কারবালায় পিপাসা

 নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে যা পাওয়া যায় তা হলো ,ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের তিন দিন পূর্বে অর্থাৎ সাতই মুহররম উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ সেনাপতি উমর বিন সাদকে নির্দেশ দিয়েছিল যে ,ইমাম হোসাইন (আ.)-কে পানি নেয়া থেকে বিরত রাখ এবং তাঁকে এক ফোঁটা পানি পান করার সুযোগ দিও না । আর সে উসমানের ওপর পানি বন্ধ করার প্রতিশোধ নেয়ার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে এ কাজ করে! ( বালাজুরী , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৮০ )

উমর বিন সাদ এ নির্দেশ পাওয়া মাত্র আমর বিন হাজ্জাজকে ৫০০ অশ্বারোহী সাথে দিয়ে ফোরাত নদীর তীর বন্ধ করার হুকুম দেয় যাতে ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর সাথিরা পানি নিতে না পারে ।

 এ দুই তিন দিন ইমাম এবং তাঁর সাথিরা বিভিন্ন পন্থায় পানি আনার চেষ্টা করছিলেন ;কারণ ,ঐ উত্তপ্ত মরুভূমিতে পিপাসার কষ্ট সহ্য করা বিশেষ করে শিশু ও নারীদের সাধ্যের বাইরে ছিল ।

কোন কোন গ্রন্থে এ রকম এসেছে : ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর শিবিরে পানির জন্য কূপ খনন করা শুরু করেছিলেন ;কিন্তু ইবনে যিয়াদের কাছে যখন এ খবর পৌঁছল তখন সে উমর বিন সাদকে নির্দেশ দিল ,অবরোধ যেন কঠোর করা হয় এবং কূপ খনন করতে বাধা দেয়া হয় ।

আবার কোন কোন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে এসেছে ,হযরত আব্বাস (আ.) ৩০ জন অশ্বারোহী এবং ২০ জন পদাতিক সৈন্য নিয়ে পতাকাবাহী নাফে বিন হেলালের সাথে রাতের বেলায় ফোরাতের তীরে হামলা করেন । তারা আমর বিন হাজ্জাজের বাহিনীর সাথে লড়াই করার পর ২০ মশক পানি নিয়ে আসতে সক্ষম হন ।

উপরিউক্ত ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোন সময় উল্লেখ করা হয়নি । তবে এ বাক্যটি বর্ণিত হয়েছে : যখন ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর সাথিদের পিপাসার কষ্ট চরম আকার ধারণ করেছিল ।

কোন কোন জায়গায় বলা হয়েছে : ইমাম হোসাইন (আ.) আশুরার দিনে তাঁর বোন যায়নাবের চেহারার ওপর পানি ছিটিয়ে দিয়েছিলেন ;কারণ ,তিনি যখন শাহাদাত নিকটবর্তী হওয়া সম্পর্কিত ইমামের কবিতা শ্রবণ করেন তখন বেহুশ হয়ে যান ।

উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে ,আশুরার রাতে ইমামের শিবিরে পানি ছিল । আল্লামা মাজলিসী (র.) বিহারুল আনওয়ার গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন যে ,আশুরার দিন সকাল বেলাতেও খাওয়ার পানির কোন সমস্যা ছিল না ।

এ সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছে : অতঃপর ইমাম হোসাইন (আ.) স্বীয় সাথিদেরকে বললেন : ওঠ ,পানি পান কর ;কারণ ,এটা হচ্ছে তোমাদের সর্বশেষ খাদ্য । ওজু কর এবং গোসল কর । আর নিজেদের কাপড়গুলোকে পানি দিয়ে ধৌত কর যাতে ঐগুলো তোমাদের কাফন হতে পারে । ঐ সময় ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁদের সাথে ফজরের নামায জামাতে আদায় করেন ।

 এটা তোমাদের সর্বশেষ খাদ্য এই বাক্য এবং আশুরার দিবস সম্পর্কিত অন্যান্য বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে ,সঞ্চিত পানি শেষ হওয়ার পর পুনরায় পানি সংগ্রহ সম্ভব হয়নি । আর ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর পরিবার এবং সঙ্গীদেরকে নিয়ে কারবালার ঐ উত্তপ্ত মরুভূমিতে শাহাদাতের মুহূর্ত পর্যন্ত একদিকে দুশমনদের সাথে কঠিন যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন ,অপরদিকে কঠিন পিপাসায় কাতর ছিলেন আল্লামা মাজলিসী (র.) স্বীয় বর্ণনায় তামীম বিন হাসীন খাজারী নামে উমর বিন সাদের এক সৈন্যের উপহাসের কথা উল্লেখ করেন । সে ইমাম হোসাইন (আ.)-কে লক্ষ্য করে বলছিল : হে হোসাইন! হে হোসাইনের সাথিরা! ফোরাত নদীর পানি দেখতে পাচ্ছ ,কিভাবে সাপের পেটের মতো জ্বলজ্বল করছে ;খোদার শপথ! মৃত্যুর আগে এক ফোঁটা পানি সেখান থেকে পান করতে পারবে না ।

হুর ইবনে ইয়াযীদ আশুরার দিন কুফাবাসীকে নসীহত করার সময় ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর সাথিদের ওপর ফোরাত নদীর পানি বন্ধ রাখার জন্য তাদেরকে খুব তিরস্কার করেন ।

কোন কোন গ্রন্থে এসেছে ,ইমাম (আ.) পানি নিয়ে আসার জন্য খুব চেষ্টা করছিলেন ;কিন্তু শিমার বাধা দিয়েছিল এবং ইমামকে উপহাস করেছিল । এ কারণে ইমাম তাকে অভিসম্পাত করেন ।

আল্লামা মাজলিসী (র.) একটি হাদীস বর্ণনা করেন যার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে ,হযরত আব্বাস যুদ্ধ করার জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন আর ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁকে শিশুদের খাওয়ার পানি নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দেন । প্রসিদ্ধ মতে ,হযরত আব্বাস (আ.) পানি নিয়ে আনতে সক্ষম হননি ;বরং ফেরার পথে শাহাদাত বরণ করেন ।( বিহারুল আনওয়ার , ৪৫তম খণ্ড , পৃ. ৪১ ও ৪২ )

Related posts

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য: জান্নাত লাভের সহজ পথ

শবে কদরের ফজিলত, মর্যাদা ও প্রাসঙ্গিক কথা

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.)-এর অমিয় বাণী

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More