ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের অনুচর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে ওয়াহাবি মাযহাব

by Rashed Hossain

লেখকঃ মল্লিক শিহাব ইকবাল

জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে এসে বিশ্বনবী (সা.) বলতেন, “তোমাদের ওপর সালাম! হে বিশ্বাসীদের আবাসস্থল! আল্লাহ চাইলে আমরাও শিগগিরই তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। হে আল্লাহ, আল-বাকির (জান্নাতুল বাকি কবরস্থানের) অধিবাসীদের ক্ষমা করুন।”

সুন্নি ও শিয়া সূত্রে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ও আত্মীয়-স্বজনদের কবরে সালাম দিতেন।

বিশ্বনবী (সা.) কবর জিয়ারতের সুন্নাতকে প্রাতিষ্ঠানিকরূপ দান করেছিলেন। সম্ভবত এর অন্যতম কারণ এটাও ছিল যে এর মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের মধ্যে বিভাদকামী এই ওয়াহাবি-সালাফি গোষ্ঠীর মুনাফেকি বা কপট চরিত্র উন্মোচন করবেন। এই সুন্নাতের মাধ্যমে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এটা স্পষ্ট করেন যে, একটি গতিশীল ইসলামী সমাজ সবসময় তার মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ করে যেই মৃত ব্যক্তিরা মৃত্যুর পরেও খোদায়ী রহমত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে শহীদদের অবস্থান আরো উন্নত। স্বয়ং মহান আল্লাহ বলেছেন, “যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে তাদের তোমরা মৃত ভেবো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের কাছে থেকে জীবিকা প্রাপ্ত।” (সুরা আলে ইমরানঃ ১৬৯)

অন্য একটি আয়াত হতে জানা যায় এই বিশেষ জীবন (বারজাখের জীবন) শুধু শহীদদের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সকল অনুগত ও সৎকর্মশীল বান্দার জন্য নির্ধারিত।
মহান আল্লাহ বলেছেন, “যারা আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত পুরুষের আনুগত্য করবে তারা সেই সব ব্যক্তির সঙ্গে থাকবে নবীগণ, সত্যবাদিগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য হতে যাদের তিনি নিয়ামত দিয়েছেন। তারা কতই না উত্তম সঙ্গী।” (সুরা নিসাঃ ৬৯)

বিশ্বনবী (সা.)’র জন্য এটা কতই না হৃদয় বিদারক যে তাঁর প্রিয় আহলে বাইত, সাহাবি ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনের মাজারগুলো গুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। জান্নাতুল বাকী কোন সাধারণ কবরস্থান নয়। এখানে রয়েছে অন্তত সাত হাজার সাহাবির কবর। এখানে রয়েছে বিশ্বনবী (সা.)’র ফুপি বা পিতার বোন হযরত সাফিয়া ও আতিকার কবর। এখানেই রয়েছে বিশ্বনবী (সা.)’র শিশু পুত্র হযরত ইব্রাহিম (তাঁর ওপর অশেষ শান্তি বর্ষিত হোক) এর কবর। এই পুত্রের মৃত্যুর সময় বিশ্বনবী (সা.) অশ্রু সজল চোখে বলেছিলেন, “চোখগুলো থেকে পানি ঝরছে এবং হৃদয় শোকাহত, কিন্তু আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্রেককারী কথা ছাড়া অন্য কিছুই বলব না। আমরা তোমার জন্য শোকাহত হে ইব্রাহিম।” জান্নাতুল বাকি হচ্ছে সেস্থান যেখানে সমাহিত হয়েছেন বিশ্বনবী (সা.)’র চাচা হযরত আবু তালিব (রা.)’র স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ (সা.আ.)। এই মহীয়সী নারী বিশ্বনবী (সা.)কে লালন করেছিলেন নিজ সন্তানের মত আদর দিয়ে এবং তাঁকে কবরে রাখার আগে বিশ্বনবী (সা.) এই মহান নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিজেই ওই কবরে কিছুক্ষণ শুয়েছিলেন। রাসুল (সা.) তার জন্য তালকিন উচ্চারণ করেছিলেন শোকার্ত কণ্ঠে। জান্নাতুল বাকি হচ্ছে সেই কবরস্থান যেখানে বেহেশতী নারীদের সর্দার তথা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (সা.) বিশ্বনবী (সা.)’র ইন্তিকালের পর যে ৯০ দিন নিজে বেঁচে ছিলেন প্রায়ই সেকানেই গিয়েই শোক প্রকাশ করতেন। যেখানেই বলে তিনি শোপ প্রকাশ করতেন সেই স্থানটিকে বলা হল বাইতুল হুজন বা শোক প্রকাশের ঘর। একই স্থানে কারবালার শোকাবহ ঘটনার পর বিশ্বনবী (সা.)’র নাতি শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.) ও নিজের পুত্র হযরত আবুল ফজল আব্বাস (রা.)’র জন্য শোক প্রকাশ করতেন মুমিনদের নেতা হযরত আলী (আ.)’র স্ত্রী উম্মুল বানিন (সা.আ.)। এখানেই মদিনাবাসী যোগ দিতেন শোক-অনুষ্ঠানে। এখানে প্রায়ই শোক প্রকাশের জন্য আসতেন ইমাম হোসাইন (আ.)’র স্ত্রী হযরত রাবাব (সা. আ.)। বিশ্বনবী (সা.)’র নাতনী ও ইমাম হোসাইন (আ.)’র বোন হযরত জয়নাব (সা.আ.) ও উম্মে কুলসুম (সা.আ.) নিয়মিত শোক প্রকাশের জন্য এখানেই আসতেন। প্রায় ৯০ বছর আগেও জান্নাতুল বাকিতে টিকে ছিল বিশ্বনবী (সা.)’র ১২ জন নিষ্পাপ উত্তরসূরির মধ্যে থেকে তাঁর নাতি হযরত ইমাম হাসান (আ.), ন্য নাতি ইমাম হোসাইন (আ.)’র পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.), তাঁর পুত্র ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.) ও বাকির (আ.)’র পুত্র ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’র সুদৃশ্য মাজার। কিন্তু বর্তমানে এ এলাকায় টিকে রয়েছে একমাত্র বিশ্বনবী (সা.)’র মাজার। ওয়াহাবিরা বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র মাজার ভাঙ্গার জন্য বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেয়ার পরও মুসলমানদের প্রতিরোধের মুখে ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার ভয়েই তা বাস্তবায়নের সাহস করেনি।

ইসলামের পবিত্র ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ধ্বংস করে ওয়াহাবিরা শুধু মুসলিম উম্মাহর হৃদয়কেই ক্ষত-বিক্ষত করেনি, একইসঙ্গে মানব সভ্যতার অবমাননার মত জঘন্য কলঙ্কও সৃষ্টি করেছে। কারণ প্রত্যেক জাতি ও সভ্যতাই নিজের পুরনো ঐতিহাসিক চিহ্ন ও নিদর্শনগুলোকে শিক্ষার মাধ্যমে হিসেবে সংরক্ষণ করে। এজন্য বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে থাকে জাতিগুলো। অথচ ওয়াহাবিরা ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোও ধ্বংস করে দিচ্ছে যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মগুলো এইসব নিদর্শন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। এটা ইসলাম ও মানব সভ্যতার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। হিজরী ১২২১ সালে (১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে) প্রথমবার ওয়াহাবিরা মদিনায় হামলা চালিয়েছিল। সেসময় জান্নাতুল বাকিতে নিষ্পাপ ইমামদের মাজার ধ্বংস করেছিল। বিশ্বনবী (সা.) এর পবিত্র মাজারের দামী পাথর ও সোনা-রূপাসহ মূল্যবান জিনিষগুলো লুটপাট চালায়। তারা পবিত্র মক্কায়ও হামলা চালিয়েছিল। মক্কা ও মদিনার জনগণকে জোর করে ওয়াহাবি মতবাদ মেনে নিতে বাধ্য করেছিল ওয়াহাবিরা। ধর্মপ্রাণ সুন্নি ও শিয়া মুসলমানরা অর্থ ব্যয় করে আবারও জান্নাতুল বাকির মাজারগুলো পুনর্নির্মাণ করেন। কিন্তু ওয়াহাবিরা দ্বিতীয়বার মক্কা দখলের পর পর ১৩৪৪ বা ১৩৪৫ হিজরীতে তখা ১৯২৫ সালে মদীনা অবরোধ করে এবং প্রতিরোধাকামীদের পরাজিত করে এই পবিত্র শহর দখল করে। আবারও জান্নাতুল বাকিতে মাসুম ইমামদের মাজারসহ সব মাজার ধ্বংস করে এবং লুটপাট চালায়। মুসলমানরা এই দিনটিকে ইয়াওমুল আলহাদাম বা ধ্বংসের দিন বলে অভিহিত করেছেন।

ইসলামে রাসুল (সা.), তাঁর পরিবার, তাঁর সাহাবা, পরবর্তীতে রাসুল, পরিবার ও সাহাবা নিয়ে বড় বড় যত ইমাম এসেছেন মাজহাবের ইমামসহ এদের সবাইকে সর্বদিক দিয়ে হেয় করাই এদের একটা প্রধান দিক। মিলাদে রাসুলের সম্মাননা তাদের সহ্য হয় না, ঈদে মিলাদুন্নবী তাদের সহ্য হয় না। এটা সেই মতবাদ, যেখানে বলা হয়, আল্লাহ ও মুহাম্মাদ পাশাপাশি লিখলে শিরক হবে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ পাশাপাশি লিখলেও শিরক হবে। এটা সেই মতবাদ, যেখানে ইমাম হোসাইন (আ.)কে জাকির নায়িক ইন্টারন্যাশনাল পিস কনসারেন্সে স্টেজে দাঁড়িয়ে দোষারোপ করে এবং সৌদি প্রধান মুফতি টেলিভিশনে গালাগালি করে এবং এই সেই মতবাদ যে মতবাদের দেশে এজিদের নামে মাদ্রাসাও রয়েছে এবং এজিদকে শহীদের মর্যাদা দানের দাবিও করা হচ্ছে। এজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (আ.)কে শহীদ করার সময় বলেছিল, দ্রুত করো! আসরের নামাজের সময় চলে যাচ্ছে! নামাজ পার্থক্য সৃষ্টি করে না, আমরা এবং তারা উভয়েই নামাজ পড়ি। পার্থক্য সৃষ্টি করছে বিশ্বাস। সৌদি আরবে ইসলঅমী নিদর্শনগুলোর শতকরা ৯৫ ভাগই ধ্বংস করে ফেলেছে ওয়াহাবিরা। ইসলামের দুই প্রধান কেন্দ্র তথা মক্কা ও মদিনায় ইসলামের প্রধান নিদর্শনগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস করে ফেলেছে তারা। অথচ ওয়াহাবিরা হাজাজে তথা সৌদি আরবে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের নিদর্শনগুলো রক্ষা করছে। এটা খুবই বিস্ময়কর ও লক্ষণীয় বিষয়। যেমন, খায়বরের মারহাব দূর্গ রক্ষা করছে তারা। মারহাব ছিল মদিনার অন্যতম ইহুদি গোত্র প্রধান ও পলোয়ান যে হযরত আলী (আ.)’র সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। এমনকি ওয়াহাবিদের প্রথম শাসনামলের দিকে নির্মিত খ্রিষ্টানদের একটি গির্জাকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে রক্ষা করছে ওয়াহাবিরা। অথচ বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র স্মৃতি-বিজড়িত নিদর্শনগুলো ধ্বংস করছে তারা। বিভিন্ন দলিল প্রমাণে দেখা গেছে ওয়াহাবিরা সৌদি আরবে, বিশেষ করে, মক্কা ও মদিনায় অলি-আওলিয়ার মাজার বা কবর ধ্বংসের পাশাপাশি তাদের অবমাননার জঘন্য ও দুঃখজনক পদক্ষেপও নিয়েছে। যেমন ওয়াহাবিরা মক্কায় বিশ্বনবী (সা.)’র স্ত্রী ও প্রথম মুসলমান উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (সা.আ.) বাসভবনটিকে ধ্বংস করে সেখানে টয়লেট নির্মাণ করেছে। কেউ কেউ বলে থাকেন যে সৌদি রাজ-পরিবার আসলে ‘দোমনেহ’ নামের বিভ্রান্ত ইহুদিবাদী গোষ্ঠীর বংশধর। এই গোষ্ঠী ভন্ড ইহুদিবাদী নবী ‘শাব্বিটি জিভি’র অনুসারী। তারা প্রকাশ্যে ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করত। কিন্তু তারা বাস্তবে মদ্যপ ও নির্বিচার যৌনাচার বা যৌন অনাচারসহ নানা ঘৃণ্য কাজে অভ্যস্ত ছিল।

বিশ্বের দিকে তাকালে আপনি নিরোপেক্ষভাবে একটু চিন্তা করুন ওয়াহাবিয়া মাযহাব খ্রিষ্টান ও ইহুদী’র অনুচর নাকি খাঁটি মুসলমান এই প্রশ্নটি পাঠকের দিকে উপস্থাপন করলাম আপনারা এর প্রকৃত উত্তর দিবেন। ###

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔