কুফা শহরে বন্দিদশায় নবী পরিবার
ভাষান্তর: হুজ্জাতুল ইসলাম আনিসুর রহমান
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর নবী পরিবারের বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিবর্গ বন্দি কাফেলা হিসেবে কুফা শহরে প্রবেশ করেছে; ইবনে জিয়াদ ও উমর ইবনে সা’দের বিজয়ীবেশ দেখার জন্য জনগণকে দাওয়াত করা হয়েছিল। শহরের অলিতে গলিতে ও বিভিন্ন চত্ত¡রে জনগণের উপচে পড়া ভীড়, ক’দিন আগেই যে জনগণ হযরত ফাতেমা জাহরার (সা. আ.) সন্তানদের শহরে প্রবেশ উপলক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল আজ সেই জনগণই হোসাইন ইবনে আলী (আ.) ও তাঁর প্রাণপ্রিয় সঙ্গী-সাথীদের কর্তিত মস্তকগুলোকে স্বাগত জানাতে একত্রিত হচ্ছে এবং যে শহরে ক’বছর আগেই আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলী (আ.) মানুষের উৎকর্ষের জন্য বক্তব্য দিতেন আর আলাভীদের (আলীর অনুসারীদের) প্রতিধ্বনি অলি-গলিতে ঝনঝন করে বাজতো, সেই শহর আজ আলীর (আ.) বড় কন্যা ও বন্দি কাফেলার প্রবেশের করুণ দৃশ্যের প্রকাশ্য সাক্ষী।
শহরের মধ্যে বিশাল দর্শক জনতার মাঝে হযরত যয়নাব (সা.আ.) বক্তব্য প্রদানের জন্য প্রস্তুত!
বর্ণনাকারী বলেন: সেদিন আলীর (আ.) কন্যা হযরত যয়নাব (সা.আ.) নিজের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। কেননা এর আগে কখনো এ রকম কোন নারীকে দেখিনি যার আপাদমস্তক লজ্জা-শরমে ভরা তিনি এ ধরনের শক্ত বক্তব্য প্রদান করতে পারে, মনে হচ্ছিল যেন আমিরুল মো’মিনীন হযরত আলীর (আ.) ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন!
যখনই তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন:“আপনারা চুপ করুন!” সাথে সাথে মনে হল যেন সবার বুকের মধ্যে নিঃশ্বাস থমকে দাঁড়ালো ও বাহনের গলায় ঝুলন্ত ঘন্টাগুলো নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল, এমতাবস্থায় হযরত যয়নাব (সা.আ.) তার বক্তব্য শুরু করলেন: সকল প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর জন্য এবং দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমার নানা হযরত মুহাম্মদ এবং তাঁর পবিত্র ও নির্বাচিত সন্তানদের উপর।
কিন্তু, আপনারা হে কুফাবাসী! ধোকাবাজ ও বিশ্বাসঘাতকেরা! তোমরা কাঁদছো?! আমি চাই তোমাদের এই অশ্রæ যেন কখনো শুষ্ক না হয় ও তোমাদের আর্তনাদ যেন কভু শেষ না হয়!
তোমরা সেই মহিলা হয়ে থাকবে যারা নিজ হস্তে রশিগুলোকে শক্তভাবে পাকানোর পর আবার সেগুলো খুলে ফেলে! তোমরা এমন যে, স্বীয় কসম ও ওয়াদাগুলোকে বিশ্বাসঘাতকতা ও ফিৎনার উসিলা বানিয়েছ!
তোমাদের মধ্যে কি মর্যাদা আছে; দম্ভ, গাঁজাখুরি কথা বলা, নোংরামী এবং বুক ভরা হিংসা ছাড়া?
তোমরা বাহ্যিকভাবে মিষ্টভাষী দাসীদের মত আর ভিতর ভিতর কঠোর শত্রু
হ্যাঁ, তোমরা ঐ ধরণের সবুজ-নির্মল ঘাঁসের মত যেগুলো ময়লা-আবর্জনার মধ্যে জন্মায় অথবা ঐরূপ রুপার মত যা দ্বারা মৃতের কফিনকে সাজানো হয়!
তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের পরকালকে তোমরা তোমাদের নোংরা কর্মের দ্বারা ধ্বংস করেছ ও আল্লাহর ক্রোধের স্বীকার হয়েছ আর তাই তোমরা চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে।
তোমরা কাঁদছো, আহাজারী ও আর্তনাদ করছো?! হ্যাঁ, আল্লাহর কসম তোমরা অবশ্যই বেশী বেশী করে কাঁদবে আর কম হাসবে। কেননা, তোমরা তোমাদের আঁচলকে অপমান ও লাঞ্ছনার কালিমা দ্বারা প‚র্ণ করেছ যা কখনো ধুয়ে বা মুছে ফেলা সম্ভব হবে না! তোমরা কিভাবে পারবে সর্বশেষ নবী ও রেসালাতের খনির সন্তানের পবিত্র রক্তকে ধুয়ে ফেলতে?! যিনি ছিলেন বেহেশতের যুবকদের সর্দার, সৎকর্মশীলদের বিপদ হতে মুক্তিদাতা, ন‚রে এলাহির নিরাপদ স্থল ও তোমাদের মহান নেতা।
জেনে রাখ! তোমরা অত্যন্ত নিকৃষ্ট পাপে লিপ্ত হয়েছ, আল্লাহর রহমত থেকে দ‚রে সরে গেছ, তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, তোমাদের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা পন্ড হয়ে গেছে, তোমাদের হাত শ‚ণ্য, লেন-দেনে সম্প‚ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছ, আল্লাহর ক্রোধের স্বীকার হয়েছ, পরিণামে তোমাদের নামের উপর কাঁটাযুক্ত ও দ‚র্ভাগ্যের সীল অঙ্কিত করা হয়েছে!!!
আফসোস তোমাদের উপর হে কুফার জনগণ! তোমরা কি জান যে, আল্লাহর রাস‚লের (সা.) কোন্ কলিজাকে তোমরা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছ? কত ম‚ল্যবান রক্ত তাঁর শরীর থেকে ঝড়িয়েছ? রাস‚লকে (সা.) কতটা অপমান ও অসম্মান করেছ?!
নিশ্চিত তোমরা এমন কাজ করেছ যা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের ও জঘন্য শ্রেণীর, অশোভনীয়, সহিংসতাপ‚র্ণ ও লজ্জাজনক!!!
এই ঘটনায় আকাশ থেকে রক্ত বৃষ্টি বর্ষণ হওয়াতে তোমরা আর্শ্চর্য্যবোধ করছো? কিন্তু পর জগতের শাস্তি এর চেয়েও অধিক লাঞ্ছনাদায়ক, কেউ তোমাদের সাহায্যে ছুটে আসবে না! তোমাদেরকে যে সময় ও সুযোগ দেওয়া হয়েছে তার ধোকায় পড় না যে, আল্লাহর অগ্রগামী হচ্ছ না, আল্লাহ ওঁৎ পেতে আছে আর তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্রও ভয় পান না!!!
[লুহুফ, পৃ.১৬৪, এমালী (মুফিদ), পৃ.৩২১, এমালি (তুসী), পৃ.৯১, মানাকিব (ইবনে শাহরে আশুব), খ.৪, পৃ.১১৫, আল-এহতেজাজ (তাবারসী), খ.২, পৃ.৩০৩, বিহারুল আনওয়ার, খ.৪৫, পৃ.১০৮ ও ১৬২।]
হযরত যয়নাব (সা. আ.) বক্তব্য শেষ করার পর কুফার জনগণের উদ্দেশ্যে একটি কবিতা উল্লেখ করেন:
কি উত্তর দিবে যখন রাস‚ল তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে যে, তোমরা শেষ উম্মত হয়ে কি করেছ?
আমার পরিবারবর্গ, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কি করেছ যে, তাদের একদল বন্দী হয়েছে আর অপর দল রক্তের মধ্যে গড়াগড়ি করেছে?!
তোমাদের ক্ষেত্রে আমি যে ভাল অবদান রেখেছিলাম ও কল্যাণময় কাজ করেছিলাম তার প্রতিদান এটা নয় যে আমার পরে আমার পরিবারবর্গের সাথে এমন নোংড়া আচরণ করবে!
এটা সত্য যে, তোমাদের জন্য আমার ঐ ভয় হয় যে, ঐরূপ শাস্তি তোমাদের উপর চলে না আসে, যেরূপ শাস্তি এসেছিল “ইরাম” দেশে “আদ” জাতির উপর।
[আল-এহতেজাজ (তাবারসী), খ.২, পৃ.৩০৩, মানাকিব (ইবনে শাহরে আশুব), খ.৪, পৃ.১১৫, তারিখে দামেশক, খ.৬৯, পৃ.১৭৮, বিহারুল আনওয়ার, খ.৪৫, পৃ.১৬২।]
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) যিনি তাঁর ফুফুর আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন, তিনি সান্ত¡না দেওয়া শুরু করলেন এবং মায়া জড়ানো ভাষায় বললেন: ফুফুজান! আপনি শান্ত হোন ও চুপ করুন, যদি এই জনগণের বুঝার উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে তারা নিজেরা এই ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকেই ভবিষ্যতের শিক্ষা নিত, আল্লাহর প্রশংসা করি যে, তুমি এমন এক জ্ঞান ভান্ডার থেকে জ্ঞান অর্জন করেছ যা সাধারণভাবে শিক্ষা-দীক্ষার দ্বারা অর্জন করা সম্ভব হয় না, তুমি উচ্চতর উপলব্ধির অধিকারীনি, তুমি জান যে, এই অবস্থায় আহাজারী ও অশ্রুপাত কোন সমস্যারই সমাধান বয়ে আনবে না এবং যারা চলে গেছেন তাদের কাউকে ফিরে আনবে না।
621
আগের পোস্ট
