লেখকঃ সৈয়দ মোহাম্মদ আলী আবেদী
“কাতলে হুসাইন আসল মে মারগে ইয়াজিদ হ্যায়, ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ”। অর্থাৎ, ইমাম হুসাইনের (আঃ) শহীদ হওয়ার ঘটনা আসলে ইয়াজিদেরই মৃত্যু, ইসলাম প্রতিটি কারবালার পর পুনরুজ্জীবিত হয়। মাওলানা মোহাম্মাদ আলী জওহারের এ উক্তি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে ইসলামের বিজয় কখন হয়েছিল এবং কার মাধ্যমে হয়েছিল। কারবালাতে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল তার পিছনে কোনো সাধারণ কারণ ছিলো না। উক্ত ঘটনার প্রধান কারণ হলো দ্বীন ইসলাম কে রক্ষা করা। কারবালায় ইমাম হুসাইন (আঃ) এত বড় আত্মত্যাগ করেন শুধু মাত্র নানার দিনকে রক্ষা করার জন্য। তিনি চেয়েছিলেন রাসূলে খোদা (সাঃ) এর উম্মত গনকে সঠিক পথে পরিচালনা করা, ন্যায় এর পথে পরিচালনা করা অন্যায় পথকে পরিত্যাগ করা এবং সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করা। কারবালার সেই ঐতিহাসিক ঘটনা কোনো গোষ্ঠী বা মাজহাবকে নিয়ে ঘটেনি। উক্ত ঘটনা পুরো মুসলিম উম্মাহর রক্ষায় ঘটেছিল।
কারবালায় ঐতিহাসিক মর্মান্তিক ঘটনা ছিল ইসলামের বিপ্লব ও ইসলাম রক্ষার প্রথম সূচনা। হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) কারবালায় যাওয়ার আগে ঘোষণা দেন যে “আমি আমার নানার দিনকে নানার উম্মতকে সংশোধনের উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করছি।” এর দ্বারা ইমাম হুসাইন (আঃ) তার উদ্দেশ্যে সকলের মাঝে তুলে ধরেন।
মহান আল্লাহ, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন এক দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের পথে আহবান করবে এবং ন্যায়সঙ্গত কর্মের আদেশ করবে ও অসঙ্গত কর্মে বাধা দান করবে আর এরাই সফলকাম হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১০৪)
হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) মহান আল্লাহর আদেশ রক্ষার্থে কারবালায় আসেন, তিনি আল্লাহর রসুলের (সাঃ) উম্মতগণকে ন্যায় পথের বার্তা দেন এবং অন্যায়কারীদের অন্যায় থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) বনি উমাইয়া’র ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, “সাবধান! তারা আল্লাহর আনুগত্যকে ত্যাগ করে শয়তান এর আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকার করেছে। শরিয়তের বিধি-বিধান উপেক্ষা করে ফিৎনা-ফ্যাসাদ এর পথ অবলম্বন করছে। তারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বায়তুল মালের অপব্যবহার করছে। মহান আল্লাহ কর্তৃক হালাল ঘোষিত বিষয়গুলিকে হারাম এবং হারাম ঘোষিত বিষয়গুলিকে হালাল হিসাবে গণ্য করছে। সুতরাং এ অবস্থার সংশোধনকে আমি অপরিহার্য মনে করি।” (তারিখে তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃ.৩০৭)
হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) সকলের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, “তোমরা কি দেখছ না, হক এর উপরে আমল হচ্ছে না এবং বাতিলকে পরিত্যাগ করা হচ্ছে না।”
কারবালাতে ইমাম হুসাইন (আঃ) যুদ্ধে লিপ্ত হবার আগে অনেকবার ইয়াজিদ বাহিনীকে সঠিক ইসলাম এর দাওয়াত দিয়েছেন ন্যায় এর পথে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানান। রাসূলের (সাঃ) এর রেখে যাওয়া ইসলামকে রক্ষার জন্য ইমাম হুসাইন (আঃ) যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তা পৃথিবীর বুকে কেউ কখনো করেনি আর করতে পারবে না। নিজের সর্বস্ব ইসলাম রক্ষায় লুটিয়ে দিয়েছিলেন। ইয়াজিদের বাহিনী কি জানত না ইমাম হুসাইন (আঃ) কে ছিলেন ? তার মর্যাদা, তার ফজিলাত কি ছিলো ? তারা কি রাসূল (সাঃ) এর মুখে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর মর্যাদা শোনে নাই ?
যেখানে রাসূল (সাঃ) নিজে বলেছেন : “নিশ্চয়ই হুসাইন হেদায়েতের প্রদীপ ও মুক্তির তরণী।” (বিহারুল আনওয়ার)
সাইয়্যেদুশ শোহাদা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর মহিমান্বিত ফজিলাত ও গৌরবোজ্জল পরিচয় জানা সত্ত্বেও তারা নির্মমভাবে তাকে ও তার পরিবারের সকলকে হত্যা করতে পারল ? রাসূলের (সাঃ) এর ওফাতের পর দ্বীন ইসলাম ধ্বংসের চক্রান্ত শুরূ হয়। ইসলামের মুখোশ পরেই ইসলাম বিরোধী কাজে লিপ্ত হতে থাকে মুসলমান নামধারী কিছু মুনাফিকের দল। ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার শাসনামলে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হতে থাকে যে রাসূল (সাঃ) এর রেখে যাওয়া ইসলামের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আঃ) তা হতে দেননি তিনি কারবালার মাধ্যমে ইসলামকে আবার উজ্জীবিত করে তোলেন। ইমাম হুসাইন (আঃ) সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এর জন্য অনুকরণীয় জীবনাদর্শ, সত্য ও ন্যায়ের পথের দিশারী এবং অন্যায় ও বাতিলের বিরূদ্ধে সংগ্রামের অনুপ্রেরণাদানকারী। ইমাম হুসাইন (আঃ) কারবালাতে আশুরার দিন এমনই এক মহাবিপ্লব সংঘটিত করেন যে বিপ্লবের কারণে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর ডাকে সারা প্রদানকারী প্রত্যেকের রক্তের এক একটি ফোটা ইসলামের বিজয়ের ডাক দেয়। আর তার এই ডাকে কারবালার মাধ্যমে ইসলাম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাই বলা হয়-“ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালাকে বাদ”।####
