কামারে বনি হাশিম হযরত আব্বাস (আ.)

হযরত আব্বাস ইবনে আলী (আ.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যার জীবন ছিল ইমামত ও সত্যের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের এক জীবন্ত দলিল। ইসলামের ইতিহাসে তিনি ‘কামারে বনি হাশিম’ (বনি হাশিম বংশের পূর্ণিমার চাঁদ) এবং ‘বাবে হাওয়ায়েয’ হিসেবে অমর হয়ে আছেন।


হযরত আলী (আ.)-এর জীবনে মা ফাতেমা (সা.আ.)-এর বিচ্ছেদ ছিল এক গভীর ক্ষত। পরবর্তীতে এক  সাহসী সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় তিনি বংশ বিশেষজ্ঞ হযরত  আকিলের পরামর্শে ‘উম্মুল বানিন’ -কে বিয়ে করেন। ৪ঠা শাবান মদিনায় হযরত আব্বাসের জন্ম হয়। জন্মের পর তাঁর দুই বাহুতে চুমু খেয়ে হযরত আলী (আ.) কেঁদেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন এই হাতগুলো কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইনের (আ.) সহায়তায় উৎসর্গিত হবে।

হযরত আব্বাসের লালন-পালন হয়েছিল ইমাম আলী, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধা ও আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী।

  • অটল ঈমান: শৈশবে যখন তাঁর পিতা তাকে ‘দুই’ বলতে বলেন, তিনি বলেন—”যে রসনায় ‘এক’ (আল্লাহ) বলেছি, সেখানে ‘দুই’ বলতে আমার লজ্জা হয়।”

  • বাহ্যিক সৌন্দর্য: তিনি ছিলেন অত্যন্ত দীর্ঘদেহী ও সুদর্শন। ঘোড়ায় চড়লে তাঁর পা মাটিতে ঠেকে যেত।

  • উপাধি: তাঁর কপালে সিজদার চিহ্ন উজ্জ্বল থাকত, যার কারণে তাঁকে বলা হতো আধ্যাত্মিক ও শারীরিক সৌন্দর্যের আধার।

কৈশোরেই সিফ্ফিনের যুদ্ধে তিনি তাঁর বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর রণকৌশল দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। তবে ইমাম আলী (আ.) তাঁকে বড় যুদ্ধগুলো থেকে আগলে রাখতেন, যাতে তিনি কারবালার মহাযুদ্ধের জন্য নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।

হযরত আব্বাসের জীবনের মূল মন্ত্র ছিল ‘বেলায়াত’ বা ইমামের প্রতি আনুগত্য। তিনি কখনও ইমাম হুসাইনকে (আ.) কেবল ভাই হিসেবে দেখেননি, বরং তাঁর নেতা ও ইমাম হিসেবে আজীবন সেবা করেছেন।

  • মাতা উম্মুল বানিনের শিক্ষা: তাঁর মা তাঁকে শিখিয়েছিলেন যে তিনি যেন নিজেকে ইমাম হুসাইনের সেবক মনে করেন।

৬০ হিজরিতে যখন ইমাম হুসাইন (আ.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে মক্কা থেকে কারবালার পথে রওনা হন, হযরত আব্বাস ছিলেন সেই কাফেলার পতাকাবাহী বা সেনাপতি।

  • পিপাসার্ত শিশুদের জন্য ত্যাগ: ফোরাত নদীর তীরে পানি থাকা সত্ত্বেও তিনি এক ফোঁটা পানি পান করেননি, কারণ তাঁর ইমাম ও শিশুরা ছিল পিপাসাসুর্ত।

  • শাহাদত: কারবালার ময়দানে শিশুদের জন্য পানি আনতে গিয়ে তাঁর দুই বাহু কাটা পড়ে এবং তিনি শাহাদত বরণ করেন। ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর মৃত্যুতে বলেছিলেন, “এখন আমার কোমর ভেঙে গেল 

হযরত আব্বাস (আ.) কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন জ্ঞান, তাকওয়া এবং ধৈর্য্যের এক সুউচ্চ শিখর। কিয়ামত দিবসে শহীদগণ তাঁর উচ্চ মর্যাদা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করবেন। আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি বিপদ মুক্তির দ্বার বা ‘বাবে হাওয়ায়েয’ হিসেবে পরিচিত।

সংকলন: ইয়াসিন মেহদী ইফাজ

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More