ইসলাম একটি জীবন্ত সত্য এবং বাস্তব বিধান। একটি সুস্থ শরীরের যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে বা একটি উন্নত গাড়ির যেমন মেরামতের সরঞ্জাম থাকে, মহান আল্লাহ ইসলামকে রক্ষা করার উপায়ও এর মধ্যেই নিহিত রেখেছেন। ইসলামকে মূলত দুই ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতে হয়: বাহ্যিক শত্রু এবং অভ্যন্তরীণ শত্রু।
১. ইসলামের দুই শত্রু: বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ
বাহ্যিক শত্রু: এরা হলো ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু। এরা অস্ত্র, প্রযুক্তি, অর্থ এবং অপপ্রচারের মাধ্যমে ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও আকিদা বিশ্বাসকে ধ্বংস করতে চায়। তারা বাইরে থেকে বা সমাজের ভেতর থেকে সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা করে।
অভ্যন্তরীণ শত্রু: এরা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এরা নিজেদের মধ্যকার লোক, যারা অর্থের লোভ, ক্ষমতার মোহ বা ইমানের দুর্বলতার কারণে নফসের কাছে পরাজিত হয়ে ইসলামের ক্ষতি করে। এরা ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’-এর মতো। এদের সৃষ্ট অনৈক্য ও বিচ্যুতি ইসলামকে ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য করে ফেলে।
২. বিচ্যুতি ও আধ্যাত্মিক সংকটের প্রেক্ষাপট
মহানবী (সা.)-এর ওফাতের মাত্র এক দশক পর থেকেই মুসলিম সমাজে বিচ্যুতির সূচনা হয়। ধীরে ধীরে দুনিয়াপূজা ও আরামপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এক সময়ের ত্যাগী যোদ্ধারা প্রচুর ধন-সম্পদ ও স্বর্ণ-রূপার মালিক হয়ে বিলাসিতায় মত্ত হন। এই বিচ্যুতি বাড়তে বাড়তে ইয়াজিদের শাসনামলে চরম সীমায় পৌঁছায়। শাসক যখন খোদাদ্রোহী ও লম্পট হয়, তখন তার কুপ্রভাব পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছিল।
৩. ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মদীনা থেকে কারবালা গমনের পেছনে অনেক শিক্ষা থাকলেও তাঁর মূল উদ্দেশ্য নিয়ে দুটি প্রচলিত ধারণা আছে: কেউ বলেন তিনি শুধু রাষ্ট্র গঠনের জন্য বেরিয়েছিলেন, আবার কেউ বলেন তিনি কেবল শহীদ হওয়ার জন্য বেরিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো— তার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের একটি বিশেষ ‘ওয়াজিব’ বা আবশ্যিক দায়িত্ব পালন করা, যা হলো ‘উম্মতের সংস্কার’। এই দায়িত্বটি পালনের সুযোগ আগে আসেনি। রাসূল (সা.) বা ইমাম আলী (আ.)-এর সময়ে সমাজ এতটা বিচ্যুত হয়নি যে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে যাওয়ার উপক্রম হবে। কিন্তু ইয়াজিদের সময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, ইমাম যদি রুখে না দাঁড়াতেন, তবে ইসলাম চিরতরে বিকৃত হয়ে যেত।
৪. সংস্কার ও জিহাদের স্বরূপ
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর লক্ষ্য ছিল আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি তাঁর অসিয়তনামায় স্পষ্ট করেছেন:
“আমি ক্ষমতার লোভে বা বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য বের হইনি; আমি বের হয়েছি আমার নানার উম্মতের সংস্কারের জন্য। আমি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে চাই।”
ইমামের এই সংগ্রামের দুটি সম্ভাব্য ফলাফল ছিল:
রাষ্ট্র গঠন: যদি সমাজ সাড়া দিত, তবে তিনি একটি আদর্শ ন্যায়বিচার ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতেন।
শাহাদাত: যদি রাষ্ট্র গঠন সম্ভব না হয়, তবে নিজের রক্ত দিয়ে ঘুমন্ত উম্মতকে জাগিয়ে তোলা এবং বাতিলের মুখোশ খুলে দেওয়া।
৫. ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলনের শিক্ষা
কারবালার ঘটনা কেবল একটি শোকাবহ ট্র্যাজেডি নয়, এটি চিরস্থায়ী সংগ্রামের আদর্শ।
বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়াই: যখন সমাজ ও শাসক ইসলামের ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে চলে যায়, তখন নীরব থাকা অপরাধ।
দুনিয়ার মোহ ত্যাগ: ইমাম শিখিয়েছেন যে, আখেরাতের স্থায়ী জীবনের তুলনায় দুনিয়ার চাকচিক্য নগণ্য। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিলাসিতার মোহ বিসর্জন দিয়ে সত্যের পথে অটল থাকতে হয়।
আধ্যাত্মিকতা ও বীরত্বের সমন্বয়: ইমাম আলী (আ.) এবং ইমাম হুসাইন (আ.) উভয়েই দেখিয়েছেন যে, বীরত্বের প্রকৃত ভিত্তি হলো আধ্যাত্মিকতা, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধি।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আন্দোলন ছিল ইসলামকে ‘মৃত্যুর’ হাত থেকে রক্ষা করে পুনরায় ‘জীবন্ত’ করার লড়াই। তিনি দেখিয়ে গেছেন যে, পরিস্থিতি যাই হোক—বিপদ আসুক বা শাহাদাত—সত্যের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখা এবং সমাজের বিচ্যুতি সংশোধন করা প্রতিটি মুমিনের আবশ্যিক কর্তব্য। আধুনিক যুগে ইমাম খোমিনী (রহ.)-এর বিপ্লবও ছিল ইমাম হুসাইনের সেই শিক্ষারই একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলন।
সংকলন: ইয়াসিন মেহদী ইফাজ
