কেন আশুরার সংস্কৃতি ও হুসাইনি চেতনা সব যুগেই জালিমদের জন্য আতঙ্ক?

by Shihab Iqbal

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি যিনি আমাদের হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র শাহাদতের পবিত্র চেহলাম বা চল্লিশার বার্ষিকী স্মরণ করার তৌফিক দিয়েছেন। একইসঙ্গে দরুদ পেশ করছি বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত এবং বিশেষ করে কারবালার মহান শহীদদের শানে।

আজ বিশে সফর। কালজয়ী কারবালা বিপ্লবের মহানায়ক ইমাম হুসাইন (আ.)’র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এই দিবসটি পালন করে আসছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। বিশেষ করে আহলে বাইতের প্রেমিক মুসলমানরা যুগ যুগ ধরে এ দিবস পালন করে আসছেন সেই ঐতিহাসিক আশুরা বিপ্লবের পর থেকেই। কারণ, এই দিবসটি পালনের জন্য বিশ্বনবী (সা.)’র আহলেবাইতভুক্ত পরবর্তী ইমামরা বেশ গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। তাই দেখা যায় ইসলামের মহাপুরুষদের মধ্য থেকে তাঁদের  জন্ম,ওফাত বা শাহাদতের বার্ষিকী পালন করা হলেও একমাত্র ইমাম হুসাইন (আ.)’রই জন্ম ও শাহাদতের বার্ষিকী ছাড়াও তাঁর শাহাদতের চেহলামও পালন করা হয়।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে: মু’মিনের কয়েকটি লক্ষণের মধ্যে এটাও অন্যতম যে, ইমাম হুসাইন (আ.)’র শাহাদতের চেহলাম উপলক্ষে জিয়ারতে আরবাঈন পাঠ করবে।

আসলে ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের কষ্ট আর মুসিবতগুলো ছিল এত কঠিন ও ব্যাপক যে মানুষের চিন্তা তা কখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। কারবালার শহীদদের আত্মত্যাগ ও মুসিবতের ব্যাপারে যথেষ্ট শোক প্রকাশ করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আর এ জন্যই এই শোক প্রকাশ কখনও বন্ধ করা উচিত নয় বলে ইসলামের মহান নেতৃবৃন্দ, আলেম ও চিন্তাবিদরা মনে করেন।

ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন, আশুরার ঘটনার পর আকাশ ও জমিন চল্লিশ দিন কেঁদেছে, সূর্য চল্লিশ প্রভাত গ্রহণের মাধ্যমে ও লাল রং ধারণ করে কেঁদেছে… ফেরেশতারাও চল্লিশ প্রভাত তাঁর (তথা ইমাম হুসাইন আ.’র) জন্য কেঁদেছেন।

মুমিনদের হৃদয়ে ইমাম হুসাইন (আ.)’র জন্য শোকের উত্তাপ কখনও কমবে না, বরং তা বাড়তে থাকবেই বলে বিশ্বনবী (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। আজ পবিত্র কারবালায় মহররম ও সফর মাসে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ আসছেন এবং কেবল ইরান ও ইরাকেরই কোটি কোটি মানুষ শোক পালন করছেন আশুরা ও আরবাইনের দিনে। অথচ এমন সময়ও গেছে যখন উমাইয়াদের যুগে আলী, হাসান, হুসাইন, ফাতিমা-এসব নাম রাখতে দেয়া হত না এবং হত্যা ও নির্যাতনের ভয়ে সন্তানদের জন্য এইসব পবিত্র নাম রাখতে সাহস করতেন না অনেক পিতা-মাতা।  আব্বাসীয় যুগেও কোনো কোনো জালিম শাসক কারবালায় জিয়ারত করতে যেতে দিত না মুসলমানদের। তারা এই মহাপুরুষের কবর জিয়ারতের শাস্তি হিসেবে হাত কেটে দিতেন। এমনও দেখা গেছে, একবার জিয়ারতের পর দ্বিতীয়বারও কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)’র পবিত্র মাজার  জিয়ারত করতে প্রস্তুত  হুসাইন-প্রেমিক ব্যক্তি বলছেন, এবার আমার দ্বিতীয় হাতটিও কেটে ফেলুন যাতে দ্বিতীয়বার ইমামের মাজার জিয়ারত করার অনুমতি পাই।!

ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম হুসাইন (আ.)’র কর্তিত শির মুবারক তাঁর শাহাদতের পর চল্লিশতম দিনে সিরিয়া থেকে কারবালায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং তা ইমামের পবিত্র শরীরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ইমাম জাইনুল আবেদীন অলৌকিকভাবে কুফার কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে ইমাম  হুসাইন (আ.)সহ কারবালার অন্যান্য শহীদদের লাশ দাফন করেছিলেন। অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে, বনি আসাদ গোত্রের লোকেরা পাশের গ্রাম থেকে এসে জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছিল। তবে আগের বর্ণনার তুলনায় এই বর্ণনাটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল।

যাই হোক, আজকের এই দিনে তথা বিশে সফর নবী-পরিবারের বন্দীরা মদীনায় ফিরে এসেছিলেন। আশুরার ঘটনার প্রায় বিশ দিন পর তাঁদেরকে সিরিয়ায় ইয়াজিদের দরবারে হাজির করা হয়েছিল। কিন্তু নবী পরিবারের পক্ষ থেকে হযরত জাইনাব  (সা.) এবং হযরত ইমাম জাইনুল আবেদীন ইবনে হুসাইন (আ.)’র বীরত্বপূর্ণ ভাষণের প্রভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ইয়াজিদের রাজ-দরবার। কারবালার প্রকৃত ঘটনা এবং নবী-বংশের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধির পাশাপাশি উমাইয়াদের নৃশংসতা ও মহাপাপের বিষয়গুলো জনগণের কাছে ফাঁস হয়ে পড়ায় গণ-অনুশোচনা ক্রমেই গণ-বিদ্রোহের রূপ নিতে থাকে।

সিরিয়ার চার হাজার ব্যক্তি ইয়াজিদের প্রাসাদে তার ওপর ঝটিকা হামলা চালিয়ে তাকে হত্যারও পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু পরিকল্পনাটি ফাঁস হয়ে যাওয়ায়  তা ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় ইয়াজিদ নবী-পরিবারকে সসম্মানে মদীনায় পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। শুধু তাই নয় এর আগে নবী-পরিবারের দাবি ও জনগণের চাপের মুখে ইয়াজিদ নিজেও সিরিয়ায় নবী পরিবারের শহীদদের জন্য শোক-প্রকাশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছিল। ইয়াজিদের এক স্ত্রীও শোক-প্রকাশের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায়।

নবী-পরিবারের সদস্যরা মদীনায় পৌছলে সেখানেও শোকে ব্যাকুল হয়ে পড়েন গোটা মদীনাবাসী। শোকে ব্যাকুল হয়ে পড়েন রাসূল (সা.)’র স্ত্রী উম্মে সালমা(সা. আ.)। হুসাইন (আ.)’র শাহাদতের খবর শুনে বেহুঁশ হয়ে পড়েন তাঁর সৎ ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া (আ.)। হযরত আলী (আ.)’র স্ত্রী উম্মুল বানিন জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে কারবালার শহীদদের জন্য শোক প্রকাশ করতেন। হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.)সহ  নিজের চার পুত্রকে কারবালায় উৎসর্গ করেছিলেন এই মহিয়সী নারী। তাঁর শোকের কবিতাগুলো শুনে তৎকালীন উমাইয়া শাসকদের চোখেও দরদর করে নেমে আসত পানি।

কারবালার শহীদদের জন্য শোক প্রকাশ, নিজে কাঁদা ও অন্যান্যদের কাঁদানোর মধ্যে অফুরন্ত সাওয়াব রয়েছে বলে অনেক হাদীস ও ইসলামী বর্ণনা রয়েছে। এইসব বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম হুসাইন (আ.)ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য শোক-প্রকাশকারীরা বেহেশতের অধিকারী হবেন। কারবালার শহীদদের জন্য কবিতা ও মর্সিয়ার মাধ্যমে শোক প্রকাশ এ কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে এর মাধ্যমে প্রকৃত ইতিহাস ও ঘটনার চর্চা হয়েছে এবং জালিমরা তা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়নি।

আশুরার শোক-প্রকাশের সংস্কৃতি কারবালার মহাশোককে পরিণত করেছিল মহাশক্তিতে। ফলে তীব্র গণ-অসন্তোস ও গণ-বিদ্রোহের মুখে উমাইয়া রাজশক্তির আয়ু দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। জনগণ ও আব্বাসীয়রা নবীবংশের কাছে  ইসলামী খেলাফত ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলে এবং নির্মূল হয় উমাইয়া রাজবংশ। অবশ্য আব্বাসীয়রা সফল ও জনপ্রিয় এই আন্দোলনের পর নিজেদের শ্লোগান ও প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে নবীবংশের প্রাপ্য খেলাফতকে জবরদখল করে এবং তারা নবীবংশের সঙ্গে পরবর্তীতে উমাইয়াদের চেয়েও কঠোর আচরণ করেছে। এমনকি তারা নবীবংশের ইমামগণকে শহীদও করেছে,যদিও  মামুনের মত কোনো কোনো আব্বাসীয় শাসক নবীর (সা.) আহলে-বাইতের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার ভান করেছিল।

আশুরার শোক-প্রকাশের সংস্কৃতি যুগে যুগে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সত্যপন্থী মানুষকে প্রেরণা যুগিয়েছে। আর এ জন্যই জালিম শাসকরা সব যুগেই আশুরার সংস্কৃতি ও হুসাইনি বিপ্লবের চেতনাকে ভয় পেয়েছে। এ কারণেই কথিত ধর্মীয় অজুহাতের মিথ্যা দোহাইসহ নানা অজুহাতে তারা আশুরার শোক প্রকাশকে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছে ও কারবালার ঘটনা বর্ণনার চেয়ে অন্য ঘটনাগুলো বর্ণনা করাকেই তারা প্রাধান্য দেয়।

আব্বাসীয় যুগের কোনো কোনো জালিম শাসক ভেঙ্গে দিয়েছিল ইমাম হুসাইনের (আ.) মাজার। ধর্মান্ধ ওয়াহাবিরাও ভেঙ্গে দিয়েছিল এই মহান ইমামের মাজার। এখনও সুযোগ পেলে এরা তাই করবে।

কারবালা বিপ্লব ইসলামের উচ্চতর লক্ষ্য ও শিক্ষাগুলোকে ধারণ করে আছে। কেবল তা-ই নয় এ মহাবিপ্লব অজস্র মহত্তম মূল্যবোধ ও গুণাবলীর সুতিকাগার। এ মহাবিপ্লব এমন এক মহাসাগর যেখান থেকে মানুষ পেতে পারে সব ধরণের কল্যাণের অজস্র মুনি-মুক্তা। একজন মানুষ যদি নিজেকে পবিত্র ও সংশোধন করতে চায় তথা নিজের আমিত্ব বা নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাহলে কারবালার আত্মত্যাগের শিক্ষাই তার জন্য যথেষ্ট।

কেউ যদি খোদাপ্রেম, মানবতা, স্বাধীনতা, আত্ম-মর্যাদা ও বীরত্বের শিক্ষা নিতে চায় তার জন্য কারবালার শহীদদের স্মৃতিচারণ অপরিহার্য। কেউ যদি ইসলামের সত্যিকারের ইতিহাস জানতে চায় তাহলে কারবালার ঘটনাবলীর পটভূমি বিশ্লেষণ করেই তিনি বুঝতে পারবেন কিভাবে ইসলামের সত্যিকারের চেতনাগুলোকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং কিভাবে ভিলেন বা মতলববাজ সুবিধাবাদীদেরকে মহানেতা কিংবা বীর আর প্রকৃত নেতা ও বীরদেরকে অতি সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের মহান আত্মত্যাগ কায়েমী স্বার্থবাদীদের হাতে ইসলামকে চিরতরে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে। আসলে ইয়াজিদ ও তার দলবল ইসলামকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্যই পৃথিবীর ইতিহাসে নির্যাতন, নৃশংসতা,পাশবিকতা ও বর্বরতার নজিরবিহীন প্রয়োগ ঘটিয়েছিল মহামানব ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন মানব জাতির এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠ সংরক্ষক।

আজ বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীনচেতা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ কারবালা বিপ্লবের এই মহামানবদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে গর্ব বোধ করে। সেই শ্রেষ্ঠ শহীদদের সুবাদেই মুসলমানরা বুঝতে পেরেছেন যে, প্রকৃত ইসলাম তথা মুহাম্মদী ইসলামের ধারা কোনটি। বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান ও চিন্তাশীল মানুষ মনে করেন যে, এমন আত্মত্যাগের ঘটনা নজিরবিহীন এবং  তাঁদের খোদাপ্রেম ও আনুগত্যের তুলনায় পরবর্তী যুগের সবার খোদাপ্রেম, আত্মত্যাগ ও আনুগত্য তুচ্ছই থেকে যাবে। কারবালার শহীদদের কাছে গোটা মানব-জাতি নানা দিক থেকে চির-ঋণী। তাই দেখা যায় প্রতিটি হৃদয়বান মানুষই অশ্রুপাত করে সেই মহাপুরুষদের কাছে নিজেদের হীনতা, ক্ষুদ্রত্ব ও অক্ষমতা প্রকাশ করেন। কারণ, সবাই এটা বোঝেন যে, এই মহাপুরুষদের বিশাল উচ্চ মর্যাদা অতিক্রম করার সাধ্য ও যোগ্যতা নিয়ে পৃথিবীতে আর কেউ জন্ম নিবেন না।

অবশ্য হযরত ইমাম মাহদী  (আ.) ইমাম হুসাইন (আ.)’র অনুসারী হিসেবেই কারবালার মহাবিপ্লবের লক্ষ্যকে দান করবেন পরিপূর্ণতা বিশ্বব্যাপী মুহাম্মদী ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তাই হুসাইনি আন্দোলনের প্রেমিকদেরকে প্রস্তুত হতে হবে সেজন্য এবং এই মহাবিপ্লবের গর্বিত সদস্য হওয়ার জন্য সব দিক থেকে গড়ে তুলতে হবে নিজেদেরকে, যেমনিভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন কারবালার সেই ৭২ জন শহীদ এবং আধুনিক যুগে ইমাম খোমেনী (র.) ও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিরা। সৃষ্টির প্রথম থেকেই  হযরত আদম (আ.) ও শয়তানের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব  শুরু হয়েছে সেটি অব্যাহত থাকবে এবং ইমাম মাহদী (আ.)র চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যমে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে।

ভারতের সুন্নি মনীষী আবদুল্লাহ ইউসুফ আলী তার লেখা পবিত্র কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ ও তাফসির গ্রন্থে সুরা সাফফাতের ১০৭ নম্বর আয়াতে যে ‘জিবহিন আজিম’ বা ‘বড় কুরবানি’ শব্দটি এসেছে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে ইমাম হুসাইন (আ.)’র আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করেছেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানির পরিবর্তে এই ‘বড় কুরবানি’র কথা এসেছে এই আয়াতে। অন্য অনেক তাফসিরকারকরাও ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী মনে করেন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো একটি ভেড়া বা দুম্বা, কুরবানি হিসেবে ইসমাইলের (আ.) মত নবীর চেয়ে বড় বা তার বিকল্প হতে পারে না।   (দুঃখজনকভাবে ইউসুফ আলীর মৃত্যুর পর প্রকাশিত একই বইয়ের পরবর্তী সংস্করণগুলোতে এই ব্যাখ্যাটিসহ বিশ্বনবী –সা.’র পবিত্র আহলে বাইতের প্রথম চার সদস্য তথা আলী-আ., ফাতিমা-সা.আ, হাসান-আ. ও হুসাইন-আ.’র ফজিলত সংক্রান্ত লেখকের ব্যাখ্যাগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না।)

বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ সরকারই বর্তমান যুগের ইয়াজিদ আমেরিকা কিংবা অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে আছে। তাদের মধ্যে সেই বিপ্লবী চেতনা নেই যা সেদিন ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালার মাধ্যমে আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। অবশ্য বর্তমান যুগে মহান  ইমাম খোমেনী (র.) সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের ইসলামি আন্দোলনেও কারবালা বিপ্লবের চেতনার অভাব দেখা যায়। ফলে এইসব আন্দোলনের নেতারা লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাবির পাশাপাশি পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে জালেমদের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। তারা একদিকে ইসরাইল ও আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতা করছেন অন্যদিকে নিজ দেশের জনগণকে নিয়ে স্বাধীনও থাকতে চান।

ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তার সবকিছুই কারবালার প্রান্তরে চিত্রিত হয়েছিল। ইসলামের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ইমাম হুসাইন (আ.) ছাড়াও তাঁর পরিবারের ১৮ সদস্যও শাহাদাত-বরণ করেছেন। ইমাম জাইনুল আবেদীন ওই ১৮ সদস্য সম্পর্কে বলেছেন, সমকালীন সময়ে তাঁদের মতো উত্তম মানুষের অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল না। তাঁদেরকে ইমাম হুসাইন (আ.) ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছেন। আর এটিই কারবালার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আমরা যখনই ইসলামের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন হতে দেখি তখনই তার প্রতিবাদ করা উচিত তা শক্ররা যত শক্তিশালীই হোক না কেন। ইমাম হুসাইন (আ.) কারবালায় ৩০ হাজার সৈন্যর মোকাবেলায় মাত্র ৭২ জন সৈন্য নিয়ে জিহাদ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, কোনভাবেই  দায়িত্বে অবহেলা করার সুযোগ নেই। অথচ তাঁরা ইচ্ছে করলে নানা অজুহাত দেখিয়ে ওই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারতেন অন্য অনেক সাহাবির মত এবং নিতে পারতেন দুনিয়াবি নানা সুযোগ-সুবিধা।

ইমাম হুসাইন (আ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের মর্ম অনুযায়ী, “আল্লাহ মানুষকে এ জন্য সৃষ্টি করেছেন যাতে তারা আল্লাহকে চিনতে পারে, আর আল্লাহকে ভালভাবে চিনতে পারলেই তারা আল্লাহর ইবাদত করতে পারবে সঠিকভাবে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যদের উপাসনা করবে না। আর আল্লাহকে ভালভাবে চিনতে হলে নিজ যুগের ইমামকে চেনা অপরিহার্য।”

তাই আমাদেরকে চিনতে হবে ইসলামের প্রকৃত নেতৃবৃন্দকে এবং বিশেষভাবে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে যিনি ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)’র হাদীস অনুযায়ী মুক্তির তরণী ও হেদায়াতের প্রদীপ। ইমাম হুসাইন (আ.)’র সেই বিপ্লব না হলে আজ মুসলমানরা থাকতো অজ্ঞতার এমন গভীর আঁধারে যে তারা সৌভাগ্য বা মুক্তি তো দূরে থাক জাহান্নামের পথে চিরবন্দী হয়ে থাকা ছাড়া তাদের জন্য অন্য কোনো পথই খোলা থাকতো না। অন্য কথায় যারা ইমাম হুসাইন (আ.)’র বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেবে না, তারা মুক্তির তরণী ও সৌভাগ্যের নাগালও পাবে না। (রেডিও তেহরান)

সম্পর্কযুক্ত পোস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
লিংক কপি হয়েছে ✔