আমরা যদি একটি শিশুকে প্রশ্ন করি যে, তুমি তোমার পিতা-মাতাকে কেন ভালবাস? সে বলবে: মিষ্টান্ন, পোষাকাশাক ও জুতা ক্রয়ের জন্যে! কিন্তু আমরা যদি এক যুবককে প্রশ্ন করি যে, তুমি তাদের কেন ভালবাস? সে উত্তর দিবে: পিতা-মাতা যেহেতু আমার ব্যক্তিত্ব ও সত্তার নিদর্শন, আমার প্রশিক্ষক ও আমার প্রতি সদয়, তাই।
সন্তানের বিকাশের বিস্তৃতি ঘটলে পিতা-মাতার অনুরাগ তার জন্যে আনন্দদায়ক হয়, তখন সে আর জুতা ও টুপি কিংবা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের চিন্তা করে না। সন্তানসন্ততিরা যদি পিতা-মাতার সেবাকে নৈকট্য অর্জন ও স্বীয় পূর্ণতার মাধ্যম হিসেবে জানত এবং বস্তুগত চিন্তাভাবনা হতে উন্নততর মনে করত তবে কতই না ভাল হত!
আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীও অনুরূপ। আর প্রত্যেকেই কোনো না কোনো কারণে আল্লাহর ইবাদত করছে। ইবাদতের স্তরভেদ রয়েছে:
প্রথম স্তর: একদল লোক আল্লাহর অনুগ্রহরাজীর কারণে তাঁর ইবাদত করে যাতে তারা তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারে। যেমন কুরআনও জনসাধারণকে সম্বধন করে বলে: “ফাল্ ই’য়াবুদূ রাব্বা হাযাল্ বাঈত্, আল্লাযী আত্ব’য়ামাহুম্ মিন্ জূইন্ ওয়া আ’মানাহুম্ মিন্ খাওফ।” অর্থাৎ অতএব, তারা যেন ইবাদত করে এ গৃহের পালনকর্তার যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং যুদ্ধভীতি থেকে নিরাপদ করেছেন।
প্রথম স্তরের ইবাদতকে আমরা কৃতজ্ঞতামূলক ইবাদত বলব এবং এটি ঠিক শিশুর ভালবাসার ন্যায় যে, স্বীয় পিতা-মাতাকে ব্যাগ, জুতা ও মিষ্টান্ন ক্রয়ের জন্যে ভালবাসে!
দ্বিতীয় স্তর: এ স্তরে, ইবাদতের বরকত ও অবদানের কারণে মানুষ আল্লাহর ইবাদত করে এবং নামাযের আধ্যাত্মিক ও আত্মিক অবদানের প্রতি গুরুত্ব দেয়। যেমন কুরআন বলে: “ইন্নাস্ সালাতা তান্হা ’আনিল্ ফাহ্শায়ি ওয়াল্ মুন্কার।” অর্থাৎ নিশ্চয় নামায মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ হতে বিরত রাখে।”
এ স্তরের ইবাদতকে আমরা উৎকর্ষমূলক ইবাদত বলব এবং এটি ঠিক এক যুবকের ভালবাসার ন্যায়, যে তার পিতা-মাতাকে শিক্ষক ও প্রশিক্ষক হওয়ার জন্যে এবং তাকে বিপদ ও ভ্রান্তিসমূহ হতে রক্ষা করার জন্যে সম্মান করে।
তৃতীয় স্তর: এ স্তরটি পূর্ববর্তী স্তরগুলি হতে উন্নততর এবং তা হচ্ছে এই যে, মহান আল্লাহ হযরত মূসাকে (আ.) বলেন: “আক্বিমিস্ সালাতা লিযিক্রী।” অর্থাৎ আমার স্মরণে নামায প্রতিষ্ঠা কর।
হযরত মূসা (আ.) পানাহারের জন্যে নামায আদায় করতেন না এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা হতে বিরত থাকার উদ্দেশ্যেও নামায আদায় করতেন না। কারণ তিনি নীতিগতভাবেই পেটপূজা ও অশ্লীলতা হতে দূরে ছিলেন। তিনি একজন “উলুল আয্ম” নবী ছিলেন এবং আল্লাহর প্রতি অনুরাগের কারণে ও আল্লাহর স্মরণে নামায আদায় করতেন। আল্লাহর ওয়ালীগণের জন্যে ইবাদতের সর্বোত্তম কারণ হচ্ছে তাঁর প্রতি তাঁদের ভালবাসা।
হ্যাঁ, এ শিশুরা যারা সভাতে সম্মানিত লোকদের পাশে বসে, তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভালভাবে আপ্যায়িত হওয়া। কিন্তু কিছু লোক আছে যারা আধ্যাত্মিক সদ্ব্যবহারের জন্যে সম্মানিত ব্যক্তিবৃন্দের নিকট বসাকে নির্বাচন করে এবং আপ্যায়নে তাদের কোনো কিছু যায় আসে না, পন্ডিতগণের প্রতি এ অনুরাগ তাদের একটি মূল্যবোধ।
চতুর্থ স্তর: এ স্তর যা ইবাদতের সর্বোন্নত ও সর্বো”” স্তর তা কৃতজ্ঞতা, বিকাশ ও অনুরাগের জন্যে নয়। বরং নৈকট্য অর্জনের জন্যে, আল্লাহর নৈকট্য।
কুরআনে চারটি আয়াত রয়েছে যেগুলো পাঠ করলে সেজদাহ্ করা আবশ্যক। সেগুলির একটিতে ইবাদতের মাধ্যমে এ নৈকট্য অর্জনের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ বলেন: “ওয়াস্জুদ্ ওয়াক্ তারিব।” অর্থাৎ সেজদাহ্ কর এবং তাঁর নৈকট্য অর্জন কর!
সারকথা, ইবাদতের একাধিক স্তর ও পর্যায় রয়েছে যা ব্যক্তির ঈমান ও আধ্যাত্মিক স্তরসমূহের উপর ভিত্তি করে পার্থক্য নিরূপণ করে।
ইবাদতের স্বরূপ
ইবাদত ও বন্দেগী আল্লাহর রসুলকে (সা.) মেরাজে নিয়ে গিয়েছিল। “সুব্হানাল্লাযী আসরা বি’আব্দিহী লায়লাম্ মিনাল্ মাসজিদিল্ হারামি ইলাল্ মাস্জিদিল্ আক্বসা।” অর্থাৎ পবিত্র সেই সত্তা যিনি স্বীয় দাসকে নৈশকালে মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আক্বসা পর্যন্ত পরিভ্রমণ করান।
ইবাদত ফেরেশতাগণের অবতরণের ক্ষেত্র প্র্রস্তুত করে। “নায্যাল্না ’আলা ’আব্দিনা।” অর্থাৎ (ফেরেশতাগণের মাধ্যমে) আমার বান্দার উপর ওয়াহী অবতীর্ণ করেছি।
ইবাদত মানুষের দুয়াকে গ্রহণ করায়। কারণ নামায হচ্ছে আল্লাহর প্রতিশ্রæতি। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিশ্রæতি রক্ষা করবে, আল্লাহও তার প্রতিশ্রæতি রক্ষা করবেন। “আওফূ বি’আহ্দী ঊফি বি’আহ্দিকুম।”
ইবাদতবিহীন মানুষ, পাথর ও জড়বস্তু অপেক্ষাও অধম। কেননা কুরআন বলে: “ওয়া ইন্না মিনহা লামা ইয়াহ্বিত্বু মিন্ খাশ্ইয়াতিল্লাহ্।” অর্থাৎ আল্লাহর ভয়ে কতক পাথর জমিনে পতিত হয়। কিন্তু কতক মানুষ, অস্তিত্বের স্রষ্টা ও উৎসের সমীপে গ্রীবা নত করে না।
ইবাদত মানুষের ব্যক্তিত্ব ও ইচ্ছার নিদর্শন। মানুষ যারা ঝোঁক ও সহজাত প্রবণতার মাঝে বিদ্যমান তারা যদি মনস্থির করে ও আল্লাহর অভিমুখে যাত্রা করে তবেই তারা গুরুত্ব রাখে, অন্যথা ফেরেশতাগণ যারা কাম ও ক্রোধ হতে মুক্ত এবং সর্বদা ইবাদতরত রয়েছে।
ইবাদত মাটির সর্বাধিক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসমানের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
ইবাদত মানুষের ক্ষুদ্র দ্বীপকে তার অস্তিত্বের উৎসের সঙ্গে মিলিত করে।
ইবাদত অর্থাৎ উপর হতে সমস্ত অস্তিত্বের প্রতি দৃষ্টি প্রদান।
ইবাদত অর্থাৎ মানুষের অস্তিত্বে লুক্কায়িত আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ক্ষমতাসমূহকে অঙ্কুরিত করা।
ইবাদত এক মূল্যবোধস্বরূপ যা মানুষ স্বীয় ইচ্ছা দ্বারা হস্তগত করে। এটি পারিবারিক মূল্যবোধসমূহ অথবা অভ্যন্তরীণ যোগ্যতাসমূহ যা ঐচ্ছিক ও উপার্জনক্ষম নয়, তার বিপরীত।
ইবাদত অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে প্রতিশ্রæতির নবায়ন এবং আধ্যাত্মিক জীবনকে সজীবভাবে সংরক্ষণ করা।
ইবাদত পাপের প্রতিবন্ধক এবং তার চিহ্নের উৎখাতকারী। আল্লাহর স্মরণই পাপের সম্মুখপথ রুদ্ধ করে, পাপের সম্পর্কে জ্ঞান নয়।
ইবাদত অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণ দ্বারা আত্মিক পাত্র পূর্ণ করা; তা যদি অন্য কিছু দ্বারা পূর্ণ হয় তবে মানবতার মর্যাদার প্রতি অত্যাচার করার নামান্তর।
ইবাদত মাটির জগতকে এমন মূল্য প্রদান করে যে, পবিত্রতা ব্যতীত সেসব স্থলে প্রবেশ অসম্ভব, যেমন মসজিদ, কাবাগৃহ ও কুদ্স প্রভৃতি।
আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী স্বয়ং এক মূল্যবোধ, যদিও আমাদের দুয়া ও প্রার্থনাগুলি গৃহীত না হয়।
ইবাদত, আনন্দ-খুশিতেও করণীয় এবং দুঃখ-বেদনায়ও। যেখানে তিনি স্বীয় পয়গামরকে “কাউসার” প্রদান করার জন্যে নামাযের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন: “ইন্না আ’ত্বয়না কালকাউছার, ফাসাল্লিলি রাব্বিকা ..।” অর্থাৎ আমরা তোমার প্রতি অঢেল কল্যাণ দান করেছি। সুতরাং তোমার প্রতিপালকের নিমিত্তে নামায আদায় কর!
কোনো দুর্ঘটনা ও সমস্যাদির সম্মুখীন হলেও নামায আদায়ের উপদেশ দেওয়া হয়েছে: “ওয়াস্ তায়ী’নূ বিস্সাবরি ওয়াস্ সালাহ্।” অর্থাৎ নামায ও ধৈর্যের সঙ্গে সাহায্য প্রার্থনা কর!
( সূত্র : তাফসীরে নামায গ্রন্থ থেকে)