ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও সাফল্যতা

সংকলন ও সম্পাদনা: হুজ্জাতুল ইসলাম মো: আনিসুর রহমান

বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের পাশাপাশি নৈতিক চরিত্রের চরম অধঃপতন, সাম্রাজ্জবাদী শোষক শ্রেণির হিংস্র আগ্রাসন, দেশে দেশে মুক্তিকামী মজলুম জনতার করুণ আহাজারি যখন পৃথিবীকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল তখনই পারস্যের শাহী লৌহপ্রাচীর ভেদ করে মহান নেতা ইমাম খোমেইনী (র.)-এর নেতৃত্বে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব মানবজাতির সামনে আবারো সেই চিরন্তন সত্যবাণী ঘোষণা করল: ‘সত্য এসেছে, মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই’। (সূরা বনি ইসরাইল : ৮১)

ইরানের ইসলামী বিপ্লব জাতিগুলোর প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় সূচিত করেছে। কারণ, এ বিপ্লব কেবল ইরানেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে তাগুতি ও সাম্রাজ্জবাদের শীর্ষস্থানীয় এক অনুচর রাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেনি। এ বিপ্লব ‘প্রাচ্যও নয়, পাশ্চাত্যও নয়-বরং ইসলামই শ্রেষ্ঠ’-এই নীতির আলোকে আধিপত্যকামী শক্তিগুলোসহ বিশ্ব-সাম্রাজ্জবাদের বিরুদ্ধেও এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তাই এ বিপ্লবের আবেদন কোনো বিশেষ অঞ্চলে সীমিত থাকেনি। বিশ্বের মুক্তিকামী জাতিগুলোর কাছে ইসলামী বিপ্লব হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস। এইসব কারণেই গত চার দশক ধরে এ বিপ্লব নব্য-উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্জবাদী শক্তিগুলোর জন্য প্রধান আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করছে। খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের পতাকাবাহী এ বিপ্লব ইসলামী আইন, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কখনও বিন্দুমাত্র আপোষ করেনি। জালিমের বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামী সরকারের কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ এবং মজলুমের পক্ষে সর্বাত্মক সাহায্য ও সমর্থনই এই বাস্তবতার বড় প্রমাণ।
এ বিপ্লব কাবিলের সঙ্গে হাবিলের, নমরুদের সঙ্গে হযরত ইব্রাহিমের, ফেরাউনের সঙ্গে হযরত মুসার, আবু জাহিল ও আবু লাহাবের মত কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে বিশ্বনবীর (সা)’র সংগ্রাম এবং ইয়াজিদসহ মুসলিম নামধারী স্বৈরশাসকদের সঙ্গে মহান ইমামদের দ্বন্দ্ব ও তাঁদের আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতার ফসল।
১৯৬২ সনে ইমাম খোমেনী যখন প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করেন তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার কর্মী বাহিনী কোথায়? তিনি বলেছিলেন, তারা এখনও মায়ের কোলে রয়েছে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লব এটা প্রমাণ করেছে যে একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকলে ও ন্যায়-নীতিতে অবিচল থাকলে জালিম শাসক ও তার সহযোগীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন তার পতন অনিবার্য এবং পরাশক্তিগুলো এমন জাতির কোনো ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে না।
বিশ্ব-যায়নবাদী চক্রের হাতে বন্দি পৃথিবীর মানুষগুলো আবার নতুন করে ভাবতে শিখল। অভ্যন্তরীণ শত্রুদের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা ও বহিঃশত্রুর কুটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক আগ্রাসন আর অব্যাহত অপপ্রচারের প্রবল লড়াই মোকাবিলা করে বিগত ৩৬ বছর ধরে ইসলামী বিপ্লব বিশ্ব-মুসলমানের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শরূপে অটল থেকে ৩৭তম বছরে প্রবেশ করেছে।
সা¤্রাজ্যবাদী বিশ্ব-শয়তানি চক্র এ ইসলামী বিপ্লবের প্রতি নানাভাবে তাদের মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এর কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন, শত শত বছর ধরে এই শোষক পুঁজিবাদী গোষ্ঠী বিশ্বের তাবৎ জনগোষ্ঠীর চোখে ধুলা দিয়ে বিশ্বকে একচেটিয়াভাবে শোষণ করে আসছিল; ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের কারণে যেন তাতে ছেদ পড়ল। বিশেষ করে বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেইনী (র.)-এর সময়োপযোগী, জাগরণী ও সুনির্দিষ্ট তথ্যবহুল বক্তৃতাসমূহ ধীরে ধীরে যখন মানুষের চোখ খুলে দিচ্ছিল তখনই এই বিশ্বলুটেরা গোষ্ঠী এ বিপ্লব ও তার নেতার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। বিশ্বব্যাপী তাদের নিয়ন্ত্রিত সকল মিডিয়া ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে তারা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালালো। কিন্তু সাম্রাজ্জবাদীদের সকল হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে এ বিপ্লব স্ব মহিমায় এগিয়ে যাচ্ছে।
ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানকে যেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে:
১. অপপ্রচার : ইসলামী বিপ্লব ও তার নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে অপপ্রচার চালিয়ে বিকৃত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন : এ বিপ্লব ইরানের উন্নয়নকে থামিয়ে দেবে; এটা উদারতার বিপরীত উগ্রতা; এটি শিয়া বিপ্লব; এতে নারীর অধিকার হরণ করা হয়েছে ইত্যাদি।
২. অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা : ইরানের বিপ্লব বিরোধী অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে বিপ্লবের প্রতি নিবেদিত অসংখ্য দেশপ্রেমিক নেতাকে গুপ্তহত্যা করা। যেমন: আয়াতুল্লাহ মোতাহ্হারী, ড. বেহেশতীসহ ৭২ জন নেতার শাহাদত।
৩. হত্যা ও আগ্রাসন : ইরানের ওপর সাদ্দামের আট বছর রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এয়ারবাস বিধ্বস্তকরণ, গুপ্তচরদের উদ্ধারের নামে তাবাস মরুভূমিতে অভিযান এবং মক্কায় হারাম তথা নিষিদ্ধ এলাকায় হাজীদেরকে শহীদ করা ইত্যাদি।
৪. নিষেধাজ্ঞা : বিজ্ঞান ও প্রকৌশলগত গবেষণা সামগ্রী, বিমান ও অন্যান্য বাহনের যন্ত্রাংশ ইত্যাদি আমদানি করতে ও একইভাবে বাণিজ্যিক লেনদেনেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
৫. শিয়া-সুন্নি বিরোধ উস্কে দেয়া : দেশে দেশে শিয়া-সুন্নি বিষয়কে ইস্যু বানিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করা হয়। যেসব দেশে শিয়া-সুন্নি শত শত বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে তাদের মধ্যে হত্যাকান্ড চালিয়ে একে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে দেয়।
৬. বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বাধা : পারমাণবিক ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা অর্জনে বিভিন্নভাবে বাধা দেয়া হয়। এতে সফল না হওয়ায় ‘ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে’ এই মিথ্যা অভিযোগের ধুঁয়া তুলে ইরানের প্রতি অব্যাহত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়।
৭. ইরান-বিরোধী চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা : ইতিমধ্যে হলিউডসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন চলচ্চিত্রধারায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চরিত্র চিত্রায়িত করে প্রচুর ইরান-বিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।
ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের মৌলিক সাফল্য:
১. ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : ১৯৭৯ সালে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ গণভোটে ৯৮% ভোট পেয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগসহ সব ধরনের ব্যবস্থা-ই আধুনিক ইসলামী প্রজাতন্ত্রে বিদ্যমান যা কুরআন-সুন্নাহ ও আহলে বাইতের শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং বিচার বিভাগ সম্পূর্ণই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ।
২. নাগরিক সুবিধা : ইসলামী ইরানে সকল মানুষ সকল মৌলিক নাগরিক সুবিধা যেমন: খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, বীমা, গৃহায়ণ ঋণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি সুবিধা ভোগ করছে।
৩. সামাজিক নিরাপত্তা ও ইসলামী পরিবেশ : ইরান বর্তমান বিশ্বে একটি বিরল রাষ্ট্র যেখানে জনগণ বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ করছে। দিন-রাত সর্বক্ষণ সকল নারী-পুরুষ নিরাপদে রাস্তাঘাটে চলাচল করতে পারে। শালীন পোশাক, নারীর হিজাব মেনে চলা ও টিভি, সিনেমা, প্রচারমাধ্যম এমনকি ইন্টারনেটেও ফিল্টারিং ব্যবস্থা থাকায় অশ্লীলতার চিহ্নমাত্র নেই। সে কারণেই অপরাধপ্রবণতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
৪. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসামান্য সাফল্য : দেশটি বিপ্লবের পর থেকেই এক ধরণের অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার হয়। তাই সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ আল উজমা আলী খামেনেয়ী’র নির্দেশে ইরানের বিজ্ঞানীরা চরম আত্মত্যাগ ও সাধনার পরিচয় দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করছে। বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে ইরানী বিজ্ঞানীদের অগ্রগতি বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানীদের গড় অগ্রগতির ১১ গুণ দ্রুততর। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে স্বল্পতম সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বের প্রথম ৫টি দেশের মাঝে স্থান করে নেবে ইরান।
৫. সাংস্কৃতিক বিপ্লব : ইসলামী বিপ্লবের পর অনেকেই মনে করেছিল যে, ইরান বোধ হয় ইসলামের প্রথম যুগের মতো রাজ্যজয় কর্মসূচি গ্রহণ করবে এবং একের পর এক অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ভূখন্ডে হুকুমত কায়েম করবে। কিন্তু ইরানীরা, প্রকৃত মুহাম্মাদী ইসলামের বিশ্বাসী, রাজ্যজয়ের মত কোনো জবরদস্তিমূলক হুকুমত কায়েম করায় বিশ্বাসী নয়। ইরান, মহানবী (সা.) ও তার আহলে বাইতের শিক্ষা ও কুরআনের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে চায় এবং প্রকৃত ইমাম ও রাহবারের নেতৃত্বে জীবনকে ঢেলে সাজাতে চায়, আর সে আলোকে একটি সমাজ যদি সত্যিই পরিপুষ্টতা লাভ করে তাহলে স্বাভাবিক গতিতে জনগণের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
ধর্মের আলোকে রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের উদ্যোগ:
ইসলামী বিপ্লবের পর পরই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের এক মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে উদ্যোগকে সফল করার জন্য যে সকল কর্মসূচী হাতে নেয়া হয় তা হল-
ক. কুরআন কেন্দ্রিক কার্যক্রম: কুরআন তেলাওয়াত ও হিফ্্জ প্রতিযোগিতা, কুরআনের বিভিন্ন কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্র ও সিরিয়াল তৈরি করা। যেমন : মারইয়াম মুকাদ্দাস, হযরত ইউসুফ ইত্যাদি, এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক, কাহিনীভিত্তিক, শব্দভিত্তিক কুরআনিক সফ্টওয়্যার তৈরি করা।
খ. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কার্যক্রম : প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাসিজ (গণসংগঠন)-এর ব্যবস্থা করা, যারা সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিনোদন, চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারী প্রদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
গ. হিজাব সংস্কৃতি : নারীদের কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হিজাব বা পর্দার ব্যবস্থা করা।
ঘ. শিল্পমাধ্যম : মানুষের সুকৃতি আচরণকে বিকশিত করার জন্য সকল শিল্পমাধ্যমকে ব্যবহার করা।
৬. প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা : ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সামগ্রী তৈরি করে জল, স্থল, আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক, আক্রমণাত্মক নয়।
৭. ইসলাম ও মানবতার বড় শত্রু চিহ্নিত করা : ইরান ইসলামী বিপ্লবের শুরু থেকেই তার নিজস্ব গণমাধ্যম, সাময়িকী ও আন্তর্জাতিক ফোরাম ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনসমূহে ইসলাম ও মানবতার অভিন্ন শত্রুকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।
৮. বিশ্বে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত একমেরু (টহরঢ়ড়ষধৎ) রাজনীতি রুখে দেয়া : ইরান মৌলিক আদর্শের বিতর্কে না জড়িয়ে মানবতা, সুস্থ সংস্কৃতি, সমানাধিকার, ন্যায়বিচার ও বাণিজ্যিক লেনদেনের বিষয়গুলোকে ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যাপক কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে যার ফলে ঐ সব দেশ স্ব স্ব অবস্থানে ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আমেরিকার একক পরাশক্তি হওয়ার খায়েশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে এবং তার একমেরু প্রভাবকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে।
৯. অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন : ইরান মধ্যপ্রাচ্যের ও আফ্রিকার আরব দেশসমূহ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এর ফলে সেসব দেশ আজ আন্তর্জাতিক কোনো ফোরামেই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে না।
১০. শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান ও এর সুফল : আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ও ইরাকে সাদ্দামের নির্যাতনে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লক্ষ শরণার্থী বছরের পর বছর ধরে ইরানে অবস্থান করেছে। আর ফিলিস্তিনি ও লেবাননি বহু নেতা দীর্ঘদিন ইরানে অবস্থানকালে ইরানের ইসলামী বিপ্লব থেকে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন।
১১. আল্-কুদ্স ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে: বিপ্লবের পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের মানবিক ও অন্যান্য কৌশলগত ক্ষেত্রে ইরানই সর্বাধিক সাহায্য প্রদান করেছে। ফিলিস্তিনীদের পক্ষে ইরানের পাশাপাশি শক্তিশালী সাহায্যে এগিয়ে আসে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার সরকার। আর ফিলিস্তিন ও আল্-কুদ্স মুক্তির জন্য ইমাম খোমেইনী (র.) রমযানের শেষ শুক্রবারকে বিশ্ব আল্-কুদ্স দিবস ঘোষণা করেছেন এবং কুদ্স দিবসের বিশেষ কর্মসূচি দিয়েছেন।
১২. ধর্মের মূলে ফিরে আসার জন্য ইসলামী বিপ্লবের অবদান : ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী (র.) বিশ্ববাসীকে কুরআন, সুন্নাহ ও আহলে বাইতের প্রদর্শিত প্রকৃত ইসলামে ফিরে আসার জন্য উদাত্ত আহবান জানান। এ উপলক্ষে ইরানে ও বহির্বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, স্মারক ও সাময়িকী প্রকাশনার আয়োজন করা হয় আর যেসব উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ইসলামী ইরান ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে তা হল : হজ্ব, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ উদ্যাপন, আশুরা উদ্যাপন, রমযান মাসে বিশ্বব্যাপী ইরানী ক্বারী প্রেরণ ও কুরআন প্রদর্শনী, ইসলামের ভিত্তিমূলে আঘাতকারী বইপুস্তক, চলচ্চিত্র ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন। যেমন: সালমান রুশদীর ‘শয়তানের পদাবলি’ (ঝধঃধহরপ ঠবৎংবং) উপন্যাসের জন্য ইমাম খোমেনী (র.) কর্তৃক (১৯৮৯) তাকে মৃত্যুদন্ডের ফতোয়া।
১৩. ইসলামী জাগরণ বনাম আরব বসন্ত : ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও বিপ্লবের নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্বব্যাপী এর সমর্থক ও শুভাকাঙ্খীরা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আহবানে কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলো অব্যাহত রাখার কারণে ধীরে ধীরে এসব চেতনা বিশ্ব-মুসলমানের চোখ খুলে দেয়। এরই ফলশ্রুতিতে কিছু কিছু আরব দেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ইসলামী জাগরণকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করে ইসলামী নেযাম বা রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার চেষ্টা করে।
১৪. সফল ন্যাম সম্মেলন : পাশ্চাত্যের প্রতিক্রিয়াশীল সা¤্রাজ্যবাদী কতক দেশের অপপ্রচার ও বাধার মুখেও জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ ২৭টি দেশের প্রেসিডেন্ট, ২ জন বাদশাহ, ৮ জন প্রধানমন্ত্রী, ২ জন পার্লামেন্ট স্পীকার, ৯ জন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে গত আগস্ট ২০১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলন।
১৫. ইরানের পরমাণু সক্ষমতা: ২০০৯ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান পারমাণবিক ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জন করে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলে। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি -তে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও কৃষি গবেষণার কাজে এ পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে যে, তার এ পারমাণবিক প্রযুক্তির জ্ঞান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে মুসলিম ও শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর সাথে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের কাছেও এ ধরণের প্রস্তাব তুলে ধরে।
১৬. প্রচারযুদ্ধে ইরান : দীর্ঘদিন ধরে সারা বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সব প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল বিশ্ব-যায়নবাদী চক্র পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ। তাই ইরান বিভিন্ন ভাষায় বহির্বিশ্ব সম্প্রচার কার্যক্রম প্রচার করে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা ও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের কথাগুলো, উন্নয়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সংবাদগুলো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম নিজ উদ্যোগেই সংগ্রহ করছে।
কয়েকটি ক্ষেত্রে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান:
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার : প্রত্নতত্ত্ব, ভাস্কর্য, হস্তশিল্প ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক নিদর্শনাদির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দিক থেকে টঘঊঝঈঙ-এর তালিকাভুক্তিতে ইরানের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম।
কর্মসংস্থান : ২০০৭ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইরানের কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৯২.২৫% কর্মসংস্থান হয়েছে এবং বেকার রয়েছে ৭.৭৫%।
তেল ও গ্যাসসম্পদ : ভূগর্ভস্থ রিজার্ভ তেলের পরিমাণের দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। রিজার্ভ গ্যাসের পরিমাণের দিক থেকে ইরান বিশ্বে দ্বিতীয় (প্রথম রাশিয়া)।
বিদ্যুৎ উৎপাদন (২০০৬ সাল) : ২০০ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার।
বাঁধের সংখ্যা : ১৮৬টি সুবৃহৎ ও ৩২০টি ছোট আকারের বাঁধ। ৯১টি বৃহৎ বাঁধের মাধ্যমে ১০ বিলিয়ন কিউব মিটার পানি সরবরাহ হয়। বিশ্বে এর র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী তৃতীয় (প্রথম চীন, দ্বিতীয় তুরস্ক)।
রেলপথ : প্রধান রেলপথ ৮,৮৩৭ কিলোমিটার, দ্বিতীয় স্তরে ১,৮৩৩ কিলোমিটার, বাণিজ্যিক রেলপথ (স্বতন্ত্র) ১,০০০ কিলোমিটার।
ইন্টারনেট ব্যবহার : ইন্টারনেট ব্যবহারের দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মধ্যে ইরানের অবস্থান প্রথম।
তেল-বহির্ভূত রফতানি সামগ্রী : কৃষি থেকে ২২% কৃষিজ দ্রব্য উৎপাদন ৮৫ মিলিয়ন টন (৬২.৫ মিলিয়ন দানাশস্য, ১৩.৫ মিলিয়ন টন ফল, ৮.৬ মিলিয়ন টন গবাদিজাত ও ৪,৫৫,০০০ টন মৎস উৎপাদন)।
বৈচিত্র্যময় বাগানজাত: বৈচিত্রময় বাগানজাত উৎপাদনের দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। পেস্তা, জাফরান, খেজুর, ডালিম উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান বিশ্বে প্রথম।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি বিশ্বে দ্রুততম। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষত মহাকাশ গবেষণা, পরমাণু চিকিৎসা ও ন্যানো টেকনোলজি গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি ব্যাপক। ন্যানো টেকনোলজি সংশ্লিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিবন্ধের ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান ২৫তম এবং মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ। আর মহাশূন্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত স্যাটেলাইট পাঠানোর ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান বিশ্বে নবম এবং মহাকাশ যানে প্রাণী পাঠানোর ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ। আর এ বছরের মধ্যে মহাশূন্যে মানুষবাহী স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ইরান ৫১,০০০ পৃষ্ঠা সমৃদ্ধ ব্যাপক বিজ্ঞান গবেষণা সংক্রান্ত প্রকল্পপত্রে বর্ণিত ২২৪টি প্রকল্প ২০২৫ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর।
বায়ো টেকনোলজি : স্টেমসেল গবেষণার ক্ষেত্রে ইরান প্রথম সারির ১০টি দেশের মাঝে অবস্থান করছে। স্টেমসেল রিপ্লেস করার ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান দ্বিতীয়।
কম্পিউটার সায়েন্স : ২০১১ সালে আমির কাবীর ও ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয় ২টি সুপার কম্পিউটার তৈরি করে যার প্রসেসিং ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ৩৪০০০ বিলিয়ন যা বিশ্বের প্রথম সারির ৫০০টি কম্পিউটারের মাঝে রয়েছে।
এনার্জি (ঊহবৎমু) : ইরান বিশ্বের প্রথম সারির চারটি দেশের মধ্যে রয়েছে যারা ঠ৯৪.২ গ্যাস টারবাইন তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। গ্যাস রিফাইনারির সব পার্টসই ইরান নিজেই তৈরি করছে। তরল গ্যাস তৈরির প্রযুক্তি অর্জনে ইরান প্রথম তিনটি দেশের মাঝে অবস্থান করছে। ইরান দেশীয়ভাবে রিফাইনারি, তেল-ট্যাংকার, তেলকূপ খনন এবং তেল উত্তোলনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। গভীর পানিতে তেলকূপ খনন প্রযুক্তিতে ইরান বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের মাঝে রয়েছে।
সমরবিজ্ঞান : ইরান সুপারফাস্ট এন্টি সাবমেরিন তৈরি করেছে যা পানির তলদেশ দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মিটার গতিতে চলে; আর এ প্রযুক্তিটি বিশ্বে রয়েছে একমাত্র রাশিয়ার হাতে। লেজার টার্গেটিং প্রযুক্তিতে অস্ত্রের ক্ষেত্রে ইরান বিশ্বের পাঁচটি দেশের অন্যতম যাদের চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) নির্মাণ সক্ষমতা রয়েছে।###

Related posts

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

পরোপকার ও সহমর্মিতা: মানবিকতার মূল ভিত্তি ও ঈমানের দাবি

নম্রতা ও বিনয়: আত্মিক প্রশান্তির চাবিকাঠি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More