দো‘আ কবুলের অন্তরায় ও আত্মশুদ্ধি

মানুষ যখন বিপদে পড়ে, আশা হারিয়ে ফেলে কিংবা জীবনের অপূর্ণতায় কষ্ট পায়, তখন সে দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে দো‘আ করে| দো‘আ মুমিনের বড় হাতিয়ার| কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, দীর্ঘদিন প্রার্থনার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না| তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—“আল্লাহ কি আমার দো‘আ শুনছেন না?” অথচ ইসলামী শিক্ষায় দো‘আ কবুল হওয়ার জন্য শুধু মুখের আবেদন যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন অন্তরের পবিত্রতা, হালাল জীবন এবং আন্তরিক নিয়ত|
একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি টানা তিন বছর আল্লাহর কাছে সন্তান কামনা করে দো‘আ করেছিলেন| কিন্তু প্রার্থনা মঞ্জুর না হওয়ায় তিনি বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে এর কারণ জানতে চান| তখন স্বপ্নে তাকে জানানো হয় যে, তার দো‘আ কবুল না হওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে: প্রথমত, তার জিহ্বা অশালীন ও কটু কথায় অভ্যস্ত; দ্বিতীয়ত, তার আহার হারাম দ্বারা কলুষিত এবং তৃতীয়ত, তার অন্তর পাপ ও অসততায় আচ্ছন্ন|
বাকশুদ্ধি ও আত্মার পরিচয়
এই বাণী আমাদের এক গভীর জীবনদর্শন শেখায়| মানুষের জিহ্বা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং তা আত্মার পরিচয় বহন করে| যে মুখ গীবত, অপবাদ, কটু ভাষা ও মিথ্যায় অভ্যস্ত, সেই মুখ দিয়ে করা প্রার্থনা আসমানে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হয়| মুখ পবিত্র না হলে মনের আকুতি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না| তাই আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপই হলো নিজের ভাষাকে মার্জিত ও সত্যনিষ্ঠ করা|
হারাম উপার্জন: দো‘আ কবুলের প্রধান বাধা
ইসলামে হালাল রিজিকের গুরুত্ব অপরিসীম| হারাম উপার্জন মানুষের আত্মাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেয় এবং হৃদয়ে কাঠিন্য ˆতরি করে| রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “অনেক মানুষ দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় হাত তুলে দো‘আ করে, কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পোশাক হারাম এবং উপার্জন হারাম—তাহলে তার দো‘আ কীভাবে কবুল হবে?” এই শিক্ষা স্পষ্ট করে যে, দো‘আ কবুলের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো পবিত্র আহার ও ˆবধ উপার্জন|
অন্তর ও নিয়তের স্বচ্ছতা
মানুষের বাহ্যিক কান্নার চেয়ে আল্লাহ তার অন্তরের একাগ্রতা বেশি দেখেন| অন্তরে যদি হিংসা, ঘৃণা বা পাপের প্রতি অনুরাগ থাকে, তবে সেই দো‘আ প্রাণহীন হয়ে পড়ে| কলুষিত হৃদয় নিয়ে আল্লাহর রহমত লাভ করা কঠিন| তাই চোখের পানির সাথে হৃদয়ের পবিত্রতাও জরুরি|
ভুল সংশোধন ও সাফল্যের পথ
আলোচ্য ঘটনার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—সেই ব্যক্তিটি হতাশ হয়ে প্রার্থনা ছেড়ে দেননি| বরং তিনি নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধন করেছেন| তিনি কটু ভাষা ত্যাগ করেন, অন্তরকে তাকওয়ার মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করেন এবং নিজের উপার্জনকে পবিত্র করেন| ফলাফল¯স্বরূপ, আল্লাহ তার দো‘আ কবুল করেন এবং তাকে সন্তান দান করেন| এতে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ বান্দাকে প্রত্যাখ্যান করেন না; বরং কখনো কখনো কবুল করতে বিলম্বের মাধ্যমে বান্দাকে আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের সুযোগ দেন|
আজকের অস্থির সমাজে আমরা প্রায়ই অভিযোগ করি যে, আমাদের দো‘আ কবুল হচ্ছে না| কিন্তু আমরা কি আমাদের চরিত্র, উপার্জন কিংবা ভাষার দিকে নজর দিয়েছি? দো‘আ কবুলের প্রকৃত পথ হলো—হালাল উপার্জন গ্রহণ করা, জিহ্বাকে সংযত রাখা এবং অন্তরকে হিংসা-মুক্ত করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা| যখন বান্দা নিজেকে শুদ্ধ করে আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়ে, তখন আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় সেই আবেদন ফিরিয়ে দেন না|

Related posts

তাত্ত্বিক ভিত্তিসমূহ

ইসলামি শিষ্টাচার: ছোটদের স্নেহ ও বড়দের প্রতি সম্মান

ইমাম রেযা’র (আ.) জ্ঞানপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More