কষ্ট এবং তার ফল

চরম বস্তুবাদী মতবাদগুলোও এক নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী- এ ভূমিকা দিয়ে বলা যেতে পারে সকল মানবীয় মূল্যবোধ এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে সারসংক্ষিপ্ত হয় যা নিজেই একটি শাখায় পরিণত হয় এবং তা এমন এক প্রেক্ষাপট যা আরেফগণের পরিভাষায় যেমনটি এসেছে তেমনি এসেছে সমসাময়িক আলেমগণের পরিভাষায়ও। তবে আরেফগণের পূর্বেই তা ইসলামের মূল পাঠ্যসমূহে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ঐ প্রেক্ষাপটকে এভাবে বর্ণনা করা যায় যে,মূলত মনুষ্যত্বের প্রকৃত মানদণ্ড তা-ই যার ফলে কষ্ট ও কষ্ট প্রাপক -কে ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষ এবং অন্যের (প্রাণীর) মধ্যে পার্থক্য হলো যে,সে কষ্ট ও বেদনাকে অনুভব করে। কিন্তু অন্যান্য প্রাণী তা পশুই হোক কিংবা মানুষের দেহাবয়বে মনুষ্যত্বহীন মানবই হোক- কষ্টের অনুভূতি সম্পন্ন নয়।

অতএব,প্রারম্ভেই কষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করব। হয়তো প্রথমত একটা আশ্চর্য বিষয় মনে হবে যে,এর মানে কি?

অবশ্য স্মরণযোগ্য,আমরা কষ্ট এবং কষ্টের উৎস এ দু য়ের মধ্যে ভুল অর্থ করি। যেমন কোন অসুখ বা জখমের মন্দের কারণ হলো জীবাণু; আর তার উপস্থিতিই হলো অসুখ বা জখম- যা দেহে অনুপ্রবেশ করে কষ্টের সৃষ্টি করে। অনুরূপ কোন ক্ষত যা অন্ত্রে হয় এবং মানুষ তার ব্যথা অনুভব করে তা ঐ ক্ষতের ফলেই। বেদনা মানুষের জন্য অস্বস্তির হলেও জ্ঞান ও জাগরণের কারণও বটে,এমনকি শারীরিক ব্যথা যা মানুষ বা পশুর জন্য অভিন্ন তাও মানুষের জ্ঞান এবং জাগরণের কারণ। যখন কারো মাথা ব্যথা হয় তখন এটা ধারণা করা অসম্ভব যে,কোন কারণ ব্যতিরেকেই ব্যথার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যথা অনুভূত হওয়ার ফলে মাথার কোন অসুস্থতা বা ক্ষত সম্পর্কে মানুষ অবগত হয় এবং তখন তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে ঠিক যেন কোন কারখানা বা গাড়ীর সূচকের মতো। যেমন কোন সূচক তৈলের পরিমাণ ইঙ্গিত করে আবার কোনটি পানির তাপমাত্রার পরিমাণ। যদি কোন সূচক ইঙ্গিত করে যে,পানির তাপমাত্রা খুব উচ্চে আছে তাহলে সেটা কি ভালো না খারাপ? অবশ্যই তা ভালো। কারণ তা আপনাকে গাড়ীর অবস্থা সম্পর্কে খবর দেয় বা সতর্ক করে দেয়। যদি ব্যথা বা এর অনুভূতি মানুষের মধ্যে না থাকত তবে প্রথমত এর সম্পর্কে অবগত হতো না। দ্বিতীয়ত এ ব্যথা মানুষকে এক নিযুক্ত কর্মচারীর মতো উপায় অনুসন্ধানের জন্য বাধ্য করে এবং তাকে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আহবান করে। যেহেতু ব্যথা আছে তা তাকে অস্বস্তিকর করে তুলে এবং নিয়মিত তাকে বলে যেভাবেই হোক এ ব্যথার উপশম করো।

সুতরাং ব্যথা এমনকি শারীরিক বা আঙ্গিক হলেও তাতে অনুগ্রহ আছে,অনুভূতি আছে,আছে জ্ঞান ও জাগরণ। অবগতি ও জাগরণ সর্ববস্থায়ই উত্তম,এমনকি তা শারীরিক কোন ক্ষত সম্পর্কে হলেও।

অতঃপর এখানে এসে বাকচাতুর্য প্রদর্শন করেন এবং বলেন,ব্যথিতের বেদন ব্যথিত ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারে না। বিশেষ করে সে এ বিষয়ে আর সকলের চেয়ে বেশি অবগত। বেদনাহীনতা মানে উদাসীনতা; বোধহীনতা,অনুভূতিহীনতা বা অবোধ্যতা। অপরদিকে বেদনার উপলব্ধি মানে হলো জ্ঞাতী,জাগরণ,বোধগম্যতা এবং বেদনাহীনতা যার অর্থ অজ্ঞতা।

যদি মানুষের জীবনে দু টি পর্যায় থাকে- বেদনাহীনতা ও অজ্ঞতা এবং তার বিপরীতে বেদনা ও বোধ্যতা- তবে কোনটিকে নির্বাচন করবে? মানুষ বেদনা ও বোধ্যতাকে প্রধান্য দিবে,না অজ্ঞতা বা নির্বুদ্ধিতা ও বেদনাহীনতাকে? নিশ্চয়ই বুদ্ধিদীপ্ত কষ্টকর জীবন নির্বোধ সুখকর জীবনের চেয়ে শ্রেয়তর।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,স্হুল শূকর হওয়ার চেয়ে দুর্বল সক্রেটিস হওয়া অনেক উত্তম। অর্থাৎ যদি মানুষ জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হয় কিন্তু বঞ্চিত,তবে তা এক নির্বোধ শূকর- যার জন্য সকল কিছুই সহজলভ্য তার চেয়ে অনেক উত্তম।

Related posts

ইসলামি শিষ্টাচার: ছোটদের স্নেহ ও বড়দের প্রতি সম্মান

ইমাম রেযা’র (আ.) জ্ঞানপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

প্রতিবেশীর অধিকার: সামাজিক সম্প্রীতি

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More