে মুস্তাকিমের” দিকনিদের্শনা দেবে কে? আমরা কিভাবে নিশ্চিত হব যে “সিরাতে মুস্তাকিমের পথে” অবিচল আছি? ‘আজ দু‘জন মুফতি বিপরীতমুখী দু’রকম কথা বলেন।’

প্রত্যেকটি ফেরকা অন্য ফেরকাকে বিচ্যুত বলে বিশ্বাস করে থাকেন। তাহলে প্রকৃত সত্যের আলো কোথায় পাওয়া যাবে? সম্মানিত পাঠক আপনার কাছেই যদি প্রশ্ন করা হয় যে, রাসূলের যুগের মতই মুসলমানগণ যদি আজ একটি একক জাতি হিসেবে থাকত, তাহলে কেমন হত? মুসলমানজাতি আজ চরম দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যদি প্রশ্ন করি, এত সব ফেরকার উৎপত্তির মূল কারণ কি? তাহলে কি উত্তর দিবেন? নিশ্চয় আমি ও আপনার মত সাধারণ লোকেরা এত সব ফেরকার সৃষ্টি করিনি। তাহলে করলো কারা? আর যারা ফেরকা সৃষ্টি করেছেন তারা কি ভালো কাজ করেছেন? ফেরকা হল রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শকে ভুল অনুধাবনের একটি ফল। যাকে আমরা মাকাল ফলের সাথে তুলনা করতে পারি। যার বাহ্যিক অবয়ব অতি সুন্দর ইসলামের মতই কিন্তু অভ্যন্তরে অবস্থান করছে আমাদের কামনা বাসনায় তৈরি এক নতুন আদর্শ। আজ কোন ফেরকাই স্বীকার করবে না যে তারা মহানবী (সাঃ)-এর আদর্শকে ভুল অনুধাবন করেছেন। কিন্তু অতি দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে! আজকে আমরা পবিত্র ইসলামে, মুসলিম উম্মাহ্র মাঝে, যে ফেরকাবন্দী বা দল বিভক্তি দেখছি, তা আল্লাহ্, রাসূল (সাঃ) কিংবা পবিত্র কোরআনকে কেন্দ্র করে হয়নি, হয়েছে খিলাফত বা ইমামতকে আক্ষেপ করার কারণে। মহানবী (সাঃ)-এর পর উম্মতে মোহাম্মদীকে কে “সিরাতে মুস্তাকিমের” পথে পরিচালিত বা দিকনির্দেশনা দিবে তা নিয়ে, রাসূল (সাঃ) আজকের দিনের অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন। কেননা একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে মহানবী (সাঃ) বলেছেন, “আমার উম্মতেরা আমার পর ৭৩ দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে, এদের মধ্যে ১টি দল পরকালে মুক্তি পাবে, আর বাঁকি দলগুলো পথভ্রষ্ট বা তারা জাহান্নামী হবে।” সূত্রঃ-মুসতাদরাক হাকেম, খঃ-৩, পৃঃ-১০৯; মুসনাদে হাম্বাল, খঃ-৩, পৃঃ-১৪; সহীহ্ তিরমীজি, খঃ-৫, হাঃ-২৬৪২, (ই,ফাঃ)। মহানবী (সাঃ) এটাও বলে গেছেনঃ “আমার উম্মতের একটি দল (মাযহাব) সর্বদাই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।” সূত্রঃ-সহীহ বোখারী, খঃ-১০, পৃঃ-৫০৩, হাঃ-৬৮১৩, (ই,ফাঃ); সহীহ্ মুসলিম, খঃ-৫, হাঃ-৪৭৯৭, (ই,ফাঃ); সহীহ্ তিরমীজি, পৃঃ-৬৯৩, হাঃ-২১৯০, (সকল খন্ড একত্রে, তাজ কোং); সহীহ্ বুখারী, পৃঃ-১১১৩, হাঃ-৬৮০৪, (সকল খন্ড একত্রে, তাজ কোং)। মহানবী (সাঃ) এটাও বলেছেন যে, “তাঁর পর তাঁর অনুসারীর মধ্যে অনেকে নিজেদের পূর্ববর্তী (কুফরীর) অবস্থায় ফিরে যাবে।” সূত্রঃ-সহীহ বোখারী শরীফ, পৃঃ-১০৮৩, হাঃ-৬৫৮৬-৬৫৯০, (সকল খন্ড একত্রে, তাজ কোং, ২০০৯ ইং); সহীহ্ মুসলিম, খঃ-১, হাঃ-১৩১, ১৩৩; (ই,সেন্টার)। “এবং তাঁর উম্মত পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং একে অপরকে হত্যা পর্যন্ত করবে।” সূত্রঃ-সহীহ বোখারী, খঃ-১০, হাঃ-৬৫৯৭-৬৬০০, ৬৪০২-৬৪০৩, (ই,ফাঃ); সহীহ্ মুসলিম, খঃ-৭, হাঃ-৬৮০৬; (ই,সেন্টার); সহীহ বোখারী শরীফ, পৃঃ-১০৫৫, হাঃ-৬৩৯২,৬৩৯৩, (সকল খন্ড একত্রে, তাজ কোং, ২০০৯ ইং)। এবং রাসূল (সাঃ) অন্যত্র বলেছেন, “আমার পরে এমন সব ইমাম হবে (নেতা হবে) যে আমার হেদায়েত অনুসারে আমল করবে না এবং আমার সুন্নাতকে আমলের উপযুক্ত মনে করবে না এবং শীঘ্রই তাদের মধ্যে হতে এমন লোকেরা উঠে দাঁড়াবে, যাদের দেহ হবে মানুষের মত কিন্তু অন্তর হবে শয়তানের।” সূত্রঃ-সহীহ্ মুসলিম, খঃ-৬, পৃঃ-৩৯৩, হাঃ-৪৬৩৪; (ই,সেন্টার); সহীহ্ মুসলিম, পৃঃ-৭৫১, হাঃ-৪৬৩৩, (সকল খন্ড একত্রে, তাজ কোং)।

কিন্তু প্রশ্ন হল? এই মহা-সমস্যা থেকে মুক্তি বা “সিরাতে মুস্তাকিমের” সত্যপথ পাওয়ার কোন দিকনির্দেশনা কি তিনি দিয়ে যাননি? যদি তিনি পথনির্দেশনা দিয়ে থাকেন, তাহলে তা আমাদের অবশ্যই অনুসন্ধান করা উচিত। আর যদি কোন পথনির্দেশনা না দিয়ে থাকেন, তবে বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। যথাক্রমেঃ তিনি তাহলে কিভাবে “রাহমাতাল্লিল্ আলামিন” হলেন? যিনি উম্মতের সমস্যাকে শনাক্ত করতে সক্ষম, কিন্তু সমাধান দিতে পারেন না। কেয়ামতের দিন আমরা মহান আল্লাহ্‌ দরবারে অজুহাতের স্বরে বলতে পারবো যে, “ইয়া রাব্বুল আলামিন” পৃথিবীতে আমরা বিভিন্ন ফেরকার বা মাযহাবের দেখানো পথের অনুসরণ করেছি। কোন পথে চলতে হবে সেক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ)-এর কোন দিকনির্দেশনা পাইনি। তাই আমরা জন্ম সূত্রে বাপ-দাদাদের কাছে যে মাযহাব পেয়েছি, তারই অনুসরণ করেছি”। কিন্তু এরকম সকল প্রকারের বাহানার ভিত্তিকেই মহান আল্লাহ্ পবিত্র র্কোআনে বাতিল করে দিয়েছেন। “সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে রাসূলদের আমি এজন্য প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর সামনে মানুষের কোন ওজর আপত্তি না থাকে।” (সূরা-নিসা, আয়াত-১৬৫)। তাই আমরা কোরআনের ভিত্তিতে বলতে পারি যে, মহানবী (সাঃ) কেয়ামত পর্যন্ত বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে মানব জাতিকে বিভিন্নভাবে পথনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কোরআন ভিত্তিক এ জাতীয় বিশ্বাসই সর্বাধিক সত্য। এখন প্রশ্ন হল যখন সমস্ত মাযহাব বলছে সত্যের আলো তারাই বহন করছেন তখন সেখানে আমরা কিভাবে রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশিত ও আল্লাহ প্রদত্ত পথকে বেছে নিতে পারবো? এবং রাসূল (সাঃ)-এর পর এ নেতৃত্বের দায়িত্ব কার? এ ধরনের নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে কি? কেননা ইসলামের নিয়ম কানুন ও বিধান চিরন্তন ও সর্বকালেই প্রযোজ্য। তাই রাসূল (সাঃ)-এর পর এই ঐশী ব্যবস্থাকে অবশ্যই অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।

যেমন পবিত্র কোরআনের ঘোষণা : “আপনি তো কেবল সতর্ককারী মাত্র। আর প্রত্যেক জাতির জন্য আছে পথ প্রদর্শক।” (সূরা-রাদ, আয়াত-৭); আরো ঘোষণা হচ্ছে-“আমিই আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর এমন কোন উম্মত ছিল না, যাদের মধ্যে কোন সতর্ককারী আসেনি।” (সূরা-ফাতির, আয়াত-২৪);

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, “আর স্মরণ কর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের বললেন : আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি তখন তারা (ফেরেশতারা) বললঃ আপনি কি সেথায় এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে সেখানে অশান্তি ঘটাবে এবং রক্তপাত করবে? আর আমরা তো সদা আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। আল্লাহ বললেন : অবশ্যই আমি যা জানি তা তোমরা জানো না।” (সূরা-বাকারা, আয়াত-৩০)

উক্ত, আয়াতে হযরত আদম (আঃ)-কে সর্বপ্রথম প্রতিনিধি মনোনীত করার সম্পর্কে বর্ণিত এবং এখানে লক্ষনীয় বিষয় এই যে আল্লাহপাক এখানে বলেননি যে, হে ফেরেশতারা তোমরা যেহেতু মাসুম সর্বদা আমার বন্দেগীতেই মগ্ন থাক তোমরা নিজেরাই ইজমা-কেয়াস করে তোমাদের ইচ্ছা মত কাউকে আমার প্রতিনিধি মনোনীত করো। এটাও বলেননি যে, আমি দুনিয়াবাসীদের ইজমা-কেয়াস দ্বারা নির্বাচনে তাদের আমার প্রতিনিধি বানানোর অধিকার দেব, এটাও বলেননি যে, লোকে যাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে আমি তাকে সমর্থন দিবো। বরঞ্চ আল্লাহ ঐ পদ্ধতিগুলো ত্যাগ করে দৃঢ়তার সহিত বলেছেন যে আমি স্বয়ং দুনিয়াতে আমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করব এবং এটাতে অন্যের হস্তক্ষেপের কোনই অধিকার নেই। আর ফেরেশতারা যখন আল্লাহর কাছে নিজের অভিমত ব্যক্ত করলেন তখন সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ ফেরেশতাদের সেই অনুরোধকে রদ করে এক তীব্র উত্তরে তাদের অনুরোধ বাতিল ঘোষণা করলেন ও বললেনঃ “অবশ্যই আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।”

পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি, যদি মাসুম, নিষ্পাপ ফেরেশতাদেরই প্রতিনিধি মনোনয়ন-এর কোন অধিকার নাই, তাহলে ভ্রান্তিযোগ্য মানুষ কি করে এমন মনোনয়নের পুরো দায়িত্ব নিজেদের উপর তুলে নিতে পারে? উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ “ইন্নি ও জায়েলোন” শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন অর্থাৎ আমিই (আল্লাহ) নিযুক্ত করব। তারপর ইজমার প্রশ্ন মোটেও আসতে পারে না। কারণ “জায়েলোন” শব্দ ইসমে ফায়েলের সেগারূপে ব্যবহৃত হয়েছে অর্থাৎ যা “পূর্বে, বর্তমানে ও ভবিষ্যতে বর্তীবে” এবং “জায়েলুন এর সঙ্গে ইন্নি” শব্দ যোগ করে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এটা ষ্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, প্রত্যেক যুগেই আল্লাহর প্রতিনিধি নিযুক্ত করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার, অন্য কেউ এটা করলে খোদার উপর খোদাগিরি হবে, তাই নয় কি?

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ আর তা হচ্ছে আল্লাহ মানবজাতি সৃষ্টি করার আগে একজন হাদী বা হেদায়াতকারীকে প্রথমেই পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন যেমন হযরত আদম (আঃ) কে, কিন্তু কেন? কেন তিনি সাধারন মানুষকে সর্বপ্রথম পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন না? এটা আমাদের জন্য চিন্তার বিষয় নয় কি? এটার কারণ হচ্ছে, আমরা সবাই জানি ইবলিস শয়তান-এর কথা সে আদম (আঃ)-এর আগে পৃথিবীতে বসে আছে সাধারণ মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তাই আল্লাহ চান না তার সৃষ্টি এটা না বলুক যে, আল্লাহ আপনি তো আমাকে সৃষ্টি করেছেন কিন্তু কোন হেদায়াতকারী পাঠাননি আর শয়তানতো প্রথম থেকেই উপস্থিত ছিল আমাদের পথভ্রষ্ট করার জন্য তাই আমি পথভ্রষ্ট হয়ে গেছি, আল্লাহ এই অভিযোগ-এর কোন সুযোগ রাখেন নি, আল্লাহ চান না তার সৃষ্টি এক সেকেন্ড-এর জন্যও হেদায়াতকারী ব্যতিত থাকুক, তাই তিনি “সর্বপ্রথমে পৃথিবীতে প্রথম হেদায়াতকারী হযরত আদম (আঃ)-কে প্রেরণ করার পর সাধারন মানুষের ধারাবাহিকতা তারই মাধ্যমে শুরু করলেন, যাতে প্রত্যেকে জন্মগ্রহণ করার পর সঙ্গে সঙ্গে হেদায়াতের ছায়া পায় তা থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে আল্লাহ সৃষ্টিকে এক সেকেন্ডের জন্য হাদী ব্যতিত রাখতে চান না, সেই আল্লাহ মহানবী (সাঃ)-এর পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যত সৃষ্টি আগমন করবে, তাদের হেদায়াতকারী ব্যতিত ছেড়ে দিবেন, এটা বিবেক গ্রহণ করতে চায় কি? কারণ ঐশী মহামানব নবী (সাঃ)-এর পর আর কোন নবীর আগমন হবে না কিন্তু এই ঐশী সংবিধানকে কে রক্ষা করবে? তাই অবশ্যই মানতে হবে যে এমন একজনকে উপনীত থাকতে হবে যিনি এই ঐশী সংবিধান-এর রক্ষাকারী ও ওয়ারিশ হবেন ও তাকে অবশ্যই আল্লাহর দ্বারা মনোনীত হতে হবে” সে নবী হবে না, সে নবীর উত্তরাধিকারী হবে, “বর্তমানে এই ঐশী সংবিধান-এর রক্ষাকারী ও ওয়ারিশ হলেন, মহানবী (সাঃ)-এর আহলে বাইত (আঃ) এর শেষ সদস্য ঐশী মানব যিনি ইমাম মাহদী (আঃ) নামে পরিচিত।”

পবিত্র র্কোআনে আল্লাহ্ পাক বলেন, “স্মরণ কর, সেদিনের (কিয়ামতের) কথা যখন আমি সকল মানুষকে তাদের ইমামসহ (নেতাসহ) আহবান করব….।” (সূরা-বনী ইসরাঈল, আয়াত-৭১)।

মহানবী (সাঃ) এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি সময়ের ইমামকে না চিনে বা না জেনে মারা যায় সে জাহেলীয়াতে মারা যায়”। সূত্র:-মুসনাদে হাম্বাল- খঃ, ৪, পৃঃ, ৯৬)

  • “আমি এ কিতাবের (র্কোআনের) অধিকারী (ওয়ারিশ) করেছি তাঁদেরকে যাদেরকে আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে পছন্দ করেছি।” (সূরা-ফাতির, আয়াত-৩২)।
  • “এটাই আল্লাহর রীতি যা পূর্ব থেকে চলে আসছে। আপনি আল্লাহর রীতিতে কোনই পরিবর্তন পাবেন না।”(সুরা-ফাতাহ,আয়াত-২৩)। ###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔