ভূমিকা: “আরবাঈন” কথাটি আরবী হলেও ফার্সী, উর্দূ ও অন্যান্য ভাষাতেও “ইয়াওম” বিশেষ্যের বিশেষণপদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে ৬১ হিজরীর ১০ই মোর্হারমে কুখ্যাত ইয়াযিদ বাহিনীর হাতে রসুলের (সা.) দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) নির্মম শাহাদাতের পর হতে অঞ্চল বিশেষে এ বিশেষণপদটি বিশেষ্যের ভূমিকা পালন করে আসছে। ইমাম হুসাইন (আ.) প্রেমিক অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে এ শব্দটি মানুষের কানে বিঁধার সঙ্গে সঙ্গে সবারই মস্তিষ্ক কারবালা ও চান্দ্র সফর মাসের ২০ তারিখ, অর্থাৎ ইমামের (আ.) শাহাদতের ৪০তম দিনের প্রতি স্থানান্তরিত হয়। কারও কারও বর্ণনা মতে, ইমামের বন্দী কাফেলা (তাঁরই সন্তান হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.), বোন যয়নব (আ.), ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে প্রমুখ।) ইয়াযিদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে এই দিনেই কারবালায় উপস্থিত হয়ে ইমাম হুসাইন (আ.) সহ অপর শহীদগণের কবরগুলো যিয়ারত করেন এবং শহীদগণের জন্যে প্রাণ উজাড় করে কান্নার সুযোগ পান। একইভাবে, আল্লাহর রসুলের (সা.) প্রবীণতম সাহাবী হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ আনসারী (রা.) যিনি বার্ধক্যের ভারে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও এই দিনে তাঁদের সঙ্গে কারবালায় যিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ করেন।
ইমাম হুসাইনের (আ.) সংক্ষিপ্ত পরিচয়: তিনি আল্লাহর রসুলের (সা.) প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র এবং হযরত ইমাম আলী ও মা ফাতিমার (আ.) সন্তান। সিহাহ্ সিত্তা ও কুতুবে আরবাআ’য় বর্ণিত একাধিক হাদীসের স্পষ্ট বর্ণনা মতে, তিনি ও তদীয় সহোদর হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) জান্নাতের পুরুষদের নেতা। এঁদেরকে ভালবাসার অর্থই হচ্ছে আল্লাহর রসুলকে (সা.) ভালবাসা এবং তাঁকে (সা.) ভালবাসার অর্থই হচ্ছে আল্লাহকে ভালবাসা। পক্ষান্তরে, এঁদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করা ও এঁদেরকে দুঃখ-কষ্ট দেয়ার অর্থই হচ্ছে আল্লাহর রসুলের (সা.) সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করা ও তাঁকে দুঃখ-কষ্ট দেয়া। আর তাঁর (সা.) সঙ্গে এসব করার অর্থই হচ্ছে স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গে এসব করা। সুতরাং, কারবালা সহ ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় যারাই এঁদের সঙ্গে এহেন দুর্ব্যবহার করেছে তাদের পরিণতি সহজেই অনুমেয়।
গুরুত্ব: আমরা হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) কারবালা বিপ্লবের ইতিহাস অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই যে, তিনি একমাত্র দ্বীন ইসলামের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই সেখানে যান। অনেকেই ধারণা করেন যে, তৎকালীন সরকারপ্রধান মোয়াবিয়াপুত্র ইয়াযীদ, হযরত ইমাম হুসাইনকে (আ.) স্বীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বদ্বী ভেবে, বায়াত গ্রহণের মাধ্যমে স্বীয় বশ্যতা স্বীকার করাতে চাচ্ছিল। কিন্তু এ ধারণাটি ভুল অথবা আংশিক সত্য। কারণ, ইমাম (আ.) স্বীয় ভাষণের বিভিন্ন অংশে বলেন: “আমার মত লোক যদি ইয়াযিদের মত লোকের হাতে বায়াত করার মাধ্যমে তার বশ্যতা স্বীকার করেন, তাহলে এখান থেকেই দ্বীন ইসলামের খোদা হাফেয!” এ কথার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ইয়াযিদ তাঁকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দীয় জ্ঞান করেনি; বরং রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় প্রভৃতি ক্ষেত্রেই তাঁকে প্রতিদ্বন্দী জ্ঞান করেছিল। ইয়াযিদ নিজে মুসলমান ছিল না। কাজেই, দ্বীন ইসলামের সঙ্গেই তার মূল শত্রুতা বিরাজমান ছিল। আর এ দাবীর সত্যতা মিলে যখন সে ইমামের (আ.) কর্তিত মাথাটিকে একটি ট্রেতে করে স্বীয় দরবারে আনিয়ে নিয়ে বেতের একখানা লাঠি দ্বারা ইমামের (আ.) দাঁতে আঘাত করছিল ও স্বীয় ক্ষোভ ঝাড়ছিল তখন। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক তাবারী স্বীয় প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থ “তারীখে তাবারী’র” ৪র্থ খন্ডের ১৮৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন: “সে প্রকাশ্যে কুফরী ঘোষণা করছিল ও তার র্শিক প্রকাশ করছিল এবং সে বলছিল: হাশেমী বংশ রাষ্ট্র নিয়ে খেলা করেছে, (আসমান হতে) না কোনো সংবাদ এসেছে এবং না কোনো অহী নাযিল হয়েছে! আমি খিন্দিফ বংশের লোক নই। যদি আজ প্রতিশোধ গ্রহণ না করি, আহমদের বংশধর হতে – তারা যা কিছু করেছিল সে সবের! হায়! বদরযুদ্ধে নিহত হওয়া আমার বড় বড় ব্যক্তিরা আজ যদি প্রত্যক্ষ করত খাযরাজদের আর্তনাদ যা ধারাল তরবারী আঘাত দেখে হচ্ছে। আমরা আজ ওদের খ্যাতনামা ব্যক্তিগণকে হত্যা করেছি এবং এর মাধ্যমে বদরের ঢাল সামঞ্জস্য করেছি। সুতরাং তারা স্বাগত জানাত ও আহ্লাদ করত এবং বলত: হে ইয়াযিদ, তোমার হাত যেন ব্যথিত না হয়!”
মূল এই কবিতার রচয়িতা যদিও “ইবনে যেবা’রা” নামক এক আরবী কবি তথাপি ইয়াযিদ এটি আবৃত্তি করার মাধ্যমে স্বীয় আক্বিদা-বিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছে। আর আমাদের সমাজে আজও এই ইয়াযিদী চিন্তাধারাসম্পন্ন লোকের অভাব নেই। নামে ও বাহ্যিক বেশ-ভূষায় মুসলমান ধারণা হলেও মূলতঃ তারা মুসলমান নয়। বরং, ইসলামের পোশাকে, দ্বীন ইসলামকে উৎখাত করার চেষ্টায় রত। এসব লোকের ব্যাপারে আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
অপরদিকে, একদল মুসলমান যুগ যুগ ধরে ইমাম হুসাইনের (আ.) চল্লিশা পালন ও উদযাপনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নিকট এই বার্তাই দিতে চান যে, তারা ইমাম হুসাইনের (আ.) রক্তের বিনিময়ে রেখে যাওয়া ইসলামের লালনকারী এবং ইসলামের প্রয়োজন হলে নিজেদের তাজা রক্ত বিসর্জন দিতে এতটুকুও কুণ্ঠাবোধ করবেন না। আর এখানেই চল্লিশা পালনের গুরুত্ব ও স্বার্থকতা ফুটে ওঠে।
ফজিলত: হযরত ইমাম সাদিক (আ.) বলেন: কেউ যদি পায়ে হেঁটে হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) কবর যিয়ারত করতে যান তাহলে তিনি তাঁর (আ.) কবরস্থানে পৌঁছা পর্যন্ত তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে মহান আল্লাহ তার আমলনামায় একটি করে নেকী লিখেন এবং একটি করে গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। আর তিনি সেই সম্মানিত স্থানে (ইমামের কবর) পৌঁছার পর থেকে যিয়ারত ও তৎসংক্রান্ত আমল সমাপ্ত করা অবধি মহান আল্লাহ তাকে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ধার্য্য করেন। আর তিনি প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ নেয়ার আগ পর্যন্ত মহান আল্লাহ তাকে বিজয়ীদের মধ্যে গণ্য করেন এবং এ সময় একজন ফেরেশতা তার নিকট আগমন করে তাকে বলতে থাকেন: আল্লাহর রসুল (সা.) আপনাকে সালাম জানিয়ে বলেছেন, “তুমি সদ্য জন্মগ্রহণ করা একজন শিশুর ন্যায় নতুনভাবে জীবনের কাজকাম (আমল) শুরু কর! কেননা, তোমার জীবনের সব গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।”
আব্দুল্লাহ ইবনে হেলাল হযরত ইমাম সাদিককে (আ.) জিজ্ঞাসা করেন: “আমার জীবন আপনার নিমিত্তে উৎসর্গ হোক! ইমাম হুসাইনের (আ.) কবর যিয়ারতের বিনিময়ে মহান আল্লাহ সর্বনিম্ন্ সওয়াব ও নেকী দিয়ে থাকেন?” উত্তরে তিনি বলেন: “হে আব্দুল্লাহ! তার সর্বনিম্ন্ নেকী হচ্ছে এই যে, তিনি প্রত্যাবর্তন করা অবধি মহান আল্লাহ স্বয়ং তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করেন এবং কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহ তাকে (আপদ-বিপদ থেকে) সংরক্ষণ করবেন।”
অপর এক হাদীসে হযরত ইমাম সাদিক (আ.) বলেন: যে ব্যক্তি হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) কবর যিয়ারত করতে যান তিনি স্বীয় পরিবার-পরিজন থেকে বিদায় গ্রহণ করে যেই প্রথম কদম তুলেন তখনই তার যাবতীয় গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হয়। এরপর হতে কবরস্তানে পৌঁছা পর্যন্ত যতবারই তিনি কদম তুলেন ততবারই তাকে পূত-পবিত্র করা হয়। অতঃপর তিনি কবরস্তানে পৌঁছে গেলে মহান আল্লাহ তাকে আহ্ববান জানিয়ে তার সঙ্গে গোপন আলাপে রত হন ও তিনি বলেন: “হে আমার বান্দা! তুমি আমার নিকট প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে প্রদান করব। তুমি আমাকে ডাকো, আমি তোমার ডাকে সাড়া দিব। তুমি আমার নিকট কামনা কর, আমি তোমার কামনা পূরণ করব। তুমি তোমার প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারে আমার নিকট চাও, আমি তোমার চাওয়া-পাওয়া পূরণ করব।” বর্ণনাকারী বর্ণনা করেন: ইমাম (আ.) বলেন, “মহান আল্লাহর দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে এই যে, বান্দা যাকিছু তাঁর পথে ব্যয় করবেন তিনি তারই বিনিময় দিবেন।”
হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) অন্য এক হাদীসে বলেন: যিনি পদব্রজে হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) কবর যিয়ারতে যাবেন, মহান আল্লাহ তার প্রত্যেক কদমের বিনিময়ে তাকে এক সহশ্র নেকী দিবেন, এক সহশ্র গুনাহ্ ক্ষমা করবেন এবং তার মর্যাদাকে এক সহশ্র ডিগ্রি উচ্চে তুলে ধরবেন। অতঃপর তিনি বলেন: “আপনি যখন ফোরাতকূলে প্রবেশ করবেন তখন প্রথমতঃ গোসল করেন এবং আপনার পায়ের জুতা-স্যান্ডেল ইত্যাদিকে রেখে, এক তুচ্ছ ও লাঞ্ছিত দাসের মত খালি পায়ে সম্মুখে অগ্রসর হন! “হায়ের” ফটকে পৌঁছে আপনি ৪ বার তকবিরধ্বনি দিন! এরপর সম্মুখে একটু অগ্রসর হয়ে আবারও ৪বার তকবিরধ্বনি দিন! অতঃপর তাঁর (আ.) শিয়রের পাশে দাঁড়িয়ে ৪বার তকবিরধ্বনি দিন ও কবরের পাশেই নামায আদায় করুন এবং মহান আল্লাহর নিকট স্বীয় প্রয়োজন পূরণের নিমিত্তে প্রার্থনা করুন!”
আব্দুল্লাহ ইবনে নাজ্জার বলেন: হযরত আবু আব্দিল্লাহ (আ.) আমাকে বলেন: “তুমি কি হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) যিয়ারতে যাবা? তুমি কি কিস্তিতে আরোহণ করবা ও তাঁর যিয়ারতে যাবা?” আমি সবিনয়ে বল্লাম: “জ্বি, হ্যাঁ।” তখন তিনি বল্লেন: “তুমি কি জান যে, যখন তোমার কিস্তি তোমাকে সাগরে উল্টে দেয় তখন একজনআহব্বানকারী এমর্মে আহব্বান জানান: “আপনি অবগত থাকুন! আপনার সৌভাগ্য; আপনাকে বেহেশেতর সুসংবাদ!”
হযরত ইমাম সাদিক (আ.) অপর এক হাদীসে বলেন: … কেউ হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) যিয়ারতে গেলে মহান আল্লাহ তার জন্যে দুইজন ফেরেশতা নিয়োগ করেন ও তাদেরকে আদেশ দেন যে, তার মুখ থেকে ভালো যা কিছু বের হবে তা যেন তারা লিখেন এবং মন্দ যা কিছু বের হবে তা যেন না লিখেন! আর তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করবেন তখন যেন তারা তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে বলেন: “হে আল্লাহর বন্ধু! আপনার পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আপনি আল্লাহ, আল্লাহর রসুল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের (আ.) দলের অন্যতম সদস্য গণ্য হয়েছেন। মহান আল্লাহ আদৌ আপনার চক্ষুকে জাহান্নামের আগুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাবেন না এবং আগুনও কখনই আপনাকে দেখতে পাবে না ও আপনাকে স্বীয় আহারে পরিণত করার সুযোগ পাবে না।”
হযরত ইমাম সাদিক (আ.) অপর এক হাদীসে বলেন: আল্লাহ পাকের কিছু ফেরেশতা আছেন যাদেরকে তিনি হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) কবরের পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। কেউ তাঁর (আ.) যিয়ারতের ইচ্ছা করলেই মহান আল্লাহ তার পাপরাশিকে এই ফেরেশতাদের এক্তিয়ারে ধার্য্য করেন। অতঃপর ব্যক্তিটি পা উঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই ফেরেশতাগণ তার পাপরাশি ক্ষমা করে দেন। এরপর তিনি দ্বিতীয় কদম তুল্লেই তারা তার নেকীসমূহকে দুই থেকে কয়েক গুণে বাড়িয়ে দেন এবং এভাবে তার পদক্ষেপ যতই বাড়তে থাকে, তার নেকীর পরিমাণ ততই বাড়তে থাকে; এভাবে বাড়তে বাড়তে এক সময় তার জন্যে বেহেশত ওয়াজিব ও সুদৃঢ় হয়ে যায়। অতঃপর তারা তার চারিদিককে পূত-পবিত্র করেন এবং আসমানের ফেরেশতারা আওয়াজ দিয়ে বলেন: “আল্লাহর বন্ধুর বন্ধু, যিয়ারতকারীদের আপনারা পবিত্রতা ঘোষণা করুন!” আর যিয়ারতকারীরা গোসল করলে হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাদেরকে আহব্বান জানিয়ে বলেন: “হে আল্লাহর মোসাফিরগণ! তোমাদের জন্যে সুসংবাদ যে, বেহেশেত তোমরা আমার সঙ্গে অবস্থান করবে!” অতঃপর আমীরুল মোমেনীন আলী (আ.) তাদেরকে আহব্বান জানিয়ে বলেন: “আমি আপনাদের প্রয়োজন পূরণ এবং দুনিয়া ও আখেরাতে আপদ-বিপদ প্রতিহত করার দায়িত্বভার কাঁধে নিয়েছি।” অতঃপর আল্লাহর রসুল (সা.) ডান-বাম থেকে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং অবশেষে তাদেরকে স্বীয় দলে ফিরিয়ে আনবেন।”
অপর এক হাদীসে তিনি (আ.) বলেন: কেউ যদি আমাদের অনুসারী হয় ও হযরত ইমাম হুসাইনকে (আ.) – কবর – যিয়ারত করে, তাহলে সে প্রত্যাবর্তনের আগেই তার যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। আর যতবারই সে কদম উঠায়, স্বীয় হাত উঁচু করে এবং স্বীয় বাহনকে হাঁটায় ততবারই তার এসব কাজের প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার আমলনামায় এক সহশ্রনেকী লেখা হয়, এক সহশ্র পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং এক সহশ্র ডিগ্রি তার মর্যাদার উন্নতি সাধিত হয়।
আরও এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: যে ব্যক্তি পদব্রজে হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) কবর যিয়ারতে যায়, মহান আল্লাহ তার প্রত্যেকবারই পা উঠানো ও মাটিতে রাখার বিপরীতে তাকে হযরত ইসমাঈলের (আ.) বংশের এক একটি দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব দান করেন। আর কেউ যদি পানি পথে নৌকা সহযোগে তাঁর (আ.) যিয়ারতে যাবার সময় নৌকা কাত হয়ে তাকে পানিতে ফেলে দেয় তাহলে আসমান হতে এক আহ্ববানকারী এমর্মে আহব্বান জানায়, “তোমার জন্যে বেহেশেতর সুসংবাদ!”
আমাদের করণীয়: উচ্চ মর্যাদার অধিকারী কারবালায় উদযাপিত হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) চল্লিশা এক বিশাল ব্যাপার যা নিশ্চিতরূপে সমগ্র বিশ্বে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এই ব্যতীক্রমধর্মী মহত্ত¡টি মহান আল্লাহ হযরত ইমাম হুসাইনকে (আ.) দান করেছেন।
কাফির বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো সংবাদ মাধ্যম, ইন্টারনেট মিডিয়া, টেলিভিশন এবং আহলে বাইতের (আ.) শত্রুদের সঙ্গে সংযুক্ত কোনো প্রচার মাধ্যমই এক নিমিষের জন্যেও, ইমাম হুসাইনের (আ.) যিয়ারতকারীদের এত বিশাল সমাগমের কোনো সংবাদ কিংবা কোনো দৃশ্য প্রচার ও প্রদর্শন করে না। পক্ষান্তরে, পৃথিবীর যে কোনো কর্ণারে ওদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে কোনো ক্ষুদ্র ঘটনা সংঘটিত হলেই সেটিকে ওরা অনেক বড় করে একাধিকবার প্রচার ও প্রদর্শন করতে থাকে।
হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) এই আরবাঈন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের উদ্দেশে বিশ্বের বিভিন্ন দূর-দূরান্ত হতে মিলিয়ন মিলিয়ন নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবনিতা কারবালায় সমবেত হয়ে থাকেন। কিন্তু বিশ্বের খুব সীমিত প্রচার মাধ্যমই এই সমাগমের খবর ও দৃশ্য প্রচার করে। তবে যিয়ারতকারীদের স্মরণ রাখতে হবে যে, কেউ বা কোনো মিডিয়া এ সংবাদ ও দৃশ্য প্রচার করুক বা না করুক, কেউ আপনার প্রশংসা করুক বা না করুক, ইহকাল ও পরকালে আপনার এ সৎ কাজের বিনিময় সংরক্ষিত রয়েছে। কাজেই, আপনার যেমন কারও প্রশংসায় উদ্বেলিত হওয়া উচিৎ হবে না, তেমনিভাবে কোনো মিডিয়া আপনার সংবাদ প্রচার না করলে, আপনার হতোদ্যম হওয়াও ঠিক হবে না। আপনাকে সচেতনভাবে মনে রাখতে হবে যে, আপনি জান্নাতের পুরুষদের এক সম্রাট, হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) উপর কৃত অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে এবং এহেন ন্যাক্কারজনক কাজের ঘৃণা জানাতে এখানে সমবেত হয়েছেন। এর মাধ্যমে আপনি ইমামের (আ.) শত্রুদের সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ ঘোষণা ও তাঁর বন্ধুগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছেন। আর আপনার এ মহৎ কাজের বিনিময় দেয়ার নিমিত্তে মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) স্বীয় শাহাদাতের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে যে বার্তা দিয়ে গেছেন সেটিকে আপনি আহলে বাইত প্রেমিক ব্যতীত আর কে প্রচার করবে? আপনি যেহেতু আল্লাহ, তদীয় রসুল (সা.) এবং তাঁর আহলে বাইতের (আ.) প্রতি বিশ্বাস রাখেন, কাজেই এটি আপনারই দায়িত্ব। আপনি কাফির বিশ্বেই থাকুন, কিংবা মুসলিম বিশ্বেই বসবাস করুন, অথবা শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলেই জীবনযাপন করুন, কিংবা সুন্নী অঞ্চলেই থাকুন, এই বিশাল আরবাঈনের সংবাদ প্রচার করার দায়িত্ব আপনারই। আপনার যতটুকুই সামর্থ্য আছে তা নিয়েই আপনাকে এই মহৎ কাজে এগিয়ে আসতে হবে! আর তাহলেই আপনি নিজেকে হুসাইনী বলে দাবী করতে পারবেন।
যদি আপনি বিভিন্ন কারণে কারবালার এই বিশাল সমাগমে উপস্থিত হতে না পারেন তাহলে অন্ততপক্ষে আপনার নিজ এলাকায় যে চল্লিশা পালন করা হয় সেখানেও যদি আপনি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত নিয়ে এগিয়ে আসেন তবুও মহান আল্লাহ কিয়ামত দিবসে আপনাকে হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) সঙ্গে উত্থান ঘটাবেন। কারণ, উদ্দেশ্য একই ও অভিন্ন। খুলনা শহরে প্রতি বছরই বিভাগীয় পর্যায়ে এমনই এক চল্লিশা পালন করা হয়ে থাকে।
উপসংহার: হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) রওজার পাশে অনুষ্ঠিত আরবাঈন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্যে প্রতি বছরই ইরান-ইরাক হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন জনতা কারবালা অভিমুখে রওনা করেন। আর এসব যিয়ারতকারীর যাবতীয় রকমের সেবা দেয়ার জন্যে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন নজিরবিহীন উদ্যোগ নেয়া হয় যা কেউ নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে চাইবে না! এরই অনুসরণ করে, আমরাও নিজ নিজ এলাকায় যেসব চল্লিশা উদযাপন করা হয় সেগুলোতে যেন সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে আসতে পারি-আজকে এটিই হোক আমাদের বলিষ্ঠ শপথ!