সারা দিন রোযা পালন শেষে ইফতারির পর আমরা এক আত্মিক ও মানসিক স্বস্তি অনুভব করি। আর এমন স্বস্তির কারণ হচ্ছে রোযারত অবস্থাতে আত্মসংযমের কারণে আমাদের মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ তাকওয়া ও খোদাভীতি সৃষ্টি হয়, তা আমাদেরকে আল্লাহর প্রকৃত বান্দা হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি তারই নির্দেশিত পথে পরিচালিত হতে অনুপ্রাণিত করে। রোযার কারণে আমরা প্রতিদিন ফজরের সময় থেকে মাগরিবের পর পর্যন্ত নানাবিধ বিষয়াবলি এমনকি হালাল পানাহার থেকেও বিরত থাকি। কিন্তু ইফতারির পর দিনের অনেক বিধি-নিষেধ থেকে আমরা স্বাধীন হয়ে যাই। এ বিষয়টিও আমাদের মধ্যে স্বস্তির অন্যতম কারণ। মূলতঃ রোযা পালনের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে নাফসের লাগামহীন চাহিদার বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর স্বাধীন বান্দা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। এক কথায় বলা যায় যে, মানুষ যতই নিজেদেরকে প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে, ততই আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হিসেবে গড়ে উঠবে।
রোযার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে অভ্যন্তরীণ তাকওয়াকে সুদৃঢ় করা। রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে,
رب صائم حَظهُ مِن صِيامه الجوع والعطش، و رُبَّ قَائِمٍ حَظِّهُ مِن قِيَامِهِ السَّهَرُ.
“অনেক রোযা আছে যা কেবল ক্ষুধা ও পিপাসিত অবস্থায় থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর রাতের অনেক নামায শুধু নির্ঘুম রাত্র জাগরণ বৈ কিছুই না।”(বিহারুল আনওয়ার খন্ড ৯৬ )’ অর্থাৎ, শুধুমাত্র পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই রোযা নয়; বরং প্রকৃত রোযা বলতে এমন রোযাকে বুঝান হয়, যে রোযার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঈমান ও তাকওয়াও মজবুত হবে। কেননা এমনও রোযাদার আছে যে বাহ্যিকভাবে পানাহার থেকে বিরত থাকে, কিন্তু নিজেকে অন্যায় ও পাপকর্ম থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই এমন বাহ্যিক রোযা তার ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে কোন ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে না। এ সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে আরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
অভ্যন্তরীণ তাকওয়া আমাদের মন ও অন্তরের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর এরূপ তাকওয়ার কারণে আমরা নিজেদের মন ও অন্তরে
আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে স্থান দেই না। অন্তরের তাকওয়া বলতে বুঝায় একমাত্র আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়কে পছন্দ করব এবং আল্লাহ যা কিছু অপছন্দ করেন সেগুলো পছন্দ করব না। অবশ্য এখানে একটি বিষয় জানা প্রয়োজন তা হচ্ছে, আমরা কিভাবে বুঝবো যে, আমাদের মন ও অন্তরে আল্লাহর ভক্তি রয়েছে কিংবা তা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত। এ সম্পর্কে হযরত ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.) অত্যন্ত চমৎকার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি
বলেন,
إِذا أَرَدْتَ أَنْ تَعْلَمَ أَنَّ فِيكَ خَيْراً فَانْظُرْ إِلَى قَلْبِكَ فَإِنْ كَانَ يُحِبُّ أَهْلَ طَاعَةِ اللَّهِ وَ يُبْغِضُ أَهْلَ مَعْصِيَتِهِ فَفِيكَ خَيْرٌ وَ اللَّهُ يُحِبُّكَ وَ إِنْ كَانَ يُبْغِضُ أَهْلَ طَاعَةِ اللَّهِ وَ يُحِبُّ أَهْلَ مَعْصِيَتِهِ فَلَيْسَ فِيكَ خَيْرٌ وَ اللَّهُ يُبْغِضُكَ وَ الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ.
“যখন তোমরা জানতে চাইবে যে, তোমাদের মধ্যে কল্যাণ আছে কিনা; তখন তোমরা নিজেদের অন্তরের প্রতি দৃষ্টি দাও। যদি তোমাদের
অন্তরে আল্লাহর অনুগত ও নেক বান্দাদের প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা বিদ্যমান এবং পাপী ও মন্দ লোকদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ পায়; তবে জানবে যে, তুমি
কল্যাণের পথে আছ এবং আল্লাহর মহব্বত তোমার অন্তরে রয়েছে। পক্ষান্তরে, যদি অনুভব কর যে, তোমরা পাপী ও আল্লাহর অবাধ্যদের প্রতি
দূর্বল এবং সৎ ও নেক বান্দাদের প্রতি বিদ্বেষপোষণ করছ; তাহলে জেনে রাখ যে, তুমি কল্যাণের পথে নেই এবং আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেন না।
আর প্রত্যেক ব্যক্তিই যাদের প্রতি ভক্তিপোষণ করে, তাদের অন্তর্ভুক্ত।(“উসূলে কাফী খন্ড ৩)
আমাদের অন্তরে কার প্রতি ভক্তি ও ভালবাসা আছে এবং কার প্রতি নেই, তা অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও খোদামুখী করা প্রয়োজন। আর এমনটি কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন আমাদের অন্তরে তাকওয়ার সঞ্চলন ঘটবে। আমাদেরকে যে কোন পদক্ষেপের পূর্বে বিবেচনা করা উচিত যে, এ পদক্ষেপের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত নাকি অসন্তুষ্টি। যদি আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, এ কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে, তবেই অগ্রসর হওয়া উচিত নতুবা সে কাজকে বর্জন করা জরুরী।