লেখকঃ হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ ইব্রাহিম খলিল রাজাভী
‘সুন্নাত’ বিষয়টি দু’টি অর্থের ধারক। এক, ‘কুরআন ও সুন্নাত’ অপরটি ‘সুন্নাতে রাসূল’ (সাঃ)। অধিকাংশ মানুষ এ দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেন। সে কারণে বিষয়টির ব্যাখ্যা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করি।
‘কুরআন ও সুন্নাত’ একটি ফিকাহগত পরিভাষা। পক্ষান্তরে, ‘সুন্নাতে রাসূল’ ঐ সকল কর্মকে বলা হয় যা মুস্তাহাব অর্থাৎ ইসলাম অনুমোদিত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’তের দৃষ্টিতে কুরআন ও সুন্নাত বলতে قول رسول ‘কাওলে রাসূল’ (সাঃ), فعل رسول ‘ফেল- এ রাসূল’ (সাঃ) ও تقریر رسول ‘তাকরীরে রাসূল’কে (সাঃ) বুঝায়।
কাওলে রাসূল (সাঃ) অর্থাৎ, নবী করিম (সাঃ) যা ইরশাদ রেছেন। যার অপর নাম হাদীসে রাসূল (সাঃ)। ফেল-এ রাসূল (সাঃ) বলতে রাসূল (সাঃ) স্বয়ং যে কর্ম সম্পাদন করেছেন। তাকরীরে রাসূল (সাঃ) অর্থাৎ, আল্লাহর নবীর (সাঃ) উপস্থিতিতে যে সকল কর্ম সম্পাদন করা হয়েছে। এ তিনটি বিষয়ই তাদের দৃষ্টিতে হুজ্জাত বলে বিবেচিত এবং এগুলো হাদীস অথবা হাদীসের সমপর্যায়ের। কিন্তু শিয়াদের নিকট রাসূলে করিম (সাঃ) এর পাশাপাশি মাসুম (আঃ) গণের (এখানে মাসুমগণ বলতে নবী করিম (সাঃ) থেকে ইমাম মাহাদী (আঃ) পর্যন্ত মোট চৌদ্দজনকে বুঝানো হয়েছে) কাওল, অর্থাৎ মাসুম (আঃ) গণ যা ইরশাদ করেছেন, তারা যেসকল কর্ম সম্পাদন করেছেন এবং যে কর্মসমূহ তাঁদের সম্মুখে সম্পাদিত হয়েছে এবং তাতে তাঁরা রাজী বা সন্তুষ্ট ছিলেন তা হুজ্জাত বলে বিবেচিত। ‘কুরআন ও সুন্নাত’ আহকামসমূহের প্রকাশ ও উন্মোচনের একটি মাধ্যম। এটি এমন একটি নীতি বা বিষয় যার মাধ্যমে ঐশী আহকামসমূহ বুঝা যায় এবং প্রকাশ করা যায়। ফিকাহ শাস্ত্রের এটি মূল বিষয় (উসূলে ফিকহ্)। অথচ ‘সুন্নাতে রাসূল’ (সাঃ) সম্পর্কে যথেষ্ট অজ্ঞতা ও ভুল বোঝাবুঝির সৃৃষ্টি করা হয়েছে। কিছু সৃষ্টি করেছে শত্র“রা আবার কিছু অজ্ঞ বন্ধুরা। ‘ইবাদত’ তো আল্লাহর করি তাহলে আবার সুন্নাতে রাসূল কেন’? মূলতঃ ইসলামী শরীয়ত দু’টি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এক ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ, ‘কালেমা তাওহীদ’ এবং অপরটি ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ, মুহাম্মাদ (সাঃ) এর রেসালতের উপর বিশ্বাস স্থাপন। এ দু’টি ভিত্তির কারণে কুরআন ও সুন্নাত (হাদীস) উভয় হুজ্জাত। ইরশাদ হচ্ছে-
من یطع الرسول فقد آطاع الله…(سوره النساء ایت ৮০)
অর্থাৎ, “যে রাসূলের আনুগত্য করল নিঃসন্দেহে সে আল্লাহরই আনুগত্য করল….”(সূরা নিসাঃ ৮০)।
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে- ماء آتاکم الرسول فخذوه وما نهکم عنه فانتهوا (( سوره حشر ایت ৭ (অর্থাৎ…“রাসূল যা কিছু তোমাদের প্রদান করে তা তোমরা গ্রহণ কর, এবং যা হতে তোমাদের নিষেধ করে তা হতে বিরত থাক”…(সূরা হাশরঃ ০৭)
ইরশাদ হচ্ছে- وما ینطق عن الهوی (৩) إن هو إلا وحی یوحی (৪) (سوره النجم) অর্থাৎ, “এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কুরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়” (সূরা আন্-নাজমঃ ৩,৪)।
যে নবী নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। এতে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর কথা ও আমল শরীয়ত ব্যতীত আর কি হতে পারে? তাঁর কথাই শরীয়ত।
ইরশাদ হচ্ছে- لقد کان لکم فی رسول الله اسوة حسنة (سوره الاحزاب ایت ২১ )
অর্থাৎ “…তাঁদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে”। (সূরা আহযাবঃ ২১)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং যখন নবী পাক (সাঃ)- এর পবিত্র সীরাতকে হুজ্জাত আখ্যায়িত করেছেন সেখানে কোন প্রকার প্রশ্ন উত্থাপন করার অধিকার কারো নেই।
মাসুম (আঃ) গণের কথা হুজ্জাত হওয়া প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
قل لا اسئلکم علیه آجرا الا المودة فی القربی و من یقترف حسنة نزد له قیها حسنا.( سوره شوری ২৩)
অর্থাৎ “(হে রাসূল!) তুমি বলে দাও, আমি এর (বার্তা প্রচারের) জন্য তোমাদের নিকট হতে আমার পরমাত্মীয়গণের প্রতি সৌহার্দ্র ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাই না…………”(সূরা শুরাঃ ২৩)।
অত্র আয়াতে ‘পরমাত্মীয়গণ’ বলতে আলে মোহাম্মাদ (সাঃ) কে বুঝানো হয়েছে। বিখ্যাত মুফাস্সির ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী স্বীয় তাফ্সীর গ্রন্থ তাফসীরে কাবীরে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় একই কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন
لا شک آن فاطمة و علیا والحسن والحسین کان التعلق بینهم و بین رسول الله( صلی علیه و آله وسلم) اشد التعلقات و هذا کالمعلوم بالنقل المتواتر فوجب ان یکونوا هم آلال؛
“এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে হযরত ফাতেমা, আলী, হাসান, ও হোসাইনের সম্পর্ক ছিল খুবই গভীর ও ঘনিষ্ট। এ বিষয়টি প্রসিদ্ধ ও মুতওয়াতির হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত। (ওই সকল হাদীসসমূহকে মুতয়াতির হাদীস বলা হয় যেগুলো সমকালীন বহুসূত্রে ও পরম্পরায় বহু সূত্রে বর্ণিত যাতে সন্দেহের অবকাশ থাকেনা এবং ওলামা ও মুজতাহিদগণের নিকট হুজ্জাত বলে বিবেচিত)।
অতঃপর তিনি কাশশাফ গ্রন্থের লেখক আল্লামা ষামাখশারীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন-
لما نزلت هذه الایة قیل یا رسول الله من قرابتک هؤلاء الذین وجبت علینا مودتهم ؟ فقال علی و فاطمة و ابناهما؛ فثبت آن هؤلاء الاربعة آقارب النبی ص ( تفسیر کبیر الجزء ২৭ صفحه ১৬৬)
যে, ‘যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয় তখন নবী করিম (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়-ইয়া রাসূলুল্লাহ! পরমাত্মীয়গণ কারা যাদের প্রতি ভালবাসা ও সৌহার্দ্র আমাদের জন্য ফরজ করা হয়েছে’? নবী করিম (সাঃ) উত্তরে বললেন-“আলী,ফাতেমা ও তাদের দু’সন্তান হাসান ও হোসাইন”।
সুতরাং স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এই চার ব্যক্তিই নবী (সাঃ) এর পরমাত্মীয়। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী অতঃপর বলেন-“আয়াতে উল্লেখিত সৌহার্দ্র বা ভালবাসার অর্থ হচ্ছে আনুগত্য ও অনুস্মরণ করা। দলিল হিসেবে তিনি সূরা আলে ইমরানের ৩১ নং আয়াত এখানে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে – قل ان کنتم تحبون الله فاتبعونی یحببکم الله .(سوره آل عمران ایت ৩১) “হে রাসূল!) বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুস্মরণ কর…..”। সুতরাং ‘ভালবাসা এবং সৌহার্দ্র’র অর্থ হচ্ছে এখানে আনুগত্য ও অনুস্মরণ করা’ (তাফসীরে কাবীর, ২৭নং, পৃঃ ১৬৬)। দলিল বা প্রমাণ হিসেবে স্বয়ং ‘হাদীসে সাক্বালাইনও’
انی تارکم فیکم الثقلین کتاب الله..اهل بیتی
এখানে উল্লেখ করা যায়।
উক্ত হাদীসে বর্ণিত হচ্ছে যে, “আমি তোমাদের মাঝে দুটি মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি, এক আল্লাহর কিতাব অপরটি আমার আহলে বাইত”। (সহীহ মুসলিম, খঃ ৬,পৃঃ ১০২)।
সুন্নাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ঘটনা নতুন কিছু নয় এবং রাসূল (সাঃ) এর ইন্তেকালের সময় একথাই বলা হয়েছিল حسبنا کتاب الله (صحیح البخاری صفحه ২৮৬) “হাসবানা কিতাবাল্লাহ” আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট (সহীহ্ বুখারী, খঃ ৩, পৃঃ ২৮৬)।
আর এভাবে সুন্নাতকে স্পষ্টতঃ অস্বীকার করা হলো। এ কথা বলা অবশ্যই ভুল হবে না যে ‘কুরআন যথেষ্ট’ এ শ্লোগানটি একটি রাজনৈতিক শ্লোগান ছিল। যদিও রাসূল (সাঃ) এর হাদীসসমূহের গুরুত্ব সম্পর্কে তারাও সম্যক জ্ঞাত ছিলেন । শুধুমাত্র হযরত আলী (আঃ) এর ইমামত ও খেলাফতকে অস্বীকার করার স্বার্থে এমন শ্লোগানেরই প্রয়োজন ছিল যার আর একটি নমুনা সে সময় প্রকাশ পায়। সিফ্ফীনের যুদ্ধ চলছিল। পরিস্থিতি আলী (আঃ) এর অনুকূলে। ঠিক সে মূহুর্তে তীক্ষ্ণ বর্শার মাথায় কুরআন উত্তোলন করে لا حکم الا لله “লা হুক্মা ইল্লা লিল্লাহ” এই শ্লোগান তোলা হয়। কুরআন ব্যতীত কোন হুকুম বা হাকিম মানিনা। অর্থাৎ, আলীর সীরাত বা আলীর খেলাফতের কী প্রয়োজন? যদিও আলীর (আঃ) সীরাত রাসূল (সাঃ) এর সীরাত দ্বারাই সুসজ্জিত আর নবীজীর সীরাত আল্লাহর হুকুমে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।
অনেকেই সুন্নাত ও মুস্তাহাবকে আলাদা আলাদা ভাবে বিচার করেন, যার ফলে এক ধরণের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহর আহকাম বা নির্দেশসমূহ বুঝতে হলে এ বিষয়টিও বুঝতে হবে। এক হলো ‘ওয়াজিব’ কর্ম যা সম্পাদন করা অত্যাবশ্যকীয়, সম্পাদন না করলে গোনাহ এবং তা হবে শাস্তিযোগ্য। ‘মুস্তাহাব’ কর্ম হলো যা না করলে কোন গোনাহ নেই, কিন্তু করলে সওয়াবের অংশীদার হবে। অপরদিকে ‘মাকরূহ’ সেই আমলকে বলা হয় যা সম্পাদন না করলে সওয়াব, করলে কোন গোনাহ নেই। ‘হারাম’ তাকে বলা হয় যা করা নিষেধ, করলে গোনাহর ভাগীদার হতে হবে। ‘মুবাহ’ সেই কর্মকে বলা হয় যা সম্পাদন করা না করা সমান। অর্থাৎ, সম্পাদন করলে কোন সওয়াব নেই আবার না করলে কোন গোনাহ নেই। আবার এমন অনেক ‘মুবাহ’ কর্ম আছে যা সম্পাদন করার পর সম্বন্ধ বা গুরুত্বের কারণে সম্মানযোগ্য এবং তা মুস্তাহাব বা ওয়াজিবও হতে পারে। যেমন প্রতীকি ‘আলম’ (পতাকা) বা ‘তাবুত’ বানানো মুস্তাহাব কিংবা ওয়াজিব কর্ম না বরং এটি একটি ‘মুবাহ’ কর্ম। কিন্তু বানানোর পর যেহেতু হযরত আব্বাস (আঃ)-এর আলম অথবা ইমাম হোসাইন (আঃ) এর তাবুতের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে তাই সম্মানের যোগ্য । তেমনি মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার জন্য আপনার দৃষ্টিতে বেশ কয়েকটি গোরস্থান থাকতে পারে। আপনি কোন গোরস্থানে দাফন করবেন এ সিদ্ধান্তটি ‘মুবাহ’। আপনি যে কোন গোরস্থানে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করতে পারেন। কিন্তু দাফন কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর উক্ত কবরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ওয়াজিব বলে বিবেচিত হবে।
অনেকেই বলে থাকেন “আমি মুস্তাহাব কাজ সম্পাদন করি কিন্তু সুন্নাত মানিনা”। যারা একথা বলেন তারা অজ্ঞ। তারা জানেন না যে মুস্তাহাব কর্মই ‘সুন্নাত’। জীবনের সৌন্দর্য ও বসন্ত সুন্নাতের দ্বারাই এবং জীবনের ওয়াজিব কর্ম ছাড়াও মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে মুস্তাহাব কর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মুস্তাহাব কোন আমল হোক অথবা মুস্তাহাব কোন নামাজ, এ সবকিছুই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পাথেয়, জান্নাতের জামিন, মাসুমীন (আঃ)-এর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সর্বোত্তম উপায় এবং ভালবাসার উৎকৃষ্ট দলিল।
যদিও ‘সুন্নাতে রাসূল’ (সাঃ) এমন এক মুস্তাহাব আমল যার কারণে সাওয়াব অর্জন একথারই প্রমাণ বহন করে যে, এটিও শরীয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) শরীয়তের শা’রে অর্থাৎ শরীয়তের বিধানদাতা।###