ইমাম বাকের (আ) এর জন্মবার্ষিকী

সম্পাদনা: হুজ্জাতুল ইসলাম মো: আনিসুর রহমান

রাসূলে কারিমের (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের (আ.) মহান ইমাম হযরত বাকের (আ.) এর পবিত্র জন্মবার্ষিকীতে আপনাদের সবার প্রতি রইলো প্রাণঢালা অভিনন্দন ও মোবারকবাদ।

ইমাম বাকের (আ.) ৫৭ হিজরীতে মদীনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ.)। তাঁর জন্মের বহু বছর আগে নবীজী (সা.) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী নামে তাঁর এক সঙ্গীকে বলেছিলেন-‘হে জাবের! তুমি আমার পরে জীবিত থাকবে এবং আমার এক উত্তর প্রজন্ম দেখতে ঠিক আমার মতো হবে, তার নামও হবে আমার নামে, তুমি তাকে দেখতে পাবে। যেখানেই তুমি তাকে দেখতে পাও আমার সালাম পৌঁছে দিও। ‘বহু বছর পর জাবের শেষ পর্যন্ত ইমাম বাকের (আ.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে রাসূলে খোদার (সা.) সালাম তাঁকে পৌঁছে দেন। হিজরী প্রথম শতাব্দির শেষের বছরগুলোতে একদিকে উমাইয়া শাসকদের অত্যাচার, জুলুম নিপীড়ন এবং অন্যদিকে তাদের বিরোধীদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। এ কারণে জনগণ দ্বীনি জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করতে পারছিলো না ঠিকমতো।

ইতিহাসের পাতায় এমন বহু প্রমাণপঞ্জী রয়েছে যে, তখন বহু মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কেও জানতো না। হজ্বের ব্যাপারেও তারা ছিল উদাসীন। খেলাফত ব্যবস্থা এ সময় দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতর এবং অক্ষম থেকে অক্ষমতর হয়ে পড়ছিলো। নবীজীর (সা.) আহলে বাইতের (আ.) সম্মানিত ইমামগণ হলেন মুসলমানদের নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত ও যোগ্যতম। তাঁদের উপস্থিতি সত্ত্বেও সে সময় মানুষ খেলাফত এবং শাসনকার্য সংক্রান্ত বিষয়ে মতপার্থক্যে ভুগছিল। কেউ কেউ খেলাফতকে উমাইয়াদের অধিকার বলে মনে করতো, আবার অনেকেই আহলে বাইতের (আ.) অবস্থান ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বক্র চিন্তা তথা অনেকটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ভাবতো।

এ রকম একটি সময়ে উজ্জ্বল সূর্যের মতো আবির্ভূত হন ইমাম বাকের (আ.)। তাঁর আগমনে অজ্ঞতার আঁধারের সকল পর্দা সরে যায়। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার আলোকে তিনি মুসলমানদেরকে ইসলামের সঠিক পথ দেখান এবং সর্বপ্রকার বক্র চিন্তা, কু-সংস্কার আর অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুসলমানদেরকে মুক্তি দেন। নবীজীর (সা.) আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা এবং ইমামতের অবস্থান সম্পর্কে তিনি জনগণকে সচেতন করে তোলেন। রাসূলে খোদার (সা.) পর আহলে বাইতের (সা.) নেতৃত্বকেই ইসলামী উম্মাহর মুক্তির সবচেয়ে উত্তম পথ বলে তিনি মনে করতেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্বাস ও চিন্তাগত বিভিন্ন বিষয়ে সমাধান দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র আহলে বাইতই (আ.) হলো সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি বলেছেন-রাসূলে খোদার (সা.) সন্তানেরা হলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে ঐশী জ্ঞানের দরজা এবং জান্নাতের দিকে আহ্বানকারী।

জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নতি এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যে ইমাম বাকের (আ.) শিক্ষা ও সংস্কৃতির বহু কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর পরে তাঁরই উত্তরসূরি স্বীয় সন্তান ইমাম সাদেক (আ.) বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হিজরী প্রথম শতাব্দির শেষের দিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইমাম বাকের (আ.) এর চেষ্টা-প্রচেষ্টা সত্যিকার অর্থেই জনগণের মাঝে ইসলামী চিন্তা ও মূল্যবোধের প্রাণ সঞ্চারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। জাবের ইবনে ইয়াযিদ যোড়ফি ইমাম বাকের (আ) এর একজন ছাত্র ছিলেন। তিনি ইমামের কাছ থেকে অন্তত: সত্তর হাজার হাদিস বর্ণনা করেছেন। জাবের বলেছেন-আঠারো বছর ইমাম বাকের (আ.)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। যখন তাঁর কাছ থেকে চলে আসতে চেয়েছি, তাঁকে বলেছি, হে রাসূলের সন্তান! আমাকে জ্ঞানে পরিতৃপ্ত করুন! ইমাম বাকের (আ.) বললেন-‘হে জাবের! আঠারো বছর পরও কি তুমি জ্ঞানে পরিতৃপ্ত হও নি? বললাম-আপনি হলেন অসীম এক ঝর্ণাধারা, এই ঝর্ণাধারার তো শেষ নেই।’

ইমাম বাকের (আ.) এর অস্তিত্ব ঝর্ণার পানির মতো ইসলামী চিন্তাবিদদের এমনকি ধর্মের অনুসারীদেরও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা মেটাতো। জ্ঞানের ভান্ডার হবার কারণে বহু অজানা বিষয়ে জানার জন্যে ইমামের কাছে ভিড় করতো জ্ঞান অন্বেষীগণ। যারা তাঁর কাছে আসতো তারা ইমামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে হাজার হিসামি ইমাম বাকের (আ.)-এর জ্ঞান, চরিত্র, অন্তরের পবিত্রতা এবং আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগির ক্ষেত্রে তাঁর একাগ্রতার উল্লেখ করে বলেন- তিনি যতটা উচ্চ মর্যাদার ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁর সেই ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করা এবং তাঁর প্রশংসা করার যোগ্যতা অনেকেরই নেই।

অত্যাচারী এবং তাদের অনুসারীদের প্রসঙ্গে ইমামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণী ছিল এ রকম-জুলুম-নির্যাতনকারী নেতৃবৃন্দ এবং তাদের অনুসারীরা আল্লাহর দ্বীনের বাইরে অবস্থান করে। ইমাম বাকের (আ) বলেছেন, সর্বোৎকৃষ্ট পুঁজি হলো আল্লাহর ওপর বিশ্বাস।

তিনি আরো বলেছেন, সর্বোৎকৃষ্ট পূর্ণতা হলো দ্বীন সম্পর্কে জানা ও সচেতন হওয়া, দুঃসময়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং জীবন যাপনে শৃঙ্খলা বিধান করা।#####

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More