ইবাদত হল দিবা-রাত্রির ঔষধালয়

কোনোরূপ পূর্বপ্র্রস্তুতি ও মাধ্যম ব্যতীতই যে কেউ যে কোনো মুহূর্তে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। যদিও কিছু নির্দিষ্ট সময়, যেমন – সুবহে সাদিকের সময়, জুমু’আর দিন সূর্যাস্তের সময়, জুমু’আর নামাযের খুৎবার পরে, বৃষ্টিবর্ষণের সময় অথবা ক্বদরের রাত্রিতে দুয়া ও ইবাদতের স্বতন্ত্র অবস্থা রয়েছে কিন্তু তাই বলে দুয়া ও প্রার্থনা শুধু এ সময়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
সর্বাবস্থায় ইবাদত হচ্ছে উদাসীনতা, ভ্রম ও পাপের ঔষধস্বরূপ। (আক্বিমিস সালাতা লি যিকরী)।”(সূরা: ত্বাহা, ১৪তম আয়াত)

এটি শান্তির উপকরণ, বিশ্বাসের নিশ্চয়তা প্রদানকারী এবং অন্তরের অশান্তি ও অস্থিরতা দূরীভূতকারী। (আলা বিযিকরিল্লাহি তাত্বমাইন্নুল কুলূব) সূরা: রা’দ, ২৮তম আয়াত ।

ইবাদত শান্তির উৎস
আপনারা শক্তিধর খোদাদ্রোহী, বিরাট পূঁজিপতি, বিদ্বান, আবিষ্কারক এবং প্রযুক্তিবিদকে চেনেন কিন্তু সেগুলো হতে কি শান্তির সন্ধান কেউ দিতে পারেন? অধুনা পশ্চিমা সমাজগুলি কি আত্মিক ও মানসিকভাবে শান্তিতে রয়েছে? শক্তি, শিল্প ও ধনসম্পদ আজকের মানুষের জন্যে কি সন্ধি, প্রীতি, নিরাপত্তা ও শান্তি উপহার দিতে পেরেছে?
কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগী আল্লাহর ওলীগণের জন্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি

 

করে যে, তাঁরা কোনোক্রমেই অস্থিরতায় নিপতিত হন না। ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনীর (রহ.) দু’টি স্মরণীয় বিষয় এখানে তুলে ধরা যুক্তিযুক্ত মনে করছি:
ইরান হতে “শাহ্ পাহলাভী” পলায়ন করার পর, অনিচ্ছাকৃত হলেও তার চাকর “শাপুর বখ্তিয়ার” তখনও ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছিল। পনেরটি বছর নির্বাসনে থাকার পর ইমাম খোমেনী তাঁর দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। বিমানে সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন: এখন আপনার অনুভূতি কেমন? তিনি উত্তরে বললেন: কিছুই না!
অথচ তখন মিলিয়নাধিক ইরানী ভক্ত ইমামের জীবনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ইমাম বিমানে পূর্ণ আস্থার সঙ্গে তাহাজ্জুদের নামায ও আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত ছিলেন। শুধুমাত্র আল্লাহর স্মরণের কারণেই এ প্রশান্তি ছিল।
দ্বিতীয় স্মরণীয় ঘটনা যা আমি ইমামের সন্তান মরহুম আলহাজ্জ সাইয়্যেদ আহমদের নিকট হতে শুনেছিলাম তা হচ্ছে এই যে, ইরান হতে শাহ্ যেদিন পলায়ন করে সেদিন প্যারিসে ইমামের বাসায় বিশে¡র শতাধিক ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক ইমামের বক্তব্য বিশে¡র সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের জন্যে সমবেত হন। ইমাম একখানা চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে অল্প কিছু বক্তব্য রাখেন। অতঃপর তিনি আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করেন: আহমদ! যোহর হয়েছে কি? আমি বললাম: জী, হয়েছে। ইমাম কালবিলম¡ না করেই স্বীয় বক্তব্য সমাপ্ত করেন এবং প্রথম ওয়াক্তে নামায আদায় করার জন্যে চেয়ার হতে নেমে আসেন। সবাই হতবুদ্ধি হয়ে যান যে, এ কি হল?! আমি বললাম ইমাম প্রথম ওয়াক্তেই তাঁর নামায আদায় করে থাকেন।
ইমাম প্যারিসে যা বাস্তবায়ন করেন তা একটি পাঠ ছিল যা তিনি স্বীয় পূর্বপুরুষ ইমাম রেযা (আ.) হতে রফ্ত করেন। ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, সাবেঈন দলের নেতা যার নাম পবিত্র কুরআনে আলোচিত হয়েছে, তিনি একজন আত্মগর্বি ও গোঁড়া পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। যতবারই তিনি ইমাম রেযার (আ.) সঙ্গে আলোচনায় বসতেন ততবারই যুক্তিতে আসতে রাজি হতেন না। শেষ পর্যন্ত এক সভায় তার ভোঁতা ও বক্র চিন্তাধারা পর্যুদস্ত হয় এবং বলেন: “এতক্ষণে আমার অন্তর নরম হল এবং আপনার যুক্তি গ্রহণ করলাম।” এমতাবস্থায় আযানের ধ্বনি শোনা যায়। ইমাম রেযা (আ.) নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে সভা পরিত্যাগ করেন। ইমামের সঙ্গীগণ যতই পীড়াপীড়ি করল এ বলে যে, আপনি অল্প কিছু সময় ধরে সভার কাজ চালাতে থাকলে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা মুসলমান হয়ে যাবেন। তিনি উত্তরে বলেন: প্রথম ওয়াক্তে নামায আদায় করা, আলোচনা অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি উপযুক্ত হন তাহলে নামাযের পরেও সত্যকে গ্রহণ করবেন। সাবেঈ পন্ডিত সত্যের প্রতি ইমামের মাঝে যখন এরূপ দৃঢ়তা, আপোষহীনতা, ভক্তি ও প্রেম লক্ষ্য করলেন তখন তিনি অধিকতর মুগ্ধ হলেন। । (বিহার, ৪৯তম খন্ড, পৃ. ১৭৫) ।

সূত্র :  তাফসীরে নামায গ্রন্থ থেকে

 

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More