ইসলাম হলো সেই পথ যা মানবজাতিকে তাদের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি ও পরিপূর্ণ করার দিকে পরিচালিত করে| এর ভিত্তি হলো এই মৌলিক বিশ্বাস যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই (আল্লাহ হলো ইব্রাহিমীয় ধর্মগুলোতে ‘ঈশ্বর-এর আরবি শব্দ), তিনিই সকল সৃষ্টির স্রষ্টা| এর সাথে রয়েছে এই দৃঢ় বিশ্বাস যে, মানুষের জন্য তাঁর পরিকল্পনা আমাদের মৌলিক স্বভাবের প্রতিটি দিককে গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং আমাদের কল্যাণের চাবিকাঠি ধারণ করে| অধিকন্তু, একমাত্র ঐশ্বরিক নির্দেশনার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই মানবজাতি তার পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারে এবং প্রকৃত অর্থে ব্যক্তিগত, সামষ্টিক ও সামাজিক কল্যাণের দিকে অগ্রসর হতে পারে|
নিশ্চয়ই আল্লাহ বলেন, “ শপথ প্রাণের এবং যিনি তাকে সুগঠিত করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন|” (সুরা আশ-শাম : ৭-৮) এর মাধ্যমে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, তিনি আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে জাগরণের এক স্ফুলিঙ্গ এবং এমন এক অসীম সামর্থ্য সৃষ্টি করেছেন যার মাধ্যমে আমরা নিয়মিতভাবে সেই কাজগুলোও অর্জন করতে পারি, যেগুলোকে আজকের মানুষ দুর্ভাগ্যবশতঃ অসাধারণ বলে মনে করে|
ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) আমাদের এই আল্লাহপ্রদত্ত সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, “মানুষ যদি আল্লাহকে জানার (এবং তাঁর সৃষ্ট ব্যবস্থাকে বোঝার) মর্যাদা উপলব্ধি করত, তবে তারা কখনোই আল্লাহ যেসব দুনিয়াবি চাকচিক্য ও নিয়ামত শত্রুদেরকে দিয়েছেন, সেদিকে দৃষ্টি প্রসারিত করত না| নিশ্চয়ই আল্লাহর অন্তর্দৃষ্টি প্রতিটি নিঃসঙ্গতায় অন্তরঙ্গ সঙ্গী, প্রতিটি একাকীত্বে বন্ধু, প্রতিটি অন্ধকারে আলো, প্রতিটি দুর্বলতায় শক্তির উৎস এবং প্রতিটি রোগের আরোগ্য|” (আল-কাফি, খ. ৮, পৃ. ২৪৭, হাদিস নং ৩৪৭)
একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা:
এইভাবে তেইশ বছর ধরে, নবী মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর সেই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন যা একটি পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক জীবনবিধান ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে মানবজাতি উন্নতি লাভ করতে পারে এবং কেবল ব্যক্তিগত বিকাশই নয় বরং কোনো ব্যক্তির অধিকার বিসর্জন না দিয়ে বা সমাজের কাউকে পরিত্যাগ না করে সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক ও সার্বজনীন কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে| এটাই ইসলামের (ধর্মের) উদ্দেশ্য-ব্যক্তিগত স্বার্থ, পরীক্ষা ও সংকট, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং জীবনের ˆদনন্দিন উত্থান-পতনের মাঝে জীবনের আধ্যাত্মিক, শারীরিক, আবেগিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলিতে শৃঙ্খলা, ভারসাম্য এবং অর্থ প্রদান করা| অধিকন্তু, আমাদের ধর্ম নির্দেশ করে যে, মানবজাতি কীভাবে নিজেদের চারপাশের বিশ^কে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে দেখবে| যদি আমরা চিন্তা করি, আমরা এই উপলব্ধিতে পৌঁছাব যে, একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা রয়েছে যা এই সমস্ত পরিস্থিতি নির্ধারণ করে এবং আমাদের পছন্দ ও কর্মের উপর ভিত্তি করে কিছু ফলাফল ˆতরি করে, যার মধ্যে কিছু ইতিবাচক এবং কিছু নেতিবাচক|
সম্পূর্ণতা মানেই সবসময় পরিপূর্ণতা নয়:
আল্লাহর ধর্ম অনুযায়ী, মুসলমানদের লক্ষ্য হলো তাঁর নির্দেশিত কর্তব্য পালন করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো পরিহার করা (অর্থাৎ, হালাল ও হারামের সীমারেখা মানা)| এটিই সেই মানদণ্ড, যা নির্ধারণ করে একজন ব্যক্তি তাকওয়া (পরহেজগারি) অর্জন করবে কি না এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে কি না|
তবে এই সফলতা শুধু কী করা হলো বা কী করা হলো না-এর উপর নির্ভর করে না; বরং সব কাজের গুণগত মানের উপর নির্ভর করে|
উদাহরণ স্বরূপ, কেউ যদি একটি বাড়ি নির্মাণ করতে চায়, তবে প্রথমে সে ভিত্তি স্থাপন করে, তারপর দেয়াল তোলে, জানালার কাঠামো তৈরী করে এবং শেষে ছাদ নির্মাণ করে| একে একে সব কাজ সম্পন্ন হলে বাড়িটি বাহ্যিকভাবে সম্পূর্ণ হয়| কিন্তু শেষের সূক্ষ্ম কাজগুলো ছাড়া কি এই বাড়িকে নিখুঁত বলা যাবে?
অবশ্যই না| একটি বাড়ির জন্য প্রয়োজন কার্পেট, দেয়ালে রং, আসবাবপত্র, খাদ্য-পানীয় এবং আরও অনেক কিছু যা ঘরটিকে ভেতর থেকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করে তোলে|
বিদায় হজ্জ্ব:
হিজরী দশম বর্ষে, নবী মুহাম্মাদ (সা.) সকল মুমিনকে তাঁর শেষ হজ্জ পালনে সঙ্গী হওয়ার জন্য আহ্বান জানান| এই ঘোষণা মুসলিম বিশ্বের দূরতম অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যার মধ্যে ইয়েমেনও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেখানে ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) নবীর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন| বিভিন্ন বিবরণ থেকে অনুমান করা হয় যে, হাজার হাজার মুসলমান এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই হিজ্জাতুল বিদা বা বিদায়ী হজ্জ পালন করেন| (আল-তাবরাসি, আল-ইহতিজাজ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা নং ৫৬)
হজ্জ চলাকালীন সময়ে নবী মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি ভাষণ দেন, যেগুলিতে তিনি মুমিনদেরকে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, ধর্মীয় নেতৃত্বের (ইমামত) বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেন এবং তাঁর প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলী প্রচারের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন| জিলহজ্জ মাসের সতেরো তারিখে, হজ্জ সমাপ্তির পর, নবী (সা.) ঘোষণা করেন যে, কেউ যেন বিলম্বনা করে বরং গাদির খুমের দিকে যাত্রা করে| এই খরব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং যারা ইতোমধ্যে বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করেছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেই অগভীর পুকুরের নিকটে ফিরে আসে, যেখানে ততক্ষণে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল| এই পর্যায়ে, আমাদের দৃশ্যটি কল্পনা করা উচিত এবং এই মুহূর্তটি প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে নবীর কৌশল বিবেচনা করা উচিত, যাকে মুসলিম ও অমুসলিম উভয় পণ্ডিতই এমন একটি উম্মাহর (উম্মাহ হলো ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়) ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার বয়স তখনও পঁচিশ বছরও পূর্ণ হয়নি| স্পষ্টতই, মহানবী (সা.)-এর সমগ্র জীবন জুড়ে তাঁর কথা ও উপদেশ কখনও উদ্দেশ্যহীন বা দিকনির্দেশনাহীন ছিল না, কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি বিশ্বে জুড়ে সকল মুসলমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য এক গভীর উদ্দেশ্য পোষণ করেছিলেন|
ইসলাম পূর্ণতা ও পরিপূর্ণতা লাভ করেছে:
এই মহান ঘোষনায় আল্লাহর একত্ব, তাঁর সর্বোচ্চতা এবং মানবজাতির জন্য তাঁর বিধান তুলে ধরা হয়| একই সঙ্গে নবীর দায়িত্ব ও মুসলমানদের ধর্মীয় ও ˆনতিক কর্তব্যের একটি পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়| এর প্রতিধ্বনি আজও শোনা যায় এবং এটি আমাদের থমকে দাঁড়িয়ে বিবেচনা করার কারণ জোগায় যে, সেই ঐতিহাসিক দিনে নবী (সা.) যা বলেছিলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অবস্থান কোথায় শুরু মুসলমান হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব (যেমন নামাজ, রোজা, হজ্জ ও খুমস) পালনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বৃহত্তর মানব কল্যাণ ও মানব সেবার পরিপ্রেক্ষিতেও| সেই শুভ দিনে নবী (সা.) কর্তৃক বিশদভাবে বর্ণিত মহৎ মৌলিক নীতিসমূহের বাস্তবায়ন বেলায়েত (ঔশ্বরিক কর্তৃত্ব)-এর মধ্যে পরিবেষ্টিত ও মূর্ত হয়ে আছে, কারণ তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর কর্তৃত্ব ঘোষণা করার সাথে সাথেই পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়; “আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম|” (সুরা আল মায়েদ : ৩)
নবীর এই বক্তব্যের গুরুত্ব বিবেচনা করুন, শুধু ইমাম আলীর কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার জন্যই নয় (কারণ একে নিছক বন্ধুত্বের ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা অযৌক্তিক হবে) বরং এর পরবর্তীকালে পূর্ণতা ও পরিপূর্ণতা উভয়ই যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার প্রমাণের জন্যও|
এখন, ঘরটি তার সমস্ত অংশসহ সম্পূর্ণ এবং একে ত্রুটিহীন করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে পরিপূর্ণ|
আমরা কি উপাসনায় পূর্ণতার জন্য চেষ্টা করছি, নাকি শুধু সমাপ্তির জন্য?
এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সেই সূক্ষ্ম ও গভীর বার্তার মধ্যে, যা আল্লাহ তাঁর নবী (সা.)-এর মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌছে দিচ্ছেন| আর তা হলো, বিশ^স্ততার সাথে আমাদের দায়িত্বগুলো পালন করা (সম্পূর্ণ করা) এবং একই সাথে সেগুলোকে সর্বোত্তম করার (পরিপূর্ণতা) লক্ষ্য রাখা| জীবনে (যেমন, পড়াশোনা বা কর্মজীবনে) সফল হওয়ার চাকিকাঠি কি এটাই নয়? একজন ব্যক্তি শুধু বিশ^বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করার জন্যই চেষ্টা করে না, বরং তারা সম্ভাব্য সেরা গ্রেড পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে এবং কঠোর পরিশ্রম করে| সর্বোত্তম প্রচেষ্টার চেয়ে কম কিছু হলেই তার ফল কাঙ্খিত হয় না| আমাদের ইবাদত এবং আল্লাহর প্রতি ভক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য| একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, প্রত্যেক নামাজের জন্য প্রয়োজনীয় আমল ও রাকাত সংখ্যা সম্পন্ন করেন, কিন্তু এর তাৎপর্য কতটা থাকে যদি তারা তাড়াহুড়ো করে বা একেবারে শেষ মুহূর্তে নামাজ পড়েন, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে যা পাঠ করছেন তার উপর মনোযোগ না দেন? অথবা উদাহরণ¯^রূপ, মুসলিমরা রমজান মাসের রোজার সময় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ রাখে, কিন্তু তারা পরচর্চা, মিথ্যাচার এবং অন্যের নামে অপবাদ দেওয়া চালিয়ে যায়, অথবা কুটিল চিন্তা পোষণ করে এবং অন্তরে বিদ্বেষ পুষে রাখে| সুতরাং, বাহ্যিকভাবে ইবাদতটি পূর্ণাঙ্গ, কিন্তু আমরা কি সততার সাথে বলতে পারি যে এটি নিখুঁত, এবং সেই হিসেবে এর যে প্রভাব ফেলার প্রয়োজন ছিল, তা কি ফেলতে পেরেছে?
আজকের প্রেক্ষাপটে গাদিরে খুমের বার্তা:
সুতরাং একজন মুসলিম ব্যক্তি প্রশ্ন করতে পারেন, আজ আমার জন্য গাদিরে খুমের প্রাসঙ্গিকতা কি?
নবী (সা.)-এর পর ঐশ্বরিক নির্দেশনার সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়াও এই নেতৃত্বের ঘোষণা মানবজাতির মৌলিক প্রকৃতির কথা বলে যে, আমাদের সকলেরই একটি আদর্শের উপর ভিত্তি করে নিজেদের চরিত্র ও কর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে| সামাজিক শিখন ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেন যে, মানুষ সক্রিয় তথ্য প্রক্রিয়াকারী এবং তারা তাদের আচরণকে একগুচ্ছ পরিণতির সাথে যুক্ত করতে পারে|
অধিকন্তু, একটি নির্দিষ্ট আদর্শ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে চারটি প্রক্রিয়া জড়ি : (১) মনোযোগ বা অনুকরণের উদ্দেশ্যে ও একাগ্রতার সাথে কারো আচরণ পর্যবেক্ষণ করা, (২) ধারণা বা আচরণটি মুখস্থ করার ক্ষমতা যাতে তা সঠিকভাবে অনুকরণ করা যায়, (৩) পুনরুৎপাদন বা আচরণটি বারবার পুনরাবৃত্তি করা যাতে তা সত্যিকার অর্থে গৃহীত হয়, এবং (৪) প্রেরণা বা অনুকরণ করা কোনো ˆবশিষ্ট্য বা কর্ম সম্পর্কে একজন ব্যক্তি তার চারপাশ থেকে যে প্রতিক্রিয়া পায়| (Bandura, A., Social Foundations of Thought and Action: A Social Cognitive Theory, Prentice-Hall, Inc., 1986.)
সুতরাং একজন আদর্শ ব্যক্তি অস্থায়ী হতে পারেন এবং সময়ে সময়ে ও এক যুগ থেকে অন্য যুগে পরিবর্তিত হতে পারেন| তবুও আমাদের সকলকে নিজেদেরকে যে প্রশ্নটি করতে হবে তা হলো, অনুকরণীয় গুণাবলী ˆনতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কেন? এটাই মূল বিষয়, কারণ আল্লাহই ˆনতিকতার বিধান ও প্রতিষ্ঠা করেন এবং তা সময়ের সাথে বা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত হয় না| অতএব, একজন ঐশ^রিক আদর্শ ব্যক্তি হলেন তিনি, যাকে আল্লাহ ˆনতিক বিধি (অর্খাৎ, ধর্ম) সম্পূর্ণ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠা করেন এবং যা সকল মানুষের জন্য ও অনন্তকাল ধরে (একটি অপরিহার্য হাতির হিসেবে) কার্যকর থাকে; শুধু ব্যক্তিগত ˆনতিকতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রেও|
সুতরাং, এই ˆনতিক বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়েতই হলো পূর্ণতার মাপকাঠি| কারণ, যদি আমরা তাঁর জীবন পর্যালোচনা করি, তবে আমরা তাঁর ব্যক্তিগত, সাম্প্রদায়িক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে শ্রেষ্ঠত্ব লক্ষ্য করব; শুধু ক্ষেত্রবিশেষে তাঁর অর্জনের মধ্যেই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে ব্যক্তিগত অধিকার এবং মুসলিম উম্মাহর পবিত্রতা রক্ষার জন্য তিনি কীভাবে সেই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছিলেন, তার মধ্যেও| ঈদুল গাদির (গাদিরে খুম অনুষ্ঠানের বার্ষিক স্মরণোৎসব) আমাদের এই উত্তরাধিকার এবং আমাদের সকলের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়| আমাদের কাজগুলোকে ক্রমাগত নিখুঁত করার জন্য, তা ইবাদত, আখলাক (নৈতিকতা), কর্মজীবন, কিংবা সমাজের অবস্থা এবং আমাদের চারপাশের অন্যদের প্রয়োজনের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল ও সচেতন হওয়া| যা-ই হোক না কেন| একজন মুমিন হওয়ার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম কঠিন একটি দিক| ইমাম আলী (আ.) বলেন, “কোনো কাজকে পরিশুদ্ধ করার সেই কাজটি সম্পাদন করার চেয়েও কঠিন এবং কোনো নিয়তকে সকল প্রকার দুর্নীতি ও ভ্রান্তি থেকে মুক্ত (অর্থাৎ আন্তরিক) করা, কাজটি সম্পাদনকারীর জীবনব্যাপী সংগ্রামের চেয়েও অধিক শ্রমসাধ্য|” (বিহার আল-আনোয়ার, খণ্ড ১, অধ্যায় ৭৭, পৃষ্ঠা ২৮৮)
এই মহান আদর্শ প্রচারের মাধ্যমে ইমাম আলী (আ.) চরিত্র ও ইবাদতের সর্বোচ্চ শিখরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং তাঁর অনুগামীদের সমাজে, বিশেষ করে অধিকার বঞ্চিত ও সমর্থনহীনদের জন্য ‘ওয়ালী’ (পক্ষসমর্থক) হতে উৎসাহিত করেছেন| তিনি মালিক আল-আশতারকে লিখেছিলেন, “সাবধান! দরিদ্রদের (অর্থাৎ, তাদের সম্মুখীন হওয়া কঠিন পরিস্থিতি) বিষয়ে কাজ করার সময় আল্লাহকে ভয় করো; যাদের কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই, যারা নিঃসঙ্গ, নিঃস্ব, অসহায় এবং মনের দিক থেকে অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত সময়ের উত্থান-পতনের শিকার| তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা তাদের জীবনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না এবং যারা তাদের দুর্দশা সত্ত্বেও ভিক্ষা চাইতে ঘুরে বেড়ায় না| আল্লাহর দোহাই, তাদের অধিকার রক্ষা করো, কারণ তাদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব তোমার উপরই বর্তায়| তাদের ¯স্বার্থ কে নিজের ¯স্বার্থ র চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করো না এবং কখনোই তাদেরকে তোমার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বাইরে রেখো না|” (সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ: মালিক আল-আশতারকে লেখা ইমাম আলী’র পত্র)
সুতরাং, একজন প্রকৃত মুমিন হলেন তিনি, যিনি ক্রমাগত আল্লাহর ইবাদত ও ভক্তির অতিরিক্ত কাজ সম্পাদনের জন্য সচেষ্ট থাকেন এবং একই সাথে তিনি যা ইতিমধ্যেই অনুশীলন করছেন তার উন্নতি সাধন করেন| উদাহরণ¯^রূপ, আমাদের শুধু সময়মতো নামাজ পড়ার চেষ্টা করলেই হবে না, বরং প্রতিটি নামাজে আমরা যা পাঠ করছি তা আরও ভালোভাবে বুঝতে হবে, প্রতিটি কাজের (যেমন, সিজদা) তাৎপর্য সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে এবং আমাদের মনের বিক্ষিপ্ততা কমাতে হবে| অথবা উদাহরণ স্বরূপ, দান করার সময়, আমাদের নিজেদেরকে মনে করিয়ে দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে যে, এই উদারতার কাজটি কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপকের জন্যই নয়, আমাদের জন্যও (কারণ তিনিই আমাদের সামর্থ্য ও সুযোগ দিয়েছেন)| আমাদের নিয়মিত চিন্তা করা উচিত যে আমরা কেন কিছু করছি, তা কি আত্মতৃপ্তির জন্য নাকি নিঃস্বার্থ ভাবে? এইভাবে, আমরা আল্লাহর বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য আমাদের চালিকাশক্তির অভ্যন্তরীণ দিকগুলোকে বিকশিত করতে শুরু করতে পারি এবং সেখান থেকে তাঁর দ্বারা আশীর্বাদপ্রাপ্ত হওয়ার এক প্রকৃত অনুভূতির মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে কল্যাণ ছড়িয়ে দিতে পারি| (সূত্র Imam Mahdi Association of Marjaeya (I.M.A.M.), Inc.)