আল্লামা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ হোসেন ফাজলুল্লাহ

by Rashed Hossain

আল্লামা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ হোসেন ফাজলুল্লাহর জন্ম ইরাকের পবিত্র নাজাফ শহরে ১৯৩৫ সালে। তিনি কয়েক বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর নয় বছর বয়সে ধর্মীয় শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। বাবা নিজে বড় আলেম হবার কারণে ঘরোয়া পরিবেশেই ধর্মীয় শিক্ষার সাথে বিশদ পরিচিতি লাভ করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি তিনি ইরাকের বিশিষ্ট আলেমদের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে ছাত্রজীবনেও তিনি পড়ালেখার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সব সময় সক্রিয় থেকেছেন। আরব বিশ্বের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও এর অশুভ পরিণতি আঁচ করতে পেরে তিনি তখন থেকেই তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করে তোলার কাজে সময় দিতে থাকেন। আল্লামা ফাজলুল্লাহ ও শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মদ বাকের সাদ্‌রের যৌথ চেষ্টায় ‘হেয্‌বুদ্দাওয়াতুল ইসলামিয়া’ নামে একটি দল গঠিত হয়।

১৯৬৬ সালে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে পিতৃভূমি লেবানন সফর করেন আল্লামা ফাজলুল্লাহ। সে সময় লেবাননের মুসলমানদের অবস্থা মোটেই ভালো ছিলো না। এ অবস্থা দেখে তিনি লেবাননিই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং লেবাননের তৎকালীন শীর্ষ আলেম ইমাম মুসা সাদ্‌রের সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকেন। আল্লামা ফাজলুল্লাহ তরুণদের ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বৈরুতে ‘আল মোয়াহহেদুশশারয়ি আল ইসলামিয়া’ নামক ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর বেশিরভাগ নেতাই ঐ ধর্মীয় কেন্দ্রে পড়ালেখা করেছেন। এছাড়াও তিনি দক্ষিণ লেবাননের সুর শহরে আল মোর্তজা ধর্মীয় মাদ্রাসা ও বৈরুতে মহিলা মাদ্রাসা গড়ে তুলেন। পাশাপাশি ইসরাইলের আগ্রাসন ও গৃহযুদ্ধে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন আল্লামা ফাজলুল্লাহ।

অবিসংবাদিত নেতা ইমাম খোমেনী (রহ:)’র নেতৃত্বে ইরানের ইসলামী বিপ্লব আল্লামা ফাজলুল্লাহর ওপর দারুণ প্রভাব ফেলেছিলো। তিনি ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে বিশ্বে প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক বিরাট অর্জন বলে মনে করতেন। তিনি ইরানের বিপ্লব ও ইমাম খোমেনী (রহঃ) সম্পর্কে লিখেছেন, ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইরানের বিপ্লব বর্তমান যুগে বিশ্বের বুকে ধর্মীয় নেতৃত্বের ভিত্তিতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছে। ধর্ম ও রাজনীতি যে আলাদা নয়, ইমাম খোমেনীর এই দর্শনের প্রতি আল্লামা ফাজলুল্লাহর পূর্ণ সমর্থন ছিলো। তিনি এই দর্শনকে ইসলামী জাগরণ ও মুসলিম ঐক্য জোরদার এবং বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ মোকাবিলার জন্য জরুরি বলে মনে করেন। এছাড়া, দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ফিলিস্তিনিদের মুক্তির জন্য সংগ্রামের ওপর ইমাম খোমেনী (রহঃ)’র গুরুত্বারোপ, ইহুদিবাদী দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়ে আল্লামা ফাজলুল্লাহর আগ্রহ ও স্পৃহাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিলো।

লেবাননের হিজবুল্লাহর নির্বাহী পরিষদের উপ-প্রধান আব্দুল করিম ওবায়েদ বলেছেন, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ মোকাবিলার বিষয়ে ইসলামী ইরানের অবস্থানকে আল্লামা ফাজলুল্লাহ পুরোপুরি সমর্থন করতেন। তিনি প্রতিরোধের দর্শনকে কেবল লেবাননে নয় গোটা মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে আল্লামা ফাজলুল্লাহ ইরানি প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতে ইরানকে ইসলামী চিন্তা ও সংস্কৃতির লালন কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেন। ইরানের সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদ বিরোধী নীতির প্রতি আল্লামা ফাজলুল্লাহর সমর্থনের কারণে পাশ্চাত্য ও ইহুদিবাদী সরকারগুলো তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয় এবং তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তার বিরুদ্ধে চার দফা হত্যা চেষ্টা হলেও তিনি বেঁচে যান।

লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের ওপর আল্লামা ফাজলুল্লাহর চিন্তা ও দর্শনের গভীর ও স্থায়ী প্রভাব পড়েছে। আজ যে হিজবুল্লাহর সদস্যরা আগ্রাসীদের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে, তারা আল্লামা ফাজলুল্লাহর হাতে গড়া বীর মুজাহিদ। তারা সবাই এই মহান আলেমের ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এ কারণেই পশ্চিমা মিডিয়া আল্লামা ফাজলুল্লাহকে হিজবুল্লাহর আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে অভিহিত করে থাকে। আল্লামা ফাজলুল্লাহ হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক কোন পদে না থাকলেও তার চিন্তা-দর্শন হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। এ কারণে হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তার মৃত্যুর পর বলেছেন, আমরা এক দয়াশীল পিতা ও বিজ্ঞ পথপ্রদর্শককে হারালাম। আল্লামা ফাজলুল্লাহ ইহুদিবাদের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিলেন। তিনি আল-জাজিরা টিভি চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আল্লাহতায়ালা ইহুদিদের বসবাসের জন্য একটি পবিত্র ভূখণ্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে যে দাবি করা হয়, তা বড় মিথ্যাচার এবং এর কোন ভিত্তি নেই। তিনি আরও বলেছেন, ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিন দখল করে নারী ও শিশুসহ ফিলিস্তিনী জনগণের ওপর নানা পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছে।

ইহুদিবাদ বিরোধী চিন্তা-দর্শন ও অবস্থানের কারণে আল্লামা ফাজলুল্লাহর মৃত্যুর পর ইসরাইল এ বিষয়ে শোক প্রকাশকেও মেনে নিতে পারেনি। লেবাননে নিযুক্ত বৃটিশ রাষ্ট্রদূত এই নেতার মৃত্যুর পর “এক মহান ব্যক্তিত্বের বিদায়” শিরোনামে এক শোকবাণী লিখে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্লগে প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত তার শোকবাণীতে লিখেছিলেন, আল্লামা ফাজলুল্লাহর মৃত্যুতে শোক ও মাতমের জন্য লেবানন ছোট্ট একটি স্থান। লেবানন ছাড়িয়ে অন্য প্রান্তেও তার অনুপস্থিতি উপলব্ধি করা যাচ্ছে। তার মতো আরও বেশি ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন রয়েছে এ বিশ্বের। এই শোকবাণী প্রকাশের পরপরই ইহুদিবাদী চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার তা ব্লগ থেকে সরিয়ে নেয়। এছাড়া, আল্লামা ফাজলুল্লাহর মৃত্যুতে শোক প্রকাশের দায়ে ইহুদিবাদ প্রভাবিত মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএন, তাদের সিনিয়র সম্পাদিকা অক্টাভিয়া নাস্‌রকে বরখাস্ত করেছে। সিএনএন’র এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যের বাক-স্বাধীনতার দাবির অসারতা আরো এক স্পষ্ট হয়েছে।

পশ্চিমা মিডিয়া আল্লামা ফাজলুল্লাহর মৃত্যুর খবর প্রচার করতে গিয়ে একটি ভিত্তিহীন বিষয় প্রচারের চেষ্টা করেছে। পশ্চিমা মিডিয়া বলতে চেয়েছে, হিজবুল্লাহ ও ইরানি নেতাদের সাথে আল্লামা ফাজলুল্লাহর মতবিরোধ ছিলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আল্লামা ফাজলুল্লাহ ইসলামী ইরান ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীকে পশ্চিমা আধিপত্য ও ইসরাইলী আগ্রাসনের মোকাবেলায় ঝাণ্ডাবাহী হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তিনি হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের নিজের সন্তান বলে মনে করতেন। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাও আল্লামা ফাজলুল্লার মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় বলেছেন, ধর্ম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আল্লামা ফাজলুল্লাহ ছিলেন এক মহান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি আল্লামা ফাজলুল্লাহর সমর্থনেরও তিনি প্রশংসা করেছেন।

আল্লামা ফাজলুল্লাহ শুধু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিই ছিলেন না তিনি একজন প্রভাবশালী কবিও বটে। আল্লামা ফাজলুল্লাহ মৃত্যুর আগে তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থের রচনা সমাপ্ত করেছেন। এছাড়া, আল্লামা ফাজলুল্লাহর লেখা বইয়ের সংখ্যা ৭০। তবে তিনি এমন সময় পৃথিবী ত্যাগ করলেন যখন বিশ্বে নতুন করে পরিবর্তনের সুর বেজে উঠেছে। মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও দূরত্ব কমে আসতে শুরু করেছে এবং ইসলামী জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি আল্লামা ফাজলুল্লাহর স্বপ্নের কিছুটা বাস্তবায়ন হলেও তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে। আর তাহলো, ইহুদিবাদীদের হাত থেকে ফিলিস্তিনীদের মুক্তি। তার এ স্বপ্ন বাস্তবায়নেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পতনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে।

মৃত্যুর আগ মুহুর্তের কথা। হাসপাতালের বেডে মৃত্যুশয্যায় শায়িত আল্লামা ফাজলুল্লাহকে বেশ অস্থির মনে হচ্ছিল। তাই এক নার্স তাকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনি একটু শান্ত হোন প্লিজ। উত্তরে তিনি বললেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের পতন না হওয়া পর্যন্ত আমি শান্ত হবো না। এরপর ফজরের নামাজের সময় হয়েছে কী না, তা জানতে চাইলেন। নার্স জবাবে বললেন, নামাজের সময় হয়নি এখনো। এরপর আল্লামা ফাজলুল্লাহ তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণ করে ঘুমিয়ে গেলেন, আর জাগলেন না। এভাবেই গত চৌঠা জুলাই আল্লামা ফাজলুল্লাহ ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

সুত্রঃ রেডিও তেহরান।

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔