কোরআন ও হাদীসে আত্মমর্যাদাবোধ
ইসলামে যেমন প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রামের নির্দেশ সম্বলিত বাণী- উদাহরণস্বরূপ-
موتوا قبل أن تموتوا، إنّ النّفس لامّارة بالسوء نهی النّفس عن الهوی এবংقَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا রয়েছে তেমনি আত্মমর্যাদাবোধের প্রতিও দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। তার নমুনা হচ্ছে সূরা মুনাফিকুনের এ আয়াত-وَلِلَّـهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ “ সম্মান আল্লাহ্,তার রাসূল ও মুমিনদের জন্য।” কোরআন বলেনি যে,আত্মমর্যাদাবোধ আত্মপূজার শামিল। মানুষ যেহেতু প্রকৃতিগতভাবেই অন্য মানুষের মুখাপেক্ষী তাই প্রয়োজন উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি (আত্মসম্মানবোধ) লক্ষ্য রাখার জন্য উপদেশ দিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন,اطلبوا الحوائج بعزّة الآنفس “ তোমার প্রয়োজনকে আত্মসম্মান বজায় রেখে চাও” অর্থাৎ কারো নিকট ব্যক্তিত্ব হানী করে কিছু চেয়োনা। তাতে তোমার সম্মান থাকবে না। প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের অজুহাতে ভিক্ষুকের মতো কারো নিকট কিছু চাইবে না। কারণ ইসলাম তার অনুমতি দেয় না। যদি প্রয়োজনে মানুষের দ্বারস্থ হতে হয় তাহলে আত্মসম্মান বজায় রেখে তা চাও ও নাও।
লক্ষ্য করুন আলী (আ.) যুদ্ধের ময়দানে কি বলছেন, তোমাদের প্রকৃত মৃত্যু অন্যের আনুগত্যের মধ্যে বেঁচে থাকা এবং প্রকৃত জীবন হলো স্বাধীনভাবে মৃত্যু লাভের মধ্যে।” (নাহজুল বালাগাহ্,খুতবা নং ৫১) এখানে তিনি আত্মমর্যাদাবোধের কথাই বলেছেন।
ইমামা হুসাইন (আ.) বলেন,موت فی عزّ خیر من حیاة فی ذلّ “ সম্মানের সঙ্গে মৃত্যু অসম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা অপেক্ষা উত্তম।” (মুলহাকাতু ইহকাকিল হাক্ব) ইমাম হুসাইনের দর্শন এটা বলে না যে,নাফসের সাথে সংগ্রামের অজুহাতে ইয়াযীদ ও ইবনে জিয়াদের নিকট আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দিতে হবে। তাই তিনি বলছেন,
الا و انّ الدّعیّ ابن الدّعی قد رکز بین السلّة و و الذلّة و هیهات منّا الذلة یابی الله ذلک لنا و رسوله و المؤمنون و حجور طابت و طهرت
“ জিয়াদের পুত্র,এই কাপুরুষের পুত্র কাপুরুষ আমাকে এ দু’ শর্তের মধ্যে ফেলেছে,হয় অপমানকে গ্রহণ করব (বাইয়াত করব),নতুবা যুদ্ধ। অপমান আমাদের থেকে দূরে। আল্লাহ্,তার রাসূল (সা.)এবং মুমিনীন আমাদের জন্য তা কখনও মেনে নিতে পারে না।” (লুহুফ ইবনে তাউস,পৃ. ৮৫)
এ কথার মাধ্যমে তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করছেন না,বরং বলতে চাচ্ছেন,আমার দীন আমাকে এ অনুমতি দেয় না,আমার স্রষ্টা এ কাজকে অনুমোদন করেন না। নবীও তা চান না। যে পিতা-মাতার ক্রোড়ে আমি মানুষ হয়েছি তারা তা পছন্দ করেন না। আমি হযরত ফাতেমা যাহরার দুগ্ধে প্রতিপালিত হয়েছি। এ দুগ্ধ আমাকে এ কাজের অনুমতি দেয় না। ফাতেমা (আ.) আমাকে ডেকে যেন বলছেন : হুসাইন! তুমি আমার দুগ্ধে মানুষ হয়েছ,যে আমার দুগ্ধে প্রতিপালিত হয়েছে সে অপমানকে মেনে নিতে পারে না।” তাই ইমাম হুসাইন বলেননি,“ ইবনে জিয়াদ যা করার করুক,চলো আমরা তার বাইয়াত গ্রহণ করি। সে তো আমাদের অপমান ছাড়া কিছু করবে না। যত অপমান হবে তত নাফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হবে।” না,তিনি কখনই তা করতে পারেন না। বরং বলেছেন,لا والله لااعطیکم بیدی اعطاع الذّلیل و لا افرّ فرار العبید “ আমি কখনই তোমাদের দিকে অপমানের হাত প্রসারিত করব না। কোন দাসের মতো পলায়ন করব না।” অন্য রেওয়ায়েতে“ কোন দাসের মতো স্বীকার করবনা” এসেছে। এ ধরনের বক্তব্য কোরআনে এবং ইমামগণের বাণীতে বিশেষত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কথায় প্রচুর এসেছে।
যুবকদের প্রতি উপদেশ
জাভিদ মসজিদে আমি যে বিষয়টি বলেছি এখানে তার পুনরাবৃত্তি করছি। সেখানে এক বৈঠকে ইমাম হুসাইনের বাণী বলে প্রচারিত‘ জীবন বিশ্বাস (আকীদা) ও সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়’ কথাটি যে ইমাম হুসাইনের নয় তা বলেছি। কারণ কোন ইসলামী গ্রন্থেই এর পক্ষে কোন দলিল নেই। এ বাক্যের অর্থও সঠিক নয় এবং ইমাম হুসাইনের যুক্তির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামের যুক্তি এরূপ নয় যে,মানুষ তার জীবনের জন্য কোন বিশ্বাসকে গ্রহণ করবে এবং তার জন্য সংগ্রাম করতে থাকবে। ইসলামে বিশ্বাসের চেয়ে সত্যের প্রতি গুরুত্ব অধিক। তাই জীবনের অর্থ সত্যের অনুসন্ধান এবং সত্যের জন্য সংগ্রাম। বিশ্বাসের জন্য সংগ্রাম একটি পাশ্চাত্য চিন্তাপ্রসূত বিষয় যা পাশ্চাত্যে ছিল এবং পরবর্তীতে মুসলমানদের মধ্যে প্রচার লাভ করেছে।
তোমার চিন্তাকে তোমার জীবনের জন্য হাতিয়ার হিসেবে ধর এবং এর দ্বারা সংগ্রামে লিপ্ত হও। জীবন আকীদা ও সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়- এ কথাগুলো যে ইমাম হুসাইন থেকে নয় তা বলায় কিছু যুবক মর্মাহত হয়েছে। কারণ এ বাক্যগুলোকে তারা পছন্দ করেছে এবং ভাবছে যদি তা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নিকট থেকে হয় তাহলে কত উত্তম! প্রথমত আমি আমাদের পূর্বসূরিদের মতো যুবকদের ও সত্যানুসন্ধানী বলে সম্মানের পাত্র বলে মনে করি। যুক্তিহীনভাবে কোন বিশ্বাসের প্রতি গোঁড়ামি পছন্দনীয় নয়। যদি এমন হয় যে,নতুন প্রজন্মের মাথায় কিছু ঢুকলে তা বের করা সম্ভব হয় না,সে বিষয়ে কথা বলা যায় না,তবে এ প্রজন্মকে স্থবির প্রজন্ম বলতে হবে। তাহলে দেখা যাবে একজনের একটি কথা ভাল লেগেছে সে সেটা আঁকড়ে ধরবে,অন্য জন অন্য একটি কথাকে অনুরূপভাবে।
দ্বিতীয়ত এখন তোমরা তোমাদেরই এক বন্ধুর মুখে শুনতে পেয়েছ যে,এ কথাটি ইসলামের যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং কোন ইসলামী গ্রন্থে এ কথার ভিত্তি নেই। ধরা যাক,তোমাদের শত্রু ও অমুসলমান কোন ব্যক্তি তোমাদের সব সময় বলতে থাকে‘ জীবন বিশ্বাস ও সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়’ এ কথাটি ইমাম হুসাইনের। তোমাদের প্রশ্ন করা উচিত,জনাব,ইমাম হুসাইন যা যা বলেছেন তা কোননা কোন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে অবশ্যই রয়েছে। ইমাম হুসাইনের এ কথাটি কোন্ গ্রন্থে রয়েছে তা আমাকে দেখিয়ে দিন যাতে করে যারা বলে এ কথাটি ইমাম হুসাইনের নয় তাদের নিকট প্রমাণ করতে পারি যে,এটা ইমাম হতে। কিন্তু কোথাও তা খুজে না পেয়ে অবশেষে আমাকে যখন বলবে,“ আমাদের মধ্যে প্রচলিত এ কথাটি ইমাম হুসাইনের নয় তা কেন আমাদের জানাননি? কেন আপনারা (আলেমরা)এ বিষয়ে এতদিন নীরব থেকেছেন?”
তৃতীয়ত তোমরা যদি বিপ্লবী বাণীসমূহের প্রতি আসক্ত হয়ে থাক,তবে‘ জীবন বিশ্বাস ও সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়’ -এ কথা অপেক্ষা শতগুণ বিপ্লবী বাণী ইমাম হুসাইন হতে রয়েছে। আজকের বৈঠকে ইইমাম হুসাইনের যে বাণীটি-‘ সম্মানের মধ্যে মৃত্যু অপমানের সঙ্গে বেঁচে থাকা হতে উত্তম’ -পড়েছি সেটি বেশি বিপ্লবী নাকি‘ জীবন বিশ্বাস ও সংগ্রাম ছাড়া কিছু নয়’ এটি? অথবা‘ অপমান হতে মৃত্যু শ্রেয়। অপমান জাহান্নামে প্রবেশ হতে উত্তম’ (নাফ্সিল হুমুম,পৃ. ১২৭; বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৭৮,পৃ ২১৯.)-এ কথাটি অধিক বিপ্লবী।
এরূপ অসংখ্য বিপ্লবী বাণী,যেমন‘ এই কাপুরুষের পুত্র কাপুরুষ আমাকে দু’ শর্তের মধ্যে ফেলেছে- অপমান নতুবা যুদ্ধ। অপমান আমাদের কখনও স্পর্শ করতে পারে না। আল্লাহ্,তার রাসূল ও মুমিনগণ আমাদের জন্য কখনও তা মেনে নিতে পারে না। আমাদের হারিম পাক ও পবিত্র।” (লুহুফ,পৃ. ৮৫) এবং“ যারা জীবনকে আমাদের জন্য উৎসর্গ করবে এবং আল্লাহর সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্যের জন্য আগ্রহী তারা আমাদের সঙ্গে আস। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি যাত্রাশীল।” (লুহুফ,পৃ.৫৩; কাশফুল গাম্মা,পৃ. ১৮৪)
সুতরাং আমাদের বিপ্লবী বাণীর দারিদ্র্য নেই। যদি বিপ্লবী বাণীর দারিদ্র্য থাকত তদুপরি বলা ঠিক হতো না যে,এ বাণীটি ইমাম হুসাইনের। আল্লাহর নিকট এরূপ কর্ম হতে আশ্রয় চাই। তবে বাস্তবতো এর বিপরীত কথাই বলে। আমাদের নিকট ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নিকট থেকে,এমনকি তার পিতা,মাতা,সন্তানদের নিকট থেকেও এত অধিক বিপ্লবী বাণী রয়েছে যে,বিশ্ব তা থেকে ধার নিতে পারে। তাই কেন আমরা অন্যদের ভ্রান্ত বাণীকে ধার করব? নতুন প্রজন্মের তাই এ গোঁড়ামি থাকা উচিত নয়।
তদুপরি আমি দাবি করছি,যদি কেউ এসে প্রমাণ করতে পারেন এ বাণীটি ইমাম হুসাইনের তাহলে এ মিম্বারে এসেই আমি ভুল স্বীকার করব। কিন্তু আমাদের অবশ্যই উচিত প্রামাণ্য কথা বলা এবং অপ্রামাণ্য কথা বলা থেকে দূরে থাকা। যেহেতু সময় শেষ হয়ে গেছে (যদিও এ বিষয়ে প্রচুর কথা রয়েছে) সেহেতু এখানেই শেষ করছি।
আমাদের আলোচনার যা মূল ছিল তা হলো সুফী সাহিত্যে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে এতটা বাড়াবাড়ি করা হয়েছে যে,কখনো কখনো আত্মসম্মানবোধের হানী হয়েছে। যদি এ বিষয়টিকে ইসলামী মানদণ্ডের সঙ্গে যাচাই করি তবে দেখব এ বিষয়টির সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
(সূত্র : ইনসানে কামেল লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী )